বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশের ক্ষেত্রে সাময়িক পত্র গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলা সাহিত্যকে বৈচিত্র্যমুখী করার জন্য গদ্যের বিকাশের ব্যাপক প্রয়োজন ছিল। গদ্য অবলম্বনে নানা বিষয়ে সাহিত্য রচনার প্রবণতা প্রথম থেকেই প্রকাশ পেয়েছে। সাময়িক পত্রের প্রচলন বাংলা গদ্যের বিকাশের সাথে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত। বাংলা গদ্যের বিকাশে সাময়িক পত্রের ভূমিকা অপরিসীম।

সাময়িক পত্রের মাধ্যমে বাংলা শিক্ষা এবং শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করে। সাময়িক পত্রের উৎকর্ষের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয় বাংলা গদ্য সাহিত্যে। সাময়িক পত্রের প্রচলন ধরে রাখার জন্য যেমন নতুন নতুন সাহিত্য প্রচলন ছিল, তেমনি সাহিত্যের প্রয়োজন মেটাতে নতুন নতুন সাহিত্যিকের প্রয়োজন হয়েছিল; এর ফলে বাংলা গদ্য সাহিত্য ব্যাপক উৎকর্ষ সাধন করে।
প্রথমদিকে সংবাদপত্রগুলো শুধু সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করত। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা এই পত্র-পত্রিকাগুলোতে তুলে ধরা হত। সংবাদ প্রচারের সঙ্গে জ্ঞানচর্চাও এই পত্রিকার অংশ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক চেতনা ও মতাদর্শ পত্রিকায় ফুটে উঠলো। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলাদেশে প্রথম মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপিত হয়। শিক্ষা এবং জ্ঞান বিজ্ঞানের নবজাগরণের মাধ্যমে সূচনা হয়। মুদ্রণ যন্ত্র স্থাপনের ফলে সংবাদপত্রের প্রচলন ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ সাময়িক পত্র গুলো তুলে ধরা হল:
বেঙ্গল গেজেট ১৭৮০
ভারতবর্ষের প্রথম সংবাদপত্র বেঙ্গল গেজেট। এটি ১৭৮০ সালের ২৯ জানুয়ারি জেমস অগাস্টাস হিকি (James Augustus Hicky) কর্তৃক প্রকাশিত হয়। এটি ছিল ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সংবাদপত্র। দুই বছরের মধ্যে এই পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৭৯৯ সালে লর্ড ওয়েলেসলি সংবাদপত্র শাসনের জন্য কঠোর সেন্সর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। ১৮১৮ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড হেস্টিংস এই ব্যবস্থা বন্ধ করেন।
দিগদর্শন ১৮১৮
১৮১৮ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড হোস্টিং কর্তৃক পত্রের উপর আরোপ করা কঠিন সেন্সরশিপ ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার পর প্রকাশিত হয় দিগদর্শন পত্রিকা। এটি বাংলা ভাষায় প্রথম সাময়িক পত্র। ১৮১৮ সালের এপ্রিল মাসে শ্রীরামপুর মিশন থেকে জোশুয়া ম্যর্শম্যানের পুত্র জন ক্লক ম্যর্শম্যানের সম্পাদনায় এটি প্রকাশিত হয়। বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে যেমন শ্রীরামপুর মিশনের ব্যাপক অবদান ছিল, তেমনি সাময়িক পত্রের ক্ষেত্রেও তাদের ব্যাপক অবদান ছিল।
সমাচার দর্পণ ১৮১৮
১৮১৮ সালের মে মাসে জন ক্লক ম্যর্শম্যানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সমাচার দর্পণ সাপ্তাহিক পত্রিকাটি। দিগদর্শন প্রকাশের পর শ্রীরামপুর মিশন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রয়োজন অনুভব করে, ফলে এক মাস যেতে না যেতেই ১৮১৮ সালের মে মাসে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাঙ্গাল গেজেটি ১৮১৮
বাঙ্গাল গেজেটি বাঙালি পরিচালিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র। এটি ১৮১৮ সালের জুন মাসে কলকাতা থেকে গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য শ্রীরামপুর মিশনের মুদ্রণ যন্ত্রের কম্পোজিটর হিসেবে কাজ করতেন। ফলে সেখান থেকে তিনি মুদ্রণ যন্ত্র সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর স্বাধীনভাবে কলকাতায় এগিয়ে ১৮১৮ সালের জুন মাসে বাঙ্গাল গেজেটি সংবাদপত্রটি প্রকাশ করেন।
গসপেল ম্যাগাজিন ১৮১৯
ভারতবর্ষের প্রথম দ্বিভাষিক সংবাদপত্র হলো গসপেল ম্যাগাজিন। এটি ১৮১৯ সালে ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটির দ্বারা প্রকাশিত হয়। এর প্রতি পৃষ্ঠার বামপাশে ইংরেজি এবং দক্ষিণ স্তম্ভে বঙ্গানুবাদ থাকত। এটি খ্রিস্টীয় তত্ত্ব সম্পর্কিত সর্বপ্রথম সাময়িক পত্র।
ব্রাহ্মণ সেবধি ১৮২১
১৮২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শিবপ্রসাদ শর্মার নামে ব্রাহ্মণ সেবধি নামক সাময়িক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। যদিও এটি শিবপ্রসাদ শর্মার নামে প্রকাশিত, মূল লেখক ছিলেন রাজা রামমোহন রায়। এর এক পৃষ্ঠায় বাংলা এবং অপর পৃষ্ঠায় ইংরেজি অনুবাদ থাকত।
সম্বাদ কৌমুদী ১৮২১
১৮২১ সালে রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মিলিত সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সম্বাদ কৌমুদী নামক সপ্তাহিক পত্রিকাটি। খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা সমাচার দর্পণ পত্রিকার মাধ্যমে হিন্দুদের ছোট করে সংবাদ প্রচার করার প্রতিবাদ জানাতে রাজা রামমোহন রায় ও ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্বাদ কৌমুদী পত্রিকার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ জানান।
পশ্বাবলী ১৮২২
কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটির দ্বারা ১৮২২ সালে পশ্বাবলী নামক সংবাদপত্রটি প্রকাশিত হয়। এর প্রতিটি সংখ্যায় একটি করে পশুর বিবরণ থাকত। প্রথম পৃষ্ঠায় সেই পশুর কাঠ খোদাই করা চিত্র থাকত।
সমাচার চন্দ্রিকা ১৮২২
সম্বাদ কৌমুদী পত্রিকার অংশীদারদের সাথে ধর্ম নিয়ে বিরোধ হওয়ার কারণে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তার অংশীদারিত্ব ত্যাগ করেন। ১৮২২ সালে নিজ উদ্যোগে সমাচার চন্দিকা পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন।
খ্রীষ্টের রাজ্যবৃদ্ধি ১৮২২
শ্রীরামপুর মিশন থেকে ১৮২২ সালে খ্রীষ্টের রাজ্যবৃদ্ধি নামক এই মাসিক পত্রটি প্রকাশিত হয়। এটি খ্রিস্টীয় তত্ত্ব সম্পর্কিত দ্বিতীয় মাসিক পত্র।
সম্বাদ তিমিরনাশক ১৮২৩
১৮২৩ সালে কলকাতা মির্জাপুর থেকে কৃষ্ণমোহন দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সম্বাদ তিমিরনাশক। এই পত্রিকায় রক্ষণশীলদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হতো এবং উদারপন্থীদের ছোট ও তুচ্ছ করে সংবাদ প্রকাশ করা হতো।
বঙ্গদূত ১৮২৯
১৮২৯ সালের মে মাসে সার্জন আর. মন্টগোমারী মার্টিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় বেঙ্গল হেরল্ড নামে সাপ্তাহিক পত্রিকা। এই পত্রিকা বাংলা, ইংরেজি, ফার্সি ও নাগরিক ভাষায় প্রকাশিত হতো। বেঙ্গল হেরল্ডের সহচর ছিল বঙ্গদূত। এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১০ মে ১৮২৯। বঙ্গদূতের সম্পাদক ছিলেন নীলরত্ন হালদার। তিনি অবসর গ্রহণ করলে এর দায়িত্ব নেন ভোলানাথ সেন।
সংবাদ প্রভাকর ১৮৩১
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের একটি অমর কীর্তি হলো সংবাদ প্রভাকর। ১৮৩১ সালের ২৮ জানুয়ারি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের সম্পাদনায় সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাটি সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশিত হতে শুরু করে। সে সময়ের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্র ছিল সংবাদ প্রভাকর। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন খবর ছাড়াও এতে ধর্ম, সাহিত্য, সমাজ নানা বিষয় আলোচনা করা হতো। সেসময় বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিরাও এই পত্রিকায় লেখালেখি করতেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রাধাকান্ত দেব, জয়গোপাল তর্কালঙ্কার, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রামকমল সেন প্রমুখ। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও দীনবন্ধু মিত্রের প্রথম দিকে রচনা গুলো এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
