Skip to main content

Study Journalx

বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের পূর্বে সাহিত্যগুণসমৃদ্ধ কোনো গদ্য রচনার অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দৈনন্দিন জীবনে বাঙালির কথাবার্তায় চিরদিন গদ্যরীতি ব্যবহৃত হলেও উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত সাহিত্যে এর অনুপ্রবেশ ঘটেনি এবং এর লিখিত রূপ চিঠিপত্র, দলিল-দস্তাবেজে আবদ্ধ ছিল। ষোড়শ শতক থেকে গদ্যরীতির সূচনা হলেও উনিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময়ে নিতান্ত প্রয়োজনের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকে। এই আটিকেলে বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ 

 

মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের ফলে বাংলা ভাষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এক্ষেত্রে ইংরেজদের অবদান সবচেয়ে বেশি। বাংলা গদ্যের ধারাবাহিক চর্চার পূর্বে কয়েকজন ইংরেজ পণ্ডিত বাংলা গদ্যের বিকাশে সাহায্য করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মানোয়েল দা আসসুম্পসাঁও। তিনি ‘কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ’ গ্রন্থটি রচনা করেন। এরপর ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড ইংরেজি ভাষায় বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। তাঁর গ্রন্থটির নাম ছিল ‘A Grammar of the Bengali Language’ বা ‘বাঙলা ব্যাকরণ’। তিনিই প্রথম বৈয়াকরণ, যিনি বাংলা ব্যাকরণ রচনায় উদাহরণের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ ও বাংলা লিপি ব্যবহার করেন।

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভবে ও বিকাশে শ্রীরামপুর মিশন

খ্রিষ্টান মিশনারিরা ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে এদেশে এসেছিলেন। বাংলা গদ্যের অনুশীলনের ক্ষেত্রে প্রথম সার্থকতা লক্ষ্য করা যায় খ্রিষ্টান মিশনারিদের প্রচেষ্টায়। শ্রীরামপুর মিশন (১৮০০–১৮৪৫) ছিল ভারতের প্রথম নিজস্ব প্রচারক সংঘ। ১৮০০ সালের ১০ জানুয়ারি উইলিয়াম কেরি ও তাঁর সহকর্মীরা এ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্মপ্রচারের জন্য এদেশে আসলেও এই মিশনের উদ্যোগে ভাষা ও সাহিত্যচর্চা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যালয় ও স্ত্রীশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। এই মিশন থেকে উইলিয়াম কেরির বাইবেল অনুবাদ প্রকাশিত হয়। কেরির উদ্যোগে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশন ও মুদ্রণযন্ত্র স্থাপনের ফলে বাংলা গদ্যে বিপ্লব ঘটে। এই প্রেস বা মুদ্রণযন্ত্র থেকে ‘মঙ্গল সমাচার’ প্রকাশিত হয়। শুধু খ্রিষ্টীয় প্রচারপুস্তক মুদ্রণই নয়, কৃত্তিবাসী রামায়ণ (১৮০১) ও কাশীদাসী মহাভারত (১৮০২) মুদ্রণের মাধ্যমে বাঙালি আপামর জনসাধারণের জীবনে শ্রীরামপুর প্রেস গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভবে ও বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ

বাংলাদেশে কর্মরত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীদের দেশীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য তৎকালীন ইংরেজশাসিত ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি কর্তৃক ১৮০০ সালে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ৪ মে প্রতিষ্ঠা দিবস হলেও ২৪ নভেম্বর থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ প্রবর্তিত হলে অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন উইলিয়াম কেরি। তিনি তাঁর অধীনস্থ দুজন পণ্ডিত এবং ছয়জন সহকারী পণ্ডিত নিয়ে বাংলা গদ্যে কলেজের পাঠোপযোগী পুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের রচিত পাঠ্যপুস্তকগুলো বাংলা সাহিত্যের প্রথম লিখিত গদ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁদের রচিত গ্রন্থগুলোর তালিকা তুলে ধরা হলো:

 

লেখকগ্রন্থের নামপ্রকাশকাল
উইলিয়াম কেরিকথোপকথন১৮০১
ইতিহাসমালা১৮১২
রামরাম বসুরাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র১৮০১
লিপিমালা১৮০২
গোলোকনাথ শর্মাহিতোপদেশ১৮০২
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কারবত্রিশ সিংহাসন১৮০২
হিতোপদেশ১৮০৮
রাজাবলি১৮০৮
প্রবোধচন্দ্রিকা১৮৩৩
তারিণীচরণ মিত্রওরিয়েন্টাল ফেবিলিস্ট১৮০৩
রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায়মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং
চণ্ডীচরণ মুন্সীতোতা ইতিহাস
হরপ্রসাদ রায়পুরুষ পরীক্ষা

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভবে ও বিকাশে সাময়িক পত্রিকা

সাময়িক পত্রগুলো বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ এবং তাকে বহুমুখী প্রয়োগের ক্ষেত্রে অপরিসীম অবদান রেখেছে। সাময়িক পত্রের প্রচলন বজায় রাখার জন্য রচনার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে যেমন লেখকদের সৃষ্টি ও অনুশীলনের সুযোগ ঘটেছে, তেমনি পাঠকেরাও সাহিত্যের রস আস্বাদনের সুযোগ পেয়েছেন। তাই বাংলা গদ্যের বিকাশের জন্য যেমন সাময়িক পত্রের প্রয়োজন ছিল, তেমনি সাময়িক পত্রের জন্যও প্রয়োজন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ গদ্যনির্ভর সাহিত্যসৃষ্টির। উল্লেখযোগ্য কিছু সাময়িক পত্রিকা হলো দিকদর্শন, সমাচার দর্পণ, সংবাদ প্রভাকর, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, বঙ্গদর্শন, সবুজপত্র ইত্যাদি। এসব পত্রিকা বাংলা গদ্যের উদ্ভব, বিকাশ ও সমৃদ্ধিতে ব্যাপক অবদান রেখেছে।

 

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভবে ও বিকাশে রাজা রামমোহন রায়

গদ্যরীতিকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন রাজা রামমোহন রায়। তিনি আধুনিকতার অগ্রদূত ছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজসংস্কারক, শিক্ষা সম্প্রসারক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকারী। ধর্ম ও দর্শনতত্ত্বের মতো জটিল বিষয়কে তিনি বাংলা গদ্যে আলোচনা করেন। বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষায় রামমোহন রায়ের অপরিসীম দক্ষতা ছিল। রাজা রামমোহন রায় তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী, ইংরেজ কালেক্টরের দেওয়ান, কোম্পানির শেয়ারের ব্যবসায়ী, ভুটান রাজার কাছে প্রেরিত ইংরেজ দূতের সহকারী, ধর্মশিক্ষা প্রচারক ও সমাজসংস্কারকসহ বহুবিধ কাজ করেছেন। ১৮৩০ সালে তৎকালীন নামমাত্র দিল্লিশ্বর মোগল বাদশাহ দ্বিতীয় আকবর তাঁকে ‘রাজা’ উপাধি দিয়ে ইংল্যান্ডের রাজার কাছে দূত হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন।

বাংলা রচনায় রামমোহনের প্রধান কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—বেদান্তগ্রন্থ, বেদান্তসার (১৮১৫), ভট্টাচার্যের সহিত বিচার (বেদান্তচন্দ্রিকার উত্তর), গোস্বামীর সহিত বিচার (১৮১৮), প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ, সহমরণ-বিরোধী পুস্তিকা, পথ্যপ্রদান, ব্রাহ্মণ সেবধি (১৮২১) ও সংবাদ কৌমুদী (১৮২১–১৮২৯)। এছাড়া আত্মীয় সভা (১৮১৫) ও প্রতিমা উপাসনা সভার মতো উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।

বাংলা গদ্যের বিকাশে এসব রচনা ও কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে অবদান রাখে। তিনি ছিলেন একজন সচেতন ও প্রগতিশীল চিন্তাবিদ। বাংলা গদ্যকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর অবদান অপরিসীম। বাংলা গদ্যের বিকাশ ও আধুনিকীকরণে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা তাই বিশেষভাবে স্মরণীয়।

 

বাংলা গদ্যের উদ্ভবে ও বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫৭–৫৮ সাল পর্যন্ত সময়কালকে একটি পর্ব হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এই পর্বকে ‘তত্ত্ববোধিনী পর্ব’ বা ‘বিদ্যাসাগর পর্ব’ বলা হয়।  খ্রিষ্টীয় ১৮৪১ সালে বিদ্যাসাগর কর্মজীবনে সসম্মানে প্রবেশ করেন। প্রথমে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রধান পণ্ডিত ও বাংলা বিভাগের সেরেস্তাদার পদ লাভ করেন। ইংরেজ শাসকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায়ও দক্ষতা অর্জন করেন। পাঁচ বছর পর তিনি সংস্কৃত কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত হন। এই সময় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম রচনা, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পাঠ্যপুস্তক ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’। এই গ্রন্থ বাংলা গদ্যের বিকাশে ব্যাপকভাবে অবদান রাখে। তাই বাংলা গদ্যের বিকাশে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান অনস্বীকার্য।

 

বাংলা গদ্যের বিকাশ কোনো একক ব্যক্তির অবদান নয়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাংলা গদ্যের বিকাশ ঘটেছে। শ্রীরামপুর মিশন, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, সাময়িক পত্রিকা, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বাংলা গদ্য আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছে।

 

 

FAQ

১. বাংলা গদ্যের উদ্ভব কখন থেকে শুরু হয়?
বাংলা গদ্যের সূচনা ষোড়শ শতক থেকে হলেও উনিশ শতকে এর প্রকৃত বিকাশ ঘটে।

২. বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী কে?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী বলা হয়।

৩. বাংলা গদ্যের বিকাশে শ্রীরামপুর মিশনের অবদান কী?
শ্রীরামপুর মিশন মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন, গ্রন্থ প্রকাশ ও ভাষা-সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

৪. বাংলা গদ্যের বিকাশে রাজা রামমোহন রায়ের ভূমিকা কী?
রাজা রামমোহন রায় পাঠ্যপুস্তকের বাইরে বাংলা গদ্যের ব্যবহার করে গদ্যসাহিত্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

৫. বাংলা গদ্যের বিকাশে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা কী?
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে পাঠোপযোগী বাংলা গদ্যগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে বাংলা গদ্যের চর্চা ও বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।

 

 

আরো পড়ুন