সমাস কাকে বলে? কত প্রকার?

সমাস

সমাস’ শব্দটির অর্থ সংক্ষেপণ। পাশাপাশি  সম্পর্কিত  দুইটি  বা তার বেশি পদ একসাথে মিলে সমাস গঠিত হয়। বাংলা ব্যাকরণের একটি অনতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় সমাস। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, BCS, NTRC শিক্ষক নিবন্ধনসহ যে কোনো চাকরি পরিক্ষায় সমাস থেকে প্রশ্ন আসে। এজন্য এই বিষয়টি অধিকার গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

সমাস সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা না থাকার কারণে এ বিষয় থেকে প্রশ্ন আসলে কনফিউজ থাকে। অনেক জানা প্রশ্ন ও গুলিয়ে যায়। সেই কনফিউজ দূর করতে এই আর্টিকেলে সমাস কাকে বলে? কত প্রকার ও কী কী? বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এবং ভুল গুলো সহজেই বুঝতে পারবেন। এই আর্টিকেলটা  মনোযোগ সহকারে পড়লে আশাকরি সমাস নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

 

সমাস কাকে বলে কত প্রকার

 

 

সমাস কাকে বলে? কত প্রকার?

সমাস কাকে বলে? 

অর্থ আছে এমন দুই বা তার বেশি পদ একসঙ্গে মিলে একপদে পরিণত হওয়াকে সমাস বলে। যেমন: ‘ইন্দ্রকে জয় করেছে যে’ না বলে আমরা ‘ইন্দ্রজিৎ’  বলে থাকি। এতে ভাষা সহজ, সরল, সাবলীল ও শ্রুতিমধুর হয় এবং এর সাহায্যে আমরা নতুন অনেক শব্দও পাই। সমাসের রীতি সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে। তবে খাঁটি বাংলায়ও প্রচুর সমাসের উদাহরণ পাওয়া যায়।

 

 

সমাসের প্রয়োজনীয়তা

বাংলা ব্যাকরণে সমাসের প্রয়োজনীয়তা অপরসীম। ভাষার গভীরতা বৃদ্ধিতে সমাসের ভুমিকা ব্যাপক। এছাড়াও একাধিক পদকে একত্রিত করে নতুন শব্দ গঠন, ভাষায় সৌন্দর্য বৃদ্ধির ও শ্রুতিমধুর করতে সমাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য গুলো হলো:

১. ভাষা গভীরতা বৃদ্ধি

২ ভাষা শ্রুতিমধুর করা

৩. ভাষার সৌন্দর্য বৃষ্টি

৪. ভাষায় অলংকার বৃদ্ধি

৫. নতুন শব্দ গঠন

৬. ভাষা সংক্ষিপ্ত করা

৭. নতুন  শব্দের উৎপত্তি

 

 

সমাসের বৈশিষ্ট্য 

সমাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো একাধিক পদকে একত্রিত করে নতুন শব্দ গঠন করা। ভাষাকে সংক্ষিপ্ত কর, বিভক্তি লোপ পাওয়া ও ভাষায় সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা। এর মাধ্যমে নতুন অর্থ প্রকাশ পায়।

 

 

 

সমাসের পদসমূহ 

 

সমস্যমান পদ

যেসব পদ মিলে সমাস হয় তার প্রত্যেকটিকে সমস্যমান পদ বলে। যেমন: বিলাত থেকে ফেরত  = বিলাতফেরত  এখানে বিলাত থেকে ফেরত – এ দুটি সমস্যমান পদ।

 

সমস্তপদ

সমস্যমান পদগুলো দ্বারা যে একটি পদ গঠিত হয়, তাকে সমস্তপদ বলে। একে সমাসবদ্ধ পদও বলা হয়। যেমন: ‘বিলাতফেরত’ একটি সমস্তপদ।

 

ব্যাসবাক্য

সমস্যমান পদগুলো মিলে যে বাক্য গঠিত হয় তাকে ব্যাসবাক্য বলে। অন্যকথায়, সমস্তপদকে বিশ্লেষণ করলে যে বাক্য পাওয়া যায় তাকে ব্যাসবাক্য বলে। যেমন ‘বিলাতফেরত’  সমস্তপদটির ব্যাসবাক্য হচ্ছে ‘বিলাত থেকে ফেরত’। ব্যাসবাক্যের অন্য দুটো নাম ‘বিগ্রহবাক্য’ ও ‘সমাসবাক্য’।

