বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের কবিতা একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমি, সামরিক শাসনের পদাঘাত, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাঙালির জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। সে সময় তরুণ প্রজন্মের মধ্যে একধরনের নৈরাশ্যবাদ কাজ করেছিল। কোথাও কোনো চাকরি নেই, কাজ নেই, সবদিকে সংকট। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করে তুলেছিল। আর এরই প্রভাব পড়েছিল সাহিত্যে। ষাটের দশকের কবিতায় উঠে আসে সেই সময়ের নৈরাশ্যবাদ, নগরযন্ত্রণা, বেকারত্ব, আধুনিকতাবাদী চেতনা। আর তাই কবি রফিক আজাদ এই সময়ের নাম দেন স্যাড ‘জেনারেশন’। এই আর্টিকেলে ষাটের দশকের কবি ও কবিতা এবং স্যাড জেনারেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা আমাদের ভাষাকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ভাষার মধ্যে আরবি-ফারসি ভাষা ঢোকানোর চেষ্টা করে। সামরিক শাসনের মাধ্যমে আমাদের দমিয়ে রাখতে চায়। বাঙালিদের সব ক্ষেত্রে বঞ্চিত করে। ফলে এ দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা কাজ করে। আর সাহিত্যে তার প্রভাব পড়ে। এই সময়কে তাই স্যাড জেনারেশন বলা হয়। ষাটের দশক বাংলাদেশের সমাজ, রাষ্ট্রনীতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ প্রক্রিয়ায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
এ সময়ে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার রূপায়ণ ও পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং ভৌগোলিক ইতিহাসের সূচনা হয়। ষাটের দশকের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছাড়াও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র কেন্দ্রীভূত থাকে পূর্ববাংলার অর্থনীতি, ভাষা ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে শুরু হয় গভীর ষড়যন্ত্র এবং এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালি সংস্কৃতির মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এ সময় দুটি ধারায় সৃষ্টি হলো বাংলাদেশের কবিতায়।
১. পাকিস্তানবাদী ইসলামী ধারা
২. বুর্জোয়া মানবতাবাদী ধারা বা দায়বদ্ধতার কবিতা।
ইসলামি ভাবধারার সঙ্গে একাত্ম চল্লিশের দশকের সৈয়দ আলী আহসান, ফররুখ আহমদ প্রমুখ কবি পশ্চিম এশীয় ঐতিহ্য তথা আরব্য রজনী, ইসলামি চেতনামূলক কবিতা নিয়ে নবজাগরণের স্বপ্ন দেখলেন।
ষাটের দশকের কবি ও কবিতা বৈশিষ্ট্য
- এই দশকের কবিরা আধুনিকতাবাদী চেতনা ও ভাবধারার ছিল
- ষাটের দশকের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নৈরাশ্যবাদ। এই প্রজন্মের মধ্যে হতাশা কাজ করত।
- আধুনিকতাবাদী কবিতার আদর্শ, যেমন খোলা ছন্দ ও বিষয়বস্তুর দিকে মনোযোগ দেন।
- এই দশকের কবিরা সমাজের নানা অসঙ্গতি, সংকট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতি মনোযোগ দেন।
- তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত আবেগ, অনুভূতি এবং অভিজ্ঞতাও কবিতায় প্রকাশ করেন।
- ষাটের দশকের কবিরা ভাষার ক্ষেত্রে নতুনত্ব আনেন এবং প্রচলিত ছন্দের বাইরে গিয়ে নতুন ছন্দ ব্যবহার করেন।
- এই দশকে নারীবাদী কবিতা আন্দোলনের বিকাশ ঘটে, যা সামাজিক পরিবর্তন এবং নারীদের অধিকারের বিষয়ে আলোকপাত করে।
ষাটের দশকের কবি ও কবিতা
বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিতার দার্শনিক অভিজ্ঞান কবিদের মনন, প্রভা, সমাজ, দেশকাল প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তিগত জীবনাকাঙ্ক্ষার সূত্রেই নির্মিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশক একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সাহিত্যকর্মগুলো রচিত হয়েছে। নিচে বিখ্যাত ষাটের দশকের কবিতা ও কবিদের পরিচয় তুলে ধরা হলো।
১. শহীদ কাদরী
ষাটের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি ছিলেন শহীদ কাদরী। বিভাগ-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে তিনি আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটান। নাগরিক অবক্ষয়, অস্তিত্ব সংকট, এক ধরনের নৈঃসঙ্গ্যবোধজনিত বোহেমীয়ান চেতনা শহীদ কাদরীর কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ:
- উত্তরাধিকার
- তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা
২. শামসুল ইসলাম
ষাটের দশকের অন্যতম প্রভাবশালী কবি ছিলেন শামসুল ইসলাম। তিনি কবিতায় আধুনিকতার চর্চা এবং স্বতন্ত্র শব্দচয়ন করেছেন। তাঁর কাব্যে আধুনিক নগরজীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও অস্তিত্বের সর্বগ্রাসী চৈতন্য ভাষারূপ পেয়েছে। তিনি শহীদ কাদরীর মতো নাগরিকতাকে ধারণ করতে না পারলেও তাঁর দর্শনচেতনা নেতিবাচক। তাঁর কাব্যগ্রন্থ:
- নষ্ট চন্দ্রার চাঁদ
- এক প্রেমিতে আলকেমিতে
৩. রফিক আজাদ
রফিক আজাদ ছিলেন স্যাড জেনারেশনের প্রবক্তা। তিনি নৈরাশ্যবাদ, নগরযন্ত্রণা, ফ্রয়েডীয় চেতনা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তৎকালীন সময়ে নগরজীবনের যন্ত্রণা, হতাশা, বেকারত্ব, রাজনৈতিক নিপীড়ন, সামরিক শাসন ইত্যাদি তরুণ প্রজন্মকে হতাশাগ্রস্ত করেছিল। রফিক আজাদ ছিলেন একজন সমাজসচেতন সাহিত্যিক। ১৯৭৪ সালে দুর্ভিক্ষের খাদ্যসংকটে তাঁর প্রতিবাদী কবিতা ‘ভাত দে হারামজাদা, না তা না হলে মানচিত্র চিবিয়ে খাব’ তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকে তাঁর অবদান অসামান্য। তাঁর কাব্যে সমাজ, সময় এবং প্রেমচেতনা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর প্রেমবোধ ফ্রয়েডীয় মনোবিকলনে সীমাবদ্ধ। তাঁর কাব্যগ্রন্থ:
- সীমাবদ্ধ জলে
- সীমিত সবুজে
- চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া।
৪. আব্দুল মান্নান সৈয়দ
ষাটের দশকের অন্যতম একজন আধুনিক কবি ছিলেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। তাঁর কবিতায় আধুনিকতার চর্চা, নগরজীবনের যন্ত্রণা, হতাশা ইত্যাদি দেখা যায়। তিনি শুধু কবি নন, একজন বিখ্যাত সাহিত্য সমালোচকও ছিলেন। ষাটের দশকের সুররিয়ালিস্ট কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ। বৈদ্যুতিক দ্যুতিময় প্রতীকে কিন্নরকণ্ঠী শিল্পী। আব্দুল মান্নান সৈয়দ পাশ্চাত্য আধুনিকতার বিষয়গুলো ধারণ করে বাংলা কবিতাকে বিশিষ্ট করে তোলেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ:
- মাতাল মানচিত্র
- পরাবাস্তব কবিতা
৬. মুহাম্মদ নূরুল হুদা
ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি শুধু কবি নন, একজন ঔপন্যাসিক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচকও। অবস্থান ষাট ও সত্তরের সন্ধিপর্বে। তাঁকে ‘জাতিসত্তার কবি’ রূপে চিহ্নিত করা যায়। তাঁর বহুল পরিচিত কবিতা:
- শোণিত সমুদ্রপাত
- আগ্নেয়ময়ী হে মন্ময়ী
FAQ
১. ষাটের দশকের কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
নৈরাশ্যবাদ, আধুনিকতাবাদ, নগরযন্ত্রণা, ব্যক্তিচেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতা।
২. ‘স্যাড জেনারেশন’ বলতে কী বোঝায়?
ষাটের দশকের তরুণ কবিদের নৈরাশ্য ও হতাশাপ্রবণ কবিতার ধারাকে ‘স্যাড জেনারেশন’ বলা হয়।
৩. ‘স্যাড জেনারেশন’-এর প্রবক্তা কে?
কবি রফিক আজাদ ‘স্যাড জেনারেশন’-এর প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত।
৪. ষাটের দশকের উল্লেখযোগ্য কবি কারা?
শহীদ কাদরী, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আব্দুল মান্নান সৈয়দ ও মুহাম্মদ নূরুল হুদা উল্লেখযোগ্য।
৫. ষাটের দশকের কবিতায় কোন বিষয়গুলো উঠে এসেছে?
নগরজীবনের যন্ত্রণা, বেকারত্ব, নৈরাশ্য, অস্তিত্বসংকট, প্রেম ও রাজনৈতিক অস্থিরতা।
আরো পড়ুন
- ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ছোটগল্প, লেখক ও ইতিহাস
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা, বিখ্যাত কবি ও কবিতার তালিকা
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস মনে রাখার কৌশল, গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের তালিকা
- তিরিশের দশকের কবি ও কবিতার প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
