বাংলা সাহিত্যের অনন্য ও অসাধারণ প্রতিভাবান কবি ব্যক্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। কাজী নজরুল ইসলাম যদি অন্য কোনো কাব্য রচনা না করে শুধু ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থটি লিখতেন, তাহলেও তিনি বাংলা সাহিত্যে সমান মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতেন। এটি ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয়। নজরুল ইসলাম সারা জীবন অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। সেই বিদ্রোহী চেতনারই অসাধারণ প্রতিফলন ঘটেছে ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থে। এই আর্টিকেলে অগ্নিবীণা কাব্যের বিষয়বস্তু, নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা আলোচনা করা হল।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৯২০ সালে সেনাবাহিনী থেকে ফিরে আসেন। এ সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। যুদ্ধ শেষ হলেও ভারতবর্ষের মানুষ উপনিবেশিক শোষণ, অন্যায় ও অত্যাচারের শিকার হতে থাকে। কবি চারদিকে দেখেন অন্যায়-অত্যাচার, সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং ব্রিটিশদের শোষণ। এসব ঘটনা কবিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। তাছাড়া সেনাবাহিনীতে যোগদানের ফলে তাঁর মধ্যে এক ধরনের বিদ্রোহী সত্তার বিকাশ ঘটে, যা তাঁর কবিতায় ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে। তিনি এসব অন্যায়-অত্যাচার কখনো মেনে নেননি। তাই বিদ্রোহী চেতনায় তিনি অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদ করেছেন। ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থে এই বিদ্রোহী চেতনার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা, চিত্তজাগরণ ও ধর্মীয় ভাবনারও প্রকাশ ঘটেছে।
‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোকে মোটামুটি চারটি ভাবধারায় ভাগ করা যায়।
১. বিদ্রোহমূলক কবিতা।
২. নতুন সম্ভাবনার অভিব্যক্তিমূলক কবিতা।
৩. উপনিবেশিক পরাধীন ভারতবাসীর চিত্তজাগরণমূলক কবিতা।
৪. ধর্মীয় ভাবনামূলক কবিতা।
অগ্নিবীণা’ কাব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য কবিতা হলো ‘বিদ্রোহী’। এই কবিতায় কবির বিদ্রোহী সত্তা প্রবলভাবে জেগে উঠেছে। কবি যেন পৃথিবীর সবকিছু ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ে তুলতে চান। অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি এই কবিতায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের মানুষকে জেগে ওঠার জন্য তিনি এই কবিতায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সম্পর্কে পরিমল গোস্বামী বলেছেন,
“অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এমন ভাষায় আর কোনো বাঙালি কবি চ্যালেঞ্জ জানাননি, সমাজের উৎপীড়নে এমন শপথ আর কারও মুখে তো শুনিনি। ‘Must fight to the finish’ মন্ত্রে দীক্ষিত আর কোনো বাঙালি কবি শত্রুপক্ষকে এমন আহ্বান জানাননি।”
‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে বিদ্রোহী ভাবের প্রকাশ ঘটলেও কবিতাটি মূলত আত্মজাগরণমূলক। কবিতার শুরুতেই কবি মানুষের মধ্যকার অপরিসীম শক্তিকে বীরত্বব্যঞ্জনায় তুলে ধরে মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।
“বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির
ওই শিখর হিমাদ্রির।”
(‘বিদ্রোহী’, ‘অগ্নিবীণা’, কাজী নজরুল ইসলাম)
কবির এই উদ্দাম হৃদয়ের আহ্বান বাংলার মানুষ প্রথম শুনে উত্তেজনায় অধীর হয়ে ওঠে। এ যেন তাদের তারুণ্যের প্রতীক। এই আত্মজাগরণের মধ্য দিয়েই কবি মানুষের মধ্যে বিপুল ও বিরাট গতির সঞ্চার করতে চেয়েছেন।
এই কবিতায় কবি আত্মজাগরণের মাধ্যমে বিদ্রোহী সত্তায় আবির্ভূত হয়েছেন। পূর্বে যে রাজটিকা পরে আশীর্বাদ নিয়েছেন, পরে তিনি বিদ্রোহী সত্তার প্রকাশে ধ্বংসাত্মক উপমা গ্রহণ করেছেন, যা অসহযোগ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সমস্ত নিয়ম-কানুন ও বন্ধনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে কবি নটরাজ, সাইক্লোন, টর্নেডো, কালবৈশাখী ও এলোকেশী ঝড়ের রূপে আবির্ভূত হতে চেয়েছেন। ঝড় ধ্বংসের পাশাপাশি নতুন সৃষ্টিরও প্রতীক। যা কিছু অন্যায় ও অনিয়ম, সেসবকে দলিত-মথিত করে কবি নতুন রূপে সবকিছুর আবির্ভাবের কথাই বলেছেন।কবি নিজের মধ্যে এক অপরিসীম শক্তি অনুভব করেছেন। সেই শক্তি দিয়ে তিনি পৃথিবীর সকল অন্যায়, অত্যাচার ও অত্যাচারীকে দমন করতে চেয়েছেন। ব্রিটিশ শাসনের শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ ঘোষণা করেছেন এবং সাইক্লোন, টর্নেডো ও ঝড়ের মতো প্রবল শক্তিতে সব অন্যায় ও অত্যাচার দূর করতে চেয়েছেন।
