কারক ও বিভক্তি
কারক ও বিভক্তি বাংলা ব্যাকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারক বুঝতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কারকের অর্থ। কারক শব্দটির অর্থ হলো যা ক্রিয়া সম্পাদন করে। কারক এক ধরনের সম্পর্ক। বাক্যের মধ্যে অবস্থিত নামপদের সাথে ক্রিয়াপদের যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাকে কারক বলে। যেমন সোহাগ ভাত খান। এখানে সোহাগ ও ভাত নামপদ এবং খান ক্রিয়াপদ। কারক প্রত্যয় সাধিত।

কারক কাকে বলে?
বাক্যের মধ্যে অবস্থিত নামপদের সাথে ক্রিয়াপদের যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তাকে কারক বলে।
কারক কত প্রকার?
কারক ছয় প্রকার।
১. কর্তৃ কারক
২. কর্ম কারক
৩. করণ কারক
৪. সম্প্রদান কারক
৫. অপাদান কারক
৬. অধিকরণ কারক
একটি বাক্যের মাধ্যমে এই ছয়টি কারকের উদাহরণ দেখালে ব্যাপারটা বুঝতে সহজ হবে।
- সোহাগ প্রতিদিন তার ঘর থেকে নিজ হাতে অসহায়দের খাবার দিতেন।
এখানে,
১. ক্রিয়ার সাথে কর্তৃসম্বন্ধ হলো- সোহাগ
২. ক্রিয়ার সাথে কর্ম সম্বন্ধ হলো- খাবার
৩. ক্রিয়ার সাথে করণ সম্বন্ধ হলো- হাতে
৪. ক্রিয়ার সাথে সম্প্রদান সম্বন্ধ হলো- অসহায়দের
৫. ক্রিয়ার সাথে অপাদান সম্বন্ধ হলো- ঘর থেকে
৬. ক্রিয়ার সাথে অধিকরণ সম্বন্ধ হলো- প্রতিদিন
এটা শুধুমাত্র হালকা ধারণার জন্য। পুরো আলোচনা পড়লে বিস্তারিত বুঝা যাবে।
বিভক্তি কাকে বলে?
বাক্যে অবস্থিত একটি শব্দের সাথে অন্য শব্দের মিলনের জন্য যে সকল বর্ণ যুক্ত হয় তাকে বিভক্তি বলে।
যেমন বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খায়। এখানে বাঘে (বাঘ + এ বিভক্তি) মহিষে ( মহিষ+ এ বিভক্তি )। এ সপ্তমী বিভক্তি।
বিভক্তি | একবচন | বহুবচন |
প্রথমা | (0) শূন্য, অ, | রা, এরা, |
দ্বিতীয়া | কে, রে, | দিগকে, দেরকে, |
তৃতীয়া | দ্বারা, দিয়া/ দিয়ে, কর্তৃক | দিগের দ্বারা, দিগ দ্বারা, দিগ কর্তৃক, |
চতুর্থী | কে, রে, | দিগকে, দেরকে, |
পঞ্চমী | হতে, থেকে, চেয়ে | দিগ হইতে, দের হইতে, |
ষষ্ঠী | র, এর | দিগের, দের |
সপ্তমী | এ, য়, তে | দিগে, দিগেতে, গুলিতে/গুলোতে, গণে। |
নিচে প্রতিটা কারকের বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-
১. কর্তৃকারক
বাক্যের মধ্যে অবস্থিত যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ কাজ/ ক্রিয়া সম্পন্ন করে সেটা হচ্ছে ক্রিয়ার কর্তা অর্থাৎ কর্তৃকারক।
সহজভাবে বোঝার জন্য : ক্রিয়ার সঙ্গে “কে” বা ‘কারা’ যোগ করে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় সেটাই হচ্ছে কর্তৃকারক।
কর্তৃকারক কয়েক প্রকারের হয়ে থাকে।
ক. মুখ্য কর্ত:
যে নিজে নিজেই ক্রিয়া সম্পাদান করে সে হচ্ছে মুখ্যকর্তা। যেমন,
- ছেলেরা ক্রিকেট খেলছে।
- কালবৈশাখীর ঝড় হচ্ছে।
