বাংলা ব্যাকরণে প্রকৃতি ও প্রত্যয় একটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।কারণ ব্যাকরণে নতুন শব্দ গঠন হওয়ার প্রধান উপায় হলো প্রকৃতি ও প্রত্যয় যোগে।তাই এটি সঠিকভাবে না জানলে শব্দ গঠন সঠিক হবে না। এছাড়া মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, এডমিশন ও যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এ বিষয় থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। তাই প্রকৃতি ও প্রত্যয় গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত। এই আর্টিকেল প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয় ও মনে রাখার সহজ কৌশল আলোচনা করা হল।

প্রকৃতি কাকে বলে?
ক্রিয়ামূল বা ধাতুকে প্রকৃতি বলা হয়। অর্থাৎ ক্রিয়া বা শব্দের যে অংশকে আর ভাঙ্গা যায় না তাকে প্রকৃতি বলা হয়। যেমন চল্, হাঁট্, পড়, ইত্যাদি। প্রকৃতি বোঝানোর জন্য √ চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
প্রকৃতি কত প্রকার?
প্রকৃতি ২ প্রকার
১. নাম প্রকৃতি – হাত, ফুল।
২. ক্রিয়া প্রকৃতি – চল, পড়।
প্রত্যয় কাকে বলে?
প্রকৃতির সাথে যে যুক্ত শব্দ হয় তাকে প্রত্যয় বলে। যেমন দুল + আনা = দোলনা। কৃৎপ্রত্যয় সাধিত পদকে বলা হয় কৃদন্ত পদ। যেমন দোলনা।
প্রত্যয় কত প্রকার?
প্রত্যয় ২ প্রকার
১. কৃৎ প্রত্যয়
২. তদ্ধিত প্রত্যয়।
প্রকৃতি ও প্রত্যয় নির্ণয়
১. কৃৎ প্রত্যয়
কৃৎ প্রত্যয় দুপ্রকার
ক. খাঁটি বাংলা
খ. সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়।
ক. খাঁটি বাংলা
১. কৃৎ প্রত্যয় সাধিত পদটিকে বলা হয় কৃদন্ত পদ।
২. কৃৎ প্রত্যয় যোগে ‘কৃ’ প্রকৃতির আদিস্বরের পরিবর্তনকে গুণ ও বৃদ্ধি বলা হয়।
৩. উপসর্গযোগে গঠিত শব্দে প্রকৃতির আগে ড্যাস (-) চিহ্ন বসে। যেমন- অ- জান্ + আ = অজানা।
খাঁটি বাংলা কৃৎপ্রত্যয় গুলো হলো
০/ শূন্য, অ, অন, অনা, অনি, অন্ত, অক, আ, আন, আনি, আরি, আল, আই, আও, ই, ইয়া, উ, উয়া, তা, তি, না।
বাংলা কৃৎ প্রত্যয় যোগে শব্দ গঠন
- √ ধর্ + অ = ধর
- √ ডুব্ + আরি = ডুবারি > ডুবুরী
- √ কাঁদ্ + অন = কাঁদন
- √ মিশ্ +আল = মিশাল
- √ দুল্ + অনা = দোলনা
- √ ভাজ্ + ই = ভাজি
- √ বাঁধ + অনি = বাঁধনি> বাঁধুনি,
- √ ইয়া > ইয়ে:
- √ মর্ + ইয়া = মরিয়া
- √অন্ত: চল্ + অন্ত = চলন্ত
গুণ ও বৃদ্ধি
কিছু কিছু ক্ষেত্রে কৃৎ প্রত্যয় যোগে ধাতু/প্রকৃতির আদিস্বরের পরিবর্তনকে গুণ ও বৃদ্ধি বলা হয়। একে গুণ ও বৃদ্ধি বলা হয়।
গুণ
তিনটি পরিবর্তনকে গুণ বলা হয়।
১. ই, ঈ স্থলে এ: √ চিন + আ = চেনা।
২. উ, ঊ স্থলে ও: √ ধু + আ = ধোয়া।
৩. ঋ স্থলে অর: √ কৃ + তৃচ্(তা) = কর্তা।
বৃদ্ধি
চারটি পরিবর্তনকে বৃদ্ধি বলে।
১. অ-স্থলে আ : পচ্ + অ (ণক) = পাচক।
২. ই ও ঈ স্থলে ঐ: শিশু+অ(ষ্ণ) = শৈশব।
৩. উ ও ঊ স্থলে ঔ: যুব+ অন= যৌবন।
