বাংলা সাহিত্যে গল্প-নির্মাণের ইতিহাস রচিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিশ্বযুদ্ধের বাস্তবতায় বাংলা ছোটগল্প হয়ে ওঠে আরও প্রখর, জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যসমৃদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ছোটগল্পে বিচিত্র জীবন, মানুষের আন্তঃসম্পর্ক, ব্রাত্য ও বিত্তহীন মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, রাজনীতি ও রাজনৈতিক অধিকার, মন্বন্তর বিরাট হয়ে দেখা দেয়। একই সঙ্গে মনের অন্তর্দাহ, জৈবিকতা, যৌনতা, শরীরী প্রবৃত্তি ও তার জটিলতা, লোভ, হিংসা, ক্রোধ, কামনা-বাসনা দুর্মর হয়ে ওঠে বাংলা গল্পে। এক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রেখেছেন জগদীশ গুপ্ত, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোধ ঘোষ প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ছোটগল্পে মুক্তিযুদ্ধের বিষয় উঠে এসেছে। এই আর্টিকেলে বাংলা ছোটগল্প: স্বাধীনতা পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ছোটগল্প ও গল্পকার (১৯৭১-২০১৫) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলা ছোটগল্পে যুদ্ধ-পরবর্তী আর্থসামাজিক অবস্থা উঠে এসেছে। যুদ্ধের উৎসবের সঙ্গে উঠে এসেছে যুদ্ধ-পরবর্তী ধ্বংসের চিত্র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাও যুদ্ধ-পরবর্তী ছোটগল্পে উদ্ভাসিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক টানাপোড়েন বাংলা ছোটগল্পে উঠে এসেছে। তৎকালীন সময়ে সমাজ সচেতন গল্পকারেরা কঠিন বাস্তবতার নিরিখে সমকালীন বাস্তবতাকে ছোটগল্পে রূপ দিয়েছেন। এসব ছোটগল্পে যুদ্ধ-পরবর্তী ভয়াবহ অবস্থা, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন, দুর্ভিক্ষসহ বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।
স্বাধীনতা পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ছোটগল্প ও গল্পকার
১. আল মাহমুদ
আল মাহমুদের ছোটগল্পের ভাষা কাব্যিক, যৌনতা-আশ্রিত ও প্রেমপ্লাবিত। তাঁর ছোটগল্পে জীবন ও সংস্কৃতির বিচিত্র রূপ প্রতীয়মান হয়েছে। প্রেম ও রোমান্সের সঙ্গে তিনি সংস্কৃতি মিশিয়ে এক অভিনব গল্পমালা সৃষ্টি করেন। ব্যক্তির ভেতরের প্রতীকী গল্পবয়ান এবং এসব গল্পের উপস্থাপন অত্যন্ত মায়াবী। তাঁর গল্পগুলো হলো:
- পানকৌড়ির রক্ত
- সৌরভের কাছে পরাজিত
- প্রেমের গল্প
- ময়ূরী মুখ
- গন্ধবণিক
- আল-মাহমুদের গল্প (গল্পগ্রন্থ), প্রভৃতি।
২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক ও গল্পকার আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। স্বাধীনতা-পরবর্তী তাঁর ছোটগল্পগুলো বাংলা সাহিত্যে অনন্য স্থান দখল করে আছে। যুদ্ধ-পরবর্তী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর গল্পে উঠে এসেছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্পে মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা তিনি নতুন মাত্রায় তাঁর গল্পে উদ্ভাসিত করেছেন। ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্ধত্ব ও গোড়ামিকে উপেক্ষা করে তিনি যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে গল্প নির্মাণ করেছেন। তাঁর গল্পে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ, সামরিক শাসন, শ্রেণিশোষণ ও ব্যক্তিমানুষের সংকট উঠে এসেছে। তাঁর লেখালেখি ষাটের দশকে একমুখী বা আবদ্ধ ছিল, কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তা বহুমুখী হয়ে ওঠে। তাঁর গল্পে তিনি হাস্যরস ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে মধ্যবিত্তের নষ্ট স্বপ্ন তুলে ধরেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- অন্য ঘরে, অন্য স্বর
- দুধভাতে উৎপাত
- খোঁয়ারি
- দোজখের ওম
- জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল
৩. জুলফিকার মতিন
স্বাধীনতা-পরবর্তী অন্যতম গল্পকার হলেন জুলফিকার মতিন। তাঁর গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারমুক্ত যুক্তি ও চিন্তার শানিত প্রকাশ ঘটেছে। সমাজের প্রতি দায়বোধ থেকে তিনি গল্পের শরীরকে সমকালের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ, সমাজ-নস্টালজিয়া, সমাজজীবনের অঙ্গীকার, প্রেম, রোমান্টিকতা ইত্যাদি তাঁর গল্পে প্রকাশ পেয়েছে। সামাজিক বিভিন্ন অসঙ্গতি তিনি তাঁর গল্পে তুলে ধরেছেন। এছাড়াও সমকালীন বাস্তবতা জুলফিকার মতিনের গল্পে উঠে এসেছে। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- রাখো তোমার উদ্যত বাহু
- অন্যরকম
- আকাশ বাসর
- পাগল হওয়ার রূপকথা
- মুক্তিযুদ্ধের গল্প
৪. সেলিনা হোসেন
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের অন্যতম গল্পকার হলেন সেলিনা হোসেন। তাঁর গল্পে নারী অধিকারের কথা ব্যক্ত হয়েছে। তৎকালীন পুরুষশাসিত সমাজে নারীদের অনেকটা দাস হিসেবে রাখা হতো। তাদের নিজস্ব অধিকার ছিল না। সেলিনা হোসেন তাঁর গল্পে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন। ‘আমিনা ও মদিনার গল্প’-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর ধর্ষণের চিত্র তুলে ধরেছেন। এখানে নারীদের কীভাবে নির্যাতন ও ভোগের শিকার হতে হয়েছে এবং তাদের অধিকারহীনতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। নারীকে কেন্দ্র করে তাঁর আরেকটি অন্যতম বিখ্যাত গল্প ‘মতিজানের মেয়েরা’। এই গল্পে তিনি নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- মতিজানের মেয়েরা
- উৎস থেকে নিরন্তর
- জলবতী মেঘের বাতাস
- খোল করতাল
- পরজন্ম
- মানুষটি
- নির্বাচিত গল্প
- মুক্তিযুদ্ধের গল্প
- সখিনার চন্দ্রকলা
- একালের পান্তাবুড়ি
- অবেলার দিনক্ষণ
- নারীর রূপকথা
৫. কায়েস আহমেদ
কায়েস আহমেদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা অন্যান্য লেখকদের থেকে আলাদা। তাঁর গল্পে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। যুদ্ধ-পরবর্তী অরাজকতা, হত্যা, ধর্ষণ, কালোবাজারি, চোরাচালান ইত্যাদি বিষয় তাঁর গল্পে উঠে এসেছে। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- অন্ধতীরন্দাজ
- লাশ কাটা ঘর
৬. শাহরিয়ার কবির
শাহরিয়ার কবির বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গল্পে প্রধানত রাজনৈতিক বিষয় ফুটে উঠেছে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ গল্পে তুলে ধরেছেন। তিনি মূলত শোষণহীন সমাজের প্রত্যাশী ছিলেন। সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি সাহিত্যচর্চা করেছিলেন। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিলেন। এছাড়াও তাঁর গল্প মধ্যবিত্ত শ্রেণিকেন্দ্রিক। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগুলো হলো:
- একাত্তরের যীশু
- মহাবিপদ সংকেত
- জনৈক প্রতারকের কাহিনী
৭. মঞ্জু সরকার
স্বাধীনতা-পরবর্তী অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে সাহিত্যচর্চা করেছেন মঞ্জু সরকার। তাঁর গল্পের প্রধান উপজীব্য নিম্নবিত্ত শ্রেণির জীবনাচরণ। নিম্নবিত্ত শ্রেণির সুখ-দুঃখ, বিরহ-বেদনা, আনন্দ ও সংস্কৃতিকে তিনি গল্পে রূপ দিয়েছেন। মাটি ও শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি নিম্নবিত্ত ও গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতিকে গল্পের মূল উপজীব্য করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- অবিনাশী আয়োজন
- মৃত্যুবান
- আনন্দযাত্রা
- উচ্ছেদ উচ্ছেদ খেলা
- পুরাতন প্রেম ও অন্যান্য গল্প
৮. নাসরিন জাহান
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গল্পকার নাসরিন জাহান। তাঁর লেখা কুসংস্কারমুক্ত এবং আধুনিকতায় সমুজ্জ্বল। তিনি সমাজে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গল্প লিখেছেন। তাঁর লেখার ভাষা ও বর্ণনার গুণ অসাধারণ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- বিচূর্ণ ছায়া
- পথ, হে পথ
- আশ্চর্য দেবশিশু
- সারারাত বিড়ালের শব্দ
- পুরুষ রাজকুমারী
- এলেন পোর বিড়াল
৯. রবীন্দ্র গোপ
রবীন্দ্র গোপের গল্প কিছুটা কাব্যধর্মী। তাঁর গল্পে মনোজগতের অতল রহস্য উদ্ভাসিত হয়েছে। মানুষের ভেতরকার কথাগুলো তাঁর গল্পে উঠে এসেছে। স্বদেশপ্রেম ও দেশপ্রেম তাঁর গল্পে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পও লিখেছেন। তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো হলো:
- রোদহীন বসতি
- পরানের স্বাধীনতা
- স্বপ্ন ও চাঁদের কঙ্কাল
- মুক্তিযুদ্ধের গল্প
- যুদ্ধজয়ের গল্প
FAQ
১. স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা ছোটগল্পের প্রধান বিষয় কী?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধ-পরবর্তী আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট, শ্রেণিবৈষম্য, নারী অধিকার এবং প্রান্তিক মানুষের জীবন।
২. আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোটগল্পে কোন শ্রেণির মানুষের জীবন বেশি উঠে এসেছে?
উত্তর: তাঁর ছোটগল্পে প্রধানত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সুখ-দুঃখ, সংকট ও স্বপ্ন উঠে এসেছে।
৩. সেলিনা হোসেনের গল্পের অন্যতম প্রধান বিষয় কী?
উত্তর: নারী অধিকার, নারীর প্রতি নির্যাতন এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তাঁর গল্পের অন্যতম প্রধান বিষয়।
৪. মঞ্জু সরকারের গল্পের প্রধান উপজীব্য কী?
উত্তর: নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক মানুষের জীবন, জীবনাচরণ, সুখ-দুঃখ এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি তাঁর গল্পের প্রধান উপজীব্য।
৫. রবীন্দ্র গোপের গল্পের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: তাঁর গল্প কাব্যধর্মী এবং এতে মানুষের মনোজগতের রহস্য, স্বদেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয় উঠে এসেছে।
আরো পড়ুন
- বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ: ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও ক্রমবিকাশ
- তিরিশের দশকের কবি ও কবিতার প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস মনে রাখার কৌশল, গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের তালিকা
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা, বিখ্যাত কবি ও কবিতার তালিকা
- ষাটের দশকের কবি ও কবিতা এবং স্যাড জেনারেশন
- সাময়িক পত্র: বাংলা গদ্যের বিকাশে সাময়িক পত্র-পত্রিকার অবদান
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
