বাংলা শব্দভাণ্ডার ব্যাপক সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় লাখেরও বেশি শব্দ রয়েছে। বাংলা শব্দভাণ্ডার প্রথমে এত সমৃদ্ধ ছিলো না। কালে কালে বিভিন্ন ভাষার সংস্পর্শে বাংলা শব্দভাণ্ডার ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। সময়ের পরিক্রমায় এই শব্দগুলো কোনোটা সম্পূর্ণ বিকৃত হয়েছে, আবার কোনোটা সামান্য বিকৃত হয়েছে, কোনোটা অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ ছয় শ বছরের মুসলিম শাসনের ফলে বহু আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে। এর দুই শ বছর ইংরেজ শাসনেও বহু ইংরেজি শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে যোগ হয়েছে। বর্তমানেও বহু শব্দ বাংলা শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে। ফলে দিন দিন তা আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে।

বাংলা শব্দভাণ্ডার উৎস ও শ্রেণিবিভাগ
(১) অর্থগত দিক
(২) গঠনগত দিক
(৩) উৎসগত দিক।
১. অর্থগত দিক
অর্থগতভাবে বাংলা ভাষার শব্দসমূহ তিন প্রকার। যেমন:
ক) যৌগিক শব্দ
যে সকল শব্দের প্রচলিত অর্থ ও উৎসগত অর্থ একই তাদের যৌগিক শব্দ বলা হয়। যেমন:
- গায়ক = গৈ+ণক (অক), অর্থ: গান করে যে।
- কর্তব্য = কৃ+তব্য, অর্থ: যা করা উচিত।
- দৌহিত্র = দুহিতা + ষ্ণ্য, অর্থ: কন্যার পুত্র, নাতি।
খ) রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ
প্রত্যয় ও উপসর্গ যোগে যে সব শব্দের প্রচলিত অর্থ ও উৎসগত অর্থ আলাদা হয় তাদের রূঢ় বা রূঢ়ি শব্দ বলে। যেমন:
- হস্তী (উৎসগত অর্থ হস্ত আছে যার। কিন্তু প্রচলিত অর্থ পশু বিশেষ)।
- হরিণ (উৎসগত অর্থ যে হরণ করে কিন্তু প্রচলিত অর্থ পশু বিশেষ)।
- ঝি, বাঁশি, তৈল, প্রবীণ, পাঞ্জাবী, সন্দেশ, গবেষণা ইত্যাদি।
গ) যোগরূঢ় শব্দ
সমাসবদ্ধ যে শব্দের বিভিন্ন অর্থ আছে কিন্তু শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট অর্থের জন্য ব্যবহার হয় তাকে যোগরূঢ় শব্দ বলে। যেমন:
- জলদ (আভিধানিক অর্থ জল দেয় যে। এখানে জল দিতে পারে এমন অনেক কিছুই আছে কিন্তু এখানে একটি অর্থকে বুঝাচ্ছে তা হলো মেঘ।),
- অনুরূপ: পঙ্কজ, রাজপুত, মহাযাত্রা, জলধি, তুরঙ্গম ইত্যাদি।
২. গঠনগত দিক
গঠনগতভাবে বাংলা শব্দসমূহ দুই প্রকার। যেমন:
ক) মৌলিক শব্দ:
যে শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে ঐ শব্দের মূল ছাড়া অন্য কোনো রূপ পাওয়া যায় না, তাকে মৌলিক শব্দ বলে। যেমন-
- হাত, ফুল, কর, বই।
খ) সাধিত শব্দ:
যে সকল শব্দ বিশ্লেষণ করলে মূল শব্দ ছাড়া অন্য কোনো বর্ণ বা শব্দ পাওয়া যায় তাকে সাধিত শব্দ বলে। যেমন:
- হাতা, ফুলেল, করা ইত্যাদি।
এটি ২ প্রকার:
ক) নামশব্দ: হাতা, ফুলেল ইত্যাদি।
খ) ক্রিয়াশব্দ: করা, বলা ইত্যাদি।