৪. ঋ স্থলে আর : কৃ+ঘ্যণ= কার্য।
উপধা
ধাতুর অন্ত্যধ্বনির আগের ধ্বনিকে উপধা বলে।
যেমন: পঠ = প + অ + ঠ এখানে ‘অ’ উপধা।
খ. সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়
অনট, ক্ত, ক্তি, তৃচ্, তব্য, অনীয়, ণিন, ইন, অল, ইষ্ণু, বর, র, ণক, উক, ঘ্যণ, য, শানচ্, ঘঞ।
টি
আদ্য স্বরের পরবর্তী সম্পূর্ণ ধ্বনিকে ‘টি’ বলে। ‘পঠ’ ধাতুর ‘অঠ’ হচ্ছে ‘টি’।
ইৎ
ধাতু কিংবা প্রাতিপদিক এর সাথে যুক্ত হয়ে প্রত্যয়ের যে অংশ লোপ পায় তাই- ‘ইৎ’, পাচক = √পচ্+ণক্ এখানে ‘ণ’ ইৎ, উচ্চারণে ‘অক’ থাকে।
সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয় যোগে শব্দ গঠন
- ণক্ (অক): √নী + ণক্ = নায়ক
- ক্ত (ত): √ হন্ + ক্ত = হত
- অনট (অন): √নী + অনট = নয়ন
- ক্তি (তি): √গম্ + ক্তি = গতি
- তৃচ (তা): √দা + তৃচ =দাতা
- য (য়): √দা + য = দেয়
- ণিন (ঈ): √পা + ণিন = পায়ী
- ঘ্যণ (য): √ধৃ + ঘ্যণ/য =ধার্য
- ইন (ঈ): √অনু রাগ্ + ইন = অনুরাগী
- ইষ্ণু: √চল্ + ইষ্ণু = চলিষ্ণু
- অল (অয়): √ক্ষি + অল = ক্ষয়
- বর: √ঈশ্ + বর = ঈশ্বর
- ঘঞ: √যুজ্ + ঘঞ/অ = যোগ
- র: √হিন্- স্+ র = হিংস্র
- উক: √ভু + উক = ভাবুক
- তব্য: √কৃ + তব্য = কর্তব্য
- অনীয়: √ রক্ষ + অনীয় = রক্ষণীয়
- শানচ্: √চল্ + শানচ্ = চলমান
গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়
- জ্ঞাত = √ জ্ঞা + ক্ত
- চূর্ণ = √চুর্ + ক্ত
- স্থান = √স্থা + অন
- খ্যাত = √ খ্যা + ক্ত
- ঈশ্বর = √ ঈশ্+ বর
- ভাস্বর = √ ভাস্ + বর
- যোগ = √যুজ্+ঘঞ/অ
- ক্রোধ = √ক্রুধ+ঘঞ/অ
- পাক = √পচ্+ঘঞ/অ
- সিদ্ধি = √সিধ + ক্তি
- কর্তব্য = √কৃ + তব্য
- দাতব্য = √দা + তব্য
- বক্তব্য = √বচ্ + তব্য
- করণীয় = √কৃ + অনীয়
- যোদ্ধা = √যুধ্ + তৃচ্
- আত্মঘাতী = √আত্ম+হন্ + ণিন
- কার্য = √কৃ + ঘ্যণ
- হেয় = √হা + য
- গ্রাহী = √গ্রহ + ণিন
- পায়ী = √পা + ণিন
- জয় = √জি + অল্/অ
- ক্ষয় = √ক্ষি + অল/অ
- দীপ্যমান = √দীপ্ + শানচ্
- ত্যাগ = √ত্যজ্ + ঘঞ/অ
- নন্দন = √নন্দ্ + অন
- শোক = √শুচ্ + ঘঞ/অ
২. তদ্ধিত প্রত্যয়
শব্দের শেষে যেসব প্রত্যয় যোগে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে।
তদ্ধিত প্রত্যয় তিন প্রকার
ক. বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়।
খ. বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়।
গ. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়।
ক. বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়
আ
- হাজির + আ = হাজিরা
- চোখ + আ = চোখা
- বাইশ + আ = বাইশা
- জল + আ = জলা
- কেষ্ট + আ = কেষ্টা
- দখিন + আ = দখিনা
আই
- বড় + আই = বড়াই
- নিম + আই = নিমাই
- ননদ + আই = নন্দাই
- মিঠা + আই = মিঠাই
- ঢাকা + আই = ঢাকাই
- চোর + আই = চোরাই
আমি
- ইতর + আমি = ইতরামি
