বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম যে গ্রন্থটি রচিত হয়, তার নাম চর্যাপদ। আদি যুগে রচিত একমাত্র সাহিত্যিক গুণসমৃদ্ধ গ্রন্থ এটি, যা বাংলা সাহিত্যে একটি বড় অংশজুড়ে আছে। চর্যাপদ কবে রচিত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। এ বিষয় নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, চর্যাপদের রচনাকাল ৬৫০ সাল থেকে। অন্যদিকে, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মনে করেন, চর্যাপদের রচনাকাল ৯৫০ সালের দিকে। প্রাচীন যুগে রচিত এই গ্রন্থ আমাদের সেই সময়ের সমাজ, ধর্ম, অর্থনীতি, জীবনব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তৃত ধারণা দেয়। পদকর্তারা বিভিন্ন কালে ও বিভিন্ন স্থানে বর্তমান ছিলেন বলে তাঁদের দেখা সমাজ একরকম ছিল না। ফলে বিভিন্ন সময় ও স্থানের চিত্র এতে ভেসে ওঠে। এই আর্টিকেলে চর্যাপদের সমাজচিত্র আলোচনা করা হল।

চর্যাপদের সমাজচিত্র
চর্যাপদে অতি সাধারণ মানুষের জীবনপ্রণালী দেখা যায়। যেখানে নিম্নস্তরের মানুষের প্রাধান্য ছিল সবচেয়ে বেশি। কোনো রাজা বা দেবদেবীর কাহিনি চর্যাপদে স্থান পায়নি। সমাজে যারা লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অবহেলিত, শোষিত, নিষ্পেষিত, যাদের কোনো অধিকার নেই, তাদের কথা চর্যাপদের পরতে পরতে উদ্ভাসিত হয়েছে। চর্যাপদের সমাজচিত্রে নিম্নস্তরের মানুষের জীবনবৃত্তান্ত অতি সাবলীল ভাষায় ব্যক্ত হয়েছে। তাদের আচার-আচরণ, রীতি-নীতি, ধর্ম, জীবনপদ্ধতি দেখে উপলব্ধি করা যায়, সমাজে তাদের স্থান কোথায় ছিল। উঁচু স্তরের মানুষের কোনো স্থান চর্যাপদে পাওয়া যায়নি। অতি সাধারণ মানুষের কথা উঠে এসেছে এ গ্রন্থে। তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কথা উঠে এসেছে। তাই চর্যাপদকে সাধারণ মানুষের গ্রন্থ বলা যায়।
আবার চর্যাপদে যে সমাজচিত্র পাওয়া যায়, তা একান্তভাবে বাঙালির নয়। এটা সমস্ত ভারতবর্ষের জীবনাচার। সিদ্ধাচার্যরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন, কারণ তাঁরা সমাজ থেকে বিচ্যুত ছিলেন। এ জন্য চর্যাপদে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের চিত্র উঠে এসেছে। চর্যাপদের অধিকাংশ পদে নিম্নশ্রেণির বিচ্যুত, অবহেলিত মানুষের বর্ণনা এসেছে। তাঁরা অর্থনৈতিক, সামাজিক সব ক্ষেত্রে সমাজ থেকে বিচ্যুত। চর্যাপদে আমরা যেসব ভাষা, পদ, পেশা দেখি, তা সবটাই অবহেলিত মানুষের জীবনচিত্র। চর্যাপদের সমাজচিত্রে এমন মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা সমাজ থেকে দূরে পাহাড়ের টিলায় বাস করত।
“টালট মোর ঘর নাহি পড়বেসী” (৩৩ নং চর্যা)
এখানে দেখা যায়, টিলার ওপর তার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নেই। অর্থাৎ এখানে জনবসতি থেকে বিচ্যুতির কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ সমাজের নিচু স্তরের মানুষের কথা বলা হয়েছে। সমাজের নিচু জাতি বলে তার কোনো প্রতিবেশী নেই। চর্যাপদের সমাজচিত্রে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষেরা নগরের বাইরে বাস করে।
“নগর বাহিরিয়ে ডোম্বী তোহোরি কুড়িল।” (১০ নং চর্যা)
