কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও নামকরণের সার্থকতা

বাংলা উপন্যাসের সার্থক রূপকার বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, যার হাত ধরে সূচনা হয়েছিল বাংলা সার্থক উপন্যাসের। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যায় বঙ্কিম মানস সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। সাহিত্যে তিনি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি সমাজ ভাবনা এবং সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেছিলেন। বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা বঙ্গদর্শনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন তিনি। সামাজিক উপন্যাস সৃষ্টিতে বঙ্কিমের অবদান ছিল অসামান্য। উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি ধর্ম, দর্শন, সমাজ, সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যের বিকাশে তার অবদান তাই অসামান্য। এই আর্টিকেলে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও নামকরণের সার্থকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু

 

 

কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি কালজয়ী সামাজিক উপন্যাস “কৃষ্ণকান্তের উইল”। এই উপন্যাসে তিনি তৎকালীন সময়ের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক সমস্যাগুলো তুলে ধরতে চেয়েছেন। একটি ঘুনে ধরা সমাজের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে উপন্যাসের পরতে পরতে। চারিত্রিক স্খলনের পাশাপাশি নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্র উদ্ভাসিত হয়েছে। বঙ্কিম চরিত্রগুলোর মনের অন্দরমহলে ডুব দিয়ে অবগুণ্ঠিত রহস্য উদঘাটনের পাশাপাশি তাদের মনের সুপ্ত কামনা ও বাসনাকে চিত্রিত করেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজে বিধবা নারীদের জীবনযাপন, তাদের বঞ্চনা, এবং রোহিণীর মতো চরিত্রের স্বাধীনচেতা ও বিদ্রোহী রূপের প্রকাশ ঘটেছে।

 

উপন্যাসের প্রেক্ষাপটে রয়েছে জমিদার কৃষ্ণকান্ত এবং তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির উইল। কৃষ্ণকান্ত নিজের দুই পুত্র হরলাল ও বিনোদলালকে সম্পত্তির তিন আনা করে, স্ত্রী ও কন্যাকে এক আনা করে এবং ভাইপো গোবিন্দলালকে সম্পত্তির আট আনা করে উইল করে দেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র হরলাল এই উইলের কথা জেনে জাল উইল তৈরি করার চেষ্টা করেন। হরলাল ছিলেন খুবই লোভী ও অনৈতিক ব্যক্তি। তিনি জাল উইল তৈরি করে বিধবা নারী রোহিনীকে বিবাহের প্রলোভন দেখিয়ে জাল উইল বদলি করার জন্য অনুরোধ করেন। রোহিনী বিধবা নারী হওয়ায় তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে কাজ হাসিল করার সিদ্ধান্ত নেন হরলাল।

 

এভাবে রোহিণীকে রাজি করায় হরলাল। রোহিণী কথামতো জাল উইল রেখে আসল উইল চুরি করে নিয়ে আসে, কিন্তু হরলাল তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। রোহিণী একজন বুদ্ধিমতী নারী, ফলে সে হরলালকে উইল দিতে অস্বীকৃতি জানায়। হরলাল ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। দিনের পর দিন রোহিণীর মধ্যে কামনা বাসনা প্রবল হয়ে দেখা দেয়। মাঝে মাঝে তার দেখা হতো গোবিন্দলালের সাথে। গোবিন্দলাল সুদর্শন পুরুষ। তার স্বভাব চরিত্র বেশ ভালো ছিল, এজন্য কৃষ্ণকান্ত তাকে সম্পত্তির আট আনা উইল করে দিয়ে গিয়েছিলেন। স্ত্রী ভ্রমর ছিল নিতান্তই অল্পবয়সী এবং কৃষ্ণবর্ণের। স্ত্রীকে নিয়ে গোবিন্দলাল সুখেই ছিল।

 

