সোনার তরী কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

বাংলা সাহিত্যের ক্ষুরধার প্রতিভার অধিকারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা সোনার তরী। সোনার তরী কবিতাটি সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের নাম কবিতা। কবিতায় কবি নিজের দার্শনিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। সোনার তরী কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক গভীর দার্শনিক মতবাদ ব্যক্ত করেছেন। জীবনের অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান তিনি এই কবিতায় প্রকাশ করেছেন। একদিকে রবীন্দ্রনাথ একদিকে সৌন্দর্য প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছেন ও অন্যদিকে জীবনের নির্মম সত্য উপলব্ধি করেছেন। একই সাথে তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য বর্ণনা করেছেন এবং এবং জীবনের ক্ষণস্থায়ীত্ব তুলে ধরেছেন। এই নিবন্ধে সোনার তরী কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হয়েছে।

সোনার তরী কবিতার মূলভাব

সোনার তরী কবিতার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি ১৮৬১ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সাহিত্যের প্রতিটি ধারায় বিচরণ করেছেন। কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, গান, ভ্রমণ কাহিনী সবকিছুতেই তার পদচিহ্ন পড়েছে। পনের বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় হাতেখড়ি হয়। তারপর থেকে তিনি একটানা লিখে গেছেন কোথাও থামেননি। ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে সাহিত্যে তিনিই প্রথম নোবেল বিজয়ী। গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কার ভূষিত হন। তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাব্যগুলো হল সোনার তরী, মানসী, চিত্রা, বলাকা, ক্ষণিকা, জন্মদিনে, পুনশ্চ, শেষ লেখা গীতাঞ্জলি। এই মহান সাহিত্যিক ১৯৪১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

সোনার তরী কবিতার মূলভাব

সোনার তরী কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের গভীরতম উপলব্ধি প্রকাশ করেন। প্রথমে তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য তুলে ধরেন। অসাধারণ ভাবে তিনি প্রকৃতিকে উপস্থাপন করেছেন। আকাশে ভীষণ মেঘ ও প্রবল বৃষ্টি এর মাঝে একজন মানুষ একটি নির্জন ধানক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কেটে রেখেছে। চারপাশে তীব্র স্রোত সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেছে শুধুমাত্র ক্ষেতটি জেগে আছে। এরই মাঝে দাঁড়িয়ে লোকটির অব্যাক্ত মনের ভাবনা কবিতায় ফুটে উঠেছে। লোকটি নিরুপায় হয়ে চেয়ে দেখছে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা। নদীর ওপারের গ্রামটি দেখে তার ওপারে যেতে খুবই ইচ্ছা করছে কিন্তু যাওয়ার কোন উপায় নেই। সে নিরুপায় হয়ে কূলে বসে আছে।

এরই মাঝে লোকটি দেখতে পেল একজন মাঝি সোনার তরী বেয়ে চলে যাচ্ছে। সেই মাঝিকে লোকটির পরিচিত মনে হয়। কিন্তু সে কোন দিকে না চেয়ে সোজা চলে যেতে থাকে। তখন লোকটি নিরুপায় হয়ে বলে তরী কূলে নিয়ে এসো এবং আমাকে নিয়ে যাও। তুমি চাইলে আমার সমস্ত সোনার ধান নিয়ে যেতে পারো যা আমি সমস্ত জীবন ধরে সঞ্চয় করে রেখেছি। বিনিময়ে শুধুমাত্র আমাকে তোমার তরীতে ঠাই দাও। আমাকে নিয়ে যাও সমস্ত ধন-সম্পদের বিনিময়ে।

তখন সোনার তরী এসে লোকটির সঞ্চিত জীবনের সমস্ত সোনার ধান তুলে নেয়। ধান সোনার তরীতে উঠানোর পরে তরীতে আর কোন জায়গা নেই। তখন সোনার তরী লোকটিকে রেখে ধানগুলো নিয়েই চলে যায়। লোকটি আবার নদীর তীরে পড়ে থাকে। তার জীবনের অর্জিত সমস্ত সোনার ধান সোনার তরী এসে নিয়ে চলে যায়।তা র যা কিছু ছিল সব কিছু সেই সোনার তরী নিয়ে চলে গেছে।