বিজ্ঞানসেবধি ১৮৩১
Society for Translating European Science কর্তৃক ১৮৩২ সালে বিজ্ঞানসেবধি নামের মাসিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞান চর্চার জন্য এটি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এটির ১২ সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল।
তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ১৮৪৩
১৮৩৯ সালের ৬ অক্টোবর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে তত্ত্বরঞ্জিনী সভা (পরে তত্ত্ববোধিনী সভা) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সভার উদ্দেশ্য ছিল ব্রাহ্মণ সমাজের বৃদ্ধি এবং উৎকৃষ্ট সাধন। ১৮৪৩ সালে তত্ত্ববোধিনী সভার মুখপাত্র হিসেবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন অক্ষয় কুমার দত্ত।
বঙ্গদর্শন ১৮৭২
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর কীর্তি বঙ্গদর্শন পত্রিকাটি। ১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বিখ্যাত এই সাহিত্যপত্রটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গদর্শন সে সময়ের একটি অন্যতম সমৃদ্ধশালী সাময়িক পত্রিকা। পত্রিকায় প্রথমে শুধু বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য কীর্তিগুলো প্রকাশ পেত, পরবর্তীতে এর পরিধি বৃদ্ধি পায়। সমকালীন চিন্তাধারা ও বিভিন্ন প্রতিচ্ছবি এই পত্রিকায় ফুটে উঠেছে। সেসময়ের বিখ্যাত লেখকেরা এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। বঙ্গদর্শনকে কেন্দ্র করে একটি লেখকগোষ্ঠী তৈরি হয়। বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে বঙ্গদর্শন একটি অন্যতম বিখ্যাত সাময়িক পত্রিকা।
ভারতী ১৮৭৭
১৮৭৭ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় ভারতী পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার মাধ্যমে রবীন্দ্রযুগের সূত্রপাত ঘটে। বিভিন্ন সময়ে লেখকেরা এই পত্রিকায় সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার আত্মীয়রা মিলে এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে একটি সাহিত্যিক চক্র সৃষ্টি করেছিলেন। পত্রিকাটি বহু নবীন লেখক সৃষ্টি করেছে, তাই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা।
সাধনা ১৮৯১
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতুষ্পুত্র সুদীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পাদনায় সাধনা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অধিকাংশ সাহিত্য সাধনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশের চতুর্থ বছরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সম্পাদনা দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন এই পত্রিকার প্রধান লেখক এবং এছাড়া অজস্র নবীন লেখক এই পত্রিকায় তাদের সাহিত্য প্রকাশ করেছেন। সে সময়ের একটি অন্যতম বিখ্যাত পত্রিকা ছিল সাধনা।
সবুজপত্র ১৯১৪
বাংলা সাময়িক পত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ও যুগান্তকারী সাময়িক পত্র হলো সবুজপত্র। প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় ১৯১৪ সালে সবুজপত্রের প্রকাশ ঘটে। তার বীরবল নামক মৌখিক ভাষ্যরীতি সবুজপত্রের মাধ্যমে প্রচলন ঘটেছিল। সে সময়ের বুদ্ধিজীবী মহলকে কেন্দ্র করে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এটি কাকে কেন্দ্র করে একটি সাহিত্যিক চক্র গড়ে ওঠে।