এখানে ছেলেরা এবং ঝড় হচ্ছে মুখ্য কর্তা।
খ. প্রযোজক কর্তা:
মূল কর্তা যখন অন্যকে কোনো কাজে নিয়োজিত করে তা সম্পন্ন করায়, তখন তাকে প্রযোজক কর্তা বলে। যেমন-
- শিক্ষক ছাত্রদের অংক করাচ্ছেন।
- বস কর্মচারীদের কাজ শিখাচ্ছেন।
এখানে, শিক্ষক এবং বস হচ্ছে প্রযোজক কর্তা।
গ. প্রযোজ্য কর্তা:
মূল কর্তা করণীয় কাজটি যাকে / যাদের দিয়ে সম্পাদিত হয়, তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে। যেমন-
- শিক্ষক ছাত্রদের অংক করাচ্ছেন।
- বস কর্মচারীদের কাজ শিখাচ্ছেন।
এখানে, ছাত্র এবং কর্মচারী হচ্ছে প্রযোজ্য কর্তা।
ঘ. ব্যতিহার কর্তা:
একটা বাক্যে দুটো কর্তা একত্রে একজাতীয় ক্রিয়া সম্পাদন করলে তাদের ব্যতিহার কর্তা বলে। যেমন-
- ষাড়ে-ষাড়ে লড়াই।
- গরু-মহিষে এক গোয়ালে ঘাস খায়।
এখানে, ষাড়ে-ষাড়ে, গরু-মহিষে হচ্ছে ব্যতিহার কর্তা।
২. কর্মকারক
বাক্যে যাকে আশ্রয় করে কর্তা ক্রিয়া/ কাজ সম্পন্ন করে তাকে কর্মকারক বলে। কর্ম দুই প্রকার।
- মুখ্য কর্ম
- গৌণ কর্ম
একটি বাক্য দিয়ে মুখ্য কর্ম, গৌণ কর্ম বুঝে নেই:
- বড় মামা সোহাগকে একটি বাইক কিনে দিয়েছেন।
এখানে, ‘সোহাগকে’ হচ্ছে গৌণ কর্ম এবং ‘বাইক’ হচ্ছে মুখ্য কর্ম।
মনে রাখার টিপস: মুখ্য কর্মে বিভক্তি যুক্ত হয় না। গৌণ কর্মে বিভক্তি যুক্ত থাকে। আবার মুখ্য কর্ম বস্তুবাচক এবং গৌণ কর্ম প্রাণীবাচক হয়ে থাকে।
কর্মকারকের প্রকারভেদ ও এর উদাহরণ।
ক. সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম
সোহাগ পানি খাচ্ছে। এখানে ‘পানি’ সকর্মক ক্রিয়ার কর্ম
খ. প্রযোজক ক্রিয়ার কর্ম
বাচ্চাটিকে খাবার খাওয়াও। এখানে ‘বাচ্চাটিকে’ প্রযোজক ক্রিয়ার কর্ম।
গ. সমধাতুজ কর্ম
খুব এক খাওয়া খেয়েছি। এখানে ‘খাওয়া খেয়েছি’ হচ্ছে সমধাতুজ কর্ম।
৩. করণ কারক
করণ শব্দের অর্থ যন্ত্র, সহায়ক বা উপায়। তাহলে করণ কারকের সংজ্ঞায় বলা যায়- ক্রিয়া সম্পাদনের যন্ত্র উপকরণ বা সহায়ককেই করণ কারক বলা হয়।
মনে রাখার টিপস: বাক্যের ভিতর ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘কিসের দ্বারা’ বা ‘কি উপায়ে’ প্রশ্ন করলে যে উত্তরটি পাওয়া যায় তাই হচ্ছে করণ কারক
যেমন-
- সোহাগ কলম দিয়ে লেখে।
এখানে উপকরণ হলো কলম। তাই কলম হচ্ছে করণ কারক
- ভালো ডাক্তার হয় অধ্যবসায়ে।
এখানে অধ্যাবসায় হচ্ছে করণ কারক। কারণ এই বাক্যে যদি বলা হয় কি উপায়ে ডাক্তার হওয়া যায় তাহলে উত্তর আসে অধ্যাবসায় সুতরাং এখানে অধ্যবসায় করণ কারক।
করণ কারকের কিছু উদাহরণ
- ট্রাক্টর দ্বারা জমি চাষ করা হয়
- ফলে ফলে গাছ ভরে গেছে
- চেষ্টায় সব হয়।
এখানে প্রতিটা বাক্যে কিসের দ্বারা বা কি উপায়ে প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায়। এখানে “ট্রাক্টর” এবং “ফলে ফলে” এবং “চেষ্টায়” এগুলো এই বাক্যে করণ কারকের উদাহরণ ।
৪. সম্প্রদান কারক
কোন শর্ত ছাড়া অর্থাৎ স্বত্ব ত্যাগ করে দান করা, অর্চনা করা বা সাহায্য করা হলে তখন তাকে সম্প্রদান কারক বলে।
উদাহরণ :
- ভিখারিকে ভিক্ষা দাও।
- সৎ পাত্রে কন্যা দান করো।
- অন্ধজনে দেহ আলো।
- দরিদ্রকে দান করো।
৫. অপাদান কারক
যা থেকে কিছু বিচ্যুত,গৃহীত, জাত, বিরত, আরম্ভ, দূরীভূত ও রক্ষিত হয় এবং যা দেখে কেউ ভীত হয় তাকেই অপাদান কারক বলে।
নিচে এই সবগুলোর উদাহরণ দেখানো হলো:
বিচ্যুত বোঝাতে
- গাছ থেকে ফল পড়ে।
- মেঘ থেকে বৃষ্টি পড়ে।
জাত বুঝাতে
- তিলে তেল হয়
- খেজুর রসে গুড় হয়
- আখের রসে চিনি হয়
ভয় পাওয়া বোঝাতে
- সাপকে ভয় পায় না কে?
- বড় মামাকে অনেক ভয় পাই
গৃহীত বোঝাতে
- ঝিনুক থেকে মুক্তা মেলে
- দুধ থেকে দই হয়।
বিরত বোঝাতে
- অন্যায় থেকে বিরত হও
আরম্ভ বোঝাতে
- কাল থেকে পরীক্ষা শুরু হবে
- সোমবার থেকে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে
দূরীভূত বোঝাতে
- দেশ থেকে করোনা ভাইরাস চলে গেছে।
৬. অধিকরণ কারক
ক্রিয়া সম্পাদনের কাল/ সময় এবং আধারকে অধিকরণ কারক বলে। এখানে আধার অর্থ স্থান বুঝায়। অধিকরণ কারকের উদাহরণ :
আধার বা স্থান
- কৃষক রোজ মাঠে যায়
- আমরা রোজ স্কুলে যাই
- এই জায়গায় মানুষ বসবাস করে না
- এই মাঠে গরু ঘাস খায়।
এখানে স্কুল, মাঠ, জায়গা ইত্যাদি হলো বাক্যে অধিকরণ কারক।
- কাল/ সময় –
- সকালে সূর্য ওঠে
- সন্ধ্যায় সূর্য অস্ত যায়
- রাতে বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফেরে।
এখানে সকালে সন্ধ্যায় রাতে হচ্ছে বাক্যে অধিকরণ কারক।
অধিকরণ কারকের প্রকারভেদ-অধিকরণ কারক তিন প্রকার
ক. কালাধিকরণ
বাক্যে যে সময়ে বা কালে ক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় তাকে কালাধিকরণ বলে। যেমন-
- প্রভাতে সূর্য ওঠে
- আশ্বিনে শিউলি ফোটে
খ. আধারাধিকরণ
ক্রিয়াটি নির্দিষ্ট স্থান বা পাত্রে সংঘটিত হয়। যেমন-
- পুকুরে মাছ আছে
- ঘাটে নৌকা বাধা আছে।
আধারাধিকরণকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
১. ঐকদেশিক
অনেক বড় স্থানের যেকোনো অংশে ক্রিয়া বা কাজ সংঘটিত হলে তাকে ঐকদেশিক আধারাধিকরণ বলে। যেমন-
- পুকুরে মাছ আছে
- মাঠে গরু বাধা আছে
- আকাশের তারা দেখা গেছে।
এখানে পুকুরে মাঠে বা আকাশের যে কোন অংশে হয়, পুরো অংশ জুড়ে নয়।। তাই এই সব বাক্যের ‘পুকুরে’, ‘মাঠে’, ‘আকাশে’, হচ্ছে আধারাধিকরনের উদাহরণ।
২. অভিব্যাপক
বস্তু যদি সমগ্র স্থান ব্যাপ্ত করে বিরাজমান থাকে তবে তাকে অভিব্যপক আধারাধিকরণ বলে।
যেমন-
- তিলে তেল আছে
- পুকুরে পানি আছে
এখানে তিলের পুরোটা অংশে তেল আছে এবং পুকুরের পুরোটা অংশে পানি আছে তাই এই বাক্যে ‘তিলে’ এবং ‘পুকুরে’ হচ্ছে অভিব্যাপক আধারাধিকরণের উদাহরণ।
৩. বৈষয়িক
কোন বিশেষ বিষয়ে বা কোন বিশেষ গুণে কারো কোন দক্ষতা বা ক্ষমতা থাকলে সেখানে বৈষয়িক অধিকরণ হয়। যেমন-
