Skip to main content

Study Journalx

বাংলা বানানের নিয়ম এর ইতিহাস

 

মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। আর ভাষা প্রকাশের জন্য প্রয়োজন শুদ্ধ বানান। বানান শুদ্ধ না হলে ভাষা সৌন্দর্য হারায়। বাংলা বানানের নিয়ম শুদ্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল উনিশ শতকের প্রথমার্ধে। এর আগে বাংলা বানানের লিখিত নিয়ম বলতে কোনো কিছু ছিলো না। বাংলা গদ্যে চলতি রীতির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে একই শব্দের বানানে ভিন্নতা বেড়ে চলেছিল। এই সমস্যা সমাধানে বিশ শতকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বানানের একটা নিয়ম নির্ধারণ করে। তারপর ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে বাংলা বানানের নিয়ম প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানের নিয়ম প্রণয়ন করে। বর্তমানে আমরা সেই বানানরীতি অনুসরণ করে চলছি।

 

বাংলা বানানের নিয়ম

 

তৎসম স্ত্রীবাচক শব্দে ( ী- কার ) হয়

আধুনিক বাংলা অভিধানের নতুন সংস্করণ অনুসারে তৎসম স্ত্রীবাচক শব্দে ( ী- কার ) হয়। যেমন- রূপবতী, সুন্দরী, স্ত্রী, বুদ্ধিমতী, রাজ্ঞী, লক্ষ্মী, রমণী, নারী, প্রেয়সী, মহীয়সী, সিংহী, ময়ূরী, নেত্রী, বান্ধবী, শূদ্রাণী, অর্ধাঙ্গিনী, অর্ধাঙ্গী, পত্নী,  গোপিনী , মানবী, ছাত্রী, ভাগ্যবতী, দেবী, গুণবতী, নদী ।

 

 

অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দে (ি-কার) হয়

অতৎসম স্ত্রীবাচক শব্দে (ি-কার) হয়। যেমন- ভাবি (ভাবী-ভবিষ্যৎ), চাচি, মুরগি, দাদি, নানি, ননদি, ননদিনি, মামি, নাতনি, সাপিনি, বাঘিনি, ভিখারিনি, জেলেনি, গোয়ালিনি, পাগলি, রানি, গাভি, ভাগনি, চৌধুরানি।

 

বাংলা একাডেমি প্রণীত বাংলা বানানের নিয়ম

১। তৎসম শব্দ: তৎসম অর্থাৎ বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত অবিকৃত সংস্কৃত শব্দের বানান যথাযথ ও অপরিবর্তিত থাকবে। যেমন-চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, পৃথিবী, বৃক্ষ, লতা, নদী, পর্বত ইত্যাদি।

২। যে সব তৎসম শব্দে ই, ঈ বা উ, ঊ উভয়ই শুদ্ধ সেইসব শব্দে কেবল ই বা উ এবং কার চিহ্ন, ব্যবহৃত হবে। যেমন- পদবি, সূচিপত্র।

৩। তৎসম শব্দে ক, খ, গ, ঘ পরে থাকলে পদের অন্তস্থিত ম্ স্থানে অনুস্বার (ং) লেখা যাবে। যেমন-অহংকার, ভয়ংকর, সংগীত।

৪। রেফের পর কোথাও ব্যঞ্জন বর্ণের দ্বিত্ব হবে না। যেমন- কর্ম, শর্ত, সূর্য।

৫। হসন্ত-চিহ্ন ও ঊর্ধ্বকমা যথাসম্ভব বর্জন করা হবে। যেমন- করব, চট, দুজন।

৬। ক্ষ-বিশিষ্ট সকল শব্দে ক্ষ অক্ষুণ্ণ থাকবে। যেমন- অক্ষয়, ক্ষেত, পক্ষ।

৭। কয়েকটি স্ত্রীবাচক শব্দের শেষে ঈ-কার হবে। যেমন- নারী, সুন্দরী।

৮। ভাষা ও জাতির নামের ক্ষেত্রে ই-কার হবে। যেমন-ইংরেজি, জাপানি।

৯। বিশেষণবাচক ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে। যেমন- রূপালি, সোনালি, বর্ণালি।

১০। পদাশ্রিত নির্দেশক ‘টি’-তে ই-কার হবে। যেমন- ছেলেটি, মেয়েটি, লোকটি।

১১। পদান্তে বিসর্গ থাকবে না। যেমন- ক্রমশ, প্রধানত, মূলত।

১২। সমাসবদ্ধ পদ একসঙ্গে লিখতে হবে। যেমন-জটিলতামূলক সংবাদপত্র।

১৩। বিশেষণ বাচক পদ (গুণ, সংখ্যা বা দূর ইত্যাদি) হলে সেটি আলাদা বসবে। যেমন-এক জন, কত দূর।

১৪। লেখক ও কবি নিজেদের নামের বানান যেভাবে লেখেন বা লিখতেন সেভাবে লেখা হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শরৎচন্দ্র।

 

চলিত ভাষায় প্রযোজ্য কিছু বাংলা বানানের নিয়ম ও শুদ্ধ বানান

 

 

১. ই, ঈ, উ, ঊ

 

সকল অতৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এবং এদের কার চিহ্ন  ি  ব্যবহৃত হবে। যেমন: গাড়ি, চুরি, বাড়ি, আরবি, ইংরেজি, সরকারি, পাগলি, কুমির, নিচে, নিচু, চুন, মুলা, উনিশ ইত্যাদি।

  • ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে। যেমন-খেয়ালি, বর্ণালি, সোনালি।

 

  • সর্বনাম পদরূপে এবং বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ পদরূপে ‘কী’ শব্দটি ঈ-কার দিয়ে লেখা হবে। যেমন-কী করছ? কী করে যাব? অন্য ক্ষেত্রে অব্যয় পদরূপে ই-কার দিয়ে কি শব্দটি লেখা হবে। যেমন-তুমিও কি যাবে? সে কি এসেছিল?

 

 

 

 

২. নাই, নেই, না, নি

 

  • নাই, নেই, না এই নঞর্থক অব্যয় পদগুলো শব্দের শেষে যুক্ত না হয়ে পৃথক থাকবে। না পৃথক, নি যুক্ত।  যেমন-পাব না, যায়নি।

 

 

৩. মূর্ধন্য ণ, দন্ত্য ন

 

  • তৎসম শব্দের বানানে ণ ও ন-য়ের নিয়ম মানতে হবে। এছাড়া তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র কোনো শব্দের বানানে ণত্ব বিধি মানা হবে না। অর্থাৎ ‘ণ’ ব্যবহার করা হবে না। যেমন-অঘ্রান, ইরান, গুনতি, ঝরনা, ধরন, হর্ন।

 

 

৪. শ, ষ, স: এর ব্যবহার

 

তৎসম শব্দের বানানে শ, ষ, স-য়ের নিয়ম মানতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে ষত্ব বিধি প্রযোজ্য হবে না।

  • আরবি-ফার্সি শব্দে ‘সে’, ‘সিন’ ‘সোয়াদ’ বর্ণ গুলোর প্রতিবর্ণরূপে স এবং ‘শিন’ এর প্রতিবর্ণরূপে ‘শ’ ব্যবহৃত হবে। ইংরেজি ও ইংরেজির মাধ্যমে আগত বিদেশি বর্ণ বা ধ্বনির জন্য ‘স’ এবং sh, sion, ssion, tion প্রভৃতি বর্ণগুচ্ছ বা ধ্বনির জন্য ‘শ’ ব্যবহৃত হবে।

 

 

৫. জ,য: ইসলাম ধর্ম সংক্রান্ত কিছু ফারসি শব্দে জ ব্যবহার হবে

 

  • আজান, ওজু, কাজা, নামাজ, মুয়াজ্জিন, জোহর, রমজান।

 

 

৬. আনো প্রত্যয়ান্ত শব্দ: আনো প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে ও-কার যুক্ত করা হবে

 

  • করানো, বলানো, খাওয়ানো, পাঠানো, নামানো।

 

 

৭. ক্ষ: ক্ষীর, ক্ষুর , খুর ও খেত শব্দগুলো এভাবেই লিখতে হবে

 

 

 

৮. উন বা ঊন

 

উনিশ-উননব্বই এখানে ৮টি উন আছে, যার সবগুলোই ‘উ’ দিয়ে লিখতে হবে। কিন্তু ঊনবিংশ, উনষট্টি, উনাশীতিতম, ঊনসপ্ততিতম, ঊনপঞ্চাশত্তম ইত্যাদি ‘উ’ হবে।

 

  • ভূত/ভূত: সকল ‘ভূত’-এ উ-কার। যথা: ভূত (অশরীরী), ভূত (অতীত), ভূতল, ভূতশুদ্ধি, উদ্ভূত, দ্রবীভূত, পরাভূত ইত্যাদি। তবে অদ্ভুত, ভুতি/ভুতুড়ি (কাঁঠালের ভেতরের বর্জ্য)-এ দুই শব্দে উ-কার হয়।

 

  • দুরবিন: ফারসি শব্দ তাই উ-কার হবে। দূরবীক্ষণ: সংস্কৃত শব্দ তাই উ-কার হবে। তাছাড়া দূরে অর্থ বুঝাতে উ-কার হয়। যেমন: দূরযাত্রা, দূরদৃষ্টি, দূরতা, দূরান্ত, দূরগ ইত্যাদি। কয়েকটি  শব্দে দূরে অর্থ না থেকেও উ-কার হয়। যথা- দূর্বা, দূরভাষ, দূরদর্শী।

 

  • ‘নি’ এর পরে ক,ঠ,প,ফ এর সাথে ষ হবে- নিষ্কম্প, নিষ্কাম, নিষ্ক্রিয়, নিষ্ঠীব, নিষ্পলক, নিষ্প্রভ, নিষ্ফলা ইত্যাদি। তবে নিস্পন্দ, নিস্পৃহ এ দুটিতে ‘স’ হবে। বি উপসর্গের পরে ক,ট, ঠ,ণ এর সাথে ষ হবে- বিষ্কভ, বিষ্টু, বিষ্ণু ইত্যাদি। তবে বিস্কুট ইংরেজি শব্দ তাই স হবে।

 

  •   আবিষ্কার, আবিষ্করণ এ ই-কারের জন্য ষ হবে।

 

 

 

৯. স/ষ জনিত সমস্যা

 

ই-কারান্ত উপসর্গের পর ‘ষ’ হবে। যথা: পরিষ্কার, পরিষেবা, পরিষৎ, পরিষদ ইত্যাদি। তবে পরিস্ফুট, পরিসংখ্যা, পরিস্থিতিতে ‘স’ হবে। ‘অ’ এর পর ‘স’ হবে। যথা: পুরস্কার, পুরস্কৃত, মিথস্ক্রিয়া ইত্যাদি।

  • সুষমা, সুষম (সমতাযুক্ত), সুসম (সামঞ্জস্যপূর্ণ)।

 

  • ‘পুরাণ’ বানানে ‘ণ’ কিন্তু পুরানো, পুরোনো এই দুটি তদ্ভব তাই ‘ন’ হবে।

 

 

 

১০. ‘কী’ এবং ‘কি’ এর ব্যবহার

 

১. সর্বনাম ২. বিশেষণ ৩. ক্রিয়া-বিশেষণ পদরূপে বসলে ‘কী’ লিখতে হবে।যেমন:

  • কী বলছো তুমি? কী করছো? কী পড়ছো?

 

কিন্তু অব্যয় পদ হিসেবে যদি ব্যবহার হয় তাহলে ‘কি’ লিখতে হবে। যেমন:

  • তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাও? তুমি কি বিসিএস পরীক্ষা দিতে চাও? সে কি ঢাকায় এসেছিলো?

 

সংক্ষেপে: যে প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না উত্তর দেয়া যায় সেক্ষেত্রে ‘কি’ হবে। হ্যাঁ বা না উত্তর দেয়া না গেলে ‘কী’ হয়। যেমন:

  • যাবে কি? নাম কী? ইত্যাদি।

 

 

১১.  ভাষা ও জাতির বানান

 

  • ভাষা ও জাতির বানানে ই-কার হয়। ইংরেজি, বাঙালি। তবে ‘ঈয়’ প্রত্যয় যুক্ত হলে ঈ-কার হবে। যেমন: ইংরেজীয়, বাঙালীয় ইত্যাদি।

 

 

১১. ‘বাংলা’ এবং ‘বাঙলা’ এর ব্যবহার

 

  • অধিকাংশ ণ্ডিত তাঁদের লেখায় অনুস্বার (ং) গ্রহণ করেছেন। সংবিধানেও ‘ং’ দিয়ে ‘বাংলা’ লেখা। অতএব ‘বাংলা’ বানানই গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত।

 

 

 

১২. ই/ঈ কার জনিত অসুবিধা

 

  • শুদ্ধ- বিভীষিকা, সমীচীন, ঈপ্সিত, গীতাঞ্জলি, শারীরিক

 

 

আরো পড়ুন