বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব, বিষয়বস্তু ও কবিতার লাইন ব্যাখ্যা

কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম বিখ্যাত একটি কবিতা বিদ্রোহী। এই কবিতায় তিনি সকল আধিপত্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এই কবিতাটি কাজী নজরুল ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা। তিনি যদি এই কবিতাটি লিখে আর কোন কিছু না লিখতেন তাহলেও তিনি সমান খ্যাতি অর্জন করতে। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতায় ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ পোষণ করেছেন। শোষকের বিরুদ্ধে চোখের চোখ রেখে কথা বলেছেন। এই কবিতায় তিনি বিভিন্ন ধর্মীয় পৌরাণিক চরিত্র রূপক হিসাবে ব্যবহার করে শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। সমাজের সকল অন্যায় অত্যাচার শোষন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানবতার জয় গান গেয়েছেন বিদ্রোহী কবিতায়। এই নিবন্ধে বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব ও কবিতার লাইন ব্যাখ্যা করা হল।

বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব

বিদ্রোহী কবিতার কবি কাজী নজরুল

বাংলা সাহিত্যের অনন্য প্রতিভাধর ব্যক্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ১৮৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি তার পিতাকে হারান। শিশুকাল থেকেই তাঁর জীবন দরিদ্রতার সাথে কেটেছে। শৈশবকাল থেকেই নিজেকে বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত করেছিলেন। ১৮ বছর বয়সে তিন যোগ দিয়েছিলেন সেনাবাহিনীতে।

নজরুল ইসলামের সর্বপ্রথম কবিতা বিদ্রোহী যেটি সাপ্তাহিক বিজলিতে প্রকাশিত হয়েছিল। এই কবিতাটি প্রকাশের পর থেকে কাজী নজরুল ইসলামের খ্যাতি বহুগুণ বেড়ে যায়। তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগুলো হলো অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশি, সাম্যবাদী, সর্বহারা, সিন্ধু হিন্দুল, চক্রবাক, সন্ধ্যা ও প্রলয় শিখা। এছাড়াও তিনি অনেকগুলো উপন্যাস, ছোটগল্প ও গান রচনা করেছেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অসামান্য। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি। ১৯৬০ সালে তিনি পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন। এছাড়াও জগত্তারিণী স্বর্ণপদক সহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি ১৮৭৬ সালে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব

বিদ্রোহী কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমাজের সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন ও অদম্য প্রতিবাদের সুর ব্যক্ত করেছেন। তিনি পরাধীনতার ভারতবর্ষের মানুষের দুঃখ দুর্দশা দেখে খুবই ব্যথিত হয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে ইংরেজ সরকার ভারতবর্ষের মানুষদের খুবই নির্যাতন করছিল। বিভিন্নভাবে ভারতবর্ষের মানুষদের শোষণ করছিল। সেনাবাহিনীতে যোগদানের ফলে তার মধ্যে বিদ্রোহী সত্তা জাগ্রত হয়েছিল। যার কারণে তিনি এই অন্যায় অত্যাচার মুখ বুজে মেনে নেননি। তিনি প্রতিবাদের মাধ্যমে হিসাবে কবিতাকে বেছে নেন। এবং বিদ্রোহী কবিতায় সমাজের সেই সকল অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ঘোষণা করে। নিজেকে তিনি সমস্ত গন্ডি ও বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন।

তিনি ‘আমি‘ সত্তার মাধ্যমে নিজের ভেতরের অদম্য সাহস ও শক্তি ওই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। নিজেকে তিনি বীর ব্যঞ্জনায় অভিহিত করেছেন। সেই শক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন শোষণ এবং সমাজের সকল বৈষম্য দূর করতে চেয়েছে। নিজের ভেতরের শক্তিকে তিনি নানাভাবে বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। কখনো নিজেকে ধর্মীয় পৌরাণিক ও মহাকাব্যিক চরিত্রের সাথে তুলনা করেছেন। আবার কখনো নিজেকে সাইক্লোন, টর্পেডো, ভাসমান মাইন, কখনো কালবৈশাখী ঝড়, পরশুরামের কুঠার, রাহুর গ্রাস, নটরাজে সাথে তুলনা করেছেন। এভাবে তিনি নিজের মধ্যে অভাবনীয় শক্তি অনুভব করেছেন এবং সেই শক্তি দিয়ে সমস্ত অন্যায় অত্যাচার দমন করতে চেয়েছেন।

এই কবিতায় তার উপমাগুলো মানুষের মধ্যে আত্মজাগরণ ঘটিয়েছিল। মানুষেরা নিজের মধ্যে সেই শক্তি অনুভব করতে পেরেছিলেন। তিনি কখনো খোদার আসন আরশ ছেদিয়া উঠেছিলেন, কখনো ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছেন, কখনো জাহান্নামের ভিতরে পুষ্পের হাসি হেসেছিলেন,  কখনো শত্রুর সাথে গলাগলি করেছিলেন, আবার কখনো মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা ধরেছিলেন, ইসরাফিলের সিঙ্গার হুংকার হয়েছিলেন, কখনো ধর্মরাজের ত্রিশূল, দাঁত দিয়ে ছিড়েছিলেন বিশ্বমায়ের অঞ্চল, আবার কখনো আফিয়াসের বাঁশি হয়েছিলেন। তার এই উপমাগুলো মানুষের মধ্যে শক্তি ও সাহস যুগিয়েছিল। যায় কারণে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল।

বিদ্রোহী কবিতায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কখনো ধ্বংস করেছেন আবার কখনো সৃষ্টি করেছেন। তিনি সমাজের সকল অন্যায় অত্যাচার শোষণের বেড়াজাল ধ্বংস করে মানবিক বৈষম্যহীন শোষণহীন কুসংস্কার মুক্ত সমাজ গড়তে চেয়েছে। তিনি সেই দিন শান্ত হবেন যেদিন পৃথিবীতে কোন অন্যায় অত্যাচার থাকবে না। কেউ অত্যাচারীর হয়ে উঠবে পারবে না। যেদিন পৃথিবীতে কোন নিপীড়িত মানুষের কান্নার রোল আকাশে ধ্বনিত হবেনা। অত্যাচারী ব্যক্তির তলোয়ার রণভূমি রণিবে না সেই দিন তিনি ক্লান্ত হবেন এবং শান্ত হবেন।

তাই বিদ্রোহী কবিতার মাধ্যমে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাজের সকল অন্যায় অত্যাচার ও শোষণের বেড়াজাল ভেঙে পৃথিবীতে শান্তি এবং স্বাধীনতার আশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি ব্রিটিশ সরকারের সকল অন্যায় অত্যাচার সমাজের সকল বৈষম্য কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছেন বিদ্রোহী কবিতায়।

 

বিদ্রোহী কবিতার ব্যাখ্যা

বল বীর 

কবি নিজেকে বীর ব্যাজ্ঞনায় অভিহিত করেছেন।

বল উন্নত মম শির!

নিজের মাথা সবসময়ই উচু রাখার কথা বলেছেন

শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!

হিমালয়ের শিখরও যেন কবির গৌরব দেখে মাথা নিচু করে আছে।

বল বীর –

আবার কবি নিজেকে বীর ব্যাজ্ঞনায় অভিহিত করেছেন।

বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’

মাহাকাশের বুক চিরে
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’

চাদ সূর্য গ্রহ নক্ষত্র ছাড়িয়ে
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া

পৃথিবী, স্বর্গ, বৃন্দাবন ছাড়িয়ে
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,

এখানে তিনি বিট্রিশ সরকারকে বুঝিয়েছেন। সেটাকে ধ্বংস করার কথা বলেছেন 

উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!

বিষ্ময়ের সাথে সবকিছুই ছিন্ন করেছেন

মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!

রুদ্রের মতো শক্তি নিয়ে কপালে বিজয়ের গৌরবের নিশানের কথা বলেছেন

 

বল বীর – আমি চির উন্নত শির!

নিজের শক্তি অবদমিত সাহসের কথা বলেছেন 

আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,

নিজের দূর্দম ও নৃশংস সাহসের পরিচয় দিয়েছেন 

মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!