৩. উৎসগত দিক
উৎসগতভাবে বাংলা শব্দগুলো পাঁচ প্রকার। যেমন:
(ক) তৎসম
(খ) অর্ধতৎসম
(গ) তদ্ভব
(ঘ) দেশি
(ঙ) বিদেশি
ক) তৎসম শব্দ
যে সব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে কোনো পরিবর্তন না হয়ে সরাসরি বাংলা ভাষায় এসেছে , সেগুলোকে তৎসম শব্দ বলে।
- যেমন: ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য, ব্রাহ্মণ, বাস,আদর, খিল, ছাদ, মিনতি, রিপু, লেবু, কুন্তল,কন্যা, জঙ্গল, জল, চালক, নদী, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, গ্রহ, ভবন, বার্তা, পুরি, মরিচ, তারকা, দই, রামায়ণ, শাখা, শির, প্রতিষ্ঠান, কৃষক, কোষ, ভাষা, ইত্যাদি।
খ) অর্ধতৎসম শব্দ
বাংলা ভাষায় যে সব সংস্কৃত শব্দ সামান্য পরিবর্তন হয়ে বাংলা ভাষায় এসেছে তাকে অর্ধতৎসম শব্দ বলে। যেমন:
- জোছনা, ছেরাদ্দ, গিন্নী, কুচ্চিত, কেষ্ট এগুলো অর্ধতৎসমে ব্যবহার হয়। এগুলো যথাক্রমে জ্যোৎস্না, শ্রাদ্ধ, গৃহিণী, কুৎসিত, কৃষ্ণ, ইত্যাদি তৎসম থেকে এসেছে।
গ) তদ্ভব বা খাঁটিবাংলা শব্দ
যে সকল সংস্কৃত শব্দ ব্যাপকভাবে পরিবর্তন হয়ে বাংলায় ব্যবহার হয় তাদের তদ্ভব শব্দ বলে। তদ্ভব শব্দের অপর নাম খাঁটি বাংলা শব্দ।
- যেমন: চর্মকার > চম্মআর > চামার।
- মৎস > মাছ
- অনুরূপ: কুলা, খোলা, চুলা, চামেলি, চালুআজ, আতা, উনুন, এলাচি, কাজ, কঞ্চি, কেরানি, চাঁদা, ছাই, ছিনতাই,, চাহিদা, ছাতা, চাহিদা, চিনি, শিখ দাদা, ঠাকুর, ডাগর, পাড়া, পানি, পাচার, মিঠাই, তরকারি, লাগাতার, কামাই, মস্ত, বাচ্চা, বোন, বর্শা, ভাত, দোতারা, তেজ, নাম, মহড়া, মন, মাস, বাঁদর, কামার, ওঝা, রং, মই ইত্যাদি।
ঘ) দেশি শব্দ
যে সব শব্দ এদেশের প্রাচীন অদিবাসী অনার্য বা দ্রাবিড় ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় এসেছে সেগুলোকে দেশি শব্দ বলে।যেমন-
- ডালা, ডাহা, ডিঙি, ঢেঁড়ি, ঢোকরা, ঢোল,আলু, কমলা, কাতান, খদ্দর, খুচরা, টেক্কা, ডাঙর, ডাব, ডিঙা, ডালনা, ডাঙা, ডালপালা, ঢেউ, ঢিল, তামাক, তামাকু, ধুচন, ধুচনি, নিকাশ, কুড়ি, কুড়া, কয়লা, কুটোকাটা, ঝোল, পেট, টোপর, মালিশ, সড়কি ইত্যাদি।
ঙ) বিদেশি শব্দ
যে সকল বিদেশি শব্দ বাংলা ভাষায় ব্যবহার হয় তাদেরকে বিদেশি শব্দ বলা হয়। যেমন:
আরবি শব্দ
- আদালত, আবির, আয়েশ, আসবাব, আসল, আসামি, ইনকিলাব, আজব, আতর, ইজারা, এলাকা, কবর, গরিব, ছবি, জমজমাট, জমা, জলসা, জাহাজ, জিনিস, জুলুম, জৌলুস, তালিকা, বই, বকেয়া, বন্দুক, বিলাত, বোরকা, মসলা, মহব্বত, মহল্লা, মামলা, মুহুরি, মেকি, মেজাজ, মেরামত, মোলায়েম, মৌসুম, লেপ, লোকসান, শখ, শহিদ, শুরু, আকবর, আমিন, ইজ্জত, ইদ, ইন্তিকাল, ইশারা, ইসলাম, উকিল, ওজন, কবুল, কাফন, কাফের, খবর, খাজনা, খারাপ, জরিপ, জরিমানা, দখল, দলিল, দালাল, নগদ, নায়েব, বাতিল, মওকুফ, মক্কেল, মজবুত, মফস্বল,
তুর্কি শব্দ
- খান, খোকা, চকমক, চাকু, চিক, উর্দু, কফি, কাঁচি, কাবু, কুর্নিশ, কুলি, কোর্মা, খাঁ, তুর্কি, বাবুর্চি, বাহাদুর, মোগল, লাশ, সওগাত।
পর্তুগিজ শব্দ
- আলপিন, আলমারি, আলকাতরা,আনারস, ইংরেজ, ইংরেজি, ইস্পাত, ইস্তিরি, আয়া, কেদারা, কামরা, কার্তুজ, গামলা, গরাদ, গির্জা, চাবি, জানালা, তোয়ালে, নিলাম, পাউরুটি, পেয়ারা, পেরেক, পাদরি, ফিতা, বালতি, বোতাম, বোমা, বেহালা, মিস্ত্রি, মাইরি, মাস্তুল, কপি, পেঁপে, গুদাম।
ফরাসি
- ওলন্দাজ, আঁতাঁত, চকলেট, গ্যারেজ, বুর্জোয়া, ম্যাটিনি, পিস্তল, ফর্মা, পাউডার, ফরম, ক্যাপিট্যাল, ক্যাপসুল, ইস্কুপ, ক্যাফে, কুপন, রেস্তোরাঁ, ক্যাডেট, ক্যাথলিক, ক্যান্টনমেন্ট, ক্যান্টিন, ক্যানভাস, রেস্টুরেন্ট, গ্যারান্টি।
জাপানি
- ক্যারাটে, জুডো, রিক্সা, হাসনাহেনা।
ল্যাটিন/লাতিন
- ইউনিয়ন, ইউনিফর্ম, ক্যামেরা, টিউমার, ক্যামেলিয়া।
হিন্দি
- কাহিনি, খানা, ঝকমক, ঢেঁকি, টহল, ডেরা, বরগা, বাসন, ঝাড়ু, খতিয়ান, চোঙা, দাঙ্গা, ধুতি, নানা, ইস্তক, ওয়ালা, ঠান্ডা, রশি ।
ইংরেজি
- পেন্সিল, লাইব্রেরি, ব্যাগ, মার্কা, স্কুল, কলেজ, চেয়ার, টেবিল, স্টিমার, ফুটবল, মাস্টার, ডাক্তার, নার্স, পেন্সিল, কফিন, কামান, ক্রুশ, জিরাফ, টিন, দিনেমার, নভেল, নোট, ক্যম্বিস, ক্যানেস্তারা, ক্রু।
গুজরাটি
- হরতাল, খদ্দর, তকিল।
চীনা
- চা, লিচু চিনি লুচি, এলাচ।
মায়ানমার (বর্মি)
- ফুঙিগ,লুঙ্গি, কিয়াং।
স্পেনিশ
- ক্যাফেটেরিয়া, আলপাকা, হারিকেন, হারমাদি, হারমাদ।
ওলন্দাজ
- হরতন, রুইতন, ইস্কাপন তুরুপ, ইত্যাদি।
মিশ্র শব্দ
দুটি ভিন্ন জাতের শব্দ দিয়ে কোনো শব্দ তৈরি হলে তাকে মিশ্র বা শংকর শব্দ বলে।
- সোনার-হরিণ = বাং + তৎ
- রাজাবাদশা = তৎ + ফা
- শাকসবজি = তৎ + ফা
- হেডপণ্ডিত = ইং + তৎ
- মাস্টারমশাই = ইং + তদ্ভব
- হেডমৌলভী = ইং + ফা
- পকেটমার = ইং + বাং
- কালিকলম = বাং + আ
- শ্রমিক-মালিক = তৎ + আ
- আইনজীবী = ফা + তৎ
- গুরুগিরি = তৎ + ফা
- খ্রিষ্টাব্দ = ইং + তৎ
- হাফহাতা = ইং + তদ্ভব
- ডাক্তারখানা = ইং + ফা
- ফুলমোজা = ইং + ফা
- হাট-বাজার = বাং + ফা
- চৌহদ্দি = ফা + আ
- বেহেড = ফা + ইং
- চাবিকাঠি = পর্তু + বাং
আরো পড়ুন
- সন্ধি বিচ্ছেদ
- ধ্বনি পরিবর্তন: কত প্রকার ও কী কী?
- ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান | সহজ নিয়ম, সংজ্ঞা, উদাহরণ
- বাংলা শব্দভাণ্ডার:এর উৎস ও শ্রেণিবিভাগ
- বাংলা বানানের নিয়ম: Best 50+ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম, উদাহরণ
- কারক ও বিভক্তি নির্ণয়: সংজ্ঞা, প্রকারভেদ ও উদাহরণ
- বাগধারা
- সন্ধি বিচ্ছেদ শেখার সহজ উপায়, Best 200+সন্ধি বিচ্ছেদ
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
