জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব, জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ

মোতাহের হোসেন চৌধুরী “জীবন ও বৃক্ষ” প্রবন্ধে বৃক্ষের জীবনের সাথে মানুষের জীবনের তুলনা করেছেন। বৃক্ষের বৃদ্ধি, ফল, ফুল দেওয়ার পিছনে রয়েছে নীরব সাধনা; তেমনি মানব জীবনের সার্থকতার জন্য তার নিজের সাধনা বৃক্ষের মতোই হওয়া উচিত। বৃক্ষ ফলে ও ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু এই ফল ও ফুল নিজের জন্য নয়। অপরের সেবার জন্য সে এই ফল ও ফুল উৎপাদন করে। মানব জীবনের সাধনা ও ঠিক এমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। পরের উপকারে নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে রয়েছে সার্থকতা ও সফলতা। এই প্রবন্ধের পরতে পরতে সেই কথা ফুটে উঠেছে। এই আর্টিকেলে “জীবন ও বৃক্ষ” প্রবন্ধের মূলভাব, জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর এবং খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব

“জীবন ও বৃক্ষ” প্রবন্ধের লেখক মোতাহের হোসেন চৌধুরী

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার অধিকারী মোতাহের হোসেন চৌধুরী। তিনি ১৯০৩ সালে নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন। বাঙালি মুসলিম সমাজের অগ্রগতির জন্য এটি ছিল এক যুগান্তকারী আন্দোলন। তাঁর সাহিত্য চর্চার বিষয় ছিল মুক্তবুদ্ধি চর্চা, প্রগতিশীল চেতনা, সৌন্দর্যবোধ ও মানব প্রেম। তাঁর লেখা “সংস্কৃতি কথা” বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত প্রবন্ধ। তাঁর অন্য দুটি গ্রন্থ হলো “সভ্যতা” ও “সুখ”। তিনি ১৯৫৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের মূলভাব বিশ্লেষণ

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর “জীবন ও বৃক্ষ” প্রবন্ধটি তার “সংস্কৃতি কথা” প্রবন্ধগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। এই প্রবন্ধে তিনি মানুষের জীবনকে বৃক্ষের সাথে তুলনা করেছেন। আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবে, অপরের স্বার্থ ও অপরের ভালো তারা কখনোই কামনা করে না। তারা শুধু হিংসা এবং অহংকার দেখিয়ে চলে। অহংকারের পতাকা উড়ানোই তাদের কাজ। এসব মানুষদের বৃক্ষের দিকে তাকিয়ে শিক্ষা নিতে বলেছেন মোতাহের হোসেন চৌধুরী। বৃক্ষকেই মানুষের একমাত্র আদর্শ হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

 

তিনি মনে করেন বৃক্ষের জীবনের গতি ও বিকাশের দিকে না তাকালে মানুষের জীবনের সার্থকতা ও পরিপূর্ণতা কখনোই অর্জিত হবে না। বৃক্ষ ফলে ফুলে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, কিন্তু এই ফল ও ফুল কখনোই নিজের জন্য সে উৎপাদন করে না। মানুষের সেবার জন্যই সে সর্বদা নিবেদিত প্রাণ। বৃক্ষের সফলতার দিকে না তাকালে কখনোই জীবনের তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে না। বৃক্ষকে সার্থকতা ও সফলতার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ না করলে জীবন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

 

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নদীর গতির সাথে জীবনের সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছেন। তিনি মানুষের জীবনের বেদনা নদীর গতির মধ্যেই দেখতে পেয়েছেন। এজন্য তিনি মানুষের জীবনের সাথে নদীর গতিকে তুলনা করেছেন। কিন্তু মোতাহের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, বৃক্ষের বেদনাকে উপলব্ধি করতে হলে আমাদের অনুভূতির চোখ দিয়ে দেখতে হবে; চামড়ার চোখ দিয়ে বৃক্ষের বেদনা উপলব্ধি করা যায় না। তিনি মনে করেন মানুষের জীবনের সাধনা বৃক্ষের মতো ধীরস্থির হওয়া উচিত, নদীর মতো গতিশীল নয়। নদী সাগরে গিয়ে আত্মবিসর্জন দেয়। তার এই প্রাপ্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে না। কিন্তু বৃক্ষের প্রাপ্তি আমাদের চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সে ফলফুলে পরিপূর্ণ হয়ে মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী মনে করেন জীবনের সাথে বৃক্ষেরই গভীর মিল রয়েছে।

 

বৃক্ষ আমাদের নিরব ভাষায় সার্থকতার গান শোনায়। আর সেই গান অনুভূতির গান দিয়ে শুনতে হবে। বৃক্ষের মতো মানুষের শুধু দৈহিক বৃদ্ধি হলে হবে না; আত্মিক বৃদ্ধি ও হতে হবে। মানুষকে নিজেদের আত্মা সৃষ্টি করে নিতে হবে। দুঃখ-বেদনা উপলব্ধি করে অন্তরের পরিপক্কতা অর্জন করে আত্মা সৃষ্টি করতে হবে। বৃক্ষের ফল যেমন মানুষ উপভোগ করে, তেমনি আমাদের আত্মারূপ ফল স্রষ্টা উপভোগ করে। তাই আত্মাকে মধুর ও সুন্দর করে গড়তে না পারলে সেটা স্রষ্টার উপভোগের উপযুক্ত হবে না। আত্মাকে মধুর ও সুন্দর করে গড়ার জন্য বৃক্ষের মতো অপরের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের জীবনের পরিপূর্ণ সার্থকতা ও সফলতা অর্জিত হবে।

 

এই প্রবন্ধটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে শুধুমাত্র আত্মচিন্তায় মগ্ন থাকলেই হবে না, পরোপকারেই সফলতা নিহিত রয়েছে সেটি আমাদের ধারণ করতে হবে। আর সেটি উপলব্ধি করতে হলে আমাদেরকে বৃক্ষের দিকে তাকাতে হবে। বৃক্ষই একমাত্র নীরব সফলতা ও সার্থকতার প্রতীক। যা আমাদের শিক্ষা দেয় সকল অহংকারী মনোভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে প্রেম, সৌন্দর্য ও সেবায় নিজেকে পরিপূর্ণ করা।

 

জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর

 

১. জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধের লেখক কে?

মোতাহের হোসেন চৌধুরী

 

২. কোন গ্রন্থ থেকে জীবন ও বৃক্ষ প্রবন্ধটি নেওয়া হয়েছে? 

সংস্কৃতি কথা

 

৩. মোতাহের হোসেন চৌধুরী কোন আন্দোলনের অন্যতম কান্ডারী ছিলেন? 

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন

 

৪. মোতাহের হোসেন চৌধুরী রচিত অন্য দুটি গ্রন্থ কী? 

সভ্যতা  ও সুখ

 

৫. কিসের সংসার পরিপূর্ণ? 

স্বল্পপ্রাণ, স্থূলবুদ্ধি ও জবরদস্তিপ্রিয় মানুষে

 

৬. এসব মানুষের কাজ কী? 

অপরের সার্থকতার পথে বাধা সৃষ্টি করা

 

৭. কি লাভ করেনি বলে এরা নিষ্ঠুর ও বিকৃত বুদ্ধি? 

প্রেম ও সৌন্দর্যের স্পর্শ

 

৮. এদের একমাত্র দেবতা কে? 

অহংকার

 

৯. কার চরণে তারা নিবেদিত প্রাণ? 

অহংকারের

 

১০. এদের কাজ কি? 

অহংকারের নিশান ওড়ানো

 

১১. এদের কাছে জীবনদর্শনের প্রতীক হবে কে? 

সজীব বৃক্ষ

 

১২. কার জীবনের গতি ও বিকাশকে উপলব্ধি করা দরকার? 

বৃক্ষের

 

১৩. বৃক্ষের দিকে তাকালে কি উপলব্ধি সহজ হয়? 

জীবনের তাৎপর্য

 

১৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিসের সাথে মনুষ্যত্বের সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছেন? 

নদীর গতির সাথে

 

১৫. তার মতে মানুষত্বের বেদনা কিসে উপলব্ধ হয়? 

নদীর গতিতে

 

১৬. তপোবনপ্রেমিক কে? 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

১৭. কিভাবে বৃক্ষের বেদনা সহজে উপলব্ধি করা যায়? 

অনুভূতির দৃষ্টি দিয়ে দেখলে

 

১৮. বৃক্ষের অভিব্যক্তি কি? 

গোপন ও নীরব সাধনা

 

১৯. সাধনার ব্যাপারে কি বড় জিনিস? 

প্রাপ্তি

 

২০. কিসের পানে তাকিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই অন্তরের সৃষ্টি ধর্ম উপলব্ধি করেছেন? 

বৃক্ষের পানে

 

২১. মানুষের ধর্মের সাথে কার ধর্মের মিল আছে? 

প্রকৃতির

 

২২. নিরব ভাষায় বৃক্ষ আমাদের কিসের গান শোনায়? 

সার্থকতার

 

২৩. মানুষের বৃদ্ধি কোথায়? 

আত্মায়

 

২৪. মানুষকে কি সৃষ্টি করে নিতে হয়? 

আত্মা

 

২৫. কিসের ফলে আত্মার পরিপক্বতা অর্জন হয়? 

সুখ, দুঃখ, বেদনা উপলব্ধির ফলে

 

২৬. আত্মাকে মধুর ও পুষ্ট করে গড়ে না তুললে সেটা কার উপভোগের উপযুক্ত হবে না? 

স্রষ্টা

 

২৭. কিভাবে আত্মাকে পরিপুষ্ট ও মাধুর্য সম্পাদন সম্ভব? 

বিচিত্র অভিজ্ঞতা, প্রচুর প্রেম ও গভীর অনুভূতির দ্বারা

 

২৮. কোনটি কখনো মানুষের শিক্ষার প্রধান বিষয়বস্তু হতে পারে না? 

বিজ্ঞান

 

২৯. অন্তর পরিপূর্ণ হয় কিসের দ্বারা? 

সাহিত্য ও শিল্পকলার দ্বারা

 

৩০. বৃক্ষ কেবল বৃদ্ধির ইশারা নয়, তা কিসের ইঙ্গিত? 

প্রশান্তি

 

 

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120