ঊনবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বাংলার উপনিবেশ-শৃঙ্খলিত নবজাগরণের সন্ধিক্ষণের আবর্তে আবির্ভাব ঘটে দীনবন্ধু মিত্রের। বাঙালি নবজাগরণের অন্যতম ধুরন্ধর সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। কবিতা দিয়ে সাহিত্যে অনুপ্রবেশ ঘটলেও নাটকে তাঁর প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে। সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন, ফলে বিচিত্র মানুষের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছে। গ্রামগঞ্জে ঘোরার ফলে বহু লোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটেছে। এখান থেকেই তিনি বাংলার সমাজব্যবস্থা ও মানবমনের বিচিত্র রহস্য উন্মোচন করেন। সমাজের অবহেলিত, নিষ্পেষিত মানুষের আর্তনাদ তিনি কাছ থেকেই দেখেছেন, যা তাঁর সাহিত্যজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। বাস্তব জীবনের বহু অভিজ্ঞতা তিনি সাহিত্যে তুলে ধরেছেন। তারই বাস্তব উদাহরণ নীলদর্পণ নাটক।

নীলদর্পণ নাটক
দীনবন্ধু মিত্র নীলকরদের বীভৎস অত্যাচারে লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, নিষ্পেষিত নীলচাষিদের দুরবস্থা অবলম্বনে রচনা করেন নীলদর্পণ নাটক। বাংলার নীলচাষিদের দীর্ঘকালের নির্যাতিত হওয়ার এক করুণ চিত্র এই নাটক। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রপ্তানির অন্যতম কাঁচামাল ছিল নীল। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের বাজারে নীলের চাহিদা ছিল ব্যাপক। ফলে নীলকররা নীল চাষ করে উৎপন্ন নীল ইংল্যান্ডে রপ্তানি করে উচ্চ কমিশন পেত। নীলকররা ব্যাপক মুনাফা অর্জন করলেও এদেশীয় নীলচাষিরা অনাহারে থাকত। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। বরঞ্চ আরও অবনতি ঘটেছে।
নীলকরদের অমানবিক অত্যাচারের পিছনে ইংরেজ সরকারের সমর্থন ও আইনগত সহযোগিতা ছিল অতিমাত্রায়। ১৮১৯ সালে অষ্টম আইনে তারা দেশীয় জমিদারের কাছ থেকে জমির পত্তনি লাভ করেছিল। তারপর ১৮২৩ সালে ষষ্ঠ আইন দ্বারা নীলকররা যেসব চাষিদের টাকা বা নীল বীজ দাদন দিয়েছিল, তাদের জমির উপর এক বিশেষ অধিকার পায়। এবং পঞ্চম আইনের মাধ্যমে কৃষকদের সাথে সর্বোচ্চ হঠকারিতা করা হয়। এই আইনের বিধান হল, দাদন গ্রহণকারী কৃষক যদি নীল চাষ না করে, তাহলে সেটা সম্পূর্ণ বেআইনি। তখন তাদের উপর আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে শাস্তি দেওয়া হবে।
এই আইন বাস্তবায়নের ফলে বাংলা চাষিদের উপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। এই কুখ্যাত ষষ্ঠ ও পঞ্চম আইনের মাধ্যমে কৃষকদের উপর অত্যাচার ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। নীলকররা তাদের ভাড়াটে গুন্ডা ও কুখ্যাত সন্ত্রাস দিয়ে নিরীহ কৃষকদের উপর নির্যাতন চালাত। সুন্দরী মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে নীলকুঠিতে নিয়ে নির্যাতন করত।
তাদের অত্যাচারে বাধা দেওয়ার সাধ্য পুলিশের ছিল না। এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটও তাদের ভয়ে নীরব থাকত। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বিচারালয়ের শরণাপন্ন হওয়া ছিল অর্থহীন, কারণ শ্বেতাঙ্গ বিচারকদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে নীলকরদের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখত। যে কারণে তাদের আইনের আওতায় আনা যেত না। ফলে নীলকরদের অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে চলেছে। অনেক জমিদার নীরবে এই অত্যাচার সহ্য করত, আবার কেউ কেউ এর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। কিছু কিছু জমিদার কৃষকদের সাথে নিয়ে এই নীলকরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিবাদও জানিয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নীল বিদ্রোহ দেশের মেহনতি মানুষ থেকে ক্রমে সর্বস্তরের মানুষের প্রতিবাদ হিসেবে রূপ নেয়। কালক্রমে উচ্চশিক্ষিত মধ্যবিত্ত জনগণের সমর্থন পেয়ে নীল বিদ্রোহ সর্বজনীন রূপ নিয়েছিল। সচেতন মহলের দুজন মানুষ এই আন্দোলনকে আরও তীব্রতর রূপ দিয়েছিল। এরা হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও দীনবন্ধু মিত্র। হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় Hindu Patriot পত্রিকায় নীলকরদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করেন এবং দীনবন্ধু মিত্র তাঁর নীলদর্পণ নাটকে নীলকরদের অত্যাচারের চিত্র তুলে ধরেন।
দীনবন্ধু মিত্রের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত নাটক নীলদর্পণ। এই নাটকটি প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তাঁর খ্যাতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। নাটকটি রচনার মাধ্যমে তিনি আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন। নাটকটি সমাজের প্রত্যেক শ্রেণিকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছিল। অভিজাত শ্রেণি থেকে সাধারণ মানুষ সবাই কৃষকদের এই দুর্দশায় সমব্যথী হয়ে উঠেছিল এবং নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। তাদের মধ্যে একটি কাল্পনিক সম্প্রদায় গঠিত হয়েছিল, যেখানে কেউ কাউকে চেনে না, অথচ তাদের মধ্যে একটি অদৃশ্য বন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল। এই কাল্পনিক সম্প্রদায় সবাইকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল, যেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
নীলদর্পণ নাটকটি নীল বিদ্রোহকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল, যেমনটি দেখা যায় আমেরিকায় দাসপ্রথার বিরুদ্ধে Uncle Tom’s Cabin যেভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের পর নাটকটির জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে গিয়েছিল। ১৮৬০ সালে নাটকটি ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় এবং সেই বছরই মঞ্চায়িত হয়। ১৮৭২ সালে কলকাতায় পেশাদার নাট্যকাররা এটি মঞ্চায়িত করেন। নাটকটি দেখে দর্শকরা ইংরেজদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। অন্যায়-অত্যাচারের চিত্র দেখে দর্শকদের মনে প্রতিবাদের আগুন জ্বলছিল। নাটকটির মঞ্চায়ন ও দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখলে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রমাণ মেলে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নীলদর্পণ নাটকের অভিনয় দেখার সময় খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি নিজের জুতা খুলে মিস্টার রোগের ভূমিকায় অভিনয় করা অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফিরের মাথায় ছুড়ে মেরেছিলেন এবং তিনি এই জুতাটি পুরস্কার হিসেবে নিয়েছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় এই নাটকটি মঞ্চায়িত হওয়ার সময় বিভিন্নভাবে দর্শকদের ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। নীলদর্পণ নাটকের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রকাশ ঘটে। নাটকের মাধ্যমে প্রচণ্ড উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতবর্ষে। মানুষ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ করতে থাকে।
নীলদর্পণ নাটকটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছিলেন রেভারেন্ড জেমস লঙ। নাটকটি প্রকাশের জন্য তাঁকে জেল হাজতে যেতে হয়েছিল। ১৮৬০ সালে ঢাকা থেকে নাটকটি প্রকাশিত হওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর বাংলা সরকারের সেক্রেটারি সীটন কার (W. S. Seton Karr)-কে বইটি পড়ার জন্য দেন। তিনি বাংলা জানতেন এবং তিনি নাটকটি অনুবাদ করার নির্দেশ দেন। এরপর লঙ সাহেব মাইকেল মধুসূদন দত্তকে অনুবাদের দায়িত্ব দেন। কার নিজ খরচে নীলদর্পণের ইংরেজি অনুবাদ (The Indigo Planting Mirror) ৫০০ কপি ছাপিয়ে ২০০ কপি বিশিষ্টজনদের নিকট পাঠান।
নাটকটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে ইংরেজদের ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়। তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। লঙ সাহেবের বিরুদ্ধে তারা মানহানির মামলা করে। ১৮৬১ সালের জুলাই মাসে কলকাতা সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির বিচারকার্য হয়েছিল। বিচারে লঙের বিরুদ্ধে ‘সবচেয়ে সাংঘাতিক রকমের অপবাদ প্রচারক’ অভিযোগ দেওয়া হয়। এবং তাঁকে বলা হয়, ইউরোপীয়দের পিছনে তিনি ছুরি মেরেছেন। এ সকল অপবাদের পরেও তিনি নীলদর্পণ নাটকের লেখক ও অনুবাদকের নাম বলেননি। এই মামলার বিচারে কলকাতার প্রগতিশীল সমাজ বিচারব্যবস্থাকে প্রহসনমূলক বিচারব্যবস্থা বলেছে। এবং এই মামলার জরিমানা ১০০০ টাকা সঙ্গে সঙ্গে কোর্টে উপস্থিত কালীপ্রসন্ন ঘোষ দিয়ে দেন। এরই মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
স্বরপুরের বাসিন্দা গোলকচন্দ্র বসুর পরিবারকে কেন্দ্র করে নীলদর্পণ নাটকের কাহিনি গড়ে উঠেছে। তিনি একজন অবস্থাসম্পন্ন গৃহস্থ। গোলকচন্দ্র বসু বয়সে প্রবীণ এবং নিরীহ প্রকৃতির মানুষ। কারও সাথে ঝগড়া-বিবাদে জড়ান না। তাঁর যে পৈতৃক জমিজায়গা আছে, সেটা দিয়েই তাঁর সংসার, পূজার খরচ, অতিথিসেবা ভালোভাবেই চলে যায়। তাঁর বড় ছেলে নবীনমাধব গৃহকর্ম এবং বিষয়াদি দেখাশোনা করেন। তিনি একজন পরোপকারী ব্যক্তি। দরিদ্র মানুষের সুখে-দুঃখে সব সময় পাশে থাকেন। গোলকচন্দ্র বসুর ছোট ছেলে বিন্দুমাধব কলকাতা কলেজে লেখাপড়া করেন। তাঁরা দুজনেই বিবাহিত। নবীনমাধবের স্ত্রীর নাম সৈরন্ধি এবং বিন্দুমাধবের স্ত্রীর নাম সরলতা। গোলকচন্দ্র বসুর স্ত্রীর নাম সাবিত্রী। তিনি সংসারের কর্ত্রী। আর তাঁদের দাসীর নাম আদুরী। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এভাবেই সুখেই দিন কাটছিল গোলকচন্দ্র বসুর।
কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই গ্রামে নীলকরদের অত্যাচার বেড়ে যায়। তারা জোর করে মানুষকে দাদন নিতে বাধ্য করায়। দাদন না নিলে জোর করে তাদের নীলকুঠিতে ধরে নিয়ে অত্যাচার করে। লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে তাদের উপর অমানবিক অত্যাচার করে দাদন নিতে বাধ্য করে। অনেকেই আদালতে নালিশ করলে ইংরেজ বিচারকরা তাদের মামলা ডিসমিস করে দেয়। গোলক বসু গত বছর পঞ্চাশ বিঘা জমিতে নীল চাষ করেছিল তাদের নির্দেশে।
কিন্তু সে টাকা এখনো তারা পায়নি। এজন্য এ বছর আর নীল চাষ করতে চায় না গোলকচন্দ্র বসু। এ বছর তাদের ষাট বিঘা জমিতে নীল চাষ করতে নির্দেশ দিয়েছে নীলকররা। কিন্তু তারা যদি ষাট বিঘা জমিতে নীল চাষ করে, তাহলে তাদের বছরে খোরাক হবে না। এজন্য নবীনমাধব বলে দিয়েছে, আগের বছরের টাকা পরিশোধ না করলে এ বছর আর নীল চাষ করবে না।
গোলকচন্দ্র বসুর প্রতিবেশী ছিল এক ঘর গৃহস্থ কৃষক । তারা দুই ভাই সাধুচরণ ও রাইচরণ। দাদন না নেওয়ায় রাইচরণকে ধরতে আসে নীলকুঠির আমিন খালাসি ও দুজন পিয়াদা। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় সাধুচরণের কন্যা রূপবতী ক্ষেত্রমণিকে দেখতে পায় আমিন। ক্ষেত্রমণিকে দেখে তার মাথায় কুবুদ্ধি চলে আসে। তাকে যদি ধরে নিয়ে ছোট সাহেবের কাছে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার পদোন্নতি হবে। তাই সে রোগ সাহেবকে ক্ষেত্রমণির কথা জানায়। এরপর রোগ সাহেব পদী ময়রানি নামে এক ভ্রষ্টা নারীকে সাধুচরণের বাড়িতে পাঠায়। ক্ষেত্রমণি অন্তঃসত্ত্বা ছিল, তাই বাবার বাড়িতে এসেছে। পদী ময়রানি সাধুচরণের স্ত্রী রেবতীকে বিভিন্ন রকম প্রলোভন দেখিয়ে তার মেয়েকে রোগ সাহেবের কাছে নিয়ে যেতে চায়, কিন্তু সে কোনো মতেই রাজি হতে চায় না।
নবীনমাধব নীল চাষ করতে না চাওয়ায় তার পিতার উপর ফৌজদারি মামলা দায়ের করে নীলকররা। গোলকচন্দ্র বসুর উপর অভিযোগ আনা হয় যে তিনি নীল চাষে বাধা দিচ্ছেন। এজন্য তাকে ফৌজদারি তলব করা হয়। পরিবারে সবাই খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে। পুত্রবধূরা তাদের সমস্ত গহনা বন্ধক রেখে শ্বশুরের বিপদে পাশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বিকেলে ক্ষেত্রমণি দিঘিতে জল আনতে গেলে নীল সাহেবের চারজন লাঠিয়াল তাকে কুঠিতে ধরে নিয়ে যায়। ক্ষেত্রমণির মা রেবতী নবীনমাধবের পায়ে ধরে তার মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য। পদী ময়রানি ক্ষেত্রমণিকে জোর করে রোগ সাহেবের কক্ষে ঢুকিয়ে দেয়। রোগ সাহেব তার শ্লীলতাহানি করে। ক্ষেত্রমণি বাধা দিলে রোগ সাহেব তার পেটে ঘুষি মারে। এ সময় নবীনমাধব ও তোরাপ জানালা ভেঙে ক্ষেত্রমণিকে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যায়। এর কয়দিনের মধ্যে ক্ষেত্রমণি মারা যায়।
গোলকবসুকে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে ইংরেজ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দোষী প্রমাণিত করে জেলে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন। বসু একজন ভদ্র ও নিষ্ঠাবান মানুষ ছিলেন। এই অপমান তিনি সহ্য করতে পারেননি। তিন দিন অনাহারে থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন। এতেও নীলকররা সন্তুষ্ট হয়নি। তারা নবীনমাধবের পুষ্পরিণীর পাড়ে নীল চাষ করে, যাতে তাদের বাড়ির মেয়েরা ঘাটে না যেতে পারে। নবীনমাধব রোগ সাহেবকে হাত-পা ধরে অনুরোধ করেন যে, তাঁর পিতার শ্রাদ্ধের দিন পর্যন্ত নীল চাষ বন্ধ রাখতে। কিন্তু রোগ সাহেব তাঁর কথা না রেখে উল্টো তাঁর মৃত বাবার নামে অপমানজনক কথা বলে। নবীনমাধব রেগে গিয়ে রোগ সাহেবের বুকে সজোরে লাথি মারেন। রোগ সাহেব লাঠিয়ালদের নির্দেশ দেয় নবীনমাধবকে মারতে। তারা নবীনমাধবকে মারতে মারতে মৃতপ্রায় করে ছাড়ে।
মৃতপ্রায় নবীনমাধবকে বাড়িতে নিয়ে আসলে তার মা সাবিত্রী দেখে উন্মাদের মতো হয়ে যায়। এ অবস্থাতেই নবীনমাধব মারা যায়। স্বামী এবং পুত্রশোকে সাবিত্রী পাগল হয়ে যায়। সে খাওয়া-দাওয়া ত্যাগ করে। উন্মাদ অবস্থায় একদিন ছোট পুত্রবধূ সরলতার গলার উপর দাঁড়িয়ে শ্বাস রোধ করে তাকে হত্যা করে। সরলতা যখন মারা যায়, তখন তার জ্ঞান ফিরে। স্বামী এবং পুত্রশোকে কাতর সেই অবস্থাতে নিজের প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রবধূর মৃত্যুর কারণ জানতে পেরে হাহাকার ও অনুতাপে সাবিত্রী নিজেও মারা যায়।
করুণ ট্র্যাজেডির মাধ্যমে নাটকটি শেষ হয়। নীলদর্পণকে অনেকে ট্র্যাজেডি বলেছে, কিন্তু এটি ট্র্যাজেডি হিসেবে সফল নয়, কারণ রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে যখন একটি পরিবার যুদ্ধ করে, তখন তা ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে না। নীলদর্পণকে একটি ঐতিহাসিক নাটক হিসেবেও ধরা হয়, কারণ এই নাটকে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনকে ঘিরে নাটকটি গড়ে উঠেছে। তাই এটি একটি ঐতিহাসিক নাটক হিসেবে বিবেচনা করা যায়। আবার নীলদর্পণ সামাজিক নাটক হিসেবেও একটি সফল নাটক, কারণ একটি বৃহৎ সামাজিক প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে নাটকটি রচিত হয়েছে। নীলদর্পণের মাধ্যমে দীনবন্ধু মিত্র একজন সফল নাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। নীল বিদ্রোহকে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ব্যাপক অবদান রাখে। এটি একটি শিল্পসফল নাটক।
তাই পরিশেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে এক অমূল্য সম্পদ নীলদর্পণ। এই নাটকে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে দীনবন্ধু মিত্রের আহ্বান পুরো জাতিকে এক করে দিয়েছিল। জাতীয়তাবাদের অদৃশ্য বন্ধনে সবাই এক হয়ে গিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক পরিবারের অসহায়ত্বের চিত্র আমাদের সবার হৃদয়কে মর্মাহত করে। বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে নীলদর্পণ নাটক।
FAQ
১. নীলদর্পণ নাটকটি কে রচনা করেন?
দীনবন্ধু মিত্র নীলদর্পণ নাটকটি রচনা করেন।
২. নীলদর্পণ নাটকের মূল বিষয় কী?
নীলকরদের অত্যাচারে নীলচাষিদের দুরবস্থা নাটকটির মূল বিষয়।
৩. নীলদর্পণ নাটক প্রথম কবে প্রকাশিত হয়?
১৮৬০ সালে নীলদর্পণ নাটকটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
৪. নীলদর্পণ নাটকের প্রধান চরিত্র কে?
গোলকচন্দ্র বসু ও তাঁর পরিবারকে কেন্দ্র করে নাটকটির কাহিনি গড়ে উঠেছে।
৫. নীলদর্পণকে ঐতিহাসিক নাটক বলা হয় কেন?
নীল বিদ্রোহের ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাটকটি রচিত হওয়ায় একে ঐতিহাসিক নাটক বলা হয়।
আরো পড়ুন
- চোখের বালি উপন্যাসের বিষয়বস্তু
- কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও নামকরণের সার্থকতা
- গোরা উপন্যাস এর অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ
- আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক কাব্য’র প্রেম ও বিরহ চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ
- গীতাঞ্জলি কাব্য’র আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেম।
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: এর রচয়িতা, সাহিত্যিক গুরুত্ব, আঙ্গিক, ছন্দ ও অলংকার
- বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব, নায়ক কে ও চরিত্র বিশ্লেষণ