- সোহাগ ইংরেজিতে কাঁচা।
- বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর যুদ্ধে অপরাজেয়।
এই বাক্যে ইংরেজিতে এবং যুদ্ধে হচ্ছে বৈষয়িক অধিকরণ।
গ. ভাবাধিকরণ
সহজ ভাষায় বলতে গেলে বলা যায়, একটি কাজ হওয়ার ওপর অন্য একটি কাজের নির্ভরতা বুঝায়। যেমন-
- কাঁদলে কষ্ট কমে।
- সূর্যোদয়ে অন্ধকার দূরীভূত হয়।
বাংলা ব্যাকরণে কারক ও বিভক্তি এর গুরুত্ব অপরিসীম। কারক ও বিভক্তি এর মাধ্যমে আমরা বাংলা ব্যাকরণকে আরো সহজ ভাবে বুঝতে পারি।
গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. কারক কাকে বলে?
বাক্যে ক্রিয়াপদের সঙ্গে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদের যে সম্পর্ক তৈরি হয়, তাকে কারক বলে।
২. কারক কত প্রকার ও কী কী?
কারক ছয় প্রকার: কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণ কারক, সম্প্রদান কারক, অপাদান কারক ও অধিকরণ কারক।
৩. বিভক্তি কাকে বলে?
বাক্যের একটি শব্দের সাথে অন্য শব্দের সম্পর্ক প্রকাশের জন্য শব্দের শেষে যে বর্ণ বা বর্ণগুচ্ছ যুক্ত হয়, তাকে বিভক্তি বলে। যেমন— ছেলে + রা = ছেলেরা।
৪. কারক ও বিভক্তির মধ্যে পার্থক্য কী?
কারক হলো ক্রিয়ার সাথে নামপদের সম্পর্ক (অর্থগত/ব্যাকরণগত ভূমিকা), আর বিভক্তি হলো সেই সম্পর্ক প্রকাশের জন্য শব্দের সাথে যুক্ত হওয়া বর্ণ (রূপগত চিহ্ন)। এক কথায়— কারক অর্থ বোঝায়, বিভক্তি রূপ বোঝায়।
৫. কর্তৃকারক চেনার সহজ উপায় কী?
ক্রিয়াপদকে “কে” বা “কারা” দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটিই কর্তৃকারক।
৬. কর্মকারক চেনার উপায় কী?
ক্রিয়াপদকে “কী” বা “কাকে” দিয়ে প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায়, সেটি কর্মকারক।
৭. অধিকরণ কারক কত প্রকার?
সাধারণত তিন প্রকার: কালাধিকরণ, আধারাধিকরণ ও ভাবাধিকরণ (কিছু ব্যাকরণে বিষয়াধিকরণকে আলাদা চতুর্থ প্রকার হিসেবেও দেখানো হয়)।
৮. একই বিভক্তি একাধিক কারকে ব্যবহৃত হয় কেন?
বাংলায় বিভক্তির চেয়ে কারকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় (এবং বিভক্তি রূপগত, কারক অর্থগত হওয়ায়) একই বিভক্তি (যেমন “-এ”) ভিন্ন ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন কারক (করণ, অধিকরণ ইত্যাদি) বোঝাতে পারে — তাই শুধু বিভক্তি দেখে নয়, বাক্যের অর্থ বুঝেই কারক নির্ণয় করতে হয়।
আরো পড়ুন
- সন্ধি বিচ্ছেদ
- সমাস কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী উদাহরণসহ বিস্তারিত
- বাংলা শব্দভাণ্ডার:এর উৎস ও শ্রেণিবিভাগ
- বাংলা বানানের নিয়ম
- কারক ও বিভক্তি নির্ণয়
- বাগধারা
- ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান কাকে বলে
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
