দুই বা তার বেশি পদ বা শব্দ একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ এবং যথার্থ অর্থ প্রকাশ করলে তাকে বাক্য বলে। পদ হলো বাক্যের একক, কারণ অনেক পদের সমষ্টিই বাক্য। বাক্যে ব্যবহৃত প্রতিটি শব্দই পদ। বাক্য ছাড়া ভাষা অসম্পূর্ণ। মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে ব্যক্ত করতে বাক্যের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বাংলা ভাষায় শুদ্ধভাবে ব্যবহারের জন্য বাক্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। এছাড়াও মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিসিএসসহ বিভিন্ন চাকরি পরীক্ষায় বাক্য থেকে প্রশ্ন এসে থাকে। এই আর্টিকেলে বাক্য কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী, সার্থক বাক্যের গুণ থাকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এই আর্টিকেলটি পড়লে বাক্য নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

বাক্য কাকে বলে?
দুই বা তার বেশি পদ একত্রিত হয়ে সম্পূর্ণ এবং যথার্থ অর্থ প্রকাশ করলে তাকে বাক্য বলে। যেমন:
- ছেলেটি মাঠে খেলা করে।
বাক্যের প্রধান অংশ ৩ টি
ক) কর্তা (যে কাজ করে)। নাইম ও ফাইম ছবি আঁকে।
খ) কর্ম (যা অবলম্বন করে কাজটি হয়)। নাইম ও ফাইম ছবি আঁকে ।
গ) ক্রিয়া (যে পদ দ্বারা কোনো কিছু করা বা ঘটা বোঝায়)। নাইম ও ফাইম ছবি আঁকে।
বক্তব্যের লক্ষ্য অনুযায়ী বাক্যকে ৪ ভাগে ভাগ করা হয়
১. বিবৃতিবাচক
সাধারণভাবে কোনো বিবরণ প্রকাশ পায়। এটি ইতিবাচক বা নেতিবাচক হতে পারে। যেমন:
- আমরা রোজ হাঁটতে যেতাম। (ইতিবাচক)
- আমি কাল বিশ্ববিদ্যালয় যাবো না (নেতিবাচক)
২. প্রশ্নবাচক
কিছু জানার জন্য প্রশ্নস্বরূপ যে বাক্য করা হয় তাকে প্রশ্নবাচক বাক্য বলে। যেমন:
- তোমার নাম কী?
- তারা কি বাড়ি পৌঁছেছে?
৩. অনুজ্ঞাবাচক
আদেশ, নিষেধ, অনুরোধ, প্রার্থনা ইত্যাদি প্রকাশ করলে তাকে অনুজ্ঞাবাচক বাক্য বলে। যেমন:
- আমাকে একটি বই দাও।
- আমার আশীর্বাদ নিয়ো।
৪ আবেগবাচক
কিছু দেখে বা শুনে অবাক হয়ে যে ধরনের বাক্য তৈরি হয় তাকে আবেগবাচক বাক্য বলে। যেমন:
- দারুণ! আমরা জিতে গিয়েছি।
- এতো উঁচুতে উঠে আমি ভয়েই মরি!
গঠন অনুসারে বাক্য ৩ প্রকার
১. সরল বাক্য
২. জটিল/মিশ্র বাক্য
৩. যৌগিক বাক্য
১. সরল বাক্য
যে বাক্যে একটি মাত্র কর্তা এবং একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে। অর্থাৎ কোনো বাক্যে একটি কর্তা এবং একটি ক্রিয়া থাকলে তাকে সরল বাক্য বলে। যেমন:
- আকাশে তারা জ্বলছে।
- সে প্রতিদিন সকালে হাঁটতে যায়।
২. মিশ্র বা জটিল বাক্য
সাপেক্ষ সর্বনাম ও সাপেক্ষ যোজক দিয়ে যে বাক্য তৈরী হয় তাকে জটিল বাক্য বলে।
সাপেক্ষ সর্বনাম: যে-সে, যারা-তারা, যিনি-তিনি, যাঁরা-তাঁরা, যা-তা ইত্যাদি।
সাপেক্ষ যোজক: যদি-তবে, যদিও-তবু, যেহেতু-সেহেতু, যত- তত, যেটুকু-সেটুকু, যেমন-তেমন ইত্যাদি।
যেমন:
- যে মেয়েটি এখানে এসেছিল, সে আমার বোন।
- যখন ফুটবল খেলা শুরু হলো তখন দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিল।
এখানে প্রথম অংশ আশ্রিত বাক্য আর দ্বিতীয় অংশ হলো প্রধান খন্ড বাক্য
