Skip to main content

Study Journalx

বাংলা সাহিত্যে পঞ্চাশের দশক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে বাংলার জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এ সময় বাংলা কবিতায় আধুনিকতা, নাগরিক জীবনের যন্ত্রণা ও হতাশা ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। পঞ্চাশের দশকের বিশেষ একটি গুরুত্ব আছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। কারণ, এ সময় সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের। আর এরই প্রভাব পড়েছে বাংলা সাহিত্যে। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অনেক সাহিত্যকর্ম রচিত হয়। ভাষা আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে এসব সাহিত্যকর্ম ব্যাপকভাবে অবদান রাখে। তাই পঞ্চাশের দশকের কবিতার আলাদা একটি গুরুত্ব রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। এই আর্টিকেলে পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

 

পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা

পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতার তালিকা

১. আব্দুর রশীদ খান

পঞ্চাশের দশকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম মূলধারার কবি আব্দুর রশীদ খান। তাঁর কবিতার প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতি, মাটি ও মানুষ। কবিতায় কিছুটা রবীন্দ্রনাথের ছাপ থাকলেও তিনি স্বতন্ত্র কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • নক্ষত্র: মানুষ: মন
  • বন্দী মুহূর্ত
  • মহুয়া
  • বিম্বিত প্রহর
  • নিরন্তর স্বর

 

২. মাহবুব উল আলম চৌধুরী

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি মাহবুব উল আলম চৌধুরী। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতাটি লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। কবিতার মাধ্যমে তিনি শুধু ক্ষোভ প্রকাশ করেননি, বরং প্রতিশোধের আহ্বানও জানিয়েছেন। তিনি শহীদদের রক্তের প্রতিটি কণাকে আগুনের মতো জ্বলতে দেখেছেন, যা বাঙালি জাতির সংগ্রামের প্রতীক। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • আবেগধারা
  • ইস্পাত
  • অঙ্গীকার

৩. দিলওয়ার

দিলওয়ারকে গণমানুষের কবি বলা হয়। তাঁর কবিতায় প্রেম, বাসনা, জীবনের উত্থান-পতনসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর কবিতার প্রকরণ অন্যদের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ও কবিতার সংকলনগুলো হলো:

  • জিজ্ঞাসা
  • রক্তে আমার অনাদি অস্থি
  • পুবাল হাওয়া
  • ঐক্যতান
  • দিলওয়ারের একুশের কবিতা
  • দিলওয়ারের স্বাধীনতার কবিতা

 

৪. মযহারুল ইসলাম

মযহারুল ইসলামের কবিতায় মাটি, মানুষ, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা উঠে এসেছে। পরবর্তীতে তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চেতনাও দেখা যায়। তিনি সহজ, সরল ও স্বাভাবিক ভাষায় কবিতা লিখেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • মাটির ফসল
  • বিচ্ছিন্ন প্রতিলিপি
  • আর্তনাদের বিবর্ণ
  • যেখানে বাঘের থাবা
  • দুঃসময়ের ছড়া

 

৫. আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর কবিতায় মা, মাটি ও মানুষ এক হয়ে গেছে। উপনিবেশ-উত্তর কৃষিনির্ভর বাংলার অস্তিত্ব সংকটের চিত্র তিনি তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। তাঁর কবিতার ভাষা ছিল নিতান্তই সহজ-সরল। ভাষা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে রচিত তাঁর ‘মাগো, ওরা বলে’ কবিতায় তিনি মা ও সন্তানের মধ্যে এক গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। দরিদ্র মায়ের সন্তানের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও মায়া এই কবিতার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • কখনো রং কখনো সুর
  • প্রেমের কবিতা
  • কমলের চোখ
  • সাতনরী হার

 

৬. সানাউল হক

বাংলা সাহিত্যের প্রগতিবাদী ধারায় কবিতা চর্চা করেছেন সানাউল হক। তাঁকে প্রবাসবিরহদুঃখরঞ্জিত কবি বলা হয়। তাঁর কবিতায় মাটি, মানুষ, নদ-নদী ইত্যাদি বিষয় রূপায়িত হয়েছে। এছাড়াও সমাজের দুঃখ, দুর্দশা ও দুর্গতির চিত্র তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে। মধ্যবিত্তের জীবনসংকট ও রাজনৈতিক সংকট তাঁর কবিতার অনুষঙ্গ হয়েছে বারবার।তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • কত রং কত মেঘ
  • বিরতিহীন
  • ছড়া ঘরে ঘরে
  • একটি ইচ্ছা সহস্র পালে
  • প্রবাসে যখন
  • বিরাশির কবিতা
  • উত্তীর্ণ পঞ্চাশে

 

৭. আতাউর রহমান

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি আতাউর রহমান। তিনি সাম্যবাদী চেতনা ও বিপ্লবী দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিজীবনের হতাশা, গ্লানি, দ্বন্দ্বাত্মক সত্তা ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। তিনি সত্য ও ন্যায়কে ধারণ করে কবিতা চর্চা করেছেন। তাঁর কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শ্রেণিচেতনা। আতাউর রহমানকে মানবতাবাদী কবি বললেও ভুল হয় না। তিনি ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রথম সংকলনের কবি। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • দুই ঋতু
  • একদিন প্রতিদিন
  • ভালোবাসা চিরশত্রু
  • ভালোবাসা এবং তারপর
  • সারাটা জীবন ধরে

 

৮. খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। তিনি ‘মুসলিম জগৎ’ ও ‘সাম্যবাদী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি নজরুলের জীবনীগ্রন্থ ‘যুগ-স্রষ্টা নজরুল’ লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি মূলত কবিতায় মানুষের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • পালের নাও
  • হে মানুষ
  • আর্তনাদ

 

৯. সৈয়দ আলী আহসান

সৈয়দ আলী আহসান প্রকৃতিকেই সর্বজ্ঞ করে কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় আকাশ, সমুদ্র, গাছপালা, নদী-নালা ও আবহমান বাংলার চিত্র পাওয়া যায়। তিনি কবিতায় রোমান্টিকতা ও বুদ্ধির সমন্বয় করেছেন। এছাড়া কখনো কখনো তাঁর কবিতায় ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধের আভাস পাওয়া যায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • একক সন্ধ্যায় বসন্ত
  • সমুদ্রেই যাব
  • অনেক আকাশ
  • সহসা সচকিত
  • উচ্চারণ
  • আমাদের প্রতিদিনের শব্দ
  • রজনীগন্ধা

 

১০. মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ। তিনি সনেট, গদ্যছন্দ ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দে কবিতা লিখতেন। তিনি কবিতায় রোমান্টিকতা ও প্রেমের চর্চা করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • জুলেখার মন
  • অন্ধকার একা
  • রক্তিম হৃদয়
  • আপন ভুবন

 

১১. আবদুল গনি হাজারী

আবদুল গনি হাজারীর কবিতায় নগরজীবনের যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা, অবক্ষয়, স্বপ্নভঙ্গ ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে মানুষের মধ্যে যে দোলাচলপূর্ণ মনোভাব কাজ করছিল, গনি হাজারীও সেই প্রভাব থেকে মুক্ত ছিলেন না। তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • সূর্যের সিঁড়ি
  • সামান্য ধন
  • জাগ্রত প্রদীপে

 

১২. সৈয়দ শামসুল হক

বাংলা সাহিত্যের পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি সৈয়দ শামসুল হক। তাঁর কবিতায় নস্টালজিয়া, প্রেম, বিরহ এবং চেতন-অবচেতন মনের নানা অনুভূতি ও মনোভাব উঠে এসেছে। বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি কাব্যচর্চা করেছেন। তাঁকে সব্যসাচী লেখক বলা হয়। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অসামান্য।তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • একদা এক রাজ্য
  • বিরতিহীন উৎসব
  • প্রতিধ্বনিগণ
  • অপর পুরুষ
  • নিজস্ব বিষয়
  • পরানের গহীন ভিতর

 

১৩. শামসুর রহমান

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ও আধুনিক কবি শামসুর রহমান। তাঁর কবিতায় আধুনিকতার চর্চা বেশি দেখা যায়। এছাড়াও তাঁর কবিতায় ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, জাতিগত নিপীড়ন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর কবিতায় দেশপ্রেম ও স্বদেশচেতনা প্রবল হয়ে উঠেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • বন্দী শিবির থেকে
  • বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখে
  • উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ
  • বিধ্বস্ত নীলিমা
  • রুদ্র করোটিতে
  • নিরালোকে দিব্যরথ
  • নিজ বাসভূমে
  • দুঃসময়ের মুখোমুখি
  • ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা
  • মাতাল ঋত্বিক

 

১৪. আলাউদ্দিন আল আজাদ

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ। তাঁর কবিতা মানবতা ও মানবধর্মকেন্দ্রিক। তিনি কবিতায় মানবতাকে সবার ঊর্ধ্বে স্থান দিয়েছেন। এছাড়াও তিনি কবিতায় আধুনিকতার চর্চা করেছেন। তাঁর কবিতায় নগরজীবনের বৈদগ্ধ্য, অবক্ষয়, শরীরী প্রেম, রোমান্টিকতা, স্বপ্নভঙ্গ ইত্যাদি বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো:

  • মানচিত্র
  • সূর্যজ্বালার সোপান
  • লেলিহান পাণ্ডুলিপি
  • নিখোঁজ সনেটগুচ্ছ
  • আমি যখন আসব
  • সাজঘর
  • চোখ

 

 

FAQ

১. পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
পঞ্চাশের দশকের কবিতায় আধুনিকতা, নাগরিকজীবনের যন্ত্রণা, হতাশা, প্রেম, মানবতাবাদ, রাজনৈতিক চেতনা ও ভাষা আন্দোলনের প্রভাব লক্ষ করা যায়।

২. পঞ্চাশের দশকের কবিতায় ভাষা আন্দোলনের প্রভাব কী ছিল?
ভাষা আন্দোলন পঞ্চাশের দশকের কবিতায় জাতীয়তাবাদ, প্রতিবাদ ও মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসার চেতনা সৃষ্টি করে।

৩. ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার রচয়িতা কে?
‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ কবিতার রচয়িতা মাহবুব উল আলম চৌধুরী।

৪. সৈয়দ শামসুল হককে সব্যসাচী লেখক বলা হয় কেন?
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে লেখালেখি করার কারণে সৈয়দ শামসুল হককে সব্যসাচী লেখক বলা হয়।

৫. পঞ্চাশের দশকের কবিতায় কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে?
প্রকৃতি, মাটি ও মানুষ, প্রেম-বিরহ, মানবতাবাদ, শ্রেণিচেতনা, রাজনৈতিক সংকট, নাগরিকজীবনের যন্ত্রণা এবং বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পঞ্চাশের দশকের কবিতায় গুরুত্ব পেয়েছে।

 

আরো পড়ুন