বাংলা সাহিত্যের চিত্ররূকল্পময়তার কবি বলা হয় কবি জীবনানন্দ দাশ কে। তার কবিতায় প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপ, রূপসী বাংলা, চিত্রকল্পময়তা, ইতিহাসচেতনা, পরাবাস্তববাদ ইত্যাদি বিষয় গুলো ফুটে উঠেছে। তিনি বাংলা কবিতাকে রবীন্দ্র প্রভাব থেকে মুক্ত করে আধুনিকতার সূচনা ঘটিয়েছিলেন। নগর জীবনের যন্ত্রণা, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, হতাশা, যুগযন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা, মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গের তীব্র বেদনা তার কবিতার বিষয় হয়েছে। এজন্য বুদ্ধদেব বসু তাকে ‘নির্জনতার কবি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি তিরিশের দশকের প্রধান কবি ছিলেন। তিনি বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধী কাব্যধারার সূচনা করেন। কবি জীবনানন্দ দাশে জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনী, জন্ম ও পরিবার
কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালে বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন। তাদের আদিনিবাস ছিলো বিক্রমপুর। জীবনানন্দ দাশের পিতা সত্যানন্দ দাশ বরিশাল ব্রজমোহন বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। তিনি প্রথমে হিন্দু ছিলেন পরে ব্রাহ্মধর্মে ধর্মান্তরিত হন। অনেক জনকল্যাণ মূলক কাজও করেছেন। এমনকি কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তাঁর মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি। তার বিখ্যাত কবিতা –
“আমাদের দেশে হবে কি সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে”
তিনি গৃহিণী ছিলেন এবং পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন। জীবনানন্দ দাশের এক ভাই ও বোন ছিল।
কবি জীবনানন্দ দাশের শিক্ষা জীবন।
কবি জীবনানন্দ দাশ এর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় ১৯০৮ সালে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে। তিনি ১৯১৫ সালে ব্রজমোহন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ১৯১৭ সালে ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্স ডিগ্রি লাভ করেন ১৯১৯ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২১ সালে এম. এ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি আইন কলেজ ভর্তি হলেও তা সঙ্গত কারণে শেষ করতে পারেননি।
কবি জীবনানন্দ দাশের বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
কবি জীবনানন্দ দাশ ১৯৩০ সালে ঢাকায় লাবণ্য গুপ্তকে বিয়ে করেন। তাঁর পারিবারিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তিনি দুই সন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর মেয়ের নাম মঞ্জুশ্রী দাশ এবং ছেলে সমরানন্দ দাশ।
কবি জীবনানন্দ দাশের কর্মজীবন
কবি জীবনানন্দ দাশের কর্মজীবন শুরু হয় কলেজে শিক্ষকতা দিয়ে। ১৯২২ সালে তিনি কলকাতা সিটি কলেজে চাকরি নেন। এরপর তিনি চলে আসে বরিশালে। ১৯২৯ সালে যোগ দেন বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে। একই বছর চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি দিল্লি চলে যান। সেখানে রামযশ কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৯৩০ সালে জীবনানন্দ দাশ আবার দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তিনি আর কোনো চাকরি পাননি। কিছু বছর বেকার জীবন অতিবাহিত করেছিলেন।
১৯৩৫ সালে তিনি বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের আগে তিনি কলকাতা চলে যান।১৯৫৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি হাওড়া গার্লস কলেজ কর্মরত ছিলেন। কবি জীবনে অনেক অর্থকষ্টে ভুগেছেন। চাকরির জন্য দারে দারে ঘুরেছেন। তিনি চাকরির মাঝে বিভিন্ন পেশা, এমনকি ব্যবসার ও চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর স্ত্রী লাবণ্য দাশ স্কুলে শিক্ষকতা করে সংসারের অভাব কমানোর চেষ্টা করেছিলেন।