এর মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন একদিন আমাদেরও এই পৃথিবীতে সব কিছু রেখে চলে। তিনি সোনার তরীকে পৃথিবী এবং জীবনের অর্জিত জ্ঞান, কৃতকর্ম ও ধনসম্পদকে সোনার ধানের সাথে তুলনা করেছেন। সবকিছু একদিন এই পৃথিবীতে রেখে চলে যেতে হবে। যেমনটি সোনার তরী কবিতায় দেখা যায় লোকটি তার জীবনের অর্জিত সমস্ত ধন সম্পদ সোনার তরীতে তুলে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে রয়ে যায়। মহাকালের কালগ্রাস জীবনকে শেষ করে দেয় কিন্তু বেঁচে থাকে মানুষের কর্ম।

সোনার তরী কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানুষের জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব তুলে ধরেছেন। কবি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে আমরা জীবন দিয়ে যে সম্পদ অর্জন করি তা একদিন এই পৃথিবীতেই রেখে যেতে হবে। সেটা কখনোইচিরস্থায়ী হবে না। তাই সোনার তরী কবিতায় জীবনের গভীরতম দার্শনিক দিকটি উপলব্ধি প্রকাশিত হয়েছে।

 

সোনার তরী কবিতার জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

১৮৬১ সালে

২. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত সালে মৃত্যুবরণ করেন?

১৯৪১ সালে

৩.  কত বছর বয়সে তার কবিতায় হাতে খড়ি হয়?

১৫ বছর বয়সে

৪. কোন কাব্যের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার ভূষিত?

গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings এর জন্য

৫. তিনি কত সালে নোবেল পুরস্কারের ঘোষিত হন?

১৯১৩ সালে

৬. গগনে গরজে কি?

ঘন মেঘ বর্ষা

৭. রাশি রাশি ভারা তার কি কাটা হলো?

ধান কাটা

৮. নদীর অবস্থা কেমন?

ক্ষুরধারা

৯. ধান কাটতে কাটতে কি এলো?

বরষা

১০. কোথায় লোকটি একা?

একখানি ছোট খেতে

১১.  চারিদিকে কি খেলা করছে?

বাঁকা জল

১২. ওপারের গ্রামখানি কেমন?

তরুছায়ামসী মাখা

১৩. তরী বেয়ে লোকটি কিভাবে আসছিল?

গান গেয়ে

১৪. লোকটি কিভাবে চলে যায়?

ভরা পালে

১৫. ঢেউ গুলো কি করে?

নিরুপায় হয়ে ভাঙে দুই ধারে

১৬. লোকটি মাঝিকে কি বলে?

তরী কূলে ভিড়াও

১৭. লোকটি মাঝি কে কি দিতে চায়?

সোনার ধান

১৮. বিনিময়ে কি চায়?

তরীতে ঠাই

১৯. তরীতে লোকটির ঠাঁই হয় না কেন?

ছোট সে তরী তাই

২০. তরী কিসে ভরে গেছে?

সোনার ধানে

২১. যা ছিল নিয়ে গেল কে?

সোনার তরী

 

FAQ

১. সোনার তরী কবিতার রচয়িতা কে?
উত্তর: সোনার তরী কবিতার রচয়িতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

২. সোনার তরী কবিতাটি কোন কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।

৩. সোনার তরী কবিতার মূলভাব কী?
উত্তর: কবিতার মূলভাব হলো মানুষের কর্ম ও সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিজের অবদান পৃথিবীতে রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিজীবনের অপূর্ণতার বেদনা।

৪. সোনার তরী কবিতায় মাঝি কীসের প্রতীক?
উত্তর: মাঝি কবিতায় জীবনপ্রবাহ, কাল বা মহাকালের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যাত।

৫. সোনার তরী কবিতায় কৃষকের ধান কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়?
উত্তর: কৃষকের সোনালি ধান সোনার তরীতে তুলে মাঝি অন্য পারে নিয়ে যায়।

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120