বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম বিখ্যাত নাটক রক্তকরবী। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প ও গানের পাশাপাশি তিনি বহু নাটক রচনা করেছেন, যার মধ্যে রক্তকরবী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই নাটকটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রচিত। এটি একটি সাংকেতিক নাটক। পুঁজিবাদ, শিল্পব্যবস্থা এবং ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার যাঁতাকলে দরিদ্র মানুষের পিষ্ট হওয়ার চিত্র এই নাটকে অঙ্কিত হয়েছে। নাটকটি ১৯২৩-২৪ সালে (বাংলা ১৩৩০) শিলং-এ রচিত হয় এবং ১৩৩১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যা প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। নাটকটির আদি নাম ছিল “যক্ষপুরী“; পরে “নন্দিনী” নাম হয়ে শেষে “রক্তকরবী” নামে স্থিতু হয়। রক্তকরবী নাটকের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও শ্রেণিবৈষম্য বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

রক্তকরবী একটি গণনাট্য। গণনাট্য বলতে সর্বহারা শ্রেণির আশা-আকাঙ্ক্ষা ও তাদের সংগ্রামের যে নাট্যরূপ প্রকাশিত হয়, তাকে গণনাট্য বলে। আবার অনেকের মতে, জনগণের স্বার্থ যেখানে প্রতিফলিত হয়েছে, তাকেই গণনাট্য বলা হয়। গণনাট্যে কোনো একক নায়ক থাকে না। এখানে সবাই প্রধান চরিত্রের ভূমিকা পালন করে। রক্তকরবী একটি গণনাট্য, কারণ এখানে সবাই অধিকারবঞ্চিত। শোষক শ্রেণি শোষিত শ্রেণিকে যন্ত্র হিসেবে দেখে, তাদের কোনো অধিকার নেই। এ সম্পর্কে নাট্যসমালোচক শিশির কুমার দাস বলেছেন,
“মানুষের প্রবল লোভ কীভাবে জীবনের সমস্ত সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতাকে অস্বীকার করে মানুষকে নিছক যন্ত্রে ও উৎপাদনের উপকরণে পরিণত করেছে।”
রক্তকরবী নাটকের বিষয়বস্তু হলো এই নাটকে দুটি শ্রেণি রয়েছে। একটি শোষক শ্রেণি, অন্যটি শোষিত শ্রেণি। শোষক শ্রেণির মধ্যে রয়েছে রাজা ও তার অনুচররা এবং শোষিত শ্রেণির মধ্যে রয়েছে শ্রমিকদল। তারা মাটির নিচ থেকে সোনা তোলার কাজে নিয়োজিত। দিনরাত যন্ত্রের মতো পরিশ্রম করে চলেছে তারা। পুঁজিবাদী সমাজের কাছে তাদের কোনো মূল্য নেই; তারা একটি সংখ্যা মাত্র।
এই যান্ত্রিকতার মাঝে নন্দিনী এই নাটকের সৌন্দর্য ও প্রেমের প্রতীক। নন্দিনীর স্পর্শে যেন যন্ত্র প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়। রাজা নন্দিনীকে পেতে চেয়েছিল, কিন্তু লোভ ও ক্ষমতার দম্ভের কারণে তাকে পায়নি। শ্রমিকরা তাকে পায়নি, কারণ তারা লোহার শিকলে বাঁধা ছিল। পণ্ডিত তাকে পায়নি, কারণ সে দাসত্বে অন্ধ ছিল। অধ্যাপক তাকে পায়নি তার জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন থাকার কারণে। নন্দিনীর মাধ্যমে এই নাটকে রবীন্দ্রনাথ মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। যক্ষপুরীর সমস্ত যন্ত্রের মাঝে নন্দিনী একমাত্র প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ এক মানবী।
রক্তকরবী নাটকে যান্ত্রিক ও নাগরিক সভ্যতার দ্বন্দ্ব-সংঘাত প্রতিফলিত হয়েছে। নাটকে মানুষকে একটি সংখ্যা ছাড়া আর কিছু মনে করা হয় না। তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন ও অমানবিক পরিশ্রমের দৃশ্য ফুটে উঠেছে। যক্ষপুরীকে নরকের রাজ্য বলা যায়। এখানে মানুষের কোনো অধিকার নেই; তারা পণ্যের মতো কেনাবেচা হয়। রাজার নির্দেশে তাদের ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। মাটির নিচ থেকে সোনা তোলার জন্য তাদের দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করানো হয়। বিশুর ভাষায়,
“ওদের কাছে আমরা মানুষ নই, কেবল সংখ্যা। আমি ৫৯ঙ।” [রক্তকরবী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]
লোভ ও হিংসা মানুষকে মানুষ থেকে পশুতে পরিণত করে। মানুষকে হিংস্র বানিয়ে দেয়; তখন তারা অন্যায় ও অবিচার করতে দ্বিধাবোধ করে না। মানুষকে আর মানুষ বলে মনে করে না। এই নাটকে আমরা সেটিই দেখি। রাজার মধ্যে ক্ষমতার লোভী মনোভাব প্রবল হয়ে উঠেছিল। রাজা শ্রমিকদের কেবল যন্ত্র হিসেবে দেখে। সূর্যের আলো দেখারও অধিকার তাদের ছিল না। এতটাই নির্মম ও পাশবিক অত্যাচার তাদের ওপর চালানো হতো।
রক্তকরবী নাটকের প্রধান চরিত্র রঞ্জন, যে রাজার বিরুদ্ধে এবং এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে। এজন্য তাকে জীবন দিতে হয়। নন্দিনী রঞ্জনকে ভালোবাসে, তাই রাজা তার প্রতি ক্ষুব্ধ হয় এবং তাকে হত্যা করে। রঞ্জন ছিল এই নাটকের মানবিকতার প্রতীক। তার মধ্যে মানবিকতার সত্য ও সুন্দরের প্রকাশ দেখা যায়। রঞ্জন প্রকৃত বীর, সত্যানুসন্ধানী এবং মুক্তির প্রত্যাশী। নন্দিনীর ছোঁয়ায় তার মধ্যে প্রেমের সঞ্চার হয়। কিন্তু তার হাত-পা রাজার শিকলে বাঁধা ছিল, যক্ষপুরীতে আসার পর রাজার সর্দাররা তাকে হত্যা করে।
নাটকে শিল্প ও যান্ত্রিক সভ্যতার দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে উঠেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পৃথিবীর চিত্রই এই নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে। চারদিকে যখন হাহাকার ও মানবতার সংকট, তখন রবীন্দ্রনাথ এই নাটকটি রচনা করেন। সেই সময় মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়, মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং মানুষকে পরিণত করা হয়েছিল একপ্রকার দাসে। রবীন্দ্রনাথ এই পুঁজিবাদী ও যান্ত্রিক সভ্যতা থেকে মুক্তির পথ দেখিয়েছেন রক্তকরবী নাটকে।
রাজা ছিল অন্ধ ও পুঁজিবাদী শ্রেণির প্রতিনিধি। সে ক্ষমতার জোরে সবকিছু দখল করতে চায়। ক্ষমতা দিয়ে মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে মানুষকে দাসে পরিণত করেছিল। এই নাটকে রাজা অমানবিক হয়ে ওঠে। তার পাশবিকতা ও নির্যাতনের চিত্র প্রকট হয়ে ওঠে। তিনি শ্রমিকদের কেবল একটি সংখ্যা বানিয়ে রেখেছিলেন। নন্দিনীকে জোর করে পেতে চাওয়ার কারণে রঞ্জনকে হত্যা করে। এর মাধ্যমে তার হিংস্রতা প্রকাশ পায়।
রক্তকরবী নাটকের মাধ্যমে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লব মানুষের গতি বাড়ায়নি; বরং তাদের দাসে পরিণত করেছে। মানুষ শুধু যন্ত্রের দাসে পরিণত হয়েছে। মানুষকে সংখ্যায় পরিণত করার এই যন্ত্রসভ্যতার চিত্র রক্তকরবী নাটকে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত রাজাও ক্লান্ত হয়ে পড়ে। নন্দিনীর প্রতি তার আকর্ষণ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, সে জোর করে তাকে পেতে চায়। কিন্তু ভালোবাসা কখনো জোর করে অর্জন করা যায় না। অর্থবিত্তের প্রভাবে দাস কেনা যায়, কিন্তু ভালোবাসা কেনা যায় না। রঞ্জনের মৃত্যুর পর রাজা নিজেই তার তৈরি যক্ষপুরীর ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নন্দিনীর পাশে দাঁড়িয়ে ব্যবস্থাটির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়
নাটকের সবচেয়ে উজ্জ্বল, প্রাণময় ও প্রেমময় চরিত্র নন্দিনী। তার চরিত্রের উজ্জ্বলতায় অন্যান্য চরিত্র ম্লান হয়ে যায়। নন্দিনীর মাধ্যমে নাট্যকার মানবমুক্তির পথ দেখিয়েছেন। নন্দিনী যেন মানবতার প্রতীক। এই যান্ত্রিক পরিবেশে নন্দিনী একমাত্র মানবতার ছোঁয়া নিয়ে হাজির হয়। সবাই তার ছোঁয়া পেতে চায়, কিন্তু যান্ত্রিকতার জালে আবদ্ধ হয়ে তাকে পায় না।
রবীন্দ্রনাথ এই নাটকে নারীর মাধ্যমে মুক্তির পথ বেছে নিয়েছেন। এই মুক্তির প্রতীক নন্দিনী। যান্ত্রিক সভ্যতার সকল ক্লান্তি ও হতাশার মধ্যে নন্দিনী প্রাণের উন্মুক্ত বাতাস নিয়ে আসে। আপন শক্তিতে সে সবকিছু প্রাণময় করে রাখে। রবীন্দ্রনাথ যান্ত্রিক সভ্যতা থেকে মুক্তির জন্য নারীকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, রক্তকরবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাটক। এই নাটকে তিনি যান্ত্রিকতা, পুঁজিবাদ এবং শিল্পসভ্যতার মধ্য দিয়ে মানবমুক্তির পথ দেখিয়েছেন। মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠা করে তিনি এই নাটক রচনা করেছেন। নন্দিনীর মাধ্যমে তিনি মানবমুক্তির পথ তৈরি করেছেন। তাই এই নাটকে মানবতারই জয়গান গেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আরো পড়ুন
- গোরা উপন্যাস এর অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ
- আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক কাব্য’র প্রেম ও বিরহ চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ
- গীতাঞ্জলি কাব্য’র আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেম।
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব
- বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশ
- সংশপ্তক উপন্যাস এর সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট
- বন্দি শিবির থেকে কাব্যের পটভূমি, স্বদেশচেতনা ও শিল্পমূল্য
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