রশুরামের কুঠারের মতো বিশ্বকে নিঃক্ষত্রিয় করে অনাবিল শান্তি আনয়ন করবেন। বলরামের হলের ন্যায় পুরাতন বিশ্বকে উৎপাটিত করে পৃথিবীতে নতুন সৃষ্টির সূচনা করবেন। মহাবিদ্রোহী, রণক্লান্ত কবি সেদিনই শান্ত হবেন, যেদিন উৎপীড়িত ও মজলুম মানুষের কান্নার রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হবে না এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি আর শোনা যাবে না। কাজী নজরুল ইসলাম অন্যায়-অত্যাচারমুক্ত একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি চেয়েছেন, পৃথিবী থেকে সব ধরনের অন্যায়, অত্যাচার ও নিপীড়ন দূর হোক এবং কোনো অত্যাচারী যেন আর মানুষের ওপর শোষণ চালাতে না পারে। সেই দিনই তাঁর বিদ্রোহী সত্তা শান্ত হবে।
তুরস্কের রাজনৈতিক ঘটনা কাজী নজরুল ইসলামকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষকে জাগিয়ে তোলার জন্য তিনি কামাল পাশা ও আনোয়ার পাশার শৌর্য-বীর্যের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের কাছ থেকে দেশবাসীকে শিক্ষা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যেই তিনি ‘কামাল পাশা’ ও ‘আনোয়ার পাশা’ কবিতা রচনা করেন। কামাল পাশা তাঁর বীরত্ব ও নেতৃত্বের মাধ্যমে গ্রিক বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধজয়ের পটভূমিতে নজরুল ‘কামাল পাশা’ কবিতাটি রচনা করেন।
“হিংসুটে ওই জীবগুলো ভাই নাম ডুবালে সৈনিকের,
তাই তারা আজ নেস্ত-নাবুদ, আমরা মোটেই হই নি জের!”(‘কামাল পাশা’, ‘অগ্নিবীণা’, কাজী নজরুল ইসলাম)
‘কামাল পাশা’ কবিতার মাধ্যমে কবি পরাধীন ভারতবর্ষের অন্তর্জ্বালা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকেই রূপ দিয়েছেন। নিজ দেশের স্বাধীনতা প্রত্যাশী কবি অন্য দেশের স্বাধীনতা ধ্বংসকারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা পোষণ করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দেখিয়েছেন, আঘাতের প্রতিঘাত করাই একজন সৈনিকের প্রধান ব্রত হওয়া উচিত। এই বৈপ্লবিক চেতনাকে নিজ দেশের জনগণ ও সৈনিকদের মধ্যে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেছেন।
‘আগমনী’ কবিতায় কবি সমাজের সকল অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঘোষণা করেছেন। সমাজের সকল দানবীয় ও পশুশক্তির বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ জানিয়েছেন। কবিতায় তিনি হিন্দু পুরাণ থেকে বিভিন্ন উপমা গ্রহণ করেছেন এবং দেবী দুর্গাকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দেবী দুর্গা চণ্ডীরূপে আবির্ভূত হয়ে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে সত্যের জয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একইভাবে নজরুল ‘আগমনী’ কবিতায় দেবী দুর্গার প্রতীকের মাধ্যমে সমাজের সকল অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের চেতনা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছেন।
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’। এই কাব্যে কবি সমাজের সকল অন্যায়, অত্যাচার, শাসন, শোষণ, নিপীড়ন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। তিনি এমন একটি সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের প্রত্যাশা করেছেন, যেখানে কোনো অন্যায়-অত্যাচার থাকবে না, কোনো জুলুম থাকবে না, কোনো মজলুম ও নিপীড়িত মানুষ থাকবে না এবং কেউ আর অত্যাচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে না।
FAQ
১. ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয় কী?
উত্তর: অন্যায়, শোষণ, নিপীড়ন ও ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষাই এর মূল বিষয়।
২. ‘অগ্নিবীণা’তে ‘বিদ্রোহী’ কবিতার গুরুত্ব কী?
উত্তর: ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, আত্মজাগরণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
৩. ‘কামাল পাশা’ কবিতার মাধ্যমে নজরুল কী প্রকাশ করেছেন?
উত্তর: ‘কামাল পাশা’ কবিতায় নজরুল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও বৈপ্লবিক চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন।
৪. ‘আগমনী’ কবিতায় দেবী দুর্গার প্রতীকী তাৎপর্য কী?
উত্তর: দেবী দুর্গার প্রতীকের মাধ্যমে নজরুল অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সত্যের জয়ের বার্তা দিয়েছেন।
৫. ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যে নজরুল কেমন সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন?
উত্তর: তিনি এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে অন্যায়, শোষণ, জুলুম ও নিপীড়নের কোনো স্থান থাকবে না।
আরো পড়ুন
- গীতাঞ্জলি কাব্যের বিষয়বস্তু, আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেম আলোচনা
- গোরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা | বিস্তারিত আলোচনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