 

পূর্বপদ

সমস্তপদে সাধারণত দুটো পদ থাকে। প্রথম পদটিকে পূর্বপদ বলে। যেমন: ‘বিলাতফেরত’ সমস্তপদে পূর্বপদ হচ্ছে ‘বিলাত’।

 

পরপদ

সমস্তপদের দ্বিতীয় বা শেষ পদটিকে বলা হয় পরপদ বা উত্তরপদ। যেমন: ‘বিলাতফেরত’ শব্দে ‘ফেরত’ পরপদ।

 

 

সমাস কত প্রকার?

সমাস প্রাধনত ছয় প্রকার। ছয় প্রকার সামস চেনার উপায়, সংজ্ঞা, প্রকারভে, ব্যাসবাক্য ও উদাহরণ বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হলো।

১. দ্বন্দ্ব সামস

২. দ্বিগু সামস

৩. কর্মধারয় সামস

৪. তৎপুরুষ সামস

৫. অব্যয়ীভাব সামস

৬. বহুব্রীহি সামস

 

 

 

১. দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি পদ সমাস গুরুত্ব পায় তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।অর্থাৎ পূর্বপদ ও পরপদ সমান গুরুত্ব পাবে।এবং, ও, আর এই তিনটি সংযোজক অব্যয় দ্বন্দ্ব দ্বারা পূর্বপদ ও পরপদ বিভক্ত থাকবে।

দ্বন্দ্ব সমাস চেনার উপায় 

১. সমাসে সমস্যমান পদগুলি সংযোজক অব্যয় দ্বারা যুক্ত থাকে।

২. উভয় পদের অর্থই প্রাধান্য পায়।

যেমন: ঘর ও বাড়ি = ঘরবাড়ি

 

দ্বন্দ্ব সমাসের প্রকারভেদ

দ্বন্দ্ব সমাস গঠন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলো এবং তার উদাহরণ তুলে ধরা হলো।

ক. মিলনার্থক দ্বন্দ্ব

কাছাকাছি অর্থ-সম্পর্কযুক্ত একাধিক পদের মিলে যে দ্বন্দ্ব সমাস গঠিত হয়, তাকে মিলনার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

  • জ্বীন ও পরী= জ্বীনপরী
  • মা ও বাবা = মাবাবা
  • চন্দ্র ও সূর্য = চন্দ্রসূর্য
  • হাত ও পা = হাতপা
  • লেখা ও পড়া= লেখাপড়া

 

খ. সমার্থক দ্বন্দ্ব

যে দ্বন্দ্ব সমাস একই অর্থ বা সমার্থক পদ দিয়ে গঠিত হয়, তাকে সমার্থক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

  • হাট ও বাজার – হাটবাজার
  • বই ও খাতা = বইখাতা

 

গ. বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব

যে দ্বন্দ্ব সমাস বিপরীত অর্থবোধক পদ দ্বারা গঠিত হয়, তাকে বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব সমাস

বলে। যেমন:

  • আয় ও ব্যায় = আয়ব্যয়
  • ভালো ও মন্দ = ভালোমন্দ
  • জন্ম ও মৃত্যু = জন্মমৃত্যু

 

ঘ. অলুক দ্বন্দ্ব

যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না, এবং তা সমস্ত পদেও যুক্ত হয়, তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

  • ধনে ও জনে= ধনে-জনে
  • ঘরে ও বাইরে = ঘরে-বাইরে
  • জলে ও স্থলে = জলে-স্থলে

 

ঙ. ইত্যাদি অর্থে দ্বন্দ্ব

পরপদে পূর্বপদের আংশিক পরিবর্তন দ্বারা যে দ্বন্দ্ব সমাস হয়, তাকে ইত্যাদি অর্থে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন:

  • ঠিক ও ঠাক = ঠিকঠাক
  • বকা ও ঝকা = বকাঝকা
  • আলাপ ও সালাপ = আলাপ-সালাপ

 

