Skip to main content

Study Journalx

ধ্বনি পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

 

বাংলা ব্যাকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধ্বনি পরিবর্তন। উচ্চারণের সুবিধা, শব্দের গঠন এবং বিবর্তনের ফলে শব্দের ধ্বনিতে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনকেই ধ্বনি পরিবর্তন বলা হয়। ধ্বনি পরিবর্তনের ফলে শব্দ গঠন উচ্চারণ সহজ হয়।  বাংলা ব্যাকরণ, SSC, HSC, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ও চাকরির পরীক্ষায় ধ্বনি পরিবর্তন থেকে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। তাই বিষয়টি ভালোভাবে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

ধ্বনি পরিবর্তন

ধ্বনি পরিবর্তন কাকে বলে?

উচ্চারণের সুবিধা, আঞ্চলিকতা বা অন্য কোনো কারণে শব্দের মধ্যের ধ্বনি পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করলে তাকে ধ্বনি পরিবর্তন বলে।

 

ধ্বনি পরিবর্তনের কারণ

বাংলা ভাষায় ধ্বনি পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো উচ্চারণ সহজ করা। উচ্চারণ সহজ করার জন্য ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে থাকে। এছাড়া ভাষার বিবর্তনের ফলে ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে থাকে। যুগ যুগ ধরে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় পরিবর্তন হয় এর ফলে ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে থাকে। অনেক সময় আঞ্চলিকতার প্রভাবে ও এই পরিবর্তন ঘটে থাকে। আবার বিদেশি শব্দের প্রভাবে ও ধ্বনি পরিবর্তন হয়। দেশি ভাষায় বিদেশি শব্দ ঢুকলে এই পরিবর্তন ধটে থাকে। ধ্বনি পরিবর্তন আরো একটি বড় কারণ হলো দ্রুত উচ্চারণ। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে থাকে। কথা বলার জড়তা থেকেও ধ্বনি পরিবর্তন হয়ে থাকে।

 

ধ্বনি পরিবর্তনের প্রকারভেদ

 

সাধারণত তিন রকমের ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে

ক. নিঃশর্ত পরিবর্তন ও

যখন কোনো ধ্বনি শর্তহীনভাবে যেকোনো প্রতিবেশে পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে নিঃশর্ত পরিবর্তন বলে।

খ. সশর্ত পরিবর্তন

যখন  কোনো বিশেষ প্রতিবেশে কোনো বিশেষ ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে সশর্ত পরিবর্তন বলে।

গ. বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন

যখন কোনো ধ্বনির পরিবর্তন ঘটে বিশেষ প্রতিবেশে , আবার কখনো ঘটে না তাকে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন বলে।

 

ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়া

 

নিচে ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলো দেওয়া হলো-

১. আদিস্বরাগম

 

শব্দের শুরুতে যুক্তব্যঞ্জন থাকলে, তার আগে অনেক সময় একটি স্বরধ্বনি যোগ করা হয়। একে বলা হয় আদিস্বরাগম। আদিস্বরাগম অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটে থাকে যুক্তব্যঞ্জনের প্রথমটি হয়- /স/

যেমন-

  •  স্ত্রী > ইস্ত্রী
  •  স্মিতা >  ইস্মিতা
  • স্পর্ধা > আস্পর্ধা
  • স্নেহ > ইস্নেহ
  •  স্তুপ > ইস্তুপ
  •  স্নান > ইস্নান ইত্যাদি

 

বিদেশী, বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ উচ্চারণে আদিস্বরাগমের উদাহরন

  • স্কুল > ইস্কুল
  • স্ট্যাবল > আস্তাবল
  • স্টেশন > ইস্টিশন
  • স্টাম্প >  ইস্টাম্প
  • স্প্রিং > ইস্প্রিং।

 

২.মধ্যস্বরাগম

 

উচ্চারণের সুবিধার্থে শব্দের মাঝে স্বরধ্বনির আগমন হলে তাকে আদি মধ্যস্বরাগম বলে। সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির মাঝখানে স্বরধ্বনি আসলেও তাকে মধ্যস্বরাগম বলে। এ প্রক্রিয়াকে বিপ্রকর্ষ স্বরভক্তি বলা হয়ে থাকে।