রোহিনীর সাথে গোবিন্দলালের পথে ঘাটে দেখা হত। রোহিনীর গোবিন্দলালকে ভালো লাগতো। তাই তার মনে হলো, সে যে জাল উইল পরিবর্তন করে রেখে আসছিল, তাতে গোবিন্দলালের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। সে সম্পত্তির ভাগ অনেকটাই কম পাবে। ফলে রোহিনী আবার দ্বিতীয়বারের মতো উইল বদলি করে রেখে আসতে গিয়েছিল। তখন সে ধরা পড়ে, ফলে রোহিনীর বিচার করা হয়। সে সময় গোবিন্দলাল তাকে বাঁচায়। কিন্তু বিধবা জীবন সে আর বয়ে নিয়ে যেতে পারছিল না। তাই রোহিনী একদিন পুকুরের ঘাটে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিল, সে সময় গোবিন্দলাল তাকে পানি থেকে বাঁচায়। তখন থেকেই গোবিন্দলালের সাথে রোহিনীর প্রেম জমে ওঠে। এর মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিধবা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

 

রোহিনীর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার পর ভ্রমরের সাথে গোবিন্দলালের দাম্পত্য জীবনে কলহ নেমে আসে। এক সময় গোবিন্দলাল রোহিণীকে নিয়ে অন্যত্র চলে গিয়ে বসবাস শুরু করে। গোবিন্দলালের চরিত্রের এই অবনতির ফলে কৃষ্ণকান্ত তার সম্পত্তির আট আনা, যা সম্পূর্ণ গোবিন্দলাল পেতো, সেটা ভ্রমরকে দিয়ে দেয়। গোবিন্দলাল ও রোহিনীর সম্পর্কে সন্দেহের জেরে গোবিন্দলাল রোহিণীকে হত্যা করে, তারপর ফিরে এসে দেখে ভ্রমর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছে। গোবিন্দলালকে দেখে ভ্রমরও মারা যায়। গোবিন্দলাল যেন সব কূল হারায়। জীবনে নেমে আসে শূন্যতা ও হতাশা। এরপর সন্ন্যাসীর বেশে ঘুরতে থাকে গোবিন্দলাল।

 

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি সামাজিক উপন্যাস “কৃষ্ণকান্তের উইল”। তৎকালীন সময়ে নারীদের সমাজে কোনো অধিকার ছিল না। ভারতবর্ষের নারীদেরকে সহমরণে যেতে হত। সতীদাহ প্রথা সমাজে ভয়ংকর রূপ নিয়েছিল। নারীদের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে জোর করে সহমরণে যেতে বাধ্য করা হতো। রাজা রামমোহন রায়ের একান্ত প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক আইন প্রণয়ন করে সতীদাহ প্রথা দূর করেন। তবুও নারীদের মুক্তি মেলেনি। সমাজে তারা নানা অবহেলার শিকার হত। তাদের দেখা হতো ছোট চোখে। ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামির জেরে বিধবা বিবাহকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত আন্দোলন ও প্রচেষ্টার ফলে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের আইনসভায় বিধবা বিবাহ আইন পাস হয়।

 

বিধবা বিবাহ আইন পাস হলেও সমাজে বিধবাদের কোনো অধিকার ছিল না। ধর্মীয় কুসংস্কারের জেরে তাদের কেউ বিয়ে করত না। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিধবাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৮৭৮ সালে “কৃষ্ণকান্তের উইল” উপন্যাসটি প্রকাশ করেন। উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি বিধবাদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তিনি সাহিত্যে বিধবাদের অধিকার নিয়ে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসী কণ্ঠস্বর ছিলেন। রোহিণীর মাধ্যমে তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি রোহিণীকে প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন।

 

একই পটভূমিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “চোখের বালি” উপন্যাসে বিনোদিনী সৃষ্টি করেছিলেন বিধবা অধিকার প্রতিষ্ঠায়। রবীন্দ্রনাথের বিনোদিনী ছিল রূপবতী, গুণবতী ও শিক্ষিত নারী। রোহিণীর সাথে তার তফাৎ বিদ্যমান; রোহিণী অশিক্ষিত কিন্তু গুণবতী ও রূপবতী। অন্যদিকে বিনোদিনী রূপবতী, গুণবতী ও শিক্ষিত নারী। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রোহিণীকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি, ফলে তাকে গোবিন্দলালের হাতে নিহত হতে হয়। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিনোদিনীকে প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন, তাকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফলে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্র কেউই বিধবাকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

 

