বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা সাহিত্যকে সবদিক থেকেই সমৃদ্ধ করেছেন। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তাঁর পদচারণা পড়েনি। তিনি একাধারে উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গান ইত্যাদি রচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, গীতিকার ও সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা, মানবপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের চর্চা করেছেন। তাঁরই প্রতিফলন ঘটেছে ‘গোরা’ উপন্যাসে। এই আর্টিকেলে গোরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা আলোচনা করা হল।

গোরা উপন্যাসের বিষয়বস্তু
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’। এটি প্রকাশিত হয় ১৯১০ সালে। এই উপন্যাসে ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং জাতপ্রথার ঊর্ধ্বে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘গোরা’ উপন্যাসে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের চিত্র দেখানো হয়েছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের পটভূমিতে উপন্যাসটি রচিত হয়েছে। এ সময় উচ্চবিত্ত শ্রেণির মধ্যে গোঁড়া রক্ষণশীলতা ও জাতিপ্রথার গভীর প্রভাব দেখা গিয়েছিল। এজন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জাতিপ্রথার ঊর্ধ্বে উঠে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করেছেন এই উপন্যাসে। এই উপন্যাস সম্পর্কে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন,
“গোরা উপন্যাসটির কেবল একটি চরিত্র নয় এটি একটি আদর্শের প্রতিবিম্ব। রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে একটি বিশাল সামাজিক প্রেক্ষাপট কে সামনে রেখে মানবতা ও সত্যের এক চিরন্তন আদর্শকে তুলে ধরেছেন।” (বঙ্গসাহিত্যের উপন্যাসের ধারা, শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র গোরা। সে এক আইরিশ দম্পতির পুত্র। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের সময় আইরিশ দম্পতি অসহায়ভাবে মারা গেলে গোরাকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ গৃহিণী আনন্দময়ী। গোরা ব্রাহ্মণ পরিবারে বড় হওয়ার কারণে তার মধ্যে গভীর রক্ষণশীলতা দেখা দেয়। সে হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠান গভীরভাবে পালন করে এবং জাতিপ্রথাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। কিন্তু তার বন্ধু বিনয় এদিক থেকে মানবিক। সে জাতিপ্রথাকে এতটা গুরুত্ব দেয় না। বিনয় মানবতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
বিনয় পরেশবাবুর বাড়িতে যাওয়া-আসা করলে গোরা তা সহ্য করতে পারে না, কারণ তার ধারণা, এতে জাত যাবে। গোরার মধ্যে প্রবল জাতিভেদপ্রথার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বিনয় যখন পরেশবাবুর বাড়িতে যায়, তখন গোরা তা সহ্য করতে পারে না। তাই সে আনন্দময়ীর হাতে বিনয়কে খেতে দিতেও চায় না। এখানে দেখা যায়, গোরা বন্ধুত্বের চেয়ে জাতপ্রথাকে বড় করে দেখছে। এমনকি জাতপ্রথা লঙ্ঘনের কারণে সে তার নিজের বন্ধুকেও মায়ের হাতে খেতে দিতে চায় না। এর মাধ্যমে গোরার ব্রাহ্মণ্যধর্মের আচার-নিষ্ঠা গভীরভাবে পালন করার দিকটি প্রকাশ পায়।
গোরা উপন্যাসের সবচেয়ে ভিন্নধর্মী চরিত্র আনন্দময়ী। তিনি ব্রাহ্মণ নারী হলেও জাতপ্রথাকে গুরুত্ব দেন না। তিনি একসময় জাতপ্রথা মানতেন, কিন্তু গোরাকে কোলে তুলে নেওয়ার পর থেকে তিনি জাতপ্রথাকে আর এতটা গুরুত্ব দেন না। তাঁর মধ্যে আমরা বিশ্বমানবতার রূপ দেখতে পাই। এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ আনন্দময়ীর মাধ্যমে বিশ্বমানবতার জয় তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ আনন্দময়ীর মাধ্যমে বিশ্বপ্রেম ও মানবপ্রেমের স্বরূপ তুলে ধরেছেন। তিনি আনন্দময়ীর মাধ্যমে পৃথিবী থেকে সব ধরনের সাম্প্রদায়িকতা দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। আনন্দময়ীর মাধ্যমে তিনি এই উপন্যাসে বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন।
গোরা যখন তার আসল পরিচয় জানতে পারে, তখন তার মধ্যে থাকা সব ধরনের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক চেতনা দূর হয়ে যায়। সে তখন মানবতার কথা বলতে শুরু করে। এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতা দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তিনি গোরার মাধ্যমে জাতপ্রথার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের মধ্যে মানবতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চরিত্রটি সৃষ্টি করেছেন। গোরা যখন জানতে পারে, আনন্দময়ী হিন্দু হয়েও তার মতো একজন খ্রিস্টান শিশুকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন, তখন আনন্দময়ীর প্রতি তার ভালোবাসা শতগুণ বেড়ে যায়। এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ জাতপাতের প্রথা দূর করে ভারতবর্ষে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠার আদর্শ তুলে ধরেছেন। গোরার চরিত্রের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক চেতনার ঊর্ধ্বে মানবতার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উপন্যাসের আরেকজন অন্যতম মানবিক চরিত্র হলেন পরেশবাবু। তাঁর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাজের সকল কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছেন। পরেশবাবু যেন মানবতার প্রতিচ্ছবি। তাঁর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি পরেশবাবুর মাধ্যমে সমাজের জাতপ্রথা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। এখানে তিনি মানবতাকে সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। সমাজের কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ পরেশবাবুর চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
গোরা’ উপন্যাসের শেষের দিকে গোরার মধ্যে আমরা আত্মোপলব্ধি দেখতে পাই। সে বুঝতে পারে, ভারতবর্ষকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হলে জাতপ্রথা দূর করতে হবে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সে আত্মোপলব্ধি করে।
“আমি যা দিন রাত্রি হতে চাচ্ছিলাম অথচ হতে পারছিলুম না আজ আমি তা হয়েছি আজ আমি ভারতবর্ষীয়।” (গোরা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
এখানে আমরা গোরার মধ্যে আত্মোপলব্ধি দেখতে পাই। সে নিজের ভুল বুঝতে পারে। তাই উপলব্ধি করে, ভারতবর্ষকে এগিয়ে নিতে হলে জাতপ্রথা দূর করতে হবে এবং সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোরার মাধ্যমে মানবতা প্রতিষ্ঠা করেছেন। সে বুঝতে পারে, মানবধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম; এর ঊর্ধ্বে আর কোনো ধর্ম নেই।
রবীন্দ্রনাথ গোরার মাধ্যমে ভারতবর্ষের সকল ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িক চেতনা দূর করতে চেয়েছেন। তিনি গোরার মাধ্যমে আমাদের দেখিয়েছেন, কীভাবে জাতপ্রথা দূর করে সমাজে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করা যায়। গোরার আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে আমরা মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি। গোরা নিজের ভুল বুঝতে পারে। তাই সে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সে ভারতবর্ষ গড়তে চায়। রবীন্দ্রনাথ গোরার মাধ্যমে ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িক চেতনা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে মানবতার আদর্শ তুলে ধরেছেন। তাই ‘গোরা’ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপন্যাস। এই উপন্যাসে কুসংস্কার, অন্ধত্ব ও গোঁড়ামির পরাজয় এবং মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তাই পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘গোরা’ উপন্যাসে গোরার মাধ্যমে ভারতবর্ষের সকল সাম্প্রদায়িক চেতনা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, অন্ধত্ব ও কুসংস্কার দূর করে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করেছেন। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের সকল ধরনের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার দূর করতে তিনি গোরার মাধ্যমে মানবতার আদর্শ তুলে ধরেছেন। গোরা যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসে। গোরাকে দিয়ে তিনি সমাজের সকল অন্ধত্ব ও গোঁড়ামি দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
FAQ
১. ‘গোরা’ উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করেছেন?
গোরার আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে জাতপ্রথা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে মানবতার জয় প্রতিষ্ঠা করেছেন।
২. গোরার মধ্যে জাতপ্রথার প্রতি গভীর বিশ্বাস কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
গোরা হিন্দুধর্মের আচার-অনুষ্ঠান কঠোরভাবে পালন করত এবং জাতপ্রথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিত। এমনকি জাত যাবে এই আশঙ্কায় সে বিনয়কে আনন্দময়ীর হাতে খেতেও দিতে চাইত না।
৩. আনন্দময়ী চরিত্রের মাধ্যমে কোন চেতনা প্রকাশ পেয়েছে?
আনন্দময়ী চরিত্রের মাধ্যমে বিশ্বমানবতা, মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি জাতপ্রথার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখেছেন।
৪. গোরার আত্মোপলব্ধির ফলে তার চিন্তায় কী পরিবর্তন আসে?
নিজের প্রকৃত পরিচয় জানার পর গোরার ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িক চেতনা দূর হয়ে যায়। সে উপলব্ধি করে, জাতপ্রথার ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নিয়ে ভারতবর্ষ গড়ে তুলতে হবে।
৫. পরেশবাবুর চরিত্রে রবীন্দ্রনাথের কোন আদর্শ প্রকাশ পেয়েছে?
পরেশবাবুর চরিত্রের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ কুসংস্কার, জাতপ্রথা ও ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ তুলে ধরেছেন।
তথ্যসূত্র
- “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গোরা।”
আরো পড়ুন
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধারা ও বৈশিষ্ট্য
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা | বিস্তারিত আলোচনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ
- আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক কাব্য’র প্রেম ও বিরহ চেতনা