কবি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যে জীবন
কবি জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যচর্চার হাতে খড়ি হয় তার পরিবার থেকে। তার মা ছিলেন একজন অন্যতম খ্যাতিমান কবি কুসুমকুমারী দাশ। তার মার থেকেই তিনি সাহিত্যচর্চায় অনুপ্রাণিত হন ।
কবিতা
প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে। ১৯২৫ সালে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মারা গেলে তিনি তাকে উৎসর্গ করে একটি কবিতা লিখেন। এখান থেকে তার কবিতা চর্চা ধারাবাহিকভাবে শুরু হয়। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ঝরা পালক। এই কাব্যগ্রন্থের বিভিন্ন কবির প্রভাব ছিল। এরপর থেকে ধীরে ধীরে তিনি তাঁর কবিতায় স্বকীয়তা ফিরিয়ে আনলেন। প্রকাশিত হয় ধূসর পান্ডুলিপি এই কবিতায় কবির স্বকীয়তা লক্ষ্য করা যায়। তিনি প্রায় সাড়ে আটশত কবিতা লিখেছেন। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকতে ২৬২ টি কবিতা প্রকাশিত হয়। তার মোট কাব্যের সংখ্যা ১১ টি কিন্তু মৃত্যুর আগে প্রকাশিত হয় ৫ টি। তার কাব্যগুলো তুলে ধরা হলো –
জীবদ্দশায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
- ঝরাপালক (১৯২৭)
- ধূসর পাণ্ডুলিপি (১৯৩৬)
- বনলতা সেন (১৯৪২)
- মহাপৃথিবী (১৯৪৪)
- সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮)
মৃত্যুপরবর্তী প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
- রূপসী বাংলা (রচনাকাল ১৯৩৪, প্রকাশকাল ১৯৫৭)
- বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১)
- সুদর্শনা (১৯৭৩)
- আলো পৃথিবী (১৯৮১)
- মনবিহঙ্গম (১৯৭৯)
- অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯)
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় নদী, ঘাস, সমুদ্র, নক্ষত্র, আকাশ, ইতিহাস ইত্যাদি নস্টালজিয়া বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে। তিনি কবিতায় চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন। কবিতায় ছবি এঁকেছেন কিন্তু এই ছবি রংতুলি দিয়ে নয় তা ছিলো ছন্দ, অলংকার ও উপমা দিয়ে। তিনি ভাষা দিয়ে কবিতায় ছবি এঁকেছেন। অধিকাংশ কবিতায় তিনি এই চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন। ইতিহাস ঐতিহ্যচেতনাও তাঁর কবিতার বিষয় হয়েছে।
উপন্যাস
জীবনানন্দ দাশ জীবনে অসংখ্য উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে তিনি বেচে থাকতে একটা উপন্যাস ও প্রকাশিত হয়নি।তিনি মারা যাওয়ার পরে তার কিছু পান্ডুলিপি থেকে এসব উপন্যাস প্রকাশ করা হয়েছে। তার উপন্যাস গুলো তুলে ধরা হলো –
- মাল্যবান
- সুতীর্থ
- জলপাইহাটি
- জীবনপ্রণালী
- কারুবাসনা
- বাসমতীর উপাখ্যান
- মৃণাল
- বিলাস
- চারজন
ছোটগল্প
জীবনানন্দ দাশ উপন্যাসের সাথে ছোটগল্পও লিখেছেন কিন্তু তিনি বেঁচে থাকতে তা প্রকাশিত হয়নি। তার ছোট গল্পের সংখ্যা শতাধিক। তাঁর বিখ্যাত কিছু ছোটগল্প গুলো তুলে ধরা হলো –
- মহিন
- আখ্যান
- ছেঁড়া চুল
- মেয়েমানুষ
- ছায়াপ্রিয়
- রক্তমাংস
- কুয়াশার ভিতর মৃত্যুর সময়
- সমাবর্তন
- যীশু
- কাক
- বিলের ধারে
প্রবন্ধ
জীবনানন্দ দাশ কিছু প্রবন্ধও লিখেছেন কিন্তু প্রাবন্ধিক হিসেবে তার আলাদা কোনো খ্যাতি ছিলো না। তার প্রবন্ধ গুলো চারটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। সেগুলো তুলে ধরা হলো –
১. কবিতার কথা
এই গ্রন্থে তাঁর জীবদ্দশায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত ১২টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধ রয়েছে:
- কবিতার কথা
- কবিতা ও জনসাধারণ
- আধুনিক কবিতা
- উত্তররৈবিক বাংলা কাব্য
- কবিতার আলোচনা
- রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক বাংলা কবিতা
- বাংলা কবিতার ভবিষ্যৎ
- দেশকাল ও কবিতা
- কবির রূপ ও রূপান্তর
- শুদ্ধতম কবি
- যুগান্তরের কবিতা
- কবিতার উৎস
২. জীবনানন্দ দাশের নান্দনিক ও সাহিত্যবিষয়ক প্রবন্ধসমূহ
মৃত্যুর পরে পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধার হওয়া অন্যান্য প্রবন্ধ।
- সাহিত্যের সত্য
- শৈলী ও সাহিত্য
- উপন্যাস ও ছোটগল্পের ভবিষ্যৎ
- বিশ্বসাহিত্য ও আমরা
- অনুবাদ প্রসঙ্গে
৩. সমাজ, রাজনীতি ও সমকাল বিষয়ক প্রবন্ধসমূহ
রাজনীতি ও সমাজ নিয়ে চিন্তাভাবনা ফুটে উঠেছে এই প্রবন্ধগুলোতে:
- পৃথিবী ও মানুষ
- আমাদের আধুনিকতা
- দেশভাগ ও দাঙ্গা প্রসঙ্গে
- সাম্যবাদ ও সাহিত্য
- যান্ত্রিক সভ্যতা ও মানুষ
৪. শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আত্মজৈবনিক প্রবন্ধসমূহ
নিজের জীবন, চারপাশের পরিবেশ এবং শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে লেখা প্রবন্ধ:
- শিক্ষা ও সংস্কৃতি
- মফস্বল ও কলকাতা
- আমার কবিতা
- স্মৃতির শহর
কবি জীবনানন্দ দাশের পুরস্কার ও সম্মাননাসমূহ
জীবনানন্দ দাশ অসংখ্য সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।তিনি জীবনদ্দশ্যায় ও মরণোত্তর বিভিন্ন পুরষ্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে। তাকে নিয়ে এখনো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয়। তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা তুলে ধরা হলো –
১. রবীন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার (১৯৫২)
২. সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৫৫ – মরণোত্তর)
৩. শতবর্ষ স্মারক সম্মাননা ও ডাকটিকিট (১৯৯৯)
কবি জীবনানন্দ দাশের এর মৃত্যু
কবি জীবনানন্দ দাশের মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তার দূর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল না আত্মহত্যা সে বিষয় ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।১৯৫৪ সালে ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগজ্ঞে এক মর্মান্তিক ট্রাম দূর্ঘটনা ঘটে। কবি মারাত্মকভাবে আহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা সাথে সাথে তাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকদের অনেক চেষ্টা পরেও কবিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ১৯৫৪ সালে ২২ অক্টোবর তিনি হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন।
তবে বিভিন্ন গবেষকের গবেষণায় দেখা গেছে কবি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। কারণ গত একশো বছরে কলকাতা মাত্র একজন মানুষ মারা গিয়েছিলেন। আর সেই ব্যক্তি অন্য কেউ নয় কবি স্বয়ং। তাই এই মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।কবি প্রায় আত্মহত্যার কথা ভাবতেন। তিনি জীবনের ক্লান্তি, হতাশা ও নৈরাশ্যে ভুগছিলেন।তাই তিনি বারবার আত্মহত্যার কথা ভাবতেন।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা:
১. সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।
২. জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র, সম্পাদিত: আবদুল মান্নান সৈয়দ।
৩. সাহিত্য অকাদেমি (ভারত সরকার)-এর পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক তালিকা আর্কাইভ।
৪. বরিশাল জেলা প্রশাসন ও জাতীয় তথ্য বাতায়ন, বাংলাদেশ।
৫. জীবনানন্দ মূল্যায়ন, ভূমেন্দ্র গুহ ও ক্লিনটন বি সিলি (অনুবাদক ও গবেষক)।
আরো পড়ুন
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস ও জীবনী
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
