বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভাব ঘটে বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তিনি সব্যসাচীর মতো বিচরণ করেছেন। তিনি একই সঙ্গে কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, কাব্যনাট্য, শিশুসাহিত্য ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে তিনি অসংখ্য সাহিত্যকর্ম লিখে গেছেন। এই ধারারই একটি উপন্যাস ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’। এই আর্টিকেলে দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব আলোচনা করা হল।

সৈয়দ শামসুল হকের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার জটিল বাস্তবতার নিরিখে উপন্যাসটি রচিত। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা এবং সে সময়ের মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। উপন্যাসটি ১৯৭৪ সালের বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে রচিত। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অবস্থা তখন ছিল খুবই অগোছালো। চারদিকে স্বজন হারানোর বেদনা তীব্র হয়ে উঠেছিল। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ তখনও চারদিকে দৃশ্যমান ছিল। ঠিক এই পটভূমিতেই প্রকাশিত হয় ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এসব সংকট অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এক শ্রেণির মানুষ এসব সমস্যার সমাধান না করে বরং আগুনে হাওয়া দিতে শুরু করে। স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ছিল এই দলের লোকজন। তারা তৎকালীন সরকারের পতনের জন্য গোপনে কলকাঠি নাড়ছিল। এ সময় জাসদসহ আরও বিভিন্ন গুপ্ত সংগঠন সরকার পতনের জন্য তৎপর ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর এই নৈরাজ্যের সুযোগ নেয় চোর-ডাকাতরা। তারা চুরি, ডাকাতি ও খুন করে সর্বহারা পার্টির নামে চালিয়ে দিত।
এরপর শুরু হয় ১৯৭৪ সালের বন্যা। বন্যার পর বাংলাদেশে নেমে আসে চরম দুর্ভিক্ষ। এই দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশের মানুষ চরম খাদ্যসংকটে পড়ে। চারদিকে দেখা দেয় মহামারি। খাদ্যের অভাবে বহু মানুষ মারা যায়। এ সময় বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক ছিল ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে। ফলে অন্যান্য দেশগুলো সহযোগিতার পরিবর্তে ষড়যন্ত্রের হাত বাড়িয়ে দেয়। ঠিক এই পটভূমিতে প্রকাশিত হয় ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যসমালোচক অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেন,
“সৈয়দ শামসুল হক দ্বিতীয় দিনেক কাহিনী উপন্যাসে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের যে চিত্র এঁকেছেন, তা মূলত মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতের অনুপুঙ্খ বয়ান। এখানে যুদ্ধের বীরত্বের চেয়ে ‘যুদ্ধ পরবর্তী ট্রামা ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যকার তীব্র অবিশ্বাস বড় হয়ে উঠেছে, যা জলেশ্বরীর অবরুদ্ধ আবহ তৈরি করে।” (বাংলা কথাসাহিত্য: এতিহ্য ও প্রগতি: ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ: কথা প্রকাশা, ঢাকা)
দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট দেখা যায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও মানুষের মনে যুদ্ধের ক্ষত রয়ে গেছে। তাহেরের স্ত্রীকে পাকিস্তানি বাহিনী নির্মমভাবে ধর্ষণ করে। ফলে তিনি আত্মহত্যা করেন। এতে তাহেরের মধ্যে স্বজন হারানোর বেদনা তীব্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে তার মধ্যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট তৈরি হয়।
স্ত্রীর স্মৃতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে তাহের ঢাকা ছেড়ে কল্পিত নগর ‘জলেশ্বরী’র একটি উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরি নেয়। যাওয়ার পথে সে একটি স্টেশনে নামে। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশে অপরিচিত মানুষকে দেখলেই অনেক সময় বিহারি বা রাজাকার বলে সন্দেহ করা হতো। তাহেরও সেই বিপদের সম্মুখীন হয়। এখানে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি মানুষের গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট ও মানসিক অবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বিজয়ের আনন্দের চেয়ে চারদিকে ধ্বংসাবশেষ ও স্বজন হারানোর বেদনা বড় হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জলেশ্বরীতে বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম বেড়ে গেছে। সেখানে কোনো উৎসবের আমেজ নেই। জলেশ্বরীতে ‘ক্যাপ্টেন’ ডাকনামের এক মুক্তিযোদ্ধা ও কমান্ডারের তাণ্ডব তখনো চলছিল। পুরো শহর যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। তবে কমান্ডার তাহেরের পক্ষ নেয়। এ এলাকায় কমান্ডারের একচ্ছত্র আধিপত্য চলে। ‘ক্যাপ্টেন’ স্টেশনে তাহেরকে সাহায্য করে এবং তাকে একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে এই এলাকার বিভিন্ন ধরনের নৈরাজ্য ও অরাজকতার পেছনেও ‘ক্যাপ্টেন’-এর ভূমিকা রয়েছে।
