Skip to main content

Study Journalx

বাংলা সাহিত্যে ১২০১ সাল থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত খুব বেশি সাহিত্যকর্মের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এই সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয়। মধ্যযুগের সূচনা হয় ১২০০ সাল থেকে, কিন্তু পণ্ডিতগণ মনে করেন ১২০১ থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত সময়কাল অন্ধকার যুগ। এ সময় বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো গ্রন্থ রচিত হয়নি। এর কারণ হিসেবে ধরা হয় বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত। বখতিয়ার খলজি ১২০৪ সালে সেন বংশের শাসক লক্ষ্মণ সেনকে সরিয়ে বাংলা দখল করেন এবং বিনা বাধায় নদীয়াও জয় করেন। এর মাধ্যমে বাংলায় মুসলমান শাসনের সূত্রপাত হয়।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাংলা দখল করার পরে তিনি বাংলার মানুষের উপর নির্যাতন চালান; এর ফলে কেউ সাহিত্যচর্চায় আগ্রহী হয়নি। এছাড়াও তৎকালীন সময় বাংলায় বিভিন্ন দুর্ভিক্ষ, দুর্যোগ ইত্যাদির ফলেও কেউ সাহিত্যচর্চায় আগ্রহ দেখায়নি। ১৩৪২ সালে ইলিয়াস শাহের মাধ্যমে শাহী বংশের প্রতিষ্ঠা হয় এবং সিকান্দার শাহের আমলে বড়ু চণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ কাব্য রচনা করেন। এই আর্টিকেলে বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ নিয়ে আলোচনা করা হল।

বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ

১২০৪ সালে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়। বিভিন্ন দুর্যোগ ও মহামারির কথাও অনুমান করা হয়। বখতিয়ার খলজি বিধর্মীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালান এবং তাদের ধর্মান্তরিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার করেন। এই অরাজক পরিস্থিতিতে অনেকেই বাংলা ছেড়ে পালায়, আবার অনেকেই মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। এর মধ্যে সাহিত্যচর্চা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ড. সুকুমার সেনের মতে,

“মুসলমান অভিযানে দেশের আক্রান্ত অঞ্চলে বিপর্যয় শুরু হয়েছিল।”

 

গোপাল হালদার মনে করেন,

“তখন বাংলায় জীবন ও সংস্কৃতি ধ্বংসের মুখে।”

 

সে সময় বাংলায় হত্যাকাণ্ড, রাজনৈতিক অরাজকতা এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ফলে মানুষ সাহিত্যচর্চা থেকে বিরত ছিল। মুসলমানরা হিন্দুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে অথবা তাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে বাংলায় অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তারা হিন্দুদের ওপর ব্যাপক বর্বরতা চালায়। এই সময়কে ইউরোপীয় Dark Ages-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়। তুর্কিরা তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য বাঙালিদের ওপর হত্যাকাণ্ড চালায়; এর ফলে কেউ সাহিত্যচর্চায় আগ্রহ দেখায় না। সবাই নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সে সময় কালজয়ী কোনো সাহিত্য রচিত হয়নি।

গতানুগতিক ধারায় কিছু সাহিত্য রচিত হলেও তা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতের ফলে বাঙালিরা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে ব্যর্থ হয়; ফলে তারা সাহিত্যচর্চা করতে পারেনি। সাধারণত সে সময় সাহিত্য রচিত না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে এই ধ্বংসযজ্ঞকে দায়ী করা হয়।

আবার কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন, তৎকালীন সময়ে যেসব সাহিত্যকর্ম রচিত হয়, তাতে সে সময়ের রাজনৈতিক অবস্থাকে অন্ধকার যুগ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। মুসলমানরা এদেশে বর্বরতা চালিয়েছে, এমন কথাও সর্বত্র স্বীকৃত নয়। বখতিয়ার খলজির পর ১৫-২০ বছর বাংলায় অরাজক পরিস্থিতি ছিল, তারপর বাংলা শান্ত ছিল বলে বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। এদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসলামী শিক্ষা, ধর্ম, কর্ম ও আচার-ব্যবহারের ক্ষেত্রে শান্তিময় পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। আবার অনেকে মনে করেন, মুসলমান শাসকরা বাংলা সাহিত্যে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন। তাঁদের উদারতায় বাংলা সাহিত্য যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন,

“আমাদের বিশ্বাস মুসলমান কর্তৃক বঙ্গবিজয় বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।” (ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’)

তিনি ভারতে মুসলমান শাসনের ব্যাপক অবদানের কথা স্বীকার করেন। তাই মনে করা হয়, মুসলমান শাসনের মাধ্যমে বাংলা জ্ঞানচর্চায় ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়। মুসলমানরা ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি ও কূটনীতিতে ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করেন। এ সময় বিভিন্ন রাজসভায় মন্ত্রী হিসেবে হিন্দুদেরও ব্যাপক আধিপত্য ছিল। হিন্দু ও মুসলমানদের নিয়ে একসঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে চেয়েছিল শাসকগোষ্ঠী, কারণ দেশের একটি বড় অংশকে বাদ দিয়ে কখনো দেশ পরিচালনা করা যায় না।

বাংলায় মুসলমান শাসনের সূত্রপাত ঘটলেও বাঙালির ব্যবহারিক জীবনব্যবস্থায় মুসলমানরা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি বলে অনেকে মনে করেন। তাঁদের উদারনীতি ও ইসলামের উদারতার ফলে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে থাকার চেষ্টা করা হয়েছিল। তাঁরা এ দেশে বিভিন্ন হিন্দু মন্দির ও মঠের জন্য দানপত্র দিয়েছিলেন। এমনকি মুসলিম শাসনের ফলে বাংলায় মুদ্রার প্রচলন হয়েছিল। সুলতানরা মুসলমান হলেও রাজকার্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ হিন্দুদের হাতেই ছিল। তাঁরা অনেক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতেন। ক্ষমতাকে স্থায়ী করার জন্য এ দেশের হিন্দুদের নিরাপত্তা দেওয়াও শাসকদের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।

অন্ধকার যুগে কোনো সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হয়নি, একথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। এ সময় অনেক সাহিত্য রচিত না হলেও অন্ধকার যুগের অপবাদ অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত সাহিত্যকর্মের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ সময় রচিত হয় ‘প্রাকৃত-পৈঙ্গল’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য। এছাড়াও রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’, ‘খানার বচন’, ‘শেখ শুভোদয়া’ ইত্যাদি সাহিত্যকর্মের নাম উল্লেখযোগ্য। এ সময় বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন গান ও ছড়াও রচিত হয়।

এসব সাহিত্যকর্ম সেই সময়কে অন্ধকার যুগের অপবাদ থেকে অনেকাংশে রেহাই দেয়। তবে যেসব সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল, তা পর্যাপ্ত ছিল না। অনেকেই এর কারণ হিসেবে মনে করেন যে, প্রাথমিক অবস্থায় বাংলা ভাষা সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না। এটি ছিল নিম্নবিত্ত মানুষের মুখের ভাষা। এছাড়াও ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের ফলে তেমন কোনো সাহিত্যকর্ম রচিত হয়নি।

বাংলায় মুসলমান শাসন অন্ধকার যুগের একমাত্র কারণ নয়। দেশের রাজনৈতিক অরাজকতা থাকলেও সাহিত্য সৃষ্টি সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আকবর ও জাহাঙ্গীরের শাসনামলেও দেশে অনেক যুদ্ধ লেগেছিল; তারপরও সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। শাহজাহানের আমলে বাংলা বিপর্যস্ত ছিল, আওরঙ্গজেবের আমলেও ইউরোপীয় বণিকদের দৌরাত্ম্য ছিল; তারপরও সাহিত্য রচিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও গণহত্যা চলেছিল, পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অশান্ত; তারপরও সাহিত্যচর্চা থেমে থাকেনি। ফলে শাসকরা অত্যাচারী হলেও সে সময় সাহিত্যচর্চা হতো। তাই মুসলমান শাসনই অন্ধকার যুগের একমাত্র কারণ নয়; বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে মুসলমানদের অবদান অনস্বীকার্য।

এইসব কথা বিবেচনা করে অনেকেই মনে করেন, সে আমলে সাহিত্যচর্চা হয়েছিল; কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। এখানকার আবহাওয়া, মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে অনেক সাহিত্যনিদর্শন সংরক্ষিত রাখা সম্ভব হয়নি। চর্যাপদ বা ‘শেখ শুভোদয়া’র পাণ্ডুলিপি আমাদের কাছে আছে বলেই আমরা বলতে পারি যে, সে সময় সাহিত্যচর্চা হয়েছিল। যদি এসব নিদর্শন না থাকত, তাহলে মনে করা হতো যে সে সময় বাংলা সাহিত্যে কিছুই রচিত হয়নি। তাই শুধুমাত্র মুসলমান শাসনকে অন্ধকার যুগের একমাত্র কারণ বলা যায় না; বাংলার আবহাওয়া, দুর্যোগ ও মহামারিকেও এর জন্য দায়ী করা হয়।

তাই পরিশেষে বলা যায়, অন্ধকার যুগ বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময় বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত ধারাবাহিকতা বজায় না থাকলেও কিছু উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রচিত হয়। অনেকেই আবার অন্ধকার যুগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন না; তাঁরা মনে করেন, ১২০০ সাল থেকেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সূচনা। তাই শুধুমাত্র মুসলমান শাসনকে অন্ধকার যুগের জন্য দায়ী করা যায় না। সব যুক্তি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাংলার আবহাওয়া, জলবায়ু, মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক সাহিত্যকর্ম টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

 

তথ্যসূত্র

  • সেন, দীনেশচন্দ্র। বঙ্গভাষা ও সাহিত্য। কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ।
  • সেন, সুকুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (প্রথম খণ্ড)। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
  • বন্দ্যোপাধ্যায়, অসিত কুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (মধ্যযুগ)। কলকাতা: মডার্ন বুক এজেন্সি।
  • হালদার, গোপাল। বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা। কলকাতা: ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি।

 

 

FAQ

১. অন্ধকার যুগ বলতে বাংলা সাহিত্যের কোন সময়কে বোঝায়?

উত্তর: সাধারণভাবে ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ বলা হয়।

২. বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগকে কেন অন্ধকার যুগ বলা হয়?

উত্তর: এ সময় উল্লেখযোগ্য বাংলা সাহিত্যকর্মের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম এবং সাহিত্যিক ধারাবাহিকতার ঘাটতি থাকায় এ সময়কে অন্ধকার যুগ বলা হয়।

৩. মুসলমান শাসন কি অন্ধকার যুগের একমাত্র কারণ?

উত্তর: না। রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, জলবায়ু ও সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতাকেও এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

৪. অন্ধকার যুগে কি কোনো সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছিল?

উত্তর: হ্যাঁ। এ সময় ‘প্রাকৃত-পৈঙ্গল’, রামাই পণ্ডিতের ‘শূন্যপুরাণ’, ‘খানার বচন’ ও ‘শেখ শুভোদয়া’র মতো সাহিত্যকর্মের উল্লেখ পাওয়া যায়।

৫. সব পণ্ডিত কি বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগের অস্তিত্ব স্বীকার করেন?

উত্তর: না। অনেক পণ্ডিত অন্ধকার যুগের ধারণা স্বীকার করেন না এবং মনে করেন, ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সূচনা হয়েছে।

আরো পড়ুন