চ. বহুপদী দ্বন্দ্ব 

তিন বা বহু পদ দিয়ে  দ্বন্দ্ব সমাস গঠিত হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে। যেমন :

  • চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও তারা = চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা
  • পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা = পদ্মা-মেঘনা-যমুনা
  • সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যা = সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা

 

 

 

২. দ্বিগু সমাস

যে সমাসে মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে বিশেষ্য নামপদ যুক্ত হয় তাকে দ্বিগু সমাস বলে। দ্বিগু সমাস চেনার সহজ উপায় হলো ব্যাস বাক্যে সমাহার আসবে। যেমন: নবরত্নের সমাহার = নবরত্ন। এখানে পূর্বপদে সংখ্যা আসছে নয় আর পর পদে  সমহার। এভাবে দ্বিগু সমাস সহজে চেনা যাকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ দেওয়া হলো।

  • চার অঙ্গের সমাহার = চতুরঙ্গ।
  • অষ্টধাতুর সমাহার = অষ্টধাতু।
  • শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী
  • ত্রি ফলের সমাহার = ত্রিফলা
  • পঞ্চ ভূতের সমাহার = পঞ্চভূত

 

 

 

৩. অব্যয়ীভাব সমাস

যে সমাসে পূর্বপদে অব্যয় থাকে এবং অব্যয়ের অর্থই প্রাধান্য পায় তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে। যেমন: গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ, কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ, বনের সাদৃশ= উপবন। অর্থাৎ পূর্বপদে অব্যয় থাকলে সেটা গুরুত্ব পাবে।এখানে আমরা দেখি গ্রহের তুল্য এর সমস্তপদ উপগ্রহ। পূর্বপদে গ্রহ ছিলো সেটা এখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

অব্যয়ীভাব সমাস চেনার সহজ উপায়

১. পূর্ব পদে অব্যয় থাকে।

২. অব্যয়েরই অর্থের প্রাধান্য থাকে।

৩. এ সমাসের ব্যাসবাক্যে অব্যয় থাকে না। কিন্তু সমস্ত পদে থাকে।

 

বিভিন্ন অর্থে অব্যয়ীভাব সমাস 

ক. সামীপ্য অর্থে

  • কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ
  • কূলের সমীপে = উপকূল

 

খ. সাদৃশ্য অর্থে

  • গ্রহের তুল্য = উপগ্রহ
  • বনের সদৃশ = উপবন

 

গ. অভাব অর্থে

  • উৎসাহের অভাব = নিরুৎসাহ
  • আমিষের অভাব = নিরামিষ

 

ঘ. যোগ্যতা অর্থে

  • প্রেরণার যোগ্য = অনুপ্রেরণা
  • রূপের যোগ্য = অনুরূপ
  • দিন দিন = প্রতিদিন
  • ক্ষণ ক্ষণ = অনুক্ষণ

 

ঙ. অতিক্রান্ত অর্থে

  • শৃঙ্খলাকে অতিক্রান্ত = উচ্ছৃঙ্খল
  • বেলাকে অতিক্রান্ত = উদ্বেল

 

চ. বিরোধ অর্থে

  • বিরুদ্ধ বাদ = প্রতিবাদ
  • বিরুদ্ধ কূল = প্রতিকূল

 

ছ. ঈষৎ অর্থে

  • ঈষৎ নত = আনত
  • ঈষৎ রক্তিম = আরক্তিম

 

জ. পশ্চাৎ অর্থে

  • পশ্চাৎ গমন = অনুগমন
  • পশ্চাৎ ধাবন = অনুধাবন

 

ঝ. পর্যন্ত অর্থে

  • সমুদ্র থেকে হিমাচল পর্যন্ত = আসমুদ্রহিমাচল
  • পা থেকে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক

 

ঞ. অনতিক্রম্যতা অর্থে

  • বিধিকে অতিক্রম না করে = যথাবিধি
  • সাধ্যকে অতিক্রম না করে = যথাসাধ্য

 

 

৪. তৎপুরুষ সমাস

যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায় এবং পূর্বপদের দ্বিতীয়াদি (দ্বিতীয়-সপ্তমী) বিভক্তি লোপ পায়, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন: ফুলকে তোলা = ফুলতোলা এখানে ‘কে’ বিভক্তি লোপ পেয়েছে এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য পেয়েছে।

তৎপুরুষ সমাস চেনার সহজ উপায় 

১. পরপদের অর্থ প্রাধান্য পাবে

২. পূর্বপদে বিভক্তি লোপ পাবে

 

তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদ 

তৎপুরুষ সমাস ৯ প্রকার হয়ে থাকে। সেগুলোর প্রতিটির বিবরণ ও উদাহরণ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

 

ক. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ

পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে। যেমন:

  • ফুলকে তোলা = ফুলতোলা
  • মাথাকে গোঁজা = মাথাগোঁজা

ব্যাপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন:

  • চিরকাল ব্যাপীয়া সুখী = চিরসুখী
  • ক্ষণকাল ব্যাপী স্থায়ী = ক্ষণস্থায়ী –
  • চিরকাল ব্যাপী স্মরণীয় = চিরস্মরণীয়
  • কাপড়কে কাচা = কাপড়কাচা

 

খ. তৃতীয়া তৎপুরষ

পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়া, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলা হয়। যেমন :

  • মন দিয়ে গড়া = মনগড়া
  • শ্রম দ্বারা লব্ধ = শ্রমলব্ধ

পরপদে হীন, পূর্ণ, শূন্য ইত্যাদি থাকলেও তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়। যেমন:

  • জন দ্বারা শূন্য = জনশূন্য
  • বিদ্যা দ্বারা হীন = বিদ্যাহীন
  • বায়ু দ্বারা পূর্ণ = বায়ুপূর্ণ

 

গ. চতুর্থী তৎপুরুষ

পূর্বপদের চতুর্থী বিভক্তি কে, রে লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে।

  • বিয়ের জন্য পাগলা = বিয়েপাগলা
  • তপের নিমিত্ত বন = তপোবন
  • পাঠের জন্য কক্ষ = পাঠকক্ষ
  • এতিমের জন্য খানা = এতিমখানা

 

ঘ. পঞ্চমী তৎপুরুষ

পূর্বপদের পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে চেয়ে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে।

  • খাঁচা থেকে ছাড়া = খাঁচাছাড়া
  • বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত
  • মেঘ থেকে মুক্ত = মেঘমুক্ত

ঙ. ষষ্ঠী তৎপুরুষ

পূর্বপদের ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।

 

  • রাজার প্রাসাদ = রাজপ্রাসাদ
  • ভোটের অধিকার = ভোটাধিকার
  • কর্মের ফল = কর্মফল
  • রাজার পুত্র = রাজপুত্র

 

চ. সপ্তমী তৎপুরুষ

পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পেয়ে যে তৎপুরুষ সমাস হয়, তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলা হয়।

  • মাথায় ব্যথা = মাথাব্যথা
  • রাতে কানা = রাতকানা
  • বনে ভোজন = বনভোজন

 

ছ. উপপদ তৎপুরুষ

কোনো শব্দকে ভাঙলে  যদি আলাদা একটি পদ, একটি ধাতু ও একটি কৃৎ প্রত্যয় পাওয়া যায়, তবে ওই পদকে উপপদ বলা হয়।

  • গৃহে থাকে এমন = গৃহস্থ
  • সত্য বলে যে = সত্যবাদী
  • জাদু করে এমন = জাদুকর

জ. অলুক তৎপুরুষ

পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না যে তৎপুরুষ সমাসে, তাকে অলুক বা অলোপ তৎপুরুষ সমাস বলে। তৎপুরুষ সমাসের যতগুলো শ্রেণি রয়েছে, অলুক তৎপুরুষ তার প্রায় সব রকমই হতে পারে। যেমন:

  • ঘোড়ারডিম
  • ঘোড়ার ডিম।
  • কলেরগান
  • কলের গান

ঝ. নঞ তৎপুরুষ 

নাই, নেই ইত্যাদি নেতিবাচক অব্যয় পূর্ব পদে থাকবে কিন্তু ব্যাস বাক্যের শেষে যার আনা যাবে না। যেমন:

  • অধর্ম- ন ধর্ম।
  • অনাসক্ত – নয় আসক্ত।
  • অব্যয় – ন ব্যয়।
  • অসুখ – নয় সুখ।
  • অস্থির – নয় স্থির।
  • অনেক – ন এক

