Skip to main content

Study Journalx

বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই তাঁর পদচারণা পড়েছে, বিশেষ করে কাব্যে। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় বাংলা কাব্যসাহিত্য পূর্ণতা অর্জন করেছে। ‘সোনার তরী’ কাব্য তাঁর অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাব্য। এই কাব্যে কবির সৌন্দর্যচেতনা ও প্রকৃতিপ্রেমের স্বরূপ ফুটে উঠেছে। ‘মানসী’র পরে ‘সোনার তরী’তে এসে কবি এক অভিনব চেতনা অনুভব করলেন। জীবনকে তিনি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলেন। কবি প্রকৃতির মধ্যে কল্পলোকের আলোকছটার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে তাঁর ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন ‘সোনার তরী’ কাব্যে। এই আটিকেলে সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম এবং বিষয়বস্তু আলোচনা করা হল।

সোনার তরী কাব্য

 

সোনার তরী’ কাব্যের কবিতাগুলোর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দুই ধারার কবিতা বেছে নেন। এক ধারায় জগৎ ও জীবন, সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলনপূর্ণ ভালোবাসা প্রকাশ করলেন, অন্য ধারায় সৌন্দর্যের প্রতি নিরুদ্দেশ যাত্রা। দুটি বিপরীতমুখী প্রেরণা রবীন্দ্রনাথের কবিমানসে সর্বদা ক্রিয়াশীল ছিল। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরীকে একখানি পত্রে লিখেছিলেন,

“আমি সত্যি সত্যি বুঝতে পারিনে আমার মনে সুখ-দুঃখ বিরহ-মিলনপূর্ণ ভালোবাসা প্রবল, না সৌন্দর্যের নিরুদ্দেশ আকাঙ্ক্ষা প্রবল।” (‘সোনার তরী’ কাব্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভূমিকা অংশ, পৃ. ১৪)

 

‘সন্ধ্যাসংগীত’ থেকে রবীন্দ্রনাথের কাব্যের যে ধারা শুরু হয়েছিল, তাকে বলা হয় রোমান্টিক পর্ব। রবীন্দ্রনাথের কাব্যমন মূলত রোমান্টিক। ওয়ার্ডসওয়ার্থ, শেলি, কীটস প্রমুখ কবিদের সঙ্গে তাঁর সহমর্মিতা। সৌন্দর্য, ব্যাকুলতা, প্রকৃতিপ্রেম, অতীতের প্রতি আকর্ষণ প্রভৃতি রোমান্টিকতার লক্ষণ তাঁর কবিতায় স্পষ্ট। এর মধ্যে সৌন্দর্যবাসনার তীব্রতাই রোমান্টিক স্বভাবের বড় লক্ষণ। ‘সোনার তরী’ এই অর্থে পূর্ণতায় প্রতিষ্ঠিত।

‘সোনার তরী’ কাব্য প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথের কবিজীবনের বৃহৎ অভিজ্ঞতার কাব্য। বিপুল বিশ্বপ্রকৃতি এবং বৃহৎ মানবসংসারের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা কবি রবীন্দ্রনাথকে এক বিরাট অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে দিয়েছিল। এই কাব্যে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে দুটি সত্তা কাজ করেছিল। প্রমথনাথ বিশী তাঁর ‘রবীন্দ্রকাব্যপ্রবাহ’ গ্রন্থে ‘সোনার তরী’ কাব্য সম্পর্কে বলেছেন,

“কাজের গোড়াতে সোনার তরী, শেষে নিরুদ্দেশ যাত্রা। এই কবিতা দুইটি প্রতিভার ভিন্নমুখী দুটি ধারার প্রতীক। সৌন্দর্যের নির্দিষ্টলোকের আকাঙ্ক্ষায় প্রবলতা তাঁহাকে অসম্পূর্ণ মনের সংসার হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া লইয়া গিয়াছে।” (‘সোনার তরী’ কাব্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দি স্কাই পাবলিশার্স, ২০১৬, সূচনা অংশ)

 

সোনার তরী’ কাব্যের কবিতাগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গভীর জীবনবোধ অনুভব করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যে এক ধরনের দার্শনিক মতবাদ কাজ করেছিল। তিনি অনুভব করলেন, জগতের কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। অনুভব করলেন, পার্থিব যত ধন-সম্পদ বা খ্যাতি অর্জন করি না কেন, সবকিছুই একদিন এই পৃথিবীতে রেখে যেতে হবে। তিনি ‘সোনার তরী’র প্রতীকী রূপ ব্যবহার করে সেটি বর্ণনা করেছেন। সোনার তরী এসে রাশি রাশি ভরা ধান নিয়ে চলে গেল, অথচ আমাকে নিয়ে গেল না। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমার সকল কাজকর্ম, সবকিছুই পৃথিবীতে থেকে যাবে, অথচ আমি থাকতে পারব না।

 

‘সোনার তরী’ কাব্যের ‘সোনার তরী’ নামক কবিতাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সৌন্দর্যচেতনার পাশাপাশি একটি গভীর দার্শনিক মতবাদ ব্যক্ত করে গেছেন। এ ছাড়া, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক গভীর আত্মিক মিল ঘটেছে। তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে ব্যক্ত করেছেন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন,

 

“গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা

 কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা”

(সোনার তরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

কবিতায় কবি প্রকৃতির সৌন্দর্যচেতনার সঙ্গে জীবনের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান ও ধন-সম্পদের কথা বলেছেন। ধানের মাধ্যমে তিনি জীবনে অর্জিত সমস্ত মূল্যবান সম্পদ ও জ্ঞানের কথা তুলে ধরেছেন। এই সম্পদ তাঁর চিরস্থায়ী নয়। সোনার তরী এসে সেই ধান সব নিয়ে চলে যায়। ধানের মাধ্যমে তিনি জীবনের অর্জিত সমস্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সম্পদের কথা প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যে সৌন্দর্যচেতনার পাশাপাশি এক গভীর জীবনবোধের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

 

“যাহা লয়ে ছিনু ভুলে

সকলি দিলাম

তুলে থরে বিথরে”

(সোনার তরী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

সমস্ত ধান সোনার তরীতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও শূন্যতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, জীবনের কোনো কিছুই স্থায়ী নয়। আমি যা কিছু অর্জন করব, সবকিছুই রেখে যেতে হবে। কবিতার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সেই জীবনবোধেরই পরিচয় পাওয়া যায়।

 

 

 

বিশ্বসৌন্দর্যের স্বরূপ উদ্ঘাটন এবং সেটি যে এই জগৎ ও জীবনের সঙ্গেই জড়িত, সেই কথা ‘সোনার তরী’র রূপকবেশী কবিতাগুচ্ছের অভিপ্রায়। ‘পরশ পাথর’-এ একটি অনির্দিষ্ট সৌন্দর্য-আকাঙ্ক্ষার ব্যর্থতার সুর ধ্বনিত হয়েছে। ‘পরশ পাথর’ কবিতায় কবি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে গুরুত্ব দিতে বলেছেন। কারণ, কোন মুহূর্তে পরশপাথরের মতো মূল্যবান কিছু পেয়েও সেটিকে ছুড়ে ফেলতে হবে, তার কোনো নির্দিষ্টতা নেই। জীবনের প্রতিটি তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতর বিষয়কেও গভীর গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এই দার্শনিক মতবাদই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই কবিতায় তুলে ধরেছেন।

এই কবিতায় আমরা দেখি, এক সন্ন্যাসী সারা জীবন ধরে পরশপাথর খুঁজে চলেছে। সারা জীবন ধরে সে অনেক পাথর তার কোমরে বাঁধা লোহার শিকলের সঙ্গে স্পর্শ করিয়েছে। কিন্তু কখন যে তার কোমরে বাঁধা লোহাটি সোনায় পরিণত হয়েছে, সে তা খেয়াল করেনি। এমনকি কখন যে সে পরশপাথর ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, তা-ও একবারের জন্য দেখেনি। এর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের এক গভীর দার্শনিক মতবাদ তুলে ধরেছেন।

‘দুই পাখি’ কবিতাতেও কবি আদর্শ ও বাস্তবের সমন্বয়ের প্রশ্ন তুলেছেন। খাঁচার পাখি আমাদের মধ্যকার সংসার-শৃঙ্খলে আবদ্ধ। এখানে এক পাখি নিরুদ্দেশ সৌন্দর্যের আদর্শের দিকে ধাবমান, অন্যটি খাঁচায় বন্দী। এই কবিতার মাধ্যমে কবি জীবনের ভেতর ও বাইরের দুটি সত্তার কথা তুলে ধরেছেন। বাইরের পাখির মাধ্যমে তিনি সৌন্দর্যের প্রতি নিরুদ্দেশ যাত্রা, মুক্তচিন্তা ও আদর্শের কথা বলেছেন। ভেতরের পাখি বলতে আমাদের ভেতরকার সংসার ও শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনের কথা ব্যক্ত করেছেন। কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গভীর দার্শনিক মতবাদ প্রকাশ করেছেন।

