Skip to main content

Study Journalx

বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত কবি জীবনানন্দ দাশ। তিরিশের দশকে যে কয়েকজন কবি বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রপ্রভাব কাটিয়ে আধুনিকতার সূচনা করেছিলেন, জীবনানন্দ দাশ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে চিত্ররূপকল্পময়তা, নৈরাশ্যবাদ, আধুনিকতা, সুরিয়ালিজম ইত্যাদি। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর পোড়া মাটিতে তিনি ফলাতে চেয়েছিলেন সোনালি ফসল। ‘বনলতা সেন’ কাব্যে আমরা জীবনানন্দ দাশের চিত্ররূপময়তার পরিচয় পাই। এই আর্টিকেলে বনলতা সেন কাব্য’র বিষয়বস্তু, প্রেম, প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা আলোচনা করা হল।

বনলতা সেন কাব্য

 

জীবনানন্দ দাশের অন্যতম একটি বিখ্যাত কাব্য ‘বনলতা সেন’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য বললেও ভুল হবে না। এই কাব্যে চিত্ররূপকল্পময়তা ও প্রকৃতির রূপ বর্ণনা দেখা যায়। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন একজন সুররিয়ালিস্ট কবি। তিনি তাঁর ‘বনলতা সেন’ কাব্যে বাস্তব জীবনের গভীর অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন এবং তাকে ব্যাখ্যা করেছেন কঠিন বাস্তবতার আলোকে, যেখানে কোনো যুক্তি-তর্কের অবস্থান নেই। এই কাব্যে তিনি অবচেতন মনকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। বাস্তবতার ঊর্ধ্বে কল্পনা বা ‘Super Reality’ তথা পরাবাস্তববাদের চিত্র অঙ্কন করেছেন। প্রকৃতির সঙ্গে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অভিনব সংমিশ্রণ ঘটেছে এই কাব্যে। এছাড়া এখানে স্থান পেয়েছে রূপজীবাদ।

জীবনানন্দ দাশ ছিলেন প্রকৃতির কবি। ফলে তিনি প্রকৃতিকে নিয়েই কবিতা লিখেছেন। গাছপালা, পশুপাখি, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রকে তিনি তাঁর এই কাব্যে স্থান দিয়েছেন। তিনি যে চিত্রকল্প অঙ্কন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। ‘বনলতা সেন’ তাঁর কাব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্য। এ কাব্য যেন অনেকগুলো ফুলে গাঁথা একটি মালা। প্রতিটি কবিতা যেন এক অরূপ সৌন্দর্যে ভরা এক একটি অমৃত-ভাণ্ডার। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় আমরা কবির চিত্রকল্পময়তার পরিচয় পাই। এখানে তাঁর উপমাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের পর”

(‘বনলতা সেন’, বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশ)

একদিকে প্রেমের আবহ, অন্যদিকে ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি; একদিকে স্যুররিয়ালিজম, অন্যদিকে মৃত্যু-চেতনা। এখানে মনে হয়, ইতিহাস বাস্তবের মতো আমাদের সামনে উঠে এসেছে পরাবাস্তববাদের মাধ্যমে। কবিতার মাধ্যমে তিনি এখানে চিত্র এঁকেছেন। জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কাব্যে একজন শিল্পী। তিনি তুলির আঁচড়ে এঁকেছেন চিত্রকল্প। তাঁর চিন্তাভাবনা ফুটে উঠেছে চিত্রের মতো। ‘বনলতা সেন’ কাব্য পড়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, “চিত্ররূপময়”, ইংরেজিতে যাকে Image বলা যায়। তিনি এই চিত্র এঁকেছেন ভাষা দিয়ে, শব্দ দিয়ে, ধ্বনি দিয়ে। এখানে তিনি ইতিহাস ও পরাবাস্তবতাকে মিশিয়ে এক অভিনব চিত্রকল্প এঁকেছেন।

এই কাব্যে রূপজীবাদের বিস্তার বর্ণনা পাওয়া যায়। বিদিশা, শ্রাবস্তী, দারুচিনি দ্বীপ, পাখির নীড় একেকটি শব্দের চিত্রকল্প। এই শব্দগুলো তিনি মালার মতো করে গেঁথেছেন। তাঁর কবিতা যেন আমাদের সামনে চিত্রকলার মতো ভেসে ওঠে। এখানে তিনি নারীর রূপ বর্ণনা করেছেন। নারীর চুল বিদিশা নগরীর অন্ধকারে তলিয়ে গেছে, আর মুখশ্রী প্রাচীন ভারতের নগরী শ্রাবস্তীর মতো। একদিকে নারীর রূপ বর্ণনা করেছেন, অপরদিকে ইতিহাস ফুটিয়ে তুলেছেন, যা সৃষ্টি করেছে চিত্ররূপকল্প। বাংলা সাহিত্যে সার্থক চিত্রকলা সৃষ্টিতে জীবনানন্দ দাশের মতো দক্ষতা আর কেউ দেখাতে পারেননি। তিনি পৃথিবীর পশুপাখি, নদী, নক্ষত্র, ঘাস, নারী, আলো ও বাতাস নিয়ে এমন মায়াময় চিত্রকলা অঙ্কন করেছেন শব্দ ‍দিয়ে, যা রূপজীবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ।

‘কুড়ি বছর পরে’ কবিতায় চিত্রকল্পময়তার আরও বিস্তৃত ধারণা পাওয়া যায়। দীর্ঘ কুড়ি বছর পরে প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার অনুভূতি, প্রকৃতির রূপ বর্ণনা এবং হৃদয়ের নিঃসঙ্গতা ব্যক্ত হয়েছে এই কবিতায়। কবিতার একেকটি শব্দ যেন একেকটি চিত্রকল্প। হলুদ নদী, কাশ-হোগলা, সন্ধ্যার কাক, ধানের ছড়া একেকটি শক্তিশালী চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এই শব্দগুলো যেন চিত্রকল্পের মতো আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। এখানে কবির চিত্রকল্পময়তার পরিচয় মেলে। তিনি এই কবিতায় শব্দ দিয়ে ছবি এঁকেছেন। একেকটি অসাধারণ উপমার ব্যবহার দেখা যায়, যা পাঠকের হৃদয়কে বিমোহিত করে।

‘হাওয়ার রাত’ কবিতায় কবি রূপ ও রঙের ছবির সঙ্গে গন্ধ, স্পর্শ, বেদনা ও অনুভূতির ছবিও তুলে ধরেছেন। তিনি এই কবিতায় অতীতের চরিত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এখানে দেখা যায়, মৃত নক্ষত্রেরা কবির কাছে প্রতিবাদী নারী রূপে উপস্থিত হয়েছে। রূপজীবাদের পাশাপাশি এখানে তাঁর প্রতিবাদী সত্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। জ্যোৎস্নারাতের ব্যাবিলনের রূপসীরা নক্ষত্র হয়ে কবির মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে। তাই অসাধারণ চিত্রের পরম্পরা গঠিত হয়েছে। যে চিত্রকল্প গঠিত হয়েছে, তা ইতিহাস ও পরাবাস্তববাদের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি শব্দের গাঁথুনি দিয়ে অসাধারণ চিত্র এঁকেছেন। তিনি ইতিহাসের আশ্রয় নিয়ে জীবন ও প্রকৃতিকে এক করে তুলেছেন। আসিরীয়, মিশর ও বিদিশার রূপসীরা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিবাদের সুরও ব্যক্ত হয়ে উঠেছে। ইতিহাস ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় তিনি এক অপরূপ চিত্রকল্প এঁকেছেন।

