বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের অবিস্মরণীয় ব্যক্তি। তিনি বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি। তাঁর কবিতার লাইন ছিল বজ্রকন্ঠের মতো। ঔপনিবেশিক শাসন ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে তার কলম যেন কামানের মতো কাজ করেছিল। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁর সাহিত্যে। বাংলা সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে তার পদচিহ্ন রয়েছে। একই হাতে তিনি কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, গান, গজল ইত্যাদি লিখেছেন। এই বিদ্রোহী কবির পদচিহ্ন না পড়লে হয়ত বাংলা সাহিত্য অসম্পূর্ণ রয়ে যেত।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ও শৈশব
বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে (জ্যৈষ্ঠ ১১, ১৩০৬) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ। মাতা জাহেদা খাতুন। তিনি ষষ্ঠ সন্তান। তার পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহ। তিনি অতি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। ছোটবেলায় নজরুলের জীবন অতি কষ্টে কেটেছে। তাঁর ডাকনাম ছিলো দুখু মিয়া। ১৯০৮ সালে তার পিতা মারা যায়। তিনি ব্যাপকভাবে শোকাহত হয়। অভাবে কারণে তিনি মসজিদের মুয়াজ্জিন ও মাজারের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে অতি কষ্টে কেটেছে এই বিদ্রোহী কবির শৈশব।
কাজী নজরুল ইসলাম এর শিক্ষা জীবন
নজরুলের শিক্ষা জীবন শুরু হয় মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে। এখানে তিনি ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করেন। তিনি মক্তব থেকেই নিম্ন মাধ্যমিক পাশ করেন। পিতার মৃত্যুর কারণে জীবীকার তাগিদে ওই মক্তবে শিক্ষকতা শুরু করেন। একই সাথে হাজি পালোয়ানের মসজিদের মাজারের সেবক ও মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেখান থেকেই তিনি ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করেন যা পরবর্তীতে সাহিত্যকর্মে সহায়তা করে।
তারপর তিনি যোগ দেন লেটো গানের দলে। লেটো গান রাঢ় বাংলার গান। নজরুলের চাচা এই গানের দলের বিশিষ্ট উস্তাদ ছিলেন।তাই নজরুলও সেখানে যোগ দেন। যা পরবর্তীতে শ্যামাসংগীত রচনায় সহযোগিতা করেছিলো। এখান থেকে তিনি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করেছিলেন।
১৯১০ সালে তিনি আবার শিক্ষা জীবনে ফিরে আসে। তিনি এখানে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আবার অভাবের কারণে লেখাপড়া ছাড়তে হয়। এরপর তিনি কাজ নেন আসানসোল চায়ের দোকানে। তার গান ও কবিতার প্রতিভা দেখে রফিজউল্লাহ তাকে ১৯১৪ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দবিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করে দেন। তিনি ১৯১৫ সালে ফিরে এসে রানিগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে। সেখানে অষ্টম শ্রেণি থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত এখানেই পড়াশোনা করেন। এই বছরের শেষ দিকে তিনি মাধ্যমিক প্রি-টেস্ট না দিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এই স্কুলের চারজন শিক্ষক দ্বারা তিনি ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। তাঁরা হলেন – উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে সতীশচন্দ্র কাঞ্জিলাল, বিপ্লবী ভাবধারায় নিবারণচন্দ্র ঘটক, ফারসি সাহিত্যে হাফিজ নুরুন্নবী এবং সাহিত্যচর্চায় নগেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
কাজী নজরুল ইসলাম এর কর্ম ও সৈনিক জীবন
কাজী নজরুল ইসলামের কর্মজীবন শুরু হয় ১০ বছর বয়স থেকে। কখনো মসজিদের মুয়াজ্জিন, মাজারের খাদেম, কখনো লেটো গানের দলে আবার কখনো চায়ের দোকানে। তার কর্মজীবন ছিলো বিচিত্র। জীবনে তিনি বহু মানুষের সাথে মিশেছেন। তার সাহিত্যকর্মে তাই বিচিত্র মানুষের পরিচয় পাওয়া যায়।
১৯১৭ সালে শেষদিকে তিনি যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। প্রথমে প্রশিক্ষণের জন্য যান কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামে। প্রশিক্ষণ শেষে করাচি সেনানিবাসে সৈনিক জীবন শুরু করেন। এখানে তিনি আড়াই বছর অতিবাহিত করেন। এখানে তিনি ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিক ছিলেন।
তিনি সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল, পরে কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পর্যন্ত পদোন্নতি পেয়েছিলেন। এখানে তিনি ফারসি ভাষা শেখেন। অন্যান্য সৈনিকদের সাথে এখানে তিনি গান চর্চা করতেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তিনি এখান থেকে বাজানো শেখেন।
সেনাবাহিনীতে থাকা কালে তিনি কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকা পড়তেন। এবং একই সাথে তিনি লেখালেখি ও করতেন। মূলত এখান থেকেই তার সাহিত্যচর্চার শুরু। নজরুলের যে বিদ্রোহী মনোভাব সেটা সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর থেকে। এখান থেকেই তিনি বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। এর পর ১৯২০ সালে প্রথমবিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে যায় এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন।
কাজী নজরুল ইসলাম এর সাংবাদিক জীবন
যুদ্ধ শেষে তিনি কোলকাতা ফিরে আসেন। এখানে তিনি ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে বসবাস শুরু করেন। তার পরিচয় হয় মুজফফর আহমেদের সাথে। তিনি নজরুলের সাহিত্যচর্চায় সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল। তিনি মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্যে পত্রিকা ও উপাসনা পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করে। এতে তার কিছু সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়। সেগুলো হলো- উপন্যাস ‘বাধন হারা’ এবং কবিতা শাত-ইল-আরব, বাদল প্রাতের শরাব, আগমনী, খেয়া-পারের তরণী, কোরবানি প্রভৃতি।
বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে তার পরিচয় হয় বাংলা সাহিত্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে। এসময় তিনি শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে দেখা করে আসেন।
শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের সম্পাদনায় ১৯২০ সালে প্রকাশিত হয় নবযুগ পত্রিকা। নজরুল এই পত্রিকায় নিয়মিত লেখা শুরু করেন। খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন নিয়ে লেখা শুরু করেন। তিনি মোজাফফর আহমদের সাথে বিভিন্ন সভা সমাবেশে যোগ দিতেন। এখান থেকেই নজরুলের সাহিত্যচর্চা ভিত্তি শক্ত হতে থাকে।
কাজী নজরুল ইসলামের বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
কাজী নজরুল ইসলামের বৈবাহিক জীবন অত্যন্ত ঘটনাপূর্ণ ছিল। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে ১৯২১ সালে নজরুলের পরিচয় হয় আলী আকবর খানের সাথে। তিনি নজরুলকে নিয়ে যান কুমিল্লায়। প্রথমে তিনি নজরুলকে নিয়ে যান বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে। সেখানে নজরুলের পরিচয় হয় প্রমীলা দেবীর সাথে। এবং তার সাথে প্রেম হয়। তিনি দুবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১. প্রথম বিয়ে (নার্গিস)
প্রকাশক আলী আকবর খানের ভাগ্নী সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিসের সাথে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয় ১৯২১ সালের ১৮ জুন। বিয়ের আসরে কবির উপর শর্ত দেওয়া হয় যে, তাঁকে আজীবন কুমিল্লার দৌলতপুরে ঘরজামাই থাকতে হবে। এই শর্তে ক্ষুব্ধ ও অপমানিত হয়ে কবি বাসর রাতেই বিয়ে সম্পন্ন না করে নববধূর মোহরানা পরিশোধ করে কলকাতায় ফিরে আসেন। ফলে এই দাম্পত্য জীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
২. দ্বিতীয় বিয়ে (প্রমীলা দেবী)
নার্গিসের সাথে বিচ্ছেদের পর কুমিল্লায় অবস্থানকালে প্রমীলা দেবীর (আশালতা সেনগুপ্ত) সাথে নজরুলের গভীর প্রেম ও সখ্যতা গড়ে ওঠে। প্রমীলা দেবীর মা গিরিবালা দেবীর উৎসাহে ও সাহিত্যিক মুজাফফর আহমদের মতো বন্ধুদের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁদের বিয়ে হয়। প্রমীলা দেবী আমৃত্যু নজরুলের পাশে ছিলেন এবং তাঁদের দাম্পত্য জীবন অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে অতিবাহিত হয়।
সন্তান
নজরুল ছিলেন একজন সাম্যবাদী মানুষ। তিনি সবসময় হিন্দু মুসলিমের মধ্যে ঐক্য প্রত্যাশা করতেন। তিনি মুসলিম হয়েও চার সন্তানের নাম বাংলা এবং আরবি উভয় ভাষাতেই নাম রাখেন। যথা:
- কৃষ্ণ মুহাম্মদ
- অরিন্দম খালেদ (বুলবুল)
- কাজী সব্যসাচী
- কাজী অনিরুদ্ধ।
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যেচর্চা
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যচর্চা শুরু হয় সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায়। পরবর্তীতে সাংবাদিক জীবনেরও অসংখ্য কবিতা লিখেছেন। এসময় তার সাহিত্যচর্চার ব্যাপক বিকাশ ঘটে। তিনি অসাম্প্রদায়িকতা, ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী এবং বিদ্রোহী ধরার সাহিত্যেচর্চা করে গেছেন। তার সাহিত্যেকর্ম গুলো তুলে ধরা হলো।
কাব্যগ্রন্থ
১৯২১ সালে কুমিল্লা থেকে ফেরার সময় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দুটি কবিতা লেখেন – ‘বিদ্রোহী ও ভাঙ্গার গান’। বিদ্রোহী বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কবিতা। এটি তার সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা। তিনি যদি আর কোনোকিছু না লিখেছেন তবু তিনি সমান খ্যাতি অর্জন করতেন।
এছাড়া এসময় তার আরও একটি বিখ্যাত কবিতা কামাল পাশা প্রকাশিত হয়। ১৯২২ সালে অগ্নিবীণা সবগুলো কবিতা এক এক করে প্রকাশিত হয়। তিনি প্রায় ২২ টির মতো কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো নিচে দেওয়া হলো-
১. অগ্নিবীণা (১৯২২)
২. দোলনচাঁপা (১৯২৩)
৩. বিষের বাঁশি (১৯২৪)
৪. ভাঙার গান (১৯২৪)
৫. ছায়ানট (১৯২৫)
৬. চিত্তনামা (১৯২৫)
৭. সাম্যবাদী (১৯২৫)
৮. সর্বহারা (১৯২৬)
৯. ফণী-মনসা (১৯২৭)
১০. সিন্ধু হিন্দোল (১৯২৭)
১১. জিঞ্জির (১৯২৮)
১২. প্রলয়শিখা (১৯৩০)
১৩. সন্ধ্যা (১৯২৯)
১৪. চক্রবাক (১৯২৯)
১৫. নির্ঝর
১৬. নতুন চাঁদ (১৯৪৫)
১৭. মরুভাস্কর (১৯৫১)
১৮. সঞ্চিতা
১৯. ঝিঙে ফুল
এছাড়াও শিশুদের জন্য লেখা
২০. রুবাইয়াৎ-ই-উমর খৈয়াম (এটি তিনি পারস্য সাহিত্য থেকে অনুবাদ করেছিলেন)
২১. রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ
কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী সত্তা ও জেলজীবন
নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী মনোভাবের মানুষ। কোনো অন্যায়-অত্যাচার তিনি কখনো মেনে নেননি। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও সব ধরনের ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন। ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। অগ্নিবীণা কাব্যের কবিতাগুলোতে তিনি সবচেয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ১৯২২ ‘ধূমকেতুর’ ও ‘আনন্দময়ীর আগমনীর গান’ প্রকাশিত হলে পত্রিকার ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়। নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত হয় । একই দিনে নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হয়। বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ সালে নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে জবানবন্দী প্রদান করেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে সাহিত্য-মর্যাদা পেয়েছে। বিচারের রায়ে নজরুল এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি ছিলেন তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য তাঁকে উৎসর্গ করেন।
১৯২৩ সালে নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের অমানবিক ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন। কিন্তু নজরুল ছিরেন প্রকৃত বিদ্রোহী। ১৯২৩ সালের ২২ মে জেল-পরিদর্শক ড. আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্র্দী হুগলি জেল পরিদর্শন করতে যান এবং তাঁর আশ্বাস ও অনুরোধেসেই দিনই নজরুল চল্লিশ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন। এবং এখান থেকেই তাকে একই বছর মুক্তি দেওয়া হয়। জেলে বসে নজরুল রচনা করেন দুটি বিখ্যাত গান-
হুগলি জেলে
- ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল’
আর বহরমপুর জেলে
- ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্ছে জুয়া’
কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গীত ও গজল
কাজী নজরুল ইসলাম জীবনে বহু সঙ্গীত লিখেছেন। তিনি বাংলা গজলের স্রষ্টা। তার হাতে অসংখ্য গান ও গজল রচিত হয়েছে। সবমিলিয়ে তার গান ও গজলের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি বলে মনে করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ হারিয়ে গেছে। তিনি একই সঙ্গে বহু শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন। ১৯৩৮ সালে তিনি যোগ দেন কলকাতা বেতারে। সেখানে তিনটি অনুষ্ঠানে তাকে নিয়মিত গান লিখতে হতো। অনুষ্ঠান গুলো হলো-‘হারামণি’, ‘নবরাগমালিকা’ ও ‘গীতিবিচিত্রা’। তিনি বিভিন্ন রাগ তাল নিয়েও গান গেয়েছেন।
তার সবচেয়ে বিখ্যাত গান হলো বুলবুল। তার ছেলে অরিন্দম খালেদ ( বুলবুল)। গানটির সৃষ্টির পেছনের একটি হৃদয়বিদারক কাহিনী প্রচলিত আছে। অনেকেই মনে করেন, কবির আদরের চার বছরের শিশু সন্তান অরিন্দম খালেদ (যাকে কবি ‘বুলবুল’ বলে ডাকতেন) যখন বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, সেই সন্তান হারানোর শোকে এই গজলটি লিখেছিলেন।
তার অন্যান্য বিখ্যাত গজল হলো –
- মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই,
- রমজানের ওই রোজার শেষ এলো খুশির ইদ।
তার বিখ্যাত গানের বই হলো
- গানের মালা
- গীতি শতদল
- বুলবুল
- বুলবুল ২য়
- গুল বাগিচা
- চোখের চাতক
- মহুয়ার গান
- সুরসাকী
- সন্ধ্যামালতী
কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাস
গান ও কবিতার মতো উপন্যাসেও তিনি সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন। তিনি মোট ৩টি উপন্যাস লিখেছেন। তিনটি উপন্যাসই বে জনপ্রিয়। তিনি তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। তার উপন্যাস গুলো হলো-
১. বাঁধন হারা (১৯২৭) ২. মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০) ৩. কুহেলিকা (১৯৩১)
কাজী নজরুল ইসলামের ছোটগল্প
সাহিত্যের সব শাখায় তার বিচরন। তিনি অসংখ্য ছোটগল্প লিখেছেন। সেগুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
১. ব্যথার দান (১৯২২)
নজরুলের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ। এই গল্পের মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেম, বিরহ ও দেশপ্রেম।
- ব্যথার দান
- হেনা
- বাদল বরিষণে
- ঘুমের ঘোরে
- পথের কাঁটা
- মুক্তি
২. রিক্তের বেদন (১৯২৫)
মানবসর্ম্পক, রোমান্টিকতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব এই গল্পগ্রন্থের মূল বিষয়।
- রাক্ষুসী
- বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী:
- স্বামীহারা
৩. শিউলি মালা (১৯৩১)
পল্লীপ্রকৃতি, লোকজ বিশ্বাস এবং মানবীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য।
- পদ্ম-গোখরো
- জিনের বাদ্শা
- অগ্নিগিরি
- শিউলি মালা
৪. অন্যান্য (সংকলন)
- হক সাহেবের হাসির গল্প
- সাপুড়ে
কাজী নজরুল ইসলামের নাটক
কাজী নজরুল ইসলাম অনেক নাটক লিখেছেন। তার নাটকের বিষয় হলো দেশপ্রেম, মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। তার নাটক গুলো তুলে ধরা হলো
১. ঝিলিমিলি (১৯৩০)
২. আলেয়া (১৯৩১)
৩. পুতুলের বিয়ে (১৯৩৩)
৪. মধুমালা (১৯৬০)
৫. ঝড় (১৯৬০)
৬. পিলে পটকা পুতুলের বিয়ে (১৯৬৪)
কাজী নজরুল ইসলামের প্রবন্ধ
তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তার প্রবন্ধের মুখ্য বিষয় হলো সাম্যবাদী ও মুক্তচিন্তার বিকাশ। তার প্রবন্ধগুলো তুলে ধরা হলো-
১. যুগবাণী (১৯২২)
২. দুর্দিনের যাত্রী (১৯২৬)
৩. রুদ্র মঙ্গল (১৯২৭)
৪. রাজবন্দির জবানবন্দি
৫. ঝিঙ্গে ফুল (১৯২৬)
কাজী নজরুল ইসলামের পুরস্কার ও সম্মাননা
জগত্তারিণী স্বর্ণপদক (১৯৪৫)
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে এই পদকে ভূষিত করে
পদ্মভূষণ (১৯৬০)
- ভারত সরকার তাঁকে দেশটির অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ প্রদান করে।
ডিলিট ডিগ্রি (১৯৬৯ ও ১৯৭৪)
- রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৯) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৪) তাঁকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ (D.Litt) ডিগ্রি প্রদান করে।
জাতীয় কবি (১৯৭২/৭৪)
- স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৪ সালে কবিকে জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করে এবং ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
একুশে পদক (১৯৭৬)
- বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে
স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৭৭)
- মরণোত্তর তাকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের অসুস্থতা ও মৃত্যু
বাংলা সাহিত্যের একজন অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯৪২ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাকে দেশে বিদেশে বিভিন্ন ডাক্তার দেখানো হয় কিন্তু কবি আর সুস্থ হয়নি। অনেক চেষ্টার পরও তিনি সুস্থ হননি। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে নজরুলকে বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করা হয়।
তথ্যসূত্র
- “নজরুল জীবনী” – রফিকুল ইসলাম
- “কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও সাহিত্য” – ড. সুশীল কুমার গুপ্ত
- “নজরুল-মানস” – ড. আবদুল কাদির:
- “বিদ্রোহী কবি নজরুল” – গোপাল হালদার
- নজরুল সংগীত: পটভূমি ও পরিচয়”, নজরুল-গীতি অখণ্ড, আবদুল আজীজ আল্-আমান সম্পাদিত, হরফ প্রকাশনী, কলকাতা, ১৯৮১, পৃ. ২৬
- বুলবুল। Kazi Nazrul Islam | কাজী নজরুল ইসলাম (মার্কিন ইংরেজি ভাষায়)।
আরো পড়ুন
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতা ও তার জীবনী, Best 50 সাহিত্যকর্ম
- হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস ও জীবনী
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