এই পদে বলা হয়েছে, নগরের বাইরে ডোম্বীর কুঁড়েঘর, অর্থাৎ সেও সমাজ থেকে বিচ্যুত। তার কোনো অধিকার নেই। চর্যাপদে মূলত নিচু জাতির কথা বলা হয়েছে, যারা সমাজ থেকে বিচ্যুত এবং তাদের কোনো সম্মানজনক পেশাও ছিল না। সমাজের যত নিচু পেশা ছিল, তা তাদেরই ছিল। যেমন, কাপালিক, যোগী, ডোম্বী, চণ্ডালী, শবরী, তাঁতি, পতিতা ইত্যাদি মানুষের পেশা ছিল। অনেক চর্যায় শিকারের কথাও বলা হয়েছে। যেমন, ৩৩ নম্বর চর্যায় ভীত-সন্ত্রস্ত হরিণের কথা বলা হয়েছে, যে শিকারির ভয়ে ভীত। তার মাংস তারই শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মাংসের জন্য তাকে মরতে হয়। অর্থাৎ, শিকারি পেশার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। শিকারিরা সমাজের নিচু শ্রেণির মানুষ। তারা শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। শিকারিরাও অধিকারবঞ্চিত ছিল।
নদীমাতৃক এই বাংলায় নৌকার ব্যবহার ছিল প্রাচীনকাল থেকে। বিভিন্ন চর্যায় নৌকা চালানো, গুণ টানা, জাল সেচা ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হয়েছে। ডোম্বীদের পেশা ছিল তাঁত বোনা, আবার কারও কারও পেশা ছিল মদ বানানো। কিছু কিছু চর্যায় বাংলার চিরাচরিত দৈনন্দিন জীবনের অভাব, হতাশা ও দুঃখ-অশান্তির কথা বলা হয়েছে। কেউ কেউ সমাজ-সংসার থেকে দূরে থাকার কারণে অভাবে দিন কাটায়। দৈনন্দিন জীবন অনেক কষ্টে কাটে। হাঁড়িতে ভাত না থাকলেও প্রতিদিন অতিথির আগমন ঘটে। এর মাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বের চিত্র দেখানো হয়েছে। এবং ব্যাঙের মতো সংসার বেড়ে যাচ্ছে। এখানে তাই প্রতিদিনের দুঃখ ও অশান্তির কথা বলা হয়েছে।
আবার কিছু কিছু চর্যায় দেখা যায়, তখন বাংলায় চোর-ডাকাতের প্রাদুর্ভাব ছিল। সে সময় চুরি-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অন্যায়-অপকর্ম করতে দেখা যায়। এসব অন্যায়-অপকর্মের কথা চর্যাপদে নিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে।
“কানেট চোরে নিল অধরাতী” (২ নং চর্যা)
গৃহবধূর কানের দুল চোরে নিয়ে গেছে। এর মাধ্যমে বাংলার তৎকালীন সমাজচিত্র দেখা যায়। আবার কিছু কিছু চর্যায় আমরা পতিতাবৃত্তির কথা দেখি। অন্যায় ও অপকর্মের সাথে সাথে পতিতাবৃত্তিও তৎকালীন সময়ে প্রচলিত ছিল। মানুষের চারিত্রিক অবনতির দৃশ্যও চর্যাপদে দেখা গেছে।
“দিবসহি বহুড়ী কাউ হি ডর ভাই।
রাতি ভইলে কামরূ জাই।।”
এই পদে দেখা যায়, দিনের বেলায় গৃহবধূ কাকের ভয়ে ভীত, কিন্তু রাতে কামরূপ যায়। এখানে পতিতাবৃত্তির কথা বলা হয়েছে। যে বউ দিনের বেলাতেও কাককে ভয় পায়, অথচ সেই বউ রাতের বেলায় পতিতাবৃত্তি করতে যায়। এর মাধ্যমে তৎকালীন সময়ে বাংলা সহ সমগ্র ভারতবর্ষের একটি চিত্র আমাদের চোখের সামনে উঠে আসে।
চর্যাপদে আমরা বাঙালির প্রচলিত জীবনব্যবস্থা দেখতে পাই। গরু পালন থেকে শুরু করে দুধ দোহনের কথাও চর্যাপদে বর্ণিত হয়েছে। চাষ করার জন্য বলদ ব্যবহার করা হতো। অবসরে মানুষ দাবা খেলত, মদপান করত। বিনোদনের মাধ্যম ছিল মদপান করা, কর্পূর দিয়ে পান খাওয়া ইত্যাদি। নাচ-গানে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। চর্যাপদে ফুটে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন। এখানে নদ-নদী, নৌকা, চাষ সবকিছুর কথা ফুটে উঠেছে। এটা যেন বাংলারই ছবি। চর্যাপদে আমরা তৎকালীন সমাজকে প্রত্যক্ষভাবে দেখতে পাই।
সমগ্র চর্যাপদে আমরা যে সমাজচিত্র দেখতে পাই, তাতে উচ্চবিত্তের মানুষের কোনো স্থান ছিল না। এর পুরোটাই জুড়ে ছিল নিম্নবিত্ত মানুষ। পদকর্তারা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন। তাঁরা উচ্চবংশের হলেও পরবর্তীতে সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে নিম্নবর্ণের জীবনযাপন করতেন। ফলে তাঁরা সমাজের সাধারণ মানুষের স্থান দিয়েছেন চর্যাপদে। বাংলার চিরাচরিত নদ-নদী, নৌকা, পাহাড়-পর্বত ঘুরে ফিরে চর্যাপদে বারবার এসেছে।
তাই পরিশেষে বলতে পারি, চর্যাপদে প্রাচীন বাংলার সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে। এর মাধ্যমে আমরা তৎকালীন সমাজচিত্র দেখতে পাই। চর্যাপদে নিম্নশ্রেণির মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা সমাজ থেকে বঞ্চিত। তারা সমাজের বাইরে বাস করে এবং সমাজে তাদের কোনো অধিকার নেই। চর্যাপদে বাংলার চিরাচরিত জীবনের প্রত্যক্ষ চিত্র ফুটে উঠেছে।
তথ্যসূত্র
ড. সুকুমার সেন। বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (১ম খণ্ড)
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও আলী আহসান। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (১ম খণ্ড)
FAQ
১. চর্যাপদে কেমন সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে?
চর্যাপদে প্রাচীন বাংলার সাধারণ ও নিম্নশ্রেণির মানুষের জীবনযাত্রা, পেশা, দুঃখ-কষ্ট, সামাজিক অবস্থান ও দৈনন্দিন জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে।
২. চর্যাপদে কোন শ্রেণির মানুষের প্রাধান্য বেশি?
চর্যাপদে নিম্নশ্রেণি ও সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের প্রাধান্য সবচেয়ে বেশি।
৩. চর্যাপদে তৎকালীন মানুষের কী কী পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়?
চর্যাপদে শিকার, তাঁত বোনা, নৌকা চালানো, কৃষিকাজ, মদ তৈরি, যোগসাধনা ও বিভিন্ন নিম্নশ্রেণির পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়।
৪. চর্যাপদে প্রাচীন বাংলার দৈনন্দিন জীবনের কী চিত্র পাওয়া যায়?
চর্যাপদে কৃষিকাজ, গরু পালন, দুধ দোহন, নৌকা চালানো, জাল সেচা, দাবা খেলা, পান খাওয়া, নাচ-গানসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা চিত্র পাওয়া যায়।
৫. চর্যাপদকে সাধারণ মানুষের গ্রন্থ বলা হয় কেন?
চর্যাপদে রাজা বা উচ্চবিত্তের পরিবর্তে সমাজের সাধারণ, নিম্নশ্রেণির ও বঞ্চিত মানুষের জীবন, পেশা, সুখ-দুঃখ ও সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাই চর্যাপদকে সাধারণ মানুষের গ্রন্থ বলা হয়।
আরো পড়ুন
- চর্যাপদ
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ: ইতিহাস, কারণ ও বৈশিষ্ট্য
- সাময়িক পত্র: বাংলা গদ্যের বিকাশে সাময়িক পত্র-পত্রিকার অবদান
- বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও ক্রমবিকাশ
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের বিষয়বস্তু, রচয়িতা কে, খন্ড বিশ্লেষণ
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস, গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্ম
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
