পথের পাঁচালী উপন্যাসের বিষয়বস্তু, প্রকৃতি চেতনা ও চরিত্র বিশ্লেষণ

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম প্রখ্যাত ব্যক্তিত্ব বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর আগমন ছিল বিস্ময়কর। প্রকৃতির রূপ বর্ণনায় তিনি অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। তাঁকে প্রকৃতির কবি বললেও ভুল হয় না। তাঁর সাহিত্য সামগ্রিকভাবে পল্লী কেন্দ্রিক। গল্প ও উপন্যাস সব ক্ষেত্রেই গ্রামের মানুষের প্রাধান্য বেশি। তিনি মানব মনের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বর্ণনায় অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন। চরিত্র চিত্রণে তিনি সাধারণ গ্রাম্য, দরিদ্র বা স্বল্পবিদ্যা, নিরীহ, ধর্মভীরু, সরলপ্রাণ মানুষদের প্রাধান্য দিয়েছেন। পল্লী জীবনের তুচ্ছ হাসি কান্নাকেও তিনি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত করেছেন। তার রচনা গঠন, ঘটনা বিন্যাস, বর্ণনার কৌশল ও রচনার নিপুণতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এই আর্টিকেলে পথের পাঁচালী উপন্যাসের বিষয়বস্তু, প্রকৃতি চেতনা, চরিত্র বিশ্লেষণ নিয়ে আলোচনা করা হল।

 

পথের পাঁচালী উপন্যাসের বিষয়বস্তু

পথের পাঁচালী উপন্যাসের বিষয়বস্তু

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি উপন্যাস ‘পথের পাঁচালী’। যদিও এর থেকে ‘আরণ্যক’ আরো উচ্চমানের, তবুও ‘পথের পাঁচালী’ কোন অংশে কম নয়। ‘পথের পাঁচালী’ তিনটি পর্বে বিভক্ত- ‘বল্লালী বালাই’, ‘আম আঁটির ভেঁপু’ ও ‘অক্রূর সংবাদ’। উপন্যাসের প্রথম ছয়টি পরিচ্ছেদ নিয়ে ‘বল্লালী বালাই’ পর্বটি গড়ে উঠেছে। ভারতবর্ষে রাজা বল্লাল সেন কৌলীন্য প্রথার প্রচলন করেন। তার নাম অনুসারে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বল্লালী বালাই’ নামকরণ করেছেন।

একজন কুলীন পঞ্চাশ, ষাট এমনকি একশোরও বেশি বিয়ে করতেন। এবং সেই সব স্ত্রীদের বাড়িতে একবার বা দুইবার গিয়ে তাদের থেকে অনেক অর্থ সম্পদ নিয়ে চলে আসতেন। আর কখনো তাদের খোঁজ নিতেন না। সারা জীবন তারা বাপের বাড়িতে জীবন পার করতেন। পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাদের দুর্দশা দেখার মত আর কেউ থাকত না। এই গল্পের ইন্দির ঠাকরুন তেমনই কোন এক কুলীনের পত্নী। এজন্য বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই কৌলীন্য প্রথাকে নির্দেশ করে এই পর্বের নাম রাখেন ‘বল্লালী বালাই’।

 

‘আম আঁটি ভেঁপু’ পর্বের নামকরণ করা হয় আম খেয়ে তার আঁটি ফেলে রাখলে শুকিয়ে যায় এবং তখন সেটা খোসা টেনে খুলে শক্ত কিছুতে ঘষে এক ধরনের বাঁশি বানানো হয়। পল্লী বালকের সরল আনন্দের প্রতীক রূপে তিনি এই নামটি ব্যবহার করেছেন। এই পর্ব সপ্তম থেকে বাইশ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত বিস্তৃত। এর মধ্যে অপুর চেতনার বিকাশ ও বিবর্তনের ইতিহাস দেখা যায়। নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের সঙ্গে অপুর আত্মার সম্পর্ক গড়ে ওঠে এই পর্বে। এই পর্ব শেষে তাদেরকে নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে চলে যেতে হয়।

 