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় “কৃষ্ণকান্তের উইল” উপন্যাসে বিধবা নারীর কামনা বাসনাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। রোহিণীর মনের অন্দরমহলে ডুব দিয়ে অতৃপ্ত কামনা, বাসনা ও আকাঙ্খাকে উদ্ভাসিত করেছেন।

 

 

“রাত্রিদিন দারুণ তৃষা, হৃদয় পুড়িতেছে, সম্মুখেই শীতল জল, কিন্তু ইহজন্মে সে জল স্পর্শ করিতে পারিব না। আশাও নাই” [কৃষ্ণকান্তের উইল, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়]

 

রোহিনীর এই উক্তির মাধ্যমে তার অতৃপ্ত কামনা বাসনাকে উদ্ভাসিত করেছেন, গোবিন্দলালের প্রতি তার আকাঙ্ক্ষা ছিল প্রবল। এই কামনার জাল থেকে মুক্তি পেতে হরলালের অনৈতিক প্রস্তাবেও সে রাজি হয়েছিল কিন্তু হরলাল তাকে ঠকিয়েছিল। অবশেষে গোবিন্দলালের কাছে এসে সেই কামনা বাসনার অবসান ঘটে কিন্তু মুক্তি মেলেনি।

 

উপন্যাসের পরতে পরতে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে উঠেছে। গোবিন্দলাল, রোহিনী ও ভ্রমরের ত্রিভুজ প্রেম উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব প্রবল করেছে। গোবিন্দলাল রোহিণীকে নিয়ে যখন অন্যত্র বসবাস শুরু করে তখন তার মনে ভ্রমরকে নিয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাত চলত। বুঝতে পারছে না কী করবে। অবশেষে সন্দেহের জেরে রোহিণীকে হত্যা করে এবং ফিরে গিয়ে দেখে ভ্রমরও নেই, ফলে তার মধ্যে তীব্র একাকীত্ব ও অসহায়ত্ব কাজ করে। ভ্রমর, রোহিণী এবং সম্পত্তি সবই সে হারিয়ে ফেলে। চারিত্রিক স্খলনের ফলে তার সবকিছু শেষ হয়ে যায়। সবকিছু ত্যাগ করে সে সন্ন্যাসী হয়ে যায়।

 

পরিশেষে বলতে পারি বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি কৃষ্ণকান্তের উইল। এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শিল্পমানসের পরিচয় পাওয়া যায়। একটি বৃহৎ সামাজিক সমস্যাকে তিনি যেভাবে শিল্পাঙ্গীকরণ করেছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। এই উপন্যাসে তিনি একই সাথে দুটি বিষয় তুলে ধরেছেন। একটি বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং অন্যটি চারিত্রিক শ্লথনের কিভাবে একজন মানুষকে ধ্বংস করতে পারে সেটিও তুলে ধরেছেন। তাই এই উপন্যাসের মাধ্যমে বঙ্কিমমানসের সফল পরিচয় পাওয়া যায়।

 

FAQ

১. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু কী?
উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু হলো সম্পত্তির লোভ, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, দাম্পত্য সম্পর্ক এবং মানুষের নৈতিক অবক্ষয়।

২. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে উইল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কৃষ্ণকান্তের সম্পত্তির উইলকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের প্রধান দ্বন্দ্ব ও ঘটনাপ্রবাহ গড়ে উঠেছে।

৩. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে লোভের প্রভাব কীভাবে ফুটে উঠেছে?
সম্পত্তির লোভ চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রতারণা, ষড়যন্ত্র ও পারস্পরিক সংঘাত সৃষ্টি করে।

৪. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে প্রেমের ভূমিকা কী?
উপন্যাসে প্রেম মানুষের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের জটিলতাকে তুলে ধরে এবং কাহিনির ঘটনাপ্রবাহকে প্রভাবিত করে।

৫. কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস থেকে কী শিক্ষা পাওয়া যায়?
লোভ, প্রতারণা ও অনৈতিক কাজ শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনে দুঃখ ও ধ্বংস ডেকে আনে, আর সততা ও নৈতিকতার গুরুত্ব অপরিসীম।

 

 

আরো পড়ুন

 

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120