‘আকাশের চাঁদ’ কবিতাটিতে পৃথিবীর বাইরে আদর্শ সৌন্দর্য ও প্রেমের অন্বেষণের নিষ্ফলতা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি পার্থিব সৌন্দর্যচেতনা ও প্রেমের নিষ্ফলতা ব্যক্ত করেছেন। পার্থিব সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী। এই কবিতার মাধ্যমে তিনি জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোকে তুলে ধরেছেন। মানুষ এমন কিছু পেতে চায়, যা তার ধরাছোঁয়ার বাইরে, যেমন আকাশের চাঁদ। মানুষ সারা জীবন এমন কোনো জিনিসের পেছনে ছুটে, যা পাওয়া কখনোই সম্ভব নয়। ‘আকাশের চাঁদ’ কবিতার মাধ্যমে কবি জীবনের অপ্রাপ্তিগুলোকে তুলে ধরেছেন।

‘দেউল’ কবিতাটিতেও কবি বাস্তববিমুখ হয়ে কাল্পনিক আদর্শের সাধনার ব্যর্থতার ইঙ্গিত করেছেন। এই কবিতায় কবি প্রকৃতিচেতনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কবিতার মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষের ভেতরে দুটি সত্তা কাজ করে। একটি অন্তর্জগৎ, অন্যটি বহির্জগৎ। কবি যখন বহির্জগতের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা থেকে সরে এসে শুধু অন্তর্জগৎকেন্দ্রিক চিন্তা করেছেন, তখন শুধু ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই পাননি। এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের শুধু অন্তর্জগতের চিন্তা করলেই হবে না। বাস্তব জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু অন্তর্জগতের সাধনায় নিমগ্ন থাকলে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না। এর মাধ্যমে কবির মধ্যে এক গভীর দার্শনিক মতবাদ ফুটে উঠেছে।

তাই পরিশেষে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের এক অমর কীর্তি ‘সোনার তরী’ কাব্য। এই কাব্যের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনবোধের গভীর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি এই কাব্যে জীবনকে দুটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। এক ধারায় জগৎ ও জীবন, সুখ-দুঃখ, বিরহ-মিলন ও পূর্ণ ভালোবাসা; অন্য ধারায় সৌন্দর্যের প্রতি নিরুদ্দেশ যাত্রা। কবির মনে এই দুটি সত্তা সর্বদা ক্রিয়াশীল ছিল। এই কাব্যের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের সম্পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়।

 

FAQ

. ‘সোনার তরী’ কাব্যে রবীন্দ্রনাথের জীবনবোধ কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, অপ্রাপ্তি ও মানুষের অর্জন রেখে চলে যাওয়ার সত্যের মাধ্যমে তাঁর গভীর জীবনবোধ প্রকাশ পেয়েছে।

২. ‘সোনার তরী’ কাব্যে সৌন্দর্যচেতনার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: প্রকৃতির সৌন্দর্য, প্রেম, ব্যাকুলতা ও আদর্শ সৌন্দর্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষাই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।

৩. ‘সোনার তরী’ কবিতায় ধান ও সোনার তরীর প্রতীকী অর্থ কী?
উত্তর: ধান মানুষের অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সম্পদের প্রতীক এবং সোনার তরী জীবনের অনিবার্য প্রস্থানের প্রতীক।

৪. ‘দুই পাখি’ কবিতায় অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
উত্তর: অন্তর্জগৎ সংসার ও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনের এবং বহির্জগৎ মুক্তচিন্তা, আদর্শ ও সৌন্দর্যের প্রতীক।

৫. ‘পরশ পাথর’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ কোন দার্শনিক মতবাদ তুলে ধরেছেন?
উত্তর: জীবনের মূল্যবান মুহূর্ত ও প্রাপ্তিকে অবহেলা না করার গভীর দার্শনিক মতবাদ তিনি তুলে ধরেছেন।

 

 

আরো পড়ুন