- ঘর + আমি = ঘরামি
- জেঠা + আমি = জেঠামি
আমো
- ফাজিল + আমো – ফাজলামো
- ঠক + আমো = ঠকামো
মি
- ছেলে + মি = ছেলেমি
ই
- বাহাদুর + ই = বাহাদুরি
- ডাক্তার + ই = ডাক্তারি
- দোকান + ই = দোকানি
- মাদ্রাজ + ই = মাদ্রাজি
ইয়া > এ
- সেকাল + এ = সেকেলে
- পাথর + এ = পাথুরে
- জাল + এ = জেলে
- খুন + এ = খুনে
- কনকন + এ = কনকনে
উয়া > ও
- ধান + ও = ধেনো
- দাঁত + ও = দেঁতো
- বাত + উয়া = বাতুয়া > বেতো
- মাছ + উয়া = মাছুয়া > মেছো
খ. বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়
১. ওয়ালা > আলা (হিন্দি)
- বাড়ি-বাড়িআলা
- মাছ-মাছওয়ালা
২. ওয়ান > আন (হিন্দি)
- গাড়ি-গাড়োয়ান
- দার-দারোয়ান।
৩. আনা > আনি (হিন্দি)
- মুনশী-মুনশীআনা
- বিবি-বিবিআনা
- হিন্দু-হিন্দুয়ানি
৪. পনা (হিন্দি)
- ছেলে-ছেলেপনা
- গিন্নী-গিন্নীপনা
- বেহায়া-বেহায়াপনা
৫. সা > সে (হিন্দি)
- পানি+সা=পানসা>পানসে
- কাল+সা=কালসা>কালসে
৬. গর > কর (ফারসি)
- কারিগর
- বাজিকর
- সওদাগর
৭. দার (ফারসি)
- তাঁবেদার
- খবরদার
- বুটিদার
- দেনাদার
- মে পাহারাদার
৮. বাজ (দক্ষ অর্থে-ফারসি)
- কলমবাজ
- ধড়িবাজ
- ধোঁকাবাজ
৯. বন্দী (বন্দ্-ফারসি)
- জবানবন্দী
- সারিবন্দী > সারবন্দী
- নজরবন্দী
- কোমরবন্দ
১০। সই (মতো অর্থে)
- জুতসই
- মানানসই
- চলনসই
- টেকসই
গ. সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়
- মাধুর্য = মধুর + ষ্ণ্য
- সৌভাগ্য = সুভগ + ষ্ণ্য
- নীলিমা = নীল + ইমন্
- দয়াবান = দয়া + বতুপ্
- তেজস্বী = তেজঃ + বিন্
- বৌদ্ধ = বুদ্ধ + ষ্ণ
- কৌমার্য = কুমার + ষ্ণ্য
- শৈব = শিব + ষ্ণ
- বৈদ্য = বেদ + ষ্ণ্য
- বৈষ্ণব = বিষ্ণু + ষ্ণ
- যশস্বী = যশঃ + বিন্
- গুণবান = গুণ + বতুপ্
- শ্রীমান = শ্রী + মতুপ্
- প্রাচ্য = প্রাচী + য
- পঞ্চভৌতিক = পঞ্চভূত + ষ্ণিক
- পারলৌকিক = পরলোক + ষ্ণিক
- বৈমাত্রেয় = বিমাতৃ (বিমাতা) + ষ্ণেয়
- লাঘব = লঘু + ষ্ণ
- গৌরব = গুরু + ষ্ণ
- জলীয় = জল + নীয় (ঈয়)
- বুদ্ধিমান = বুদ্ধি + মতুপ
- জৈন = জিন + ষ্ণ
- কৈশোর = কিশোর + ষ্ণ
- দাশরথি = দশরথ + ষ্ণি
- আগ্নেয় = অগ্নি + ষ্ণেয়
- শৌর্য = শূর + ষ্ণ্য
- শাক্ত = শক্তি + ষ্ণ
- মেধাবী = মেধা + বিন
- মহিমা = মহৎ + ইমন
- সাম্য = সম + য
- শৈশব = শিশু + ষ্ণ
আরো পড়ুন
- সন্ধি বিচ্ছেদ
- সমাস কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী উদাহরণসহ বিস্তারিত
- বাংলা শব্দভাণ্ডার:এর উৎস ও শ্রেণিবিভাগ
- বাংলা বানানের নিয়ম
- কারক ও বিভক্তি নির্ণয়
- বাগধারা
- ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান
- উপসর্গ কাকে বলে
- বাক্য কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী, সার্থক বাক্যের গুণ থাকে
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