তিনি নিজেকে নটরাজ, সাইক্লোন ও ধ্বংসের সাথে তুলনা করেছেন

আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,

কবি এখানে নিজেকে শোষক, অন্যায়কারী এবং অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক চরম আতঙ্ক, অভিশাপ এবং এক অপ্রতিরোধ্য ধ্বংসাত্মক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন

আমি ভেঙে করি সব চুরমার!

তিনি সবকিছু ভেঙে চুরমার করেন
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,

তিনি নিজেকে অনিয়ম বলেছেন
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!

সকল নিয়ম কানুন ভেঙে ফেলেন
আমি মানি না কো কোন আইন,

কোনো আইন মানেন না
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!

তিনি ভরা তরী ডুবিয়ে দেন, তিনি টর্পেডো ও মাইন
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর

তিনি কাল বৈশাখী ঝড়ের মতো
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!

অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার এই তেজ তিনি স্বয়ং সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকেই পেয়েছেন।
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির!

নিজের শক্তি অবদমিত সাহসের কথা বলেছেন 

 

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি,

তিনি নিজেকে ঘূর্ণিঝড়ের সাথে তুলনা করেছেন
আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।

তিনি সামনে যা পান সব ভেঙে ফেলেন
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,

তিনি নৃত্য-পাগল ছন্দ

আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।

তিনি নিজের তালে মুক্ত জীবনানন্দের মতো নেচে যান
আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,

নিজের ভেতরের কাব্যিক, সাঙ্গীতিক ও নান্দনিক রূপ প্রকাশ করেছেন।

আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’

কবি নিজেকে একটি চঞ্চল দোলা বা হিন্দোলের সঙ্গে তুলনা করেছেন

পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’

কবির চঞ্চল রূপে বহিঃপ্রকাশ 

ফিং দিয়া দিই তিন দোল;

চঞ্চল রূপের ঠিক পরেই কবি আবার তাঁর চিরচেনা বিধ্বংসী ও রূপে ফিরে গেছেন

আমি চপলা-চপল হিন্দোল।

তাঁর বিদ্রোহী সত্তা কেবল ধ্বংস বা যুদ্ধের নয়; তা একই সাথে আনন্দ, সৃষ্টি এবং প্রাণের চঞ্চলতায় ভরপুর

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,

তার যখন যা মন চায় তখন তাই করেন

করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা,

কখনো শত্রুর সাথে গলাগলি করেন, কখনো মৃত্যুর সাথে পান্জা লড়েন

আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা!

তিনি উন্মাদ ঝন্ঝা

আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;

তিনি নিজেকে মহামারী এবং পৃথিবীর ভয় বলেছেন

“আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর!

কবি এখানে শোষক ও অন্যায়কারী শাসকদের মনে ত্রাস বা ভয়ের সঞ্চারকারী এক মহাশক্তি

বল বীর – আমি চির উন্নত শির!

নিজের শক্তি অবদমিত সাহসের কথা বলেছেন 

পরিশেষে বলা যায় বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য অসাধারণ কবিতা বিদ্রোহী। এই কবিতে কবি কাজী নজরুল ইসলাম নিজেকে বিভিন্ন ভাবে ভূষিত করে নিজের শক্তি ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। সমাজের সকল অন্যায় অত্যাচার শোষণ শাসন জুলুম নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে মানবতার বাণী নিয়ে এসেছেন এই কবিতায়।

FAQ

১. বিদ্রোহী কবিতার মূল বক্তব্য কী?
উত্তর: অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই কবিতার মূল বক্তব্য।

২. বিদ্রোহী কবিতায় কবি নিজেকে কী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন?
উত্তর: কবি নিজেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, দুর্বার ও অদম্য শক্তির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

৩. বিদ্রোহী কবিতায় বিদ্রোহের প্রধান উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: সব ধরনের শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা।

৪. বিদ্রোহী কবিতায় কবি কোন মানবিক আদর্শ তুলে ধরেছেন?
উত্তর: সাম্য, স্বাধীনতা, মানবতা, ন্যায়বিচার ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শ তুলে ধরেছেন।

৫. বিদ্রোহী কবিতা বাংলা সাহিত্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: পরাধীনতা ও শোষণের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ এবং শক্তিশালী বিদ্রোহী চেতনার প্রকাশ ঘটানোর জন্য কবিতাটি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120