তাহের এই স্কুলে এসে দেখে, অবস্থা করুণ। চারদিকে যুদ্ধের ছাপ, দেওয়ালে আজও রক্তের চিহ্ন। তাহেরের থাকার মতো কোনো জায়গা হয় না। বাধ্য হয়ে তাকে স্কুলের অফিসের একটি কক্ষে থাকতে হয়। আর খাওয়াদাওয়া করে পরানের পরিবারের সঙ্গে। যুদ্ধের সময় দেশের প্রায় সব স্কুলের মাওলানা শিক্ষকই পাকিস্তানপন্থি ছিলেন। এই স্কুলের মাওলানা শিক্ষকও তার ব্যতিক্রম নন। জলেশ্বরীতে মূলত তিনজনের হাতে ক্ষমতা ছিল ক্যাপ্টেন মজহার, হাফেজ (স্থানীয় এমপি) এবং হাকিম (মহকুমার প্রধান)। এই তিনজনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। তবে ক্যাপ্টেন ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সবার জন্য কাজ করতেন। কোনো অন্যায় দেখলে নিজের মতো করে বিচার করতেন। তিনি মনে করতেন, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, যুদ্ধ এখনো বাকি। হাকিম ও হাফেজের সঙ্গে তার দ্বন্দ্বও এই উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে।
তাহেরের পূর্ববর্তী হেডমাস্টারের সময়কার একটি ঘটনার মাধ্যমে লেখক সে সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ছিল, তা তুলে ধরেছেন। এই এলাকায় স্কুলকে ঘিরে নানা ধরনের রাজনীতি চলত। স্কুলের ছাত্ররা পরীক্ষায় নকল করার দাবি তোলে। কিন্তু তাহেরের পূর্ববর্তী হেডমাস্টার নকলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। হাফিজ ও হাকিমের প্ররোচনায় ছাত্ররা নকল করে। এ কারণে হেডমাস্টারকে পদত্যাগ করতে হয়। এমনকি ছাত্ররা তাকে জুতার মালা পরিয়ে দেয়। ক্যাপ্টেন এই ঘটনা দেখে চারজন ছাত্রকে গুলি করে আহত করেন এবং ওই শিক্ষককে স্টেশনে পৌঁছে দেন। এভাবে ক্যাপ্টেন সমাজের বিভিন্ন মানুষের উপকার করতেন। উপন্যাসে তাঁর এসব কর্মকাণ্ডের বর্ণনাও তুলে ধরা হয়েছে।
ক্যাপ্টেন এভাবে কিছু ভালো কাজ করলেও সে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। সে মনে করত, যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি। তাই তাকে আবার অস্ত্র হাতে তুলে নিতে হয়েছিল। উপন্যাসের শেষের দিকে ক্যাপ্টেনের স্ত্রী জলেশ্বরীতে আসে। তার নামও ছিল হাসনা। হাসনাকে দেখে তাহেরের অতীতের স্মৃতি তাকে ক্ষত-বিক্ষত করে। যে স্ত্রীর স্মৃতি ভুলতে তাহের জলেশ্বরীতে এসেছিল, সেখানেও তার স্ত্রীর নামের সঙ্গে মিলে যায় হাসনার নাম। ফলে তার মনে আবার নিজের স্ত্রীর কথা মনে পড়ে।
রাতে হাসনার থাকার কোনো জায়গা না থাকায় তাহের তাকে স্কুলের একটি কক্ষে আশ্রয় দেয়। তারা একই কক্ষে রাত কাটায়। এ সময় তারা খবর পায়, ক্যাপ্টেন মারা গেছে। তখন হাসনা হেসে বলে,
“ বাহ’ এই তবে স্বাধীনত? এরই জন্য স্বাধীনতা।” (পৃষ্ঠ: ৭৪, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, সৈয়দ শামসুল হকে)
এ সময় স্কুলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এর মাধ্যমে তারা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল। লেখক এর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন, শিক্ষা আদর্শের প্রতীক, আলোর প্রতীক। এই আলোকে ধ্বংস করতে চায় অশুভ শক্তি। তাই এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সবাইকে রুখে দাঁড়াতে হবে।
তাই পরিশেষে বলা যায়, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ উপন্যাসে যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট এই উপন্যাসে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে যুদ্ধ-পরবর্তী মানুষের মানসিক সংকট, নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক অস্থিরতার চিত্রও এতে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
FAQ
১. ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ উপন্যাসের মূল বিষয় কী?
উত্তর: ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ উপন্যাসের মূল বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট, সামাজিক অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানুষের গভীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব।
২. ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’কে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস বলা হয় কেন?
উত্তর: যুদ্ধের স্মৃতি, স্বজন হারানোর বেদনা, স্ত্রীর মৃত্যুর আঘাত এবং অতীতের স্মৃতি তাহেরের মনে গভীর সংকট সৃষ্টি করে। এসব মানসিক দ্বন্দ্বের কারণে উপন্যাসটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত।
৩. ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’তে জলেশ্বরীর চিত্র কেমন?
উত্তর: জলেশ্বরীকে যুদ্ধ-পরবর্তী অশান্ত ও অস্থির একটি জনপদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সেখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই, নৈরাজ্য, ভয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।
৪. উপন্যাসে ক্যাপ্টেন মজহারের ভূমিকা কী?
উত্তর: ক্যাপ্টেন মজহার একদিকে মানুষের উপকার করলেও অন্যদিকে জলেশ্বরীতে ত্রাস ও নৈরাজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। সে মনে করত মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজের মতো করে বিচার করত।
৫. ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রতীকেরূপে কীভাবে দেখানো হয়েছে?
উত্তর: উপন্যাসে স্কুলকে শিক্ষা, আদর্শ ও আলোর প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। স্কুলে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা অশুভ শক্তির দ্বারা শিক্ষা ও আদর্শকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আরো পড়ুন
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধারা ও বৈশিষ্ট্য
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা | বিস্তারিত আলোচনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা






