বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম যে গ্রন্থটি রচিত হয় তার নাম চর্যাপদ। চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যে একটি বড় স্থান দখল করে আছে। বাংলা সাহিত্যে চর্যাপদের সাহিত্যিক মূল অপরসীম। প্রাচীন যুগে রচিত এই গ্রন্থ, আমাদের সেই সমায়ের সমাজচিত্র, ধর্ম, অর্থনীতি জীবন ব্যবাস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তার ধারণা দেয়। চর্যাপদের কবিরা বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন সময়ে বর্তমান ছিলেন বলে তাদের দেখা সমাজ একরকম ছিলো না। চর্যাপদের মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে প্রত্যক্ষ চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে।
চর্যাপদে আমরা আতি সাধারণ মানুষের জীবন প্রণালী দেখতে পাই। যেখানে নিম্ন স্তরের মানুষের প্রাধ্যন্য ছিলো। কোনো রাজা বা দেব দেবীর কাহিনী চর্যাপদে স্থান পায়নি। সমাজে যারা লঞ্ছিত, বঞ্চিত যাদের কোনো অধিকার নেই তাদের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এ সম্পর্কে সুকুমার সেন বলেছেন-
“সমসাময়িক তুচ্ছ নীচ সাধারণ জীবনের যে জীবনচিত্র ক্ষণোদভসিত তাহা দেবদেবীর নয়, রাজা – উজিরের নয়, ব্রাহ্মন- শূদ্রের নয়, ব্যাধ- বণিকেরও নয়। ইহাতে সাহিত্যের রীতিসিদ্ধ গতানুগতিক কারবার নাই। কোনোরকম অতিশয়োক্তি নাই। সেকালের অখ্যাত অজ্ঞাত অতি সাধারণ লোকের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ও আচারনের বিম্বপ্রায় খন্ড প্রতিরূপ থাকায় গানগুলো জীবনরসিক ঐতিহাসিকের কাছে মূল্যবান হইয়াছে।”
তাই চর্যাপদে আমরা সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবন বৃত্তান্ত দেখি। তাদের আচার- আচারন রীতিনীতি দেখি। এখানে উচু স্তরের মানুষের কোনো স্থান নাই। অতি সাধারণ মানুষের কথা এখানে বলা হয়েছে। তাদের সুখ-দুঃখেদের কথা এখানে উঠে এসেছে। তাই চর্যাপদকে আমরা সাধারন মানুষের গ্রন্থ বলতে পারি।
আবার চর্যাপদে আমরা যে সমাজচিত্র পাই তা একান্তভাবে বাঙালির নয়। এটা সমস্ত ভারতবর্ষের। এবং চর্যাপদের সিদ্ধার্থরা সমাজ থেকে বিচ্যুত ছিলো বলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলো। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফ মত মন্তব্য করেছেন-
“চর্যাপদে বিধত জীবন-জীবিকা ও প্রতিবেশ উড়িষ্যা-বিহার- বাংলা-আসামের প্রতিনিধিস্থানীয় বৃহত্তর সমাজের চিত্র দান করে না। কেবল বাহিগ্রামবাসী অন্ত্যজ শ্রেনির যারা সাধারণত নির্বিত নিরক্ষর-নিঃশাস্ত্র নিঃস্ব মানুষ – পারিবারিক, নৈতিক, ও আর্থিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ব্যবহারিক জীবনের খন্ডচিত্র কিছুটা প্রাসঙ্গিকভাবে – অর্থাৎ রূপক- উপমা-উৎপ্রেক্ষা রাপে বিবৃত দেখতে পাই।”
চর্যাপদে যে মানুষদের কথা বলা হয়েছে তারা মূলত সমাজ থেকে বিচ্যুত অবহেলিত। তারা অর্থনৈতিক সামাজিক সবক্ষেত্রে সমাজ থেকে বিচ্যুত। চর্যাপদে আমরা যেসব ভাষা, পদ, পেশা দেখি তা সবটাই অবহেলিত মানুষের জীবনচিত্র। সমাজের নিচু স্তরের কথা বলা হয়েছে যারা সমাজ থেকে দূরে পাহাড়ের টিলায় বাস করে।
উষ্ণা উষ্ণা পাবত তাহি বসই সবরী বালী।
মোরাঙ্গ পীচ্ছ পরিহান সবরী গীবত গুঞ্জরী মালী ।।
২৮ নং চর্যা
উঁচু উঁচু পর্যত সেখানে বাস করে শবরী বালিকা। ময়ুরের পুচ্ছ পরিধান করে এবং তার গলায় গুঞ্জার মালা। এখানে নিম্নশ্রেনীর কথা বলা হয়েছে।
সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষেরা নগরের বাইরে বাস করে। তাদের সমাজে কোনো মূল্য নেই-
নগর বাহিরিয়ে ডোম্বী তোহোরি কুড়িল।
১০ নং চর্যা
এখানে বলা হয়েছে নগরের বাহিবে ডোম্বির বা কুড়ে ঘর সে সমাজ থেকে বিচ্যুত। তার কোনো অধিকার নেই।
আবার ৩৩ নং চর্যায় বলা হয়েছে-
টালট মোর ঘর নাহি পড়বেসী
৩৩ নং চর্যা
এখানে বলা হয়েছে টিলার উপর আমার ঘর কোনো প্রতিবেশি নেই। অথাৎ এখানে জনবসতি থেকে বিচ্যুতির কথা বলা হয়েছে। সমাজের নিচু স্তরের কথা বলা হয়েছে। সমাজের নিচু জাতি বলে তার কোনো প্রতিবেশি নেই এখানে সেই কথাই বলা হয়েছে।
চর্যাপদে মূলত নিচু জাতির কথা বলা হয়েছে যারা সমাজ থেকে বিচ্যুত এবং তাদের কোনো সম্মান জনক পেশা ও ছিলো না । সমাজের যত নিচু পেশা ছিল সেটা তাদের যেমন – কাপালিক যোগী, ডোম্বী, চান্ডলী শরবী তাতি পতিতা ইত্যাদি মানুষের পেশা ছিলো। অনেক চর্যায় শিকারের কথা ও বলা হয়েছে সেমন-
কাহেরে ঘিনি মেলি আছহু কীস
বেঢ়িল হাক পড়ই চৌদীস ।।
আপনা মাংসে হরিনা বৈরী।
খনই ন ছাড়ই ভুসুকু অহেরী ।।
৬ নং চর্যা
এখানে ভীত সন্ত্রান্ত হরিনের কথা বলা হয়েছে। যে শিকরীর ভয়ে ভীত। তার মাংস তারই শত্রু হয়ে দাড়িয়েছে। তার মাংসের জন্য তাকে মরতে হয়। তাই এখানে মূলত শিকারের কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ শিকরী পেশার কথা বলা হয়েছে। এবং শিকরীরা সমাজের নিচু শ্রেনীর তারা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। সমাজে তাদের অধিকার নেই।
নদীমাতৃক এই বাংলায় নৌকার ব্যবহার ছিলো প্রাচীন কাল থেকে বিভিন্ন চর্যায় নৌকা চালানো, গুন টানা, জাল সেচ ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
মুটি উপড়ী সেলিনি কাছি ।
বাহ তু কামলি সদগুরু পুছি।।
৮ নং চর্যা
ডোম্বীদের পেশা ছিলো তাত বোনা আবার কারো কারো পেশা ছিলো মদ বানানো
এক সে শুনিনী ঘরে সান্ধই
চীঅন বাকলত বারুণী বান্ধাই
কিছু কিছু চর্যায় বাংলা চিরাচরিত দৈনন্দন জীবনের অশান্তি হতাশা ও দুঃখ, অশান্তির কথা বলা হয়েছে। যেমন-
টালত মোর ঘর নাহি পঢ়বেশী ।
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।।
বেঙ্গ সংসার বড়হিল জাঅ।
দুহিল দুধ কি বেন্টে সামায় ।।
৩৩ নং চর্যা
এখানে আমরা দেখি সমাজ থেকে বাহিরে টিলার উপর তার মর কোনো প্রতিবেশি নেই। অথাৎ সমাজ সংস্কার থেকে দুরে। কিন্তু তার হাড়িতে ভাত নেই। এবং সেখানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো অতিথি আসছে এবং ব্যাঙের মতো সংসার বেড়ে যাচ্ছে। এখানে তাই প্রতিদিনের দুঃখ ও অশান্তির কথা বলা হয়েছে।
আবার কিছু কিছু চর্যায় আমরা দেখি তখন বাংলায় চোর ডাকাতের প্রাদুর্ভাব ছিলো। সেসময় চুরির বর্ণনা আমরা পাই-
কানেট চোরে নিল অধরাতী
২ নং চর্যা
এখানে আমরা দেখি গৃহ বধুর কানের দুল চোরে নিয়ে গোছে।
কিছু কিছু চর্যায় আমরা পতিতা বৃত্তির কথা দেখি।
দিবসহি বহুড়ী কাউ হি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরূ জাই।।
এখানে বলা হয়েছে দিনের বেলায় গৃহ বধু কাকের ভয়ে ভীত কিন্তু রাতে কামরূপ যায়। এখানে পতিতাবৃতির কথা বলা হয়েছে।
চর্যাপদে আমরা বাঙলির প্রচলিত জীবন ব্যবস্থা দেখতে পাই। গরু পালন থেকে শুরু করে দুধ দহনের কথা ও চর্যাপদে বর্ণিত হয়েছে। এবং চাষ করার জন্যে বলদ ব্যবহার করা হতো। এবং অবসরে মানুষ দাবা খোলত, মদপান করত। বিনোদনের মাধ্যম ছিলো মদপান করা কপপুর দিয়ে পান খাওয়া ইত্যাদি । এবং নাচ গানে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো।
চর্যাপদে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন। এখানে নদনদী, নৌকা, চাষ সবকিছুর কথা ফুটে উঠেছে। এটা যেন বাংলারই ছবি। চর্যাপদের মাধ্যম্যে আমরা তৎকালীন সমাজচিত্র প্রত্যাক্ষ ভাবে দেখতে পাই।
তাই পরিশেষে বলতে পারি, চর্যাপদে প্রাচীন বাংলার সমাজ চিত্র ফুটে উঠেছে। এর মাধ্যমে আমরা তৎকালীন সমাজচিত্র দেখতে পাই। চর্যাপদে নিম্ন শ্রেণীয় মানুষের কথা বলা হয়েছে যারা সমাজ থেকে বঞ্চিত। তারা সমাজের বাইরে বাস করে। এবং সমাজে তাদের কোনো অধিকার নেই। চর্যাপদে বাংলার চিরাচরিত জীবনের প্রত্যাক্ষ চিত্র ফুটে কঠেছে।