 

৫. কর্মধারয় সমাস

যে সমাসে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে।অর্থাৎ এখানে পরপদে গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ব্যাস বাক্যের মাঝে ‘যে’ বা ‘যিনি-তিনি’ দ্বারা ব্যাস বাক্য হবে। যেমন: মহান যে ঋষি = মহার্ষি

কর্মধারয় সমাস চেনার সহজ উপায় 

কর্মধারয় সমাস চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ব্যসবাক্য করলে এর মাঝে যে, যিনি, তিনি যাহা ইত্যাদি আসবে এবং পরপদের অর্থ গুরুত্ব পাবে।

 

কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ 

কর্মধারয় সমাসকে ৫ ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলো উদাহরণসহ তুলে ধরা হলো।

 

ক. সাধারণ কর্মধারয় 

মধ্যপদলোপী, উপমান, উপমিত ও রূপক কর্মধারয় সমাস ছাড়া অন্যান্য কর্মধারয় সমাসকে সাধারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। সমাসবদ্ধ শব্দে বিশেষ্য ও বিশেষণের অবস্থান অনুসারে সাধারণ কর্মধারয় সমাসের কয়েকটি ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। যেমন:

বিশেষণ-বিশেষ্য

  • মহান যে নবি = মহানবি
  • ছিন্ন এমন পত্র = ছিন্নপত্র

বিশেষণ-বিশেষণ

  • কাঁচা তবু মিঠে = কাঁচামিঠে
  • যে চালাক সেই চতুর = চালাকচতুর

বিশেষ্য-বিশেষণ

  • পড়া এমন তেল = তেলপড়া
  • ভাজা এমন মাছ = মাছভাজা

 

খ. উপমান কর্মধারয়

উপমান অর্থ তুলনীয় বস্তু।প্রত্যক্ষ বস্তুর সাথে পরোক্ষ বস্তুর তুলনা করলে প্রত্যক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমেয় এবং পরোক্ষ বস্তুটিকে বলা হয় উপমান।যেমন: ভ্রমরের ন্যায় কৃষ্ণ কেশ

উপমান কর্মধারয় চেনার উপায়:

১. সমস্ত পদে একটি বিশেষ্য অপরটি বিশেষণ হবে।

২. উপমান পদ থাকবে উপমেয় পদ থাকবে না।

৩. সাধারণ গুণ উল্লেখ থাকবে।

৪. তুলনা বুঝাবে।

উদাহরণ:

  • ঘনশ্যাম = ঘনের ন্যায় শ্যাম
  • তুষারশুভ্র = তুষারের ন্যায় শুভ্র
  • বকধার্মিক = বকের ন্যায় ধার্মিক

 

 

গ. উপমিত কর্মধারয়

উপমেয় পদের সাথে উপমান পদের সমাস হয়।

উপমিত কর্মধারয়চেনার উপায়

১. সমস্ত পদে দুটি বিশেষ্য হয়।

২. সাধারণ গুণের উল্লেখ থাকে না।

৩. তুলনা বুঝাবে।

উদাহরণ:

  • মুখচন্দ্র = মুখ চন্দ্রের ন্যায়
  • পুরুষসিংহ = পুরুষ সিংহের ন্যায়
  • অধরপল্লব = অধর পল্লবের ন্যায়

 

ঘ. রূপক কর্মধারয়

যে কর্মধারয় সমাসে উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে অভিন্নতা কল্পনা করা হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে।

রূপক কর্মধারয় চেনার উপায়:

১. দুটি বিশেষ্য সমস্ত পদে থাকে।

২. ব্যাস বাক্যে রূপ শব্দটি আনতে হয়।

৩. কাল্পনিক তুলনা বুঝাবে।

উদাহরণ:

  • মন রূপ মাঝি = মনমাঝি
  • বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাদসিন্ধু
  • জীবন রূপ প্রদীপ = জীবনপ্রদীপ
  • মোহ রূপ নিদ্রা = মোহনিদ্রা
  • যৌবন রূপ সূর্য = যৌবনসূর্য

 

ঙ. মধ্যপদলোপী কর্মধারয়:

যে কর্মধারয় সমাসে ব্যাস বাক্য থেকে মধ্যপদ লুপ্ত হয় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় বলে।

মধ্যপদলোপী কর্মধারয় চেনার উপায়:

১. দুটি বিশেষ্য সমস্ত পদে থাকে।

২. ব্যাস বাক্য স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা হয়।

৩. ব্যাস বাক্য থেকে প্রধান পদটি লুপ্ত হয়।

উদাহরণ:

  • জ্যোৎস্না শোভিত যে রাত = জ্যোৎস্নারাত
  • স্মৃতি রক্ষার্থে যে সৌধ = স্মৃতিসৌধ
  • সাহিত্য বিষয়ক যে সভা = সাহিত্যসভা
  • বট নামক যে বৃক্ষ = বটবৃক্ষ
  • খেয়াঘাট = খেয়া পারাপারের জন্য যে ঘাট

 

 

৬. বহুব্রীহি সমাস

যে সমাসের সমস্ত পদে সমস্যমান পদগুলোর কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে, অন্য কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে বোঝায়, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে। যেমন: বহুব্রীহি = বহু ব্রীহি আছে যার। এখানে যার বহু ধান আছে এমন লোককে বোঝাচ্ছে।সম্পূর্ণ অন্য একটি অর্থ বোঝানো হয়েছে।

 

বহুব্রীহি সমাসের প্রকারভেদ 

বহুব্রীহি সমাকেন ৮ ভাগে ভাগ করা হয়।  সেগুলোর উদাহরণসহ তুলে ধরা হলো।

 

ক. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি

সমস্ত পদটি বিশেষণ+বিশেষ্য হয়। এবং তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • হতশ্রী = হত হয়েছে শ্রী যার
  • খোশমেজাজ = খোশ মেজাজ যার
  • উচ্চশির = উচ্চ শির যার
  • নীলকণ্ঠ = নীল কণ্ঠ যার

 

খ. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি

সমস্ত পদে বিশেষণ থাকে না।তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • আশীবিষ = আশীতে বিষ যার
  • কথাসর্বস্ব = কথা সর্বস্ব যার

 

গ.  ব্যতিহার বহুব্রীহি

সমস্ত পদটি কোনো কাজ করা বা ক্রিয়া বুঝাবে। তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • কানাকানি = কানে কানে যে কথা
  •  হাতাহাতি = হাতে হাতে যে লড়াই
  • কোলাকুলি = কোলে কোলে যে মিলন

 

ঘ. নএর বহুব্রীহি

নতুন অর্থ সমস্ত পদে নাবোধক অব্যয় থাকে। ব্যাস বাক্যের শেষে ‘যার’ আসবে। তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • অপয়া = নেই পয় যার
  • বেহায়া = নেই হায়া যার

 

ঙ. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি

ব্যাস বাক্যটি স্বাভাবিকের চেয়ে লম্বা হয়। ব্যাস বাক্য থেকে মধ্যবর্তী পদ লুপ্ত হয়। যেমন-

  • মেনিমুখো = মেনির মতো মুখ আছে যার
  • গায়ে হলুদ = গায়ে হলুদ দেয়া হয় যে অনুষ্ঠানে
  • বিড়ালচোখী = বিড়ালের চোখের মতো চোখ যার

 

চ. অলুক বহুব্রীহি

ব্যাস বাক্যের বিভক্তি সমস্ত পদে লুপ্ত হয় না। তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • হাতেছড়ি = হাতে ছড়ি আছে যার
  • কানেকলম = কানে কলম যার
  • মুখেভাত = মুখে ভাত যার

 

ছ. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি

সমস্ত পদের শেষে ও, আ, এ, ঈ থাকে। তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • একচোখা = এক দিকে চোখ যার।
  • ঘরমুখো – ঘরের দিকে মুখ যার।

 

জ. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি

সংখ্যা + বিশেষ্য = বিশেষণ। তৃতীয় পদের প্রাধান্য পায়। যেমন:

  • দোনলা = দু’ নল আছে যার।
  •  দ্বিপদী = দুই পদ আছে যার।

 

