ষাটের দশকের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রখ্যাত আধুনিক কবি ও সাংবাদিক আবুল হাসান (৪ আগস্ট ১৯৪৭ – ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫)। তাঁর ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যে প্রেম ও বিরহের চেতনা পরম আর্তি হিসেবে ধরা দিয়েছে। সত্তরের দশকের উত্তাল রাজনৈতিক স্লোগান, যুদ্ধোত্তর হতাশা এবং সামাজিক ভাঙনের মধ্য দিয়ে আবুল হাসান মানুষের একেবারে নিজস্ব, গোপন ও ব্যক্তিক অনুভূতিকে তুলে ধরেছেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে, রোগশয্যায় লেখা এই কাব্যে কবি শারীরিক বিচ্ছেদের মাঝেও ভালোবাসার গভীরতা এবং প্রেম ও বিরহের করুণ সুর বাজিয়েছেন। এই আর্টিকেলে পৃথক পালঙ্ক কাব্যের বিষয়বস্তু, প্রেম ও বিরহ চেতনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

পৃথক পালঙ্ক কাব্যের বিষয়বস্তু
আবুল হাসানের প্রেমে জৈবিক আসক্তি বা পাওয়ার বাসনা প্রধান নয়; বরং না পাওয়ার মধ্যে যে এক ধরনের সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে, কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থে সেটিই প্রকাশ করেছেন। না পাওয়ার মধ্যে যে অপরূপ সৌন্দর্য রয়েছে, কবি তাকেই উদযাপন করেছেন। কবি প্রেমকে দেখেছেন এক সুন্দর বেদনা হিসেবে। প্রিয়তমার কাছ থেকে আসা দুঃখ বা অবহেলাকেও তিনি সাদরে যাপন করেন। ‘এক প্রেমিকের কথা’ কবিতায় কবি প্রেমিকার দেওয়া দুঃখ, কষ্ট, যাতনা ও অবহেলার কথা তুলে ধরেছেন। প্রেমের বিরহের কথাও ‘এক প্রেমিকের কথা’ কবিতায় ব্যক্ত হয়েছে।
এই কাব্যের বিরহ চেতনার একটি বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘অপেক্ষা’ কবিতায়। এই কবিতায় কবির অনন্ত প্রতীক্ষা এবং ইন্দ্রিয়ের সজাগতা লক্ষ্য করা যায়। এখানে কবি তাঁর বিরহকে সাময়িক কোনো বিচ্ছেদ হিসেবে দেখাননি; বরং এটিকে তিনি চিরন্তন দুঃখ হিসেবে দেখিয়েছেন। কবির প্রিয় মানুষটি আসবে কি আসবে না, এই দোলাচলের মধ্যে কবির প্রেম সর্বোচ্চ তীব্রতা লাভ করেছে।
“বৃষ্টির ফোটাকে মনে হয় তোমার পায়ের আওয়াজ,
পাতার শব্দকে মনে হয় তোমার গাড়ির আওয়াজ।”
(অপেক্ষা, পৃথক পালঙ্ক কাব্য, আবুল হাসান)
কবিরের চাতক পাখির মতো অপেক্ষার প্রহর কখনোই শেষ হয় না। এই অপেক্ষার শেষ পরিণতি কবিকে দিয়েছে এক চরম নিঃসঙ্গতা। যখন চেনা পৃথিবীর সমস্ত আলো নিভে যায়, তখনো কবির এই বিরহ শেষ হয় না। এই কবিতায় কবির চরম বিরহের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি হলো, ভীষণ দুঃসময়ে, কষ্টের মুহূর্তে ও কণ্টকাকীর্ণ সময়ে সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে মনে পড়া এবং তাঁর সান্নিধ্যে যাওয়ার ব্যাকুলতা সৃষ্টি হওয়া। এর ব্যতিক্রম ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি জীবনের শেষ বয়সে এসে যখন রোগ, শোক, হতাশা, জরা-জীর্ণতা ও মৃত্যুর ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়েছিলেন, তখন তাঁর বিদেশিনী প্রেমিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে তিনি বারবার মনে করেছেন এবং তাঁর সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন। এরই প্রকাশ আমরা তাঁর শেষ লেখা কাব্যগ্রন্থে দেখতে পাই। তিনি তাঁর ‘শেষ লেখা’ কাব্যের পঞ্চম কবিতায় বলেছেন,
“বিদেশের ভালোবাসা দিয়ে,
যে প্রেয়সী পেতেছে আসন।
চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া,
কানে কানে তারই ভাষণ।”
(শেষলেখা, ৫ সংখ্যক কবিতা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