উদাহরন:

  • প্রীতি > পিরীতি
  • যত্ন > যতন
  • রত্ন > রতন
  • ধর্ম > ধরম
  • হর্ষ > হরষ
  •  গ্রাম>  গেরাম
  •  মুক্তা  > মুকুতা
  •  ভ্রু > ভুরু
  • প্রেক > পেরেক

 

 

৩. অন্ত্য স্বরাগম

শব্দের শেষে স্বরধ্বনির আগমন ঘটলে তাকে অন্ত্যস্বরাগম বলা হয়।

উদাহরন:

  • বেঞ্চ > বেঞ্চি,
  • সত্য > সত্যি
  • বড়া > বড়াই
  • নস্য>নস্যি

 

 

 

৪. সমীভবন

 

ধ্বনি পরিবর্তনের প্রক্রিয়াগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া সমীভবন। সমীভবন একরকম সশর্ত পরিবর্তন। কোনো ধ্বনি যখন পরিবর্তন হয়ে পাশের  কোনো ধ্বনির মতো হয়ে ওঠে, তখন তাকে সমীভবন বলে। এমন পরিবর্তন ঘটে থাকে উচ্চারণ সহজ সরল সুবিধাজনক করার জন্য।যেমন-

  • কাঁদনা > কান্না
  • জন্ম > জন্ন

প্রভাবশালী ও প্রভাবিত ধ্বনির অভিমুখ অনুসারে সমীভবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়।

ক) প্রগত সমীভবন

খ) পরাগত সমীভবন

গ) পারস্পরিক  সমীভবন

 

ক) প্রগত সমীভবন

যখন প্রথম  ধ্বনিটি শক্তিশালী  হয় ও পরবর্তী ধ্বনিটিকে নিজের মতো করে তোলে, তখন তাকে বলা হয় প্রগত সমীভবন। যেমন-

  • গলদা > গল্লা
  • পদন > পদ্দ
  • লগ্ন > লগ্গ/লগগ
  • যাইতে পারি > যাইত্তারি
  • চন্দন > চন্নন

 

খ) পরাগত সমীভবন

যখন পরবর্তী ধ্বনিটি বেশি শক্তিশালী  হয় এবং পূর্ববর্তী ধ্বনিটিকে নিজের মতো করে তোলে তখন তাকে পরাগত সমীভবন বলে। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা থেকে প্রাকৃতে ধ্বনি পরিবর্তনের পাওয়া যায়। যেমন-

  • রক্ত >রত্ত
  • মুক্তা > মুত্তা
  • কর্ম > কম্ম
  • ভক্ত> ভত্ত

আধুনিক বাঙলায় পরাগত উদাহরন:

  • মৎস্য> মশশ
  •  ধর তাকে >ধত্তাকে
  •  রথ দেখা >রদ্দেখা
  • উৎস > উশশ
  • কার টাকা > কাটটাকা।

 

গ) পারস্পারিক সমীভবন

যখন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী দুটি ধ্বনিই পরপদের প্রভাবে পরিবর্তন হয়ে সমতা লাভ করে তখন তাকে বলা হয় পারস্পরিক সমীভবন। উদাহরন

  • সত্য > সচ্চ
  • বিদ্যা > বিজ্জা
  • কুৎসিত > কুচ্ছিত
  • বিশ্রী > বিচ্ছিরি
  • বৎসর >বচ্ছর

সংস্কৃত কিছু সন্ধিতে পারস্পরিক সমীভবনের উদাহরণ পাওয়া যায়-

  • উৎ + শ্বাস> উচ্ছ্বাস
  • প্রতি + স্থান > প্রতিষ্ঠান

 

৫. বিষমীভবন

 

সমীভবনের বিপরীত প্রক্রিয়া হচ্ছে বিষমীভবন। যখন দুটি অভিন্ন বা বৈশিষ্ট্যসম্পূর্ণ ধ্বনির মধ্যে একটি বদলে যায় তখন তাকে বলা হয় বিষমীভবন।

  • প্রাকৃতে বিষমীভবনের উদাহরন লক্ষ করা যায়- নূপুর >নেউর।
  • পুরুষ >পুবিস, পিপীলিকা > কিপিল্লিকা
  • বাংলা – লাল > নাল, অভিভাবক > অবিভাবক, বিবাহ > বিভা
  • পর্তুগিজ- আনানস > আনারস।

 

 

৬. ধ্বনি বিপর্যয়

 

একই শব্দের দুটি ধ্বনি যদি পরস্পর স্থানবদল করে তবে তাকে বলা হয় ধ্বনি বিপর্যয়। এ বিপর্যয়ের মূলে বাক প্রত্যঙ্গের থেকে স্নায়ুর ভূমিকাই বেশি। ধ্বনি বিপর্যয়ের  দু-রকম উদাহরণ পাওয়া যায়।

ক) কখনো কিছুটা দূরবর্তী  ধ্বনির মধ্যে বিপর্যয় ঘটে।

খ) সন্নিহিত ধ্বনি স্থানবদল করে

ধ্বনি বিপর্যয়ের উদাহরন:

 

  • রিকশা > রিশকা
  • জানলা > জালনা
  • বাক্স > বাসক
  • ডেস্ক > ডেক্স
  • রিস্ক > রিক্স
  • মহারাষ্ট্র > মারহট্ট
  • দ্রহ > দহ
  • লাফ>  ফাল
  • পিশাচ> পিচাশ,
  • মুকুট > মুটুক

 

 

৭. স্বরলোপ

 

উচ্চারণের সুবিধা বা দ্রুত উচ্চারণের জন্য শব্দের আদি, মধ্য বা শেষে স্বরধনি লোপ পেলে তাকে স্বরলোপ বলে। স্বরলোপ তিন প্রকার- আদি, মধ্য ও অন্তস্বরলোপ ।

 

ক. আদিস্বরলোপ

শব্দ-শুরুতে স্বরধ্বনিলোপ পাওয়াকে বলা হয় আদিস্বরলোপ।

উদাহরন:

  • অতসী > তসী
  • আছিল > ছিল

 

খ. মধ্যস্বরলোপ

শব্দের মাঝখানের  স্বরধ্বনির লোপ পেলে তাকে মধ্যস্বরলোপ বলে।

উদাহরন সংস্কৃতে:

  •  অগুরু > অগ্রু

বাংলাঃ

  • গৃহিনী > গিন্নী
  • বাদল > বাদলা
  • রাধনা > রান্না
  • পাগল > পাগলা

 

গ. অন্ত্যস্বরলোপ

শব্দের শেষে স্বরধ্বনি লোপ পেলে তাকে  অন্তস্বরলোপ বলে।

উদাহরণ ইংরেজি:

  • nama > name
  • sónu > son
  • mona > moon

বাংলা

  •  দাড়িম্ব > ডালিম

 

৮. অপিনিহিতি

 

পরের ই-কার আগে উচ্চারিত হলে কিংবা যুক্ত ব্যঞ্জনধানির আগের ই-কার বা উ-কার উচ্চারিত হলে তাকে অপিনিহিতি বলে।

উদাহরন:

  • বাক্য > বাইক্ক
  • সত্য > সইত্ত
  • কথ্য > কইথ্য
  • পদ্য > পইদ্য
  • ভাগ্য >ভাইগ্য
  •  দ্রব্য > দইব্য
  • গদ্য > গইদ্য
  • আজি > আইজ,
  • করিয়া > কইর‍্যা,
  • চারি > চাইর,
  • রাতি > রাইত ইত্যাদি।

 

 

৯. অভিশ্রুতি

 

অভিশ্রুতি একরকম অসন্নিহিত সমীভবন। তবে অভিশ্রুতিতে সমীভবন ঘটে স্বরধ্বনির মধ্যে। অভিশ্রুতি অপিনিহিতির পরবর্তী পর্যায়। বিপর্যন্ত স্বরধ্বনি পূর্ববর্তী স্বরধ্বনির সাথে মিলে গেলে এবং সেই অনুসারে  পরবর্তী স্বরধ্বনির পরিবর্তন ঘটলে তাকে অভিশ্রুতি বলা হয়।

উদাহরণঃ

  • করিয়া> করে
  • জানিয়া > জেনে
  • রাখিয়া > রেখে
  • ফেলিয়া > ফেলে

১০. স্বরসঙ্গতি

 

একটি স্বরধ্বনির প্রভাবে শব্দে তার স্বরের পরিবর্তন ঘটলে তাকে স্বরসঙ্গতি বলে। যেমন:

  • দেশি > দিশি
  •  বিলাতি > বিলিতি

 

ক) প্রগত স্বরসঙ্গতি

পূর্ববস্বরধ্বনির  প্রভাবে পরবর্তী স্বরধ্বনি পরিবর্তিত হলে তাকে প্রগত স্বরসঙ্গতি বলে

উদাহরণ:

  • পূজা > পুজো
  •  মূলা > মুলো,
  • রূপা > রূপো
  •  ধূলা > ধুলো
  •  কুমড়া > কুমড়ো

 

খ) পরাগত স্বরসঙ্গতি

পরবর্তী স্বরধ্বনির প্রভাবে পূর্ববর্তী স্বরধ্বনি পরিবর্তন ঘটলে তাকে পরাগত স্বরসঙ্গতি বলে।

উদাহরণ:

  • দেশি > দিশি
  •  দেই > দিই
  • বিলাতি > বিলিতি
  • এখনি > এখুনি

 

গ) পারস্পারিক স্বরসঙ্গতি

পাশাপাশি অবস্থিত দুটি স্বরধ্বনি যখন একটির প্রভাবে অন্যটির পরিবর্তন ঘটে তখন তাকে পারস্পরিক স্বরসঙ্গতি বলে। যেমন-

  •  মোজা > মুজো
  •  ধোঁকা> ধুকো
  • খোকা>  খুকু

 

 

১১. অসমীকরণ

 

স্বরধনির পুনরাবৃত্তি দূর করার জন্য শব্দের মাঝে যখন আরেকটি স্বরধনির যুক্ত করা হয় তখন তাকে অসমীকরণ বলে। যেমন-

  • টপ + টপ > টপাটপ
  • ধপ + ধপ > ধপাধপ

 

 

১২. দ্বিত্ব ব্যঞ্জন

 

কোনো শব্দ জোর দিয়ে বলার সময় শব্দের মধ্যের ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ হয়, একে দ্বিত্ব ব্যঞ্জন বলে। যেমন

  • পাকা >  পাক্কা
  • সকাল > সক্কাল

 

১৩. ব্যঞ্জন বিকৃতি

 

কোনো কোনো সময় শব্দের মধ্যের ব্যঞ্জন পরিবর্তন হয়ে নতুন ব্যঞ্জনধ্বনি ব্যবহৃত হয়। একে ব্যঞ্জন বিকৃতি বলে। যেমন-

  • ধোবা > ধোপা
  • কবাট > কপাট

১৪. ব্যঞ্জনচ্যুতি

 

দুটি ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি সমউচ্চারণের ফলে একটি লোপ পেলে তাকে ব্যঞ্জনচ্যুতি বলে। যেমন-

  • বড় দাদা > বড়দা
  • বউদিদি > বউদি

 

১৫. হ-কার লোপ

 

চলিত  ভাষায় দুই স্বরের মাঝামাঝি হ-কার লোপ পেলে তাকে হ-কার লোপ বলে।

  • পুরোহিত > পুরুত
  • চাহে > চায়

 

পরীক্ষায় আসা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

ধ্বনি পরিবর্তন কাকে বলে?

উচ্চারনের সুবিধা আঞ্চলিকতা বা অন্য কোনো কারনে শব্দের মধ্যাকার ধ্বনির পরিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করলে তাকে ধ্বনি পরিবর্তন বলে।

ধ্বনি পরিবর্তনের প্রধান কারণ কী?

উচ্চারণের সুবিধা ও ভাষার বিবর্তন।

  • কর্ম → কম্ম = সমীভবন
  •  ধর্ম → ধম্ম = সমীভবন
  •  গল্প → গপ্প = সমীভবন
  •  স্কুল → ইস্কুল = স্বরাগম
  •  জানালা → জানলা = স্বরলোপ

 

 

আরো পড়ুন