ঝ. নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি

দ্বীপ = দু দিকে অপ যার।

  • নরপশু = নর আকারের পশু যে।
  • অন্তরীপ = অন্তর্গত অপ যার।
  • পণ্ডিতমূর্খ = পণ্ডিত হয়েও মূর্খ।

 

এই ছয় প্রকার সমাস ছাড়াও বাংলা ব্যাকরণে আরো কিছু সমাস আছে। সেগুলোর হলো:

 

প্রাদি সমাস

পরি, প্র অনু প্রভৃতি অব্যয়ের সঙ্গে যদি কৃৎ প্রত্যয় সাধিত বিশেষ্যের সমাস হয়, তবে তাকে বলে প্রাদি (প্র-আদি) সমাস। যথা-

  • প্র (প্রকৃষ্ট) যে বচন = প্রবচন,
  • প্র (প্রকৃষ্টরূপে) গতি = প্রগতি

 

 

নিত্য সমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদগুলো নিত্য সমাসবদ্ধ থাকে, ব্যাসবাক্যের দরকার হয় না, তাকে নিত্য সমাস বলে।

যেমন:

  • তুমি আমি ও সে = আমরা,
  •  দুই এবং নব্বই= বিরানব্বই।

 

 

সংক্ষেপে ৬ প্রকার সমাস চেনার উপায়

সমস্ত পদটি দ্বারা কোন পদের প্রাধান্য পাচ্ছে তার উপর ভিত্তি করে ৬ প্রকার সমাসকে চেনা যায়। যেমন:

১। সকল পদের প্রাধান্য পেলে দ্বন্দ্ব হবে।

২। পূর্বপদের প্রাধান্য পেলে অব্যয়ীভাব হবে।

৩। পরপদের প্রাধান্য পেলে তিনটি সমাস হবে। যেমন: দ্বিগু, তৎপুরুষ, কর্মধারয়।

৪। কোন পদের প্রাধান্য না বুঝালে বহুব্রীহি হবে।

 

 

 

ব্যাস বাক্য দ্বারা সমাস চেনার উপায়

 

সমাসব্যাস বাক্যে

উদাহরণ

দ্বন্দ্ব সমাস

ব্যাস বাক্যে এবং, ও, আর থাকে।

মা ও বাবা = মাবাবা

দ্বিগু সমাস

ব্যাস বাক্যে সমাহার আসবে।

ত্রি ফলের সমাহার = ত্রিফলা

কর্মধারয় সামস

ব্যাস বাক্যের মাঝে ‘যে’ বা ‘যিনি-তিনি’ দ্বারা ব্যাস বাক্য হলে।

মহান যে নবি = মহানবি

 

তৎপুরুষ সামস

পূর্বপদ থেকে বিভক্তি লুপ্ত হলে অর্থাৎ ব্যাস বাক্যে পূর্বপদে

ফুলকে তোলা = ফুলতোলা

অব্যয়ীভাব সামসপূর্বপদ অব্যয় হবে এবং এর ব্যাখ্যা ব্যাস বাক্যের পরে থাকবে।

কূলের সমীপে = উপকূল

বহুব্রীহি সামস

ব্যাস বাক্যে যার আসবে।

হতশ্রী = হত হয়েছে শ্রী যার

 

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর

১. সমাস কাকে বলে?
অর্থ আছে এমন দুই বা তার বেশি পদ একসঙ্গে মিলে একপদে পরিণত হওয়াকে সমাস বলে।

২. সমাস কেন ব্যবহার করা হয়?
ভাষাকে সংক্ষিপ্ত, সহজ, অর্থবহ ও শ্রুতিমধুর করার জন্য সমাস ব্যবহার করা হয়।

৩. সমাসে বিভক্তির কী হয়?
সমাসে সাধারণত বিভক্তি লোপ পায় এবং পদগুলো একত্রিত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে।

৪. সমাস ও সন্ধির মধ্যে পার্থক্য কী?
সমাসে শব্দের অর্থগত মিলনে নতুন পদ তৈরি হয়, আর সন্ধিতে ধ্বনিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে শব্দ যুক্ত হয়।

৫. সমাস কত প্রকার?
বাংলা ব্যাকরণে প্রধানত ছয় প্রকার সমাস রয়েছে: দ্বন্দ্ব, তৎপুরুষ, কর্মধারয়, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।

 

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120