আশ্রিত খণ্ড বাক্য তিন প্রকার
ক. বিশেষ্য স্থানীয় আশ্রিত খণ্ড বাক্য
যে আশ্রিত খন্ডবাক্য প্রধান খন্ডবাক্যের যে কোনো পদের আশ্রিত থেকে বিশেষ্যের কাজ করে, তাকে বিশেষ্যস্থানীয় আশ্রিত খন্ডবাক্য বলে।যেমন:
- আমি বাড়ি গিয়ে দেখলাম, মা মামার বাড়ি চলে গিয়েছে।
খ. বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ড বাক্য
যে আশ্রিত খণ্ডবাক্যপ্রধান খন্ডবাক্যের অন্তর্গত কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামের দোষ, গুণ এবং অবস্থা প্রকাশ করে, তাকে বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খন্ডবাক্য বলে। যেমন:
- যে ছেলেটি সৎ, তাকে সবাই পছন্দ করে।।
গ. ক্রিয়া বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খণ্ড বাক্য
যে আশ্রিত খন্ডবাক্য ক্রিয়াপদের স্থান, কাল ও কারণ নির্দেশক অর্থে ব্যবহৃত হয়, তাকে ক্রিয়া-বিশেষণ স্থানীয় আশ্রিত খন্ডবাক্য বলে।যেমন:
- যতই পড়িবে, ততই শিখিবে।
৩. যৌগিক বাক্য
যে বাক্যটি বিশ্লেষণ করে একাধিক সরল বাক্য বা স্বাধীন বাক্য পাওয়া যায় তাকে যৌগিক বাক্য বলে। যেমন:
- তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন কিন্তু আমাকে চিনলেন না।
যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত নিরপেক্ষ বাক্যগুলো এবং, ও, কিন্তু, অথবা, অথচ, সেজন্য, ফলে, কিংবা, বরং, তথাপি প্রভৃতি যোজক দ্বারা সংযুক্ত থাকে। যেমন:
- নেতা জনগণকে উৎসাহিত করলেন বটে, কিন্তু কোনো পথ দেখাতে পারলেন না।
- বস্ত্র মলিন কেন, কেহ জিজ্ঞাসা করিলে সে ধোপাকে গালি পাড়ে।
- না খেয়ে থাকবো, তবুও কারো কাছে হাত পাতবো না।
কমা (,), সেমিকোলন (;), কোলন (:), ড্যাশ (-) এসব যোজকের মাধ্যমেও যৌগিক বাক্য হয়। এক্ষেত্রে সরাসরি যোজক দেখা না গেলেও সংক্ষেপিত যৌগিক বা যৌগিক বলতে হয়। যেমন:
- অন্ধকার হয়ে এসেছে-বন্ধুরাও মুখ ভার করে রইল।
- পরিশ্রম করো, সফল হবে।
বাক্যের গুণ
একটি পূর্ণ বাক্যে কয়েকটি গুণ থাকতে পারে।বাক্যের উপর নির্ভর করে এই গুণ হয়। বাক্যের তিনটি গুণ থাকে। আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি, যোগ্যতা।
১. আকাঙ্ক্ষা
বাক্যের পূর্ণ অর্থ বোঝার জন্য পরবর্তী পদ শোনার যে ইচ্ছা, তাকেই আকাঙ্ক্ষা বলে। যেমন: ‘চন্দ্র পৃথিবীর চার দিকে’- এ টুকু বললে বাক্যটি সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশ করে না, আরও কিছু শোনার ইচ্ছা থেকে যায়। বাক্যটি এভাবে পূর্ণাঙ্গ করা যায়:
- চন্দ্র পৃথিবীর চার দিক ঘোরে।
এখানে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে বলে এটি সম্পূর্ণ বাক্য।
২. আসত্তি
বাক্যের সম্পূর্ণ মনোভাব প্রকাশের জন্য বাক্যে অবস্থিত পদগুলোকে সঠিকভাবে সাজিয়ে লেখা বা বলার নামই আসত্তি। অর্থাৎ বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য সুশৃঙ্খল পদবিন্যাস-ই আসত্তি। যেমন:
- রেজাল্ট আমাদের কাল পরীক্ষার দেবে
লেখা হওয়াতে পদ সন্নিবেশ ঠিক ভাবে না হওয়ায় শব্দ গুলোর অন্তর্নিহিত ভাবটি যথাযথ প্রকাশিত হয়নি। তাই এটি একটি বাক্য হয়নি। মনের ভাব সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করার জন্য পদ গুলোকে নিম্নলিখিত ভাবে যথাস্থানে সাজাতে হবে। যেমন:
- কাল আমাদের পরীক্ষার রেজাল্ট দেবে
৩. যোগ্যতা
বাক্যের মধ্যে পদসমূহের অর্থ ও ভাবগত মিলকে যোগ্যতা বলে। যেমন:
- বর্ষার বৃষ্টিতে প্লাবনের সৃষ্টি হয়।
এটি একটি যোগ্যতাসম্পূর্ন বাক্য। কারণ বাক্যটিতে পদসমূহের অর্থগত ও ভাবগত সমন্বয় রয়েছে। কিন্তু ‘বর্ষার রৌদ্র প্লাবনের সৃষ্টি করে।’ বললে বাক্যটি ভাবপ্রকাশের যোগ্যতা হারাবে। কারন রৌদ্র প্লাবন সৃষ্টি করে না।
শব্দের যোগ্যতার সাথে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জড়িত
ক. দুর্বোধ্যতা
অপ্রচলিত, দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করলে বাক্য যোগ্যতা হারায়। যেমন: তুমি আমার সঙ্গে প্রপঞ্চ করেছ। (চাতুরী বা মায়া অর্থে বাংলায় অপ্রচলিত তাই দুর্বোধ্যতার কারণে বাক্যটি অশুদ্ধ।)।
- শুদ্ধ বাক্য: তুমি আমার সাথে চাতুরী করেছ।
খ. উপমার ভুল প্রয়োগ
সঠিকভাবে উপমা অলংকার ব্যবহার না করলে যোগ্যতার নষ্ট হয়। যেমন: আমার হৃদয় মন্দিরে আশার বীজ উপ্ত হলো (ভুল)। বীজ ক্ষেতে বপন করা হয়, মন্দিরে নয়। কাজেই বাক্যটি হওয়া উচিত
- আমার হৃদয় ক্ষেত্রে আশার বীজ উপ্ত হলো (শুদ্ধ)।
গ. বাহুল্য দোষ
প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহারে বাহুল্য দোষ ঘটে এবং এর ফলে বাক্য তার যোগ্যতা হারায়। যেমন: দেশের সব আলেমগণই এ ব্যাপারে আমাদের সমর্থন দান করেন। আলেমগণ বললেই বহুবচন হয়ে যায়। নতুবা বলতে হবে সব আলেম (বহুবচন বাচক শব্দ)। এর সঙ্গে ‘সব’ শব্দটি অতিরিক্ত ব্যবহার বাহুল্য দোষ সৃষ্টি করছে।
ঘ. বাগধারার রদবদল
বাগধারা ভাষা বিশেষের ঐতিহ্য। এর যথেচ্ছা পরিবর্তন করলে শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। যেমন: ‘অরণ্যে রোদন’ (অর্থ নিষ্ফল আবেদন) এর পরিবর্তে যদি বলি ‘বনে ক্রন্দন’ তবে বাগধারাটি তার যোগ্যতা হারায়।
ঙ. গুরুচণ্ডালী দোষ
তৎসম শব্দের সঙ্গে দেশীয় শব্দের প্রয়োেগ কখনও কখনও গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে। এ দোষে দুষ্ট শব্দ তার যোগ্যতা হারায়। ‘গরুর গাড়ি’ ‘শবদাহ’ ‘মড়াপোড়া’ প্রভৃতি স্থলে যথাক্রমে ‘গরুর শকট’, ‘শবপোড়া, ‘মড়াদাহ’ প্রভৃতি ব্যবহার গুরুচণ্ডালী দোষ সৃষ্টি করে।
চ. রীতিসিদ্ধ অর্থবাচকতা
প্রকৃতি প্রত্যয়জাত অর্থে শব্দ সর্বদা ব্যবহার না করে কখনও কখনও যোগ্যতার দিক থেকে রীতিসিদ্ধ অর্থের দিকে লক্ষ্য রেখে কতকগুলো শব্দ ব্যবহার করতে হয়। যেমন- ‘বাধিত’ শব্দটির রীতিসিদ্ধ বা প্রচলিত অর্থ ‘কৃতজ্ঞ’ এবং প্রকৃতি-প্রত্যয়জাত অর্থ ‘বাধাপ্রাপ্ত’। তাই শব্দটি কৃতজ্ঞ অর্থে ব্যবহার না করলে যোগ্যতা হারাবে।
আরো পড়ুন
- সন্ধি বিচ্ছেদ
- সমাস কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী উদাহরণসহ বিস্তারিত
- বাংলা শব্দভাণ্ডার:এর উৎস ও শ্রেণিবিভাগ
- বাংলা বানানের নিয়ম
- কারক ও বিভক্তি নির্ণয়
- বাগধারা
- ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান
- উপসর্গ কাকে বলে
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