কল্লোল ১৯২৩
১৯২৩ সালে দীনেশরঞ্জন দাসের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে কল্লোল পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। সেসময় বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ও যুগান্তকারী পত্রিকা ছিল কল্লোল। প্রগতিশীল লেখকরা এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এর মধ্যে রয়েছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, মহিতলাল মজুমদার প্রমুখ। কল্লোল বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা।
কালিকলম ১৯২৬
কালিকলম পত্রিকাটি কলকাতা থেকে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং ঢাকা থেকে ১৯২৭ সালে প্রগতি সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে বাংলা সাহিত্যকে মুক্ত করার প্রধান লক্ষ্য ছিল কালিকলম পত্রিকার লেখকদের।
মুসলমান সম্পাদিত সাময়িক পত্র
মুসলমান সম্পাদিত সাময়িক পত্রগুলো বিভিন্ন দিক থেকে প্রশংসার দাবিদার। ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে মুসলমানরা প্রথমদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। পরবর্তীতে প্রগতিশীল মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চায় নিজেদেরকে আত্মনিয়োগ করে ধর্ম, ইতিহাস, রাজনীতি এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় মুসলিম সম্পাদিত বাংলা সাময়িক পত্রের পথচলা।
সমাচার সভারাজেন্দ্র ১৮৩১
মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা সংবাদপত্র হল সমাচার সভারাজেন্দ্র। ১৮৩১ সালের ৭ই মার্চ শেখ আলিমুল্লাহর সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এটি বাংলা ও ফারসিতে প্রকাশিত হত।
সুধাকর ১৮৮৯
১৮৮৯ সালে শেখ আব্দুর রহিমের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে সুধাকর পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। মুসলমানদের কল্যাণে এই পত্রিকাটি নিয়োজিত ছিল। এছাড়া সমাজের বিভিন্ন অধঃপতন রোধ এবং মুসলমানদের কল্যাণে এই পত্রিকাটি ব্যাপক অবদান রাখে।
মিহির ১৮৯২
সুধাকর সম্পাদক শেখ আব্দুর রহিমের সম্পাদনায় ১৮৯২ সালে মিহির মাসিক পত্রিকা নামে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। সাহিত্য, জ্ঞান, বিজ্ঞান চর্চার দিক থেকে পত্রিকাটি ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো সমকালীন উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের জীবনী, ঐতিহাসিক কাহিনী, পুরাতত্ত্ব, ধর্ম, বিজ্ঞান, গল্প, উপন্যাস, অনুবাদ, খণ্ড কবিতা, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি।
মিহির ও সুধাকর ১৮৯৫
১৮৯৫ সালে শেখ আব্দুর রহিম সুধাকরের সঙ্গে মিহির নাম সংযুক্ত করে মিহির ও সুধাকর পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। বাংলা মুসলিম সমাজকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ১৯০৮ সাল পর্যন্ত এটি প্রকাশিত হয়েছিল। শেষ বছরে এর সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ ওসমান আলী।
কোহিনুর ১৮৯৮
১৮৯৮ সালে এস কে এম মহাম্মদ রওশন আলীর সম্পাদনায় কোহিনুর পত্রিকাটি কুষ্টিয়া থেকে প্রকাশিত হয়। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সম্প্রতি বজায় রাখা এবং দেশের কল্যাণে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মীর মশারফ হোসেন, কবি মোজাম্মেল হক, মুন্সী মোহাম্মদ রেয়াজউদ্দিন, কবি কায়কোবাদ, মৌলভী আব্দুর রহিম, শেখ জমিরউদ্দিন প্রমুখ। ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের জন্য এই পত্রিকাটি ব্যাপক অবদান রাখে।
নবনূর ১৯০৩