শ্রীকৃষ্ণের জেঠার নাম অক্রূর। মথুরায় যখন কংসের দুঃশাসন বেড়ে যায়, তখন কংস নিধনের জন্য শ্রীকৃষ্ণকে বৃন্দাবন থেকে নিয়ে আসার জন্য অক্রূরকে পাঠানো হয়। অক্রূর রথে বৃন্দাবন ছেড়ে কৃষ্ণ মথুরায় আসে। তার বাল্যলীলার অবসান ঘটিয়ে মথুরায় আসার সাথে মিল রেখে এই পর্বের নাম রাখা হয় অক্রূর সংবাদ। এ পর্বে অপুর বাল্যলীলার অবসান ঘটে এবং সম্পূর্ণ একটি নতুন শহরে তার জীবন কাটতে থাকে।

 

বাংলা সাহিত্যের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস পথের পাঁচালী। এই উপন্যাসে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় পল্লী বালক-বালিকার গল্প এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যা পাঠকের হৃদয়কে স্পর্শ করে। অতি সাধারণ গ্রামের বালক-বালিকার শৈশব তিনি মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সাধারণ পল্লী জীবন ও পল্লী প্রকৃতি এক আশ্চর্য উদ্ভাসে মায়াময় হয়ে উঠেছে। একটি সাধারণ গ্রামকে সৌন্দর্যের মায়াপুরীতে পরিণত করেছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনার শক্তি। এই সাধারণ প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে অসাধারণ কিছু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই বলেছেন,

 

“পথের পাঁচালীর আখ্যানটা অত্যন্ত দেশি। কিন্তু কাছের জিনিসেরও অনেক পরিচয় বাকি থাকে।”

 

এই উপন্যাসে দুই পল্লী বালক-বালিকার প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অপু ও দুর্গা যেন প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতি তাদেরকে নিজের মতো করে মানুষ করেছে। প্রকৃতির সাথে তারা অবলীলায় মিশে গেছে। গাছপালা, বাগান, নদী, নালা, পুকুর সবকিছুই যেন তাদের অতি পরিচিত জীবন। অপু এই প্রকৃতি দেখে বিস্মিত হয়। তার বালক হৃদয়ে বিস্ময় জাগে। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তুকে তাই বলা যায় আমাদের সকলেরই সমষ্টিগত শৈশব। কারণ আমাদের সকলের শৈশব কেটেছে এমনই প্রকৃতির মধ্যে। দুঃখ, হাসি, কান্না, অভিমান, আনন্দ সবকিছুই এই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

 

পথের পাঁচালী উপন্যাসে ভারতীয় গ্রামীণ জীবন অত্যন্ত বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে, যেখানে আমাদের চেনা জীবন বারবার হাতছানি দিয়েছে। Ernest Bender-এর মতে,

 

“পথের পাঁচালীর বিষয়বস্তু হল শিশুর চোখে দেখা ভারতীয় পল্লী জীবন।”

 

ভারতীয় গ্রামীণ পল্লী সমাজের পূর্ণাঙ্গ চিত্র এই উপন্যাসে পাওয়া যায়। গ্রামীণ জীবনের নর-নারীর জীবন, শিশুর বেড়ে ওঠা সবকিছুই বাস্তবসম্মতভাবে ফুটে উঠেছে। হরিহর ছিল ভবঘুরে মানুষ। সংসারের প্রতি সে ছিল উদাসীন। সর্বজয়া আমাদের বাঙালি নারীর বাস্তব উদাহরণ। চিরপরিচিত বাঙালি মায়ের রূপ সর্বজয়া চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। কঠিন সময়েও সংসারকে আগলে রাখার চেষ্টা, সন্তানের প্রতি মমতা সবকিছু তার মধ্যে দেখা যায়। সংসারের শত অভাব-অনটনের মধ্যে সবকিছু আগলে রাখার চেষ্টা দেখা গেছে।

 

উপন্যাসে অপু ও দুর্গার শৈশব এবং তাদের বেড়ে ওঠার দৃশ্য দেখা যায়। দুই শিশুর সরল অনুভূতি বিভূতিভূষণ নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অসহায় ইন্দির ঠাকরুনের প্রতি দুর্গার মায়া কাজ করে। সর্বজয়া যখন ইন্দির ঠাকরুনের উপর অমানবিক আচরণ করে, তখন দুর্গার খুবই মায়া হয়। সে বাড়ি থেকে চলে গেলেও দুর্গা তাকে বারবার আটকানোর চেষ্টা করে। শিশু মনের এই মানবিকতা বিভূতিভূষণ অতি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

 

ভাই-বোনের মধ্যে গভীর ভালোবাসা দেখা গেছে। অপু ও দুর্গা দুজনে মারামারি করলেও তাদের মধ্যে গভীর ভালোবাসা ছিল। দুর্গা ছিল খুবই দুরন্ত প্রকৃতির মেয়ে। সে বনে জঙ্গলে প্রকৃতির মধ্যে ঘুরে বেড়াতো। ক্ষুধা লাগলে প্রকৃতি তাকে খাবার দিতো। প্রকৃতি তাকে আপন করে নিয়েছিল। সে আপন হাতে প্রকৃতির সাথে অপুর পরিচয় করিয়ে দেয়। অপু দুর্গার সাথে যেন প্রকৃতির সন্তান হয়ে গিয়েছিল। তারা সর্বদা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো, বিভিন্ন ফল-মূল সংগ্রহ করে খেত।

 

প্রকৃতির মধ্যেই তাদের জীবন বেড়ে উঠেছে, যা আমাদের সকলেরই শৈশবের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দুর্গার মৃত্যুতে অপু খুবই কষ্ট পায়। তার ইচ্ছা ছিল, দিদি সুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিয়ে রেললাইন দেখতে যাবে। কিন্তু তার সেই আশা আর পূরণ হয়নি। দুর্গার মৃত্যুতে সে খুবই ভেঙে পড়েছিল। একা হয়ে যায় অপু। দুর্গার মৃত্যুর পর হরিহর ও সর্বজয়া অপুকে নিয়ে নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। এখানেই ছিল অপুর বেড়ে ওঠা শৈশব এবং শৈশবের মধুময় স্মৃতি। এরই মাধ্যমে শেষ হয় আম আঁটির ভেঁপু পর্ব।

 

অক্রূর সংবাদ পর্বে তারা নতুন এক শহরে জীবনযাপন শুরু করে। চিরপরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরে অপুর মানিয়ে নিতে অনেক কষ্ট হয়। এসে সে নতুন স্কুলে ভর্তি হয়। সময় কাটছিল ভালোই, কিন্তু এ সময় তার বাবার মৃত্যুর কারণে তার জীবনে করুন পরিণতি নেমে আসে। বাবার মৃত্যুতে সে খুবই শোকগ্রস্ত হয়ে যায়। পরিবারে একমাত্র আয়ের উৎস ছিল তার পিতা। পিতার মৃত্যুতে তাদের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়।

 

সংসারের ভার কাঁধে নিয়ে সর্বজয়া শহর ছেড়ে দূরে এক জমিদারের বাড়িতে গৃহস্থের কাজ নেয়। অপু সেখানে স্কুলে ভর্তি হয়। গরিব হলেও একসময় সর্বজয়ার উপরে কেউ হুকুম করতে পারত না, আজ সেই সর্বজয়াকে মানুষের বাড়িতে কাজ করতে হচ্ছে। এখানেই অপুর দেখা হয় লীলার সাথে, যে অপুর জীবনের একমাত্র প্রেমময়ী নারী ছিল। এভাবে শৈশব থেকে বেড়ে ওঠা অপুর জীবনের সমস্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে “পথের পাঁচালী” উপন্যাসে।

 

“পথের পাঁচালী” উপন্যাসটি যাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে, সে অপু। এই উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র অপুর। বাংলার প্রতিটি গ্রামে ঘুরলে হয়তো অপুর মতো শিশু পাওয়া যাবে। সে যেন আমাদের ছেলেবেলার প্রতিচ্ছবি। চাল ভাজা ও পানসে পায়েস খেয়ে অবাধ আনন্দ পাওয়া, বাবার অনুপস্থিতিতে লেখা পড়া ছেড়ে গুলি খেলতে বেরিয়ে যায়, সামান্য খাদ্য বা বুনো ফল বলে প্রতি লোভ তাকে অতি সাধারণ বালক হিসেবে তৈরি করেছে। কিন্তু তাকে অসাধারণ করে তুলেছে তার কল্পনাপ্রবণ দৃষ্টি। সে যাত্রা দেখতে দেখতে যাত্রার মধ্যে হারিয়ে যায়, সান্ন্যাল মহাশয়ের দেশ ভ্রমণের গল্প শুনে সে দেশন্তরী হয় কল্পনায়, সর্বদর্শন সংগ্রহ পড়তে পড়তে মনে মনে ভরা শকুনের ডিম মুখে পুরে আকাশে উড়ে বেড়ায়।

 

নিশ্চিন্দিপুর গ্রামকে সে খুবই ভালোবাসত। এই গ্রামের প্রকৃতি, গাছপালা, নদী, নালা সবকিছুকেই তার ভীষণ আপন মনে হত। এই প্রকৃতির মধ্যেই তার জীবন ও বেড়ে ওঠা। তার মধ্যে দুইটি সত্তা কাজ করত: একটি হচ্ছে শিকড়ের প্রতি টান, অন্যটি বহির্জগতের প্রতি টান। এজন্য সে যাত্রা দলে যোগ দিয়ে দেশান্তরী হয়ে যেতে চাইত। ‘মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত‘ ও ‘রাজপুত জীবন সন্ধ্যা’ পড়তে পড়তে তার মন চলে যেত রাজপুতানার মরুপর্বতে, দিল্লির আগ্রার রঙমহালে, শিসমহালে। তার মধ্যে বিস্ময়বোধ কাজ করত। সে কল্পনা বিলাসী মনোভাবের ছিল। উপন্যাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র অপুর। যার মধ্যে আমরা আমাদের শৈশবের স্মৃতি খুঁজে পাই।

 

পথের পাঁচালী উপন্যাসের সবচেয়ে দুরন্ত চরিত্র দুর্গার। যে সর্বদা বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো, বিভিন্ন গাছের ফলমূল বেড়ে খেত। প্রকৃতিকে সে আপন করে নিয়েছিল। আপন হাতেই অপুকে প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। আর হাত ধরেই অপু সৌন্দর্য জগতে প্রবেশ করেছিল। সে খুবই দুরন্ত ছিল। মায়ের হাতে একবেলা মার না খেয়ে তার দিন কাটে না। পরের বাগানের ফল পাকুর, এমনকি পরের ঘরের সোনা চুরি করতেও তার এতটুকু বাঁধে না; অথচ সেই দুর্গা ছিল মানবতার অন্তহীন প্রতীক। ইন্দির ঠাকরুনের প্রতি তার ভালোবাসা ও দয়ার কোনো সীমা ছিল না। অপুকে সে খুবই ভালোবাসতো। যেসব ফল পাকুর নিয়ে আসতো, অপুকে না দিয়ে খেত না। এই উপন্যাসে আমাদের সকলেরই মন জয় করে নিয়েছে দুর্গা।

 

পঁচাত্তর বছর বয়সী বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকরুন নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের একমাত্র অতীত ইতিহাসের সাক্ষী। অবহেলা যেন তার নিত্যদিনের সঙ্গী। কৌলীন্য প্রথার বলী হয়ে হরিহরের ঘাড়ের বোঝা হয়েছে সে। ইন্দির ঠাকরুন যে হরিহরকে এত ভালোবাসত, সেই হরিহরের বউ সর্বজয়া তাকে দুচোখে দেখতে পারেনা। সর্বজয়া সব সময় তাকে গালমন্দ করত। কষ্ট ছাড়া জীবনে যে তার আর কিছু পাওয়ার ছিল, সেটা সে একবারে ভুলেই গেছিল। কিন্তু তার এই দুঃখের মাঝে একমাত্র সুখ ও সান্তনার জায়গা ছিল ভাইজি দুর্গা। পিসি ও ভাইজির মধ্যে এই মধুর ভালোবাসা সম্পর্ক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিখুঁতভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন।

 

পথের পাঁচালী উপন্যাসে সর্বজয়া যেন আমাদের সকলেরই মা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সংসারে সবসময় অভাব-অনটন লেগেই ছিল। সংসারের প্রতি উদাসীন ছিল হরিহর। সর্বজয়াকে সবকিছু একাই সামলাতে হয়েছিল। কিন্তু এই দুঃখ ও অভাব-অনটন অপু দুর্গাকে স্পর্শ করতে দেয়নি সর্বজয়া। সে যেন নিজে ঢাল হিসেবে সবকিছু প্রতিহত করেছেন। সে মহীয়সী নারী নয়; তার মধ্যে দোষ-গুণ ছিল। সে ইন্দির ঠাকরুনের প্রতি অবিচার করেছে, ছেলে-মেয়ে ফলমূল চুরি করে নিয়ে আসলে তাদেরকে তিরস্কার করেনি। তার চরিত্রে দোষ-গুণ ছিল, কিন্তু মাতৃত্বের মহিমা তাকে অমর করেছে এই উপন্যাসে।

 

হরিহর ভবঘুরে এবং সংসার বিমুখ মানুষ। সংসারের প্রতি তার অনীহা ছিল। এমনকি সে বিয়ের পরেও দশ বছর নিরুদ্দেশ ছিল। মেয়ে দুর্গার মৃত্যুর সংবাদও সে পায়নি। সংসারে অভাব ঘোচাতে সর্বজয়াকে অনেক কষ্ট করেছে, কিন্তু হরিহর সংসারের প্রতি বিমুখ ছিল; সে ভাবত কিছু একটা হয়ে যাবে।

 

“এইবার ঠিক কিছু একটা হয়ে যাবে, শীঘ্রই সুদিনের মুখ দেখতে পাবো।” (পথের পাঁচালী, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়)

 

সে আশাবাদী ছিল, কিন্তু সংসারের প্রতি তার অনিহা ছিল। এজন্য কাশিতে চরম অর্থ সংকটে তার জীবন অবসান ঘটে।

 

পরিশেষে বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী ও অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস পথের পাঁচালী। এই উপন্যাসে পল্লী প্রকৃতির এক সাধারণ জীবনের কাহিনী মহৎ ব্যাঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অপু দুর্গার ছেলেবেলা বেড়ে ওঠা যেন আমাদের শৈশবকেই মনে করিয়ে দেয়।

 

 

FAQ

১. পথের পাঁচালী উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু কী?
উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু হলো গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রাম, শৈশব, প্রকৃতি ও সুখ-দুঃখের বাস্তব চিত্র।

২. পথের পাঁচালী উপন্যাসে শৈশবের চিত্র কীভাবে ফুটে উঠেছে?
দুর্গা ও অপুর আনন্দ, কৌতূহল, প্রকৃতিপ্রেম এবং নতুন কিছু দেখার আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে শৈশবের সুন্দর চিত্র ফুটে উঠেছে।

৩. পথের পাঁচালী উপন্যাসে প্রকৃতির ভূমিকা কী?
প্রকৃতি উপন্যাসের চরিত্রগুলোর জীবন ও অনুভূতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এবং গ্রামীণ পরিবেশকে জীবন্ত করে তুলেছে।

৪. পথের পাঁচালী উপন্যাসে দারিদ্র্যের প্রভাব কী ছিল?
দারিদ্র্য রায় পরিবারের জীবনে অভাব, কষ্ট ও নানা সংকট সৃষ্টি করলেও তাদের পারিবারিক সম্পর্ক ও জীবনসংগ্রামকে আরও বাস্তব করে তুলেছে।

৫. পথের পাঁচালী উপন্যাসের প্রধান বার্তা কী?
জীবনে দুঃখ, কষ্ট ও বিচ্ছেদ থাকলেও মানুষ নতুন আশা ও স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, এটিই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান বার্তা।

 

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120