অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের মূলভাব ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন বিশ্লেষণ

উনিশ শতকের বাঙালি মুসলিম নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার “অর্ধাঙ্গী” প্রবন্ধে অধিকার বঞ্চিত নারীদের অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। তৎকালীন পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের কোনো অধিকারই ছিল না। পুরুষেরা নিজেদের স্বার্থ ও আধিপত্য বিস্তারের কারণে নারীদেরকে পশ্চাৎপদ করে রেখেছিল। এই প্রবন্ধে তিনি যুক্তি দিয়ে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। সমাজের অধঃপতনের জন্য তিনি পুরুষদেরকে দায়ী করেছেন। কারণ সমাজ কখনো তার অর্ধেকটা বাদ দিয়ে অগ্রসর হতে পারে না। নারীরা সেই সমাজের অপরিহার্য অর্ধেক। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন সমাজের অগ্রগতি ও মঙ্গল সাধনের জন্য নারী জাগরণের পাশাপাশি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের বিকল্প নেই। এই আর্টিকেলে “অর্ধাঙ্গী” প্রবন্ধের মূলভাব ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন আলোচনা করা হলো।

 

অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের মূলভাব

অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের লেখক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বেগম রোকেয়া এক রক্ষণশীল মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পারিবারিকভাবে নারীদের শিক্ষার কোনো অধিকার ছিল না। ফলে বিয়ের আগে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। তিনি নিজের ইচ্ছায় বোন, বড়ভাই এবং বিয়ের পর স্বামী সাখাওয়াত হোসেনের কাছ থেকে বাংলা এবং ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করেন।

 

তৎকালীন সময়ে নারীদের পশ্চাৎপদ করে রাখার দৃশ্যটি নিজ চোখে দেখেন। ফলে নারীদের অধিকার নিয়ে তিনি সচেষ্ট হন। বিয়ের পর তিনি নারীদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রচনা করে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হন। ১৯১১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল। ১৯১৬ সালে নারীদের অধিকার রক্ষায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম। তার রচিত গ্রন্থসমূহ হলো:

  • মতিচূর (১ম খণ্ড)
  • সুলতানার স্বপ্ন (Sultana’s Dream)
  • মতিচূর (২য় খণ্ড)
  • পদ্মরাগ
  • অবরোধবাসিনী

এই মহীয়সী নারী ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

 

 

অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের মূলভাব

সমাজের অধিকার বঞ্চিত পিছনে পড়া নারীদের আলোর মুখ দেখাতে আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এসেছিলেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। “অর্ধাঙ্গী” শব্দের অর্থ হলো অর্ধেক। নারীরা সমাজের অর্ধেক, আর এই অর্ধেক অংশ বাদ দিয়ে কখনো সমাজের অগ্রগতি সাধন করা সম্ভব নয়। সেটি তুলে ধরেছেন অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধে। প্রাচীনকাল থেকেই নারীরা বিভিন্ন কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে তারা অবরোধবাসিনী হয়ে যায়। তাদের পায়ে পরিয়ে দেওয়া হয় পরাধীনতার জিঞ্জির। সবরকম শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা হয় যেন তারা আলোর মুখ না দেখতে পারে।

 

তিনি তৎকালীন সমাজের চিত্র তুলে ধরে নারীদের পশ্চাৎপদ অবস্থাকে উপস্থাপন করেছেন। যেখানে স্বামী নক্ষত্রের দূরত্ব মাপে, সেখানেই স্ত্রী বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য মাপে। এর মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন কিভাবে নারীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে, তাদেরকে সব রকম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে শুধুমাত্র ভাগ্যবস্তু হিসাবে রাখা হয়েছে। নারীদেরকে সেসময় দাসে পরিণত করা হয়েছিল। যেখানে স্বামী নক্ষত্র ও ধূমকেতুর দূরত্ব মাপে, সেখানে স্ত্রী রান্নার জন্য চালের ওজন মাপে। এর মাধ্যমে নারীদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। ধর্মীয় কুসংস্কার ও রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীদেরকে পদ্মার আড়ালে রাখা হয়েছিল। তিনি সেই সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন যেখানে নারীকে পুতুল হিসাবে পুরুষেরা ব্যবহার করে। ইচ্ছে হলে তাকে দূরে ফেলে দেয়, আবার ইচ্ছা হলে তাকে কাছে টেনে নেয়।

 

তিনি মনে করেন নারীদের এই পিছিয়ে পড়ার পিছনে রয়েছে অশিক্ষা, কুসংস্কার ও রক্ষণশীল মনোভাব। তিনি মনে করেন নারীরা সমাজের অর্ধেক, আর এই অর্ধেক অংশকে বাদ দিয়ে কখনো সমাজ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হবে না। তিনি নারী ও পুরুষকে দুই চাকা বিশিষ্ট একটি যানবাহনের সাথে তুলনা করেছেন। যার একটি যদি ছোট হয়, তাহলে সেটি আর সামনের দিকে এগোতে পারে না, একই জায়গায় ঘুরতে থাকে। এমনি নারী সমাজের অর্ধেক, আর এই অর্ধেক অংশকে বাদ দিলে সমাজ সামনের দিকে এগোতে পারে না।

 

পরিবারেও কন্যা সন্তানের প্রতি অবিচার করা হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে ছেলেদের লেখাপড়ার জন্য বিভিন্ন স্কুল ও কলেজ তৈরি হয়েছিল এবং তাদেরকে অনেক টাকা পয়সা খরচ করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করা হতো, অথচ মেয়েদের কোনো শিক্ষা দেওয়া হতো না। তাদের ঘরেই অবরোধবাসিনী করে রাখা হতো। সম্পত্তি বন্টনের ক্ষেত্রেও মুসলমান মেয়েদের প্রতি অবিচার করা হতো। কোনো পুত্র সন্তান যা পাবে, তার অর্ধেকটা কন্যা পাবে। তৎকালীন সময়ে নারীদেরকে সব রকম সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হত।

 

তিনি নারীদের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। তাদের অগ্রগতির পিছনে অন্তরায় ছিল অশিক্ষা। তাই নারীদেরকে শিক্ষিত হওয়ার জন্য এই প্রবন্ধে জোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সমাজে নারী-পুরুষ যেদিন সমান অধিকার পাবে, সেদিন সমাজের অগ্রগতি সাধিত হবে। সমাজের অর্ধেকটা বাদ দিয়ে কখনো অগ্রগতি ও কল্যাণ সম্ভব নয়, সেটি এই প্রবন্ধের প্রতি পরতে পরতে তুলে ধরেছেন।

 

 

অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন-উত্তর

 

১. অর্ধাঙ্গী প্রবন্ধের লেখক কে? 

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

 

২. বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কত সালে জন্মগ্রহণ করেন? 

১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর, রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে

 

৩. তিনি কত সালে মৃত্যুবরণ করেন? 

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর

 

৪. তার স্বামীর নাম কি? 

সাখাওয়াত হোসেন

 

৫. অবলাজাতির উন্নতির পথ আবিষ্কার করার পূর্বে তাদের কোন চিত্র দেখতে হয়? 

অবনতির

 

৬. স্ত্রী জাতির অবনতি প্রবন্ধে তিনি নারীদের কোন রোগের কথা বলেছেন? 

দাসত্ব

 

৭. স্ত্রী জাতির অবনতি প্রবন্ধে তিনি কোন দাসত্বের কথা বলেছে? 

মানসিকতা দাসত্বের

 

৮. এখানে তিনি কোন দেশের মহিলাদের পরিবর্তিত অবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন? 

পার্সি

 

৯. পার্সি কোন দেশ? 

পারস্য বা ইরান

 

১০. পার্সি মহিলাদের কি মোচন হয়েছে? 

পর্দা

 

১১. কে আমেরিকা আবিষ্কার করতে কৃতসংকল্প করেছিলেন?

কলম্বাস।

 

১২. তখন লোক তাকে কী বলেছিল?

বাতুল।

 

১৩. বাতুল শব্দের অর্থ কী?

পাগল।

 

১৪. লোকে কাদের ভয় করে পূজা করে?

কালী, শীতলা প্রভৃতি রাক্ষস প্রকৃতির দেবীদের।

 

১৫. নারী শিক্ষা দেওয়ার জন্য গুরুলোক কাকে আদর্শ রূপে দেখেন?

সীতাকে।

 

১৬. সীতা কার অর্ধাঙ্গী ছিল?

রামচন্দ্রের।

 

১৭. কে স্বামীত্বের ষোল আনা পরিচয় দিয়েছেন?

রামচন্দ্র।

 

১৮. আমাদের সাংসারিক জীবন কিসের ন্যায়?

দ্বিচক্র শকটের ন্যায়।

 

১৯. শকট মানে কী?

গাড়ি।

 

২০. নবদম্পতির প্রেম আলাপ কবিতাটি কার লেখা?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

 

২১. স্বামী যখন পৃথিবী থেকে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপে, স্ত্রী তখন কী মাপেন?

বালিশের ওয়াড়ের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ।

 

২২. অনেকেই বলেন কাদের উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজন নেই?

স্ত্রীলোকদের।

 

২৩. আরববাসীগণ যখন কন্যাহত্যা করছিল, তখন কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ কে দণ্ডায়মান হয়েছিলেন?

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

 

২৪. জগতে যখন অন্যায় অত্যাচার বেড়ে গেছে, তখন কে এসে সেটা দমন করেছেন?

এক একজন পয়গম্বর।

 

২৫. কে নেই বলে আজ আমাদের এই দুর্দশা?

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

 

২৬. অর্ধাঙ্গী শব্দের অর্থ কী?

অর্ধেকটা।

 

২৭. শুক্লকেশ শব্দের অর্থ কী?

সাদা চুল।

 

২৮. কাদম্বিনী মানে কী?

মেঘমালা।

 

২৯. সূত্রধর শব্দের অর্থ কী?

কাঠমিস্ত্রি।

 

৩০. এন্টাস শব্দের অর্থ কী?

প্রবেশিকা বা মাধ্যমিক।

 

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120