পিছিয়ে পড়া মুসলিম সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নবনূর পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ১৯০৩ সালে সম্পাদক সৈয়দ এমদাদ আলীর সম্পাদনায় এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। এটি তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে উন্নত মুসলমান সম্পাদিত পত্রিকা। মুসলমানদের দুর্দশা ঘুচিয়ে তাদেরকে শিল্প, শিক্ষা, দর্শনের দিকে এগিয়ে রাখার লক্ষ্যে এই পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। পত্রিকার লেখকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কবি কায়কোবাদ, শেখ ফজলল করিম, কাজী ইমদাদুল হক, মতীয়র রহমান, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শেখ জমিরউদ্দিন প্রমুখ।
বাসনা ১৯০৮
শেখ ফজলুল করিমের সম্পাদনায় ১৯০৮ সালে এবং রংপুরের কাকিনা থেকে বাসনা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। ইতিহাস, দর্শন, ধর্ম এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। হিন্দু, মুসলিম ও উভয় লেখক তাদের নিজ নিজ ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে এই পত্রিকায় লিখতেন। শিকার ও সমালোচনা বিষয়টি বেশি সমৃদ্ধ ছিল।
সওগাত ১৯১৮
বাংলা সাহিত্যের জাগরণ ও মুক্তচিন্তা প্রসারে সওগাত একটি ঐতিহাসিক মাসিক পত্রিকা। ১৯১৮ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিনের সম্পাদনায় এটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে পত্রিকাটি ঢাকা থেকেও প্রকাশিত হয়। অনিবার্য কারণে ১৯২১ সালের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত প্রথম পর্যায় চালু থেকে বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯২৬ সালে ‘সওগাত-নবপর্যায়’ নামে পুনরায় চালু হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ভূমিকা রাখে। মুক্তবুদ্ধি ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় এটি ব্যাপক অবদান রাখে।
মোসলেম ভারত ১৯২০
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিখ্যাতি অর্জনের পিছনে যে পত্রিকাটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে সেটি হল মোসলেম ভারত। ১৯২০ সালে মোজাম্মেল হকের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে মোসলেম ভারত পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পত্রিকা হলো মোসলেম ভারত। এই পত্রিকার মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিভা বিকাশিত হয়।
ধুমকেতু ১৯২২
কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী পত্রিকা ধূমকেতু, যা ১৯২২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি ঘুণে ধরা সমাজকে পুনরজ্জীবিত করতে এই পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন। এ পত্রিকার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বারণী ঘোষসহ অনেকেই কবি নজরুলকে আশা বাণী পাঠিয়েছিলেন। ইংরেজি শোষণের বিরুদ্ধে এই পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। তার বিদ্রোহী ভাবনা এই পত্রিকায় প্রকাশ পায়। ফলে ইংরেজ সরকার তাকে রাজদ্রোহমূলক কবিতা প্রকাশের জন্য এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ধুমকেতু।
শিখা ১৯২৭
১৯২৭ সালে আবুল হোসেনের সম্পাদনায় ঢাকা থেকে শিখা পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়। মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এই শিখা পত্রিকায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা শুরু হয়। পত্রিকার পরবর্তী সম্পাদক ছিলেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুর রশিদ ও আবুল ফজল প্রমুখ। পত্রিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানদের সংকীর্ণতা থেকে বাইরে এনে মুক্ত চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলা সাহিত্যের উদ্ভব ও বিকাশে এই সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলোর অবদান ছিল। এই শিখা পত্রিকার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য যেমন উৎকর্ষ সাধন করেছে, তেমনি বাংলা ভাষা, বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, ধর্মচর্চা ও ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেছে। বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ও উদ্ভবে এই পত্রপত্রিকার অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
পত্রিকার নাম | প্রকাশের সাল | সম্পাদক |
| বেঙ্গল গেজেট | ১৭৮০ | জেমস অগাস্টাস হিকি |
দিক দর্শন | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান |
| সমাচার দর্পণ | ১৮১৮ | জন ক্লার্ক মার্শম্যান |
বাঙ্গাল গেজেটি | ১৮১৮ | গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য |
| ব্রাহ্মণ সেবধি | ১৮২১ | রাজা রামমোহন রায় |
সমাচার চন্দ্রিকা | ১৮২২ | ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় |
| বঙ্গদূত | ১৮২৯ | নাম নীলরত্ন হালদার |
সংবাদ প্রভাকর | ১৮৩১ | ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত |
| সমাচার সভারাজেন্দ্র | ১৮৩১ | শেখ আলীমুল্লাহ |
সংবাদ রসসাগর | ১৮৫০ | রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় |
| সাপ্তাহিক বার্তাবহ | ১৮৫৬ | রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় |
বঙ্গদর্শন | ১৮৭২ | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
| ভারতী | ১৮৭৭ | দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর |
সুধাকর | ১৮৮৯ | শেখ আবদুর রহিম |
| সাহিত্য | ১৮৯০ | সুরেশচন্দ্র সমাজপতি |
সাধনা | ১৮৯১ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
| ইসলাম প্রচার | ১৮৯১ | মোঃ রেয়াজ উদ্দিন |
মিহির | ১৮৯২ | শেখ আবদুর রহিম |
| হাফেজ | ১৮৯৭ | শেখ আবদুর রহিম |
কোহিনূর | ১৮৯৮ | মোঃ রওশন আলী |
| প্রবাসী | ১৯০১ | রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় |
নবনূর | ১৯০৩ | সৈয়দ এমদাদ আলী |
| দৈনিক খাদেম | ১৯১০ | মোহাম্মদ আকরাম খাঁ |
সাপ্তাহিক মোহাম্মদী | ১৯১০ | মোহাম্মদ আকরাম খাঁ |
| ভারতবর্ষ | ১৯১৩ | জলধর সেন ও অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণ |
সবুজপত্র | ১৯১৪ | প্রমথ চৌধুরী |
| আল ইসলাম | ১৯১৫ | মওলানা আকরাম খাঁ |
সওগাত | ১৯১৮ | মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন |
| মোসলেম ভারত | ১৯২০ | মোজাম্মেল হক |
ধূমকেতু | ১৯২২ | কাজী নজরুল ইসলাম |
| কল্লোল | ১৯২৩ | দীনেশরঞ্জন দাস |
লাঙল | ১৯২৫ | কাজী নজরুল ইসলাম |
| দৈনিক আজাদ | ১৯৩৫ | মোহাম্মদ আকরাম খাঁ |
দৈনিক নবযুগ | ১৯৪১ | কাজী নজরুল ইসলাম |
| সমকাল | ১৯৫৪ | সিকান্দার আবু জাফর |
গুলিস্তা | ১৯২৫ | এস, ওয়াজেদ আলী |
| আঙুর (কিশোর পত্রিকা) | ১৯২০ | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ |
শিখা | ১৯২৭ | কাজী মোতাহার হোসেন |
| বঙ্গদর্শন (নব পর্যায়) | ১৯০১ | মোহিতলাল মজুমদার |
চতুরঙ্গ | ১৯৩৮ | হুমায়ুন কবীর |
| বেগম | ১৯৪৭ | নূরজাহান বেগম |
সংবাদ রত্নাবলী | ১৮৩২ | ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত |
| পূর্ণিমা | ১৮৫৯ | বিহারীলাল চক্রবর্তী |
সাহিত্য সংক্রান্তি | ১৮৬৩ | বিহারীলাল চক্রবর্তী |
| অবোধ বন্ধু | ১৮৬৩ | বিহারীলাল চক্রবর্তী |
সৈনিক | ১৯৪৮ | শাহেদ আলী |
| মুসলিম জগৎ | ১৯২২ | খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন |
সাম্যবাদী | ১৯২৫ | খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন |
| কবিকণ্ঠ | ১৯৫৬ | ফজল শাহাবুদ্দীন |
আরো পড়ুন
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধারা ও বৈশিষ্ট্য
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা | বিস্তারিত আলোচনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