‘ঘাস’ কবিতায় কবি জীবন ও প্রকৃতিকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। প্রকৃতির প্রতি কবির গভীর অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। এখানে তিনি ঘাস, কচি লেবু ইত্যাদির উপমা নিয়ে এসেছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য তিনি এখানে শব্দের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এখানে কবি প্রকৃতির উপমা ব্যবহার করে এক অসাধারণ চিত্রকল্প এঁকেছেন।

‘হায় চিল’ কবিতায় কবি রূপকের আদলে চিত্রকর্ম গড়ে তুলেছেন। ভেজা মেঘের দুপুরে একটি চিল উড়ে তার বেদনার কথা প্রকাশ করেছে। চিলের কান্নার রূপকে কবির মনে তাঁর প্রিয়তমার বেতের ফলের মতো ম্লান চোখের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। এই কবিতায় কবি অসাধারণ সব চিত্র এঁকেছেন। বেতের ফল, ধানসিঁড়ি নদী, রাঙা রাজকন্যা ইত্যাদি অসাধারণ শব্দের মাধ্যমে তিনি চিত্রকল্প এঁকেছেন। তুলির আঁচড়ের মতো তিনি শব্দ দিয়ে ছবি এঁকেছেন। এখানে তিনি প্রকৃতি ও পরাবাস্তববাদকে একসঙ্গে মিলিয়ে শব্দ দিয়ে অসাধারণ চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন।

‘বনলতা সেন’ কাব্যের সবগুলো কবিতায় তিনি চিত্রকল্পের চমৎকার ব্যবহার করেছেন, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল। কাব্যের প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি চিত্রকল্প। জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কাব্যে ছন্দ ও অলংকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। অসাধারণ দক্ষতায় তিনি এই কাব্যে ছন্দ ও অলংকার প্রয়োগ করেছেন। কবি জীবনানন্দ দাশ ‘বনলতা সেন’ কাব্যে প্রকৃতি, ইতিহাস ও পরাবাস্তবতা বা Super Reality-কে মিশিয়ে এক অসাধারণ চিত্রকল্প এঁকেছেন। এই চিত্রকল্প রং-তুলি দিয়ে নয়, কবির শিল্পীমনের সৃষ্ট এক শাব্দিক বা কথার চিত্র। এই চিত্র মানুষের অন্তরকে নাড়া দিয়ে যায়, যা বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল।

 

 

FAQ

১. বনলতা সেন’ কাব্যে চিত্রকল্পময়তার বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: প্রকৃতি, ইতিহাস, প্রেম ও পরাবাস্তবতার সমন্বয়ে অসাধারণ চিত্রকল্প সৃষ্টি করা হয়েছে।

২. জীবনানন্দ দাশ কীভাবে শব্দের মাধ্যমে চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন?
উত্তর: উপমা, রূপক ও শব্দের নান্দনিক ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি শব্দ দিয়ে ছবির মতো দৃশ্য এঁকেছেন।

৩. ‘বনলতা সেন’ কাব্যে প্রকৃতি ও ইতিহাসের সমন্বয় কীভাবে ঘটেছে?
উত্তর: প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের সঙ্গে বিদিশা, শ্রাবস্তী, ব্যাবিলন ও অন্যান্য ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ যুক্ত করে সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।

৪. ‘কুড়ি বছর পরে’ ও ‘হায় চিল’ কবিতায় চিত্রকল্প কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, প্রেম ও বেদনার অনুভূতিকে শক্তিশালী শব্দ ও উপমার মাধ্যমে চিত্রকল্পে রূপ দেওয়া হয়েছে।

৫. ‘বনলতা সেন’ কাব্যে পরাবাস্তববাদের ভূমিকা কী?
উত্তর: বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনা ও অবচেতন অনুভূতির মিশ্রণে পরাবাস্তব আবহ তৈরি করে চিত্রকল্পকে গভীরতা দেওয়া হয়েছে।

 

 

আরো পড়ুন