তেমনি আবুল হাসানও যখন বিদেশের কোনো এক হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তখন দেশে থাকা তাঁর প্রিয়তমার জন্য ব্যাকুল হয়েছেন এবং তাঁর সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন। কবির মনে হয়েছে, তাঁর প্রিয়তমার ভালোবাসা ও মমতায় তিনি আবার নতুন করে জন্ম নেবেন, আবার সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে আসবেন। এরই প্রকাশ আমরা তাঁর ‘রোগশয্যায় বিদেশ থেকে’ কবিতায় দেখতে পাই। কবি বিদেশে বসে তাঁর প্রিয়তমার জন্য আকুল হয়েছেন। তাঁর মনে হয়েছে, প্রিয়তমার সেবা, যত্ন ও মমতায় তিনি আবার সুস্থ হয়ে উঠবেন।
আবুল হাসানের বিরহ চেতনার আরেকটি গভীর দিক হলো এর আধ্যাত্মিক রূপান্তর। তিনি তাঁর বিরহকে এক ধরনের বৈষ্ণবীয় ও মহাভাবের স্তরে নিয়ে গেছেন, যেখানে বিরহের আগুনে পুড়ে প্রেমিকের আত্মা শুদ্ধ হয়। ‘মীরা বাঈ’ কবিতার মাধ্যমে কবি নিজের আত্মিক যন্ত্রণাকে ঐতিহাসিক রূপকে মুড়িয়ে নিয়েছেন। এখানে তিনি তাঁর যন্ত্রণা ও বিরহকে রাধা বা মীরা বাঈয়ের বিরহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। রাধা বা মীরা বাঈ যেভাবে কৃষ্ণের জন্য জাগতিক সমস্ত সুখ, সংসার ও সমাজকে ত্যাগ করে এক অনন্ত বিরহকে বরণ করে নিয়েছিলেন, তেমনি কবিও তাঁর ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যগ্রন্থে এই পৃথক পালঙ্কে শুয়ে একই রকম বিরহকে বরণ করে নিয়েছেন। তাঁর এই বিরহ কোনো ক্ষোভ বা প্রতিবাদের জন্ম দেয় না; বরং তা এক সুন্দর শান্তি ও সমর্পিত হাহাকারে পরিণত হয়।
তাই বলা যায়, ‘পৃথক পালঙ্ক’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি কবি আবুল হাসানের জীবনের শেষ এপিটাফ। এখানে তিনি তাঁর শেষ জীবনের দুঃখ-দুর্দশা, হতাশা, প্রেম ও বিরহকে তুলে ধরেছেন। এই কাব্যে প্রেম পূর্ণতা পেয়েছে বিরহের মধ্য দিয়ে, আর বিরহ মহিমান্বিত হয়েছে মৃত্যুর অনিবার্য ছায়ায়।
FAQ
১. ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যে আবুল হাসানের প্রেমচেতনার প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: এ কাব্যে প্রেমের চেয়ে না-পাওয়ার বেদনা ও তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কবি প্রেমকে এক সুন্দর ও গভীর বেদনা হিসেবে দেখেছেন।
২. ‘অপেক্ষা’ কবিতায় আবুল হাসানের বিরহ চেতনা কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: ‘অপেক্ষা’ কবিতায় প্রিয় মানুষটির জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা, দোলাচল, ইন্দ্রিয়ের সজাগতা ও চরম নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে কবির গভীর বিরহ প্রকাশ পেয়েছে।
৩. ‘রোগশয্যায় বিদেশ থেকে’ কবিতায় প্রেম ও বিরহের কী পরিচয় পাওয়া যায়?
উত্তর: বিদেশের হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও কবি প্রিয়তমার সান্নিধ্যের জন্য ব্যাকুল হয়েছেন। তাঁর ভালোবাসা, সেবা ও মমতায় সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা কবিতাটিতে ফুটে উঠেছে।
৪. ‘মীরা বাঈ’ কবিতায় আবুল হাসানের বিরহ চেতনার আধ্যাত্মিক রূপ কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে?
উত্তর: ‘মীরা বাঈ’ কবিতায় কবি নিজের আত্মিক যন্ত্রণাকে রাধা ও মীরা বাঈয়ের কৃষ্ণপ্রেমের বিরহের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এর মাধ্যমে তাঁর বিরহ বৈষ্ণবীয় প্রেম ও মহাভাবের স্তরে উন্নীত হয়েছে।
৫. ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যে প্রেম ও বিরহের সম্পর্ক কী?
উত্তর: ‘পৃথক পালঙ্ক’ কাব্যে প্রেম বিরহের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে এবং বিরহ মৃত্যুর অনিবার্য ছায়ায় আরও গভীর ও মহিমান্বিত হয়েছে।
আরো পড়ুন
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- বাংলা সাহিত্যে অন্ধকার যুগ
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধারা ও বৈশিষ্ট্য
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- তিরিশের দশকের কবিতা ও পঞ্চপাণ্ডব, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা | বিস্তারিত আলোচনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ






