বাঙালি জাতির জন্য এক মহাগৌরবের নাম মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু এই যুদ্ধে বাঙালি জাতি অনায়াসেই জয়ী হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি কেবলমাত্র একটি স্বাধীন দেশই পায়নি, এর পেয়েছে হাজার বছরের দাসত্ব থেকে মুক্তির ছাড়পত্র। তাই এই মুক্তিযুদ্ধ কেবল তার সংগ্রামময়ী আন্দোলনই ছিল না, ছিল পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তির জাগরণ। আর এই জাগরণে অভাবনীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বাংলার কবি, সাহিত্যেক, লেখক, গীতিকার ইত্যাদি ব্যক্তিবর্গরা। বিভিন্ন কবিরা তাঁদের শব্দের ধারালো অস্ত্র দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। কবিতা ছিল তখনকার সময়ে বাঙালি জাতির প্রেরণার উৎস। কবিরা যুদ্ধ করেছেন শব্দসৈনিক হয়ে যাঁদের অস্ত্র ছিল কলম আর এই অস্ত্রের ভিতর থেকে বের হতো শব্দ নামক এক একটা বুলেট। এই আর্টিকেলে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কবিতা আলোচনা করা হল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক কবি সাহিত্যিকরা তাঁদের লেখা গান, কবিতা দিয়ে বাঙালি জাতিকে সেই কন্টকাকীর্ণ মুহুর্তে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন এমনকি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাঙালি জাতির মধ্যে এই সংগ্রামময় যুদ্ধের চেতনা ধরে রাখেন। এমন অনেক কবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন কবি হলেন- আল মাহমুদ, সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আতাউর রহমান, আবু বরক সিদ্দিক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, শামসুর রহমান প্রমুখ।
বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির চেতনা এসব কবিদের কবিতায়, লেখনীতে প্রত্যক্ষভাবেই প্রকাশ পেয়েছে। সিকান্দার আবু জাফরও তাদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর কবিতার প্রতিটি শব্দ যেন প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সেনাপতির নির্দেশের মতো কাজ করে। যে শব্দে বাঙালির ভিতর দৃঢ়তা তৈরি হয়েছে, নিজের ভিতরকার শক্তিকে বলিষ্ঠভাবে জাগিয়ে তুলতে পেরেছে প্রতিটি মুক্তিকামী বাঙালি। ক্ষিপ্ত বাজের থাবার মতোই বাঙালি তার অধিকার এবং স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনতে পেরেছে তার কবিতার শব্দে অনুপ্রাণিত হয়ে।
“আমার বুকেই ফিরিয়ে নেবো
ক্ষিপ্ত বাজের থাবা,
তুমি আমার জলেস্থলের
মাদুর থেকে নামো
তুমি বাংলা ছাড়ো।”
(বাংলা ছাড়ো;সিকান্দার আবু জাফর)
এই কবিতাটি ১৯৭০ সালের পটভূমিতে কবি লিখেছিলেন। যখন দেশে হায়নারা দখলে নেবার জন্য বাঙালির উপর অমানুষিক নির্যাতন করছিল। দেশটা যখন পরগাছা শক্তির কবলে দুমড়ে যাচ্ছিল ঠিক তখন সিকান্দার আবু জাফর সেই পরগাছা শক্তি ও দেশদ্রোহিতার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর তুলে ধরেছিলেন তাঁর ‘বাংলা ছাড়’ কবিতার ভেতর।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ তাঁর লেখনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতির সামনে বাঙালির হাজার বছরের যে সংগ্রাম ও ঐতিহ্য রয়েছে তা তুলে ধরেছেন। ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ কবিতায় বাঙালি জাতি যাতে তাদের ঐতিহ্য সংগ্রাম ভুলে পরাশক্তির হাতে পরাজিত না হয় সে কথা ব্যক্ত করেছেন। বাঙালিকে দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য তিনি আহ্বান করেছেন। তিনি বাঙালি জাতিকে মনে করিয়ে দেন তাদের পূর্বপুরুষদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কথা৷ তিনি বলেন-
“আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি
যার করতলে পলি মাটির সৌরভ ছিল।”
(আমি কিংবদন্তির কথা বলছি; আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ)
প্রকৃতির সাথে যে বাঙালির আজন্মকালের সম্পর্ক সে শিকড়ের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার জন্য কবির এই প্রয়াস। তার মতে, যারা কবিতা শুনতে জানে না তাদের এই পরাশক্তি ধ্বংস করতে পারবে সহজেই। কবিতার মাধ্যমে কবি বাঙালিকে তার পূর্বপুরুষদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সম্পর্কে অবগত করতে চেয়েছেন। কবিতা শোনার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তাদের শেকড় চিনতে পারবে তবেই তো সংগ্রামে জয়ী হওয়ার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে পারবে।
“যে কবিতা শুনতে জানে না
পরভৃতের গ্লানি তাকে ভুলুন্ঠিত করবে।
যে কবিতা শুনতে জানে না
অভ্যুত্থানের জলোচ্ছ্বাস তাকে নতজানু করবে।”
(আমি কিংবদন্তির কথা বলছি; আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ)
কবি এই কবিতায় বাঙালি জাতির পূর্বপুরুষদের গ্লানি, অত্যাচারিত, নিপীড়িত হওয়ার কথা যেমন বলেছন তেমনি এসব পরাধীনতার শেকলের গ্লানি মুছে স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে আনার জন্য আহ্বান করেছেন। যা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে মনোবল ও দৃঢ়তার জন্ম দিয়েছে এবং মানুষকে পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সংগ্রাম ও কঠিন লড়াই করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছিলেন ‘স্মৃতির মিনার’ কবিতাটি। প্রতিবাদের এক কালজয়ী কবিতা স্মৃতির মিনার। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরে শহীদদের স্মরণে তৈরি করা হয়েছিল স্মৃতির মিনার। কিন্তু পরাশক্তি ও তাদের দোসররা মিলে যখন সেই মিনার ভেঙে ফেলে তখন তীব্র ক্রোধ ও ক্ষোভ নিয়ে আলাউদ্দিন আল আজাদ এই কবিতাটা লিখেন। কবি বাঙালি জাতিকে অভয় দিয়েছেন শোষকগোষ্ঠীরা যতই ইট পাথরের তৈরি স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙুক হৃদয়ের ধারণ করা শহীদদের স্মৃতি তারা কি করে মুছবে। মানুষের হৃদয়ে ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা তা তারা কোনোদিন মুছে ফেলতে পারবে না। এ দেশের প্রতিটি মানুষের সংগ্রাম ও ঐক্যবোধের মধ্য দিয়ে শহীদর স্মৃতি আর ভাষা-আন্দোলনের চেতনা থেকে যাবে।
“স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার?
ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো! যে কখনো কোনো
রাজন্য ভাঙতে পারেনি।
(স্মৃতির মিনার; আলাউদ্দিন আল আজাদ)
এই কবিতটি বাঙালি জাতিকে আরও ঐক্যবদ্ধ আরও সংগ্রামী হতে সাহায্য করেছে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা অক্ষুন্ন রাখতে বাঙালি জাতি দ্বিগুন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অত্যাচারী শোষকগোষ্ঠীকে বাঙালি জাতি দেখাতে সক্ষম হয়েছেন যে বাহির থেকে যত মিনার পারো ভাঙো,কিন্তু হৃদয়ে শহীদের যে আদর্শ,ন্যায়, ভাষার জন্য প্রেম ধারন করেছি তা নিয়ে বারবার আমরা রুখে দাড়াবো। হৃদয়ে ধারণ করা এই ন্যায়, আদর্শ, চেতনা এসবের ভিত্তি কখনো কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শামসুর রহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘বর্ণমালা আমার দুঃখিণী বর্ণমালা’। এই কবিতায় মাতৃভাষার জন্য কবির গভীর মমত্ববোধ ফুটে উঠেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে একমাত্র বাঙালি জাতিই সর্বপ্রথম জীবন দিয়েছিল। পৃথিবীর কোনো ইতিহাসে এমনটা হতে দেখা যায়নি। বাঙালির প্রাণের ভাষা বাংলা, মায়ের ভাষা বাংলা। এই ভাষাকে মাতৃভাষা করতে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়েছে বাঙালি জাতির। কিন্তু সেই ভাষাকে নিয়ে যখন ষড়যন্ত্র করা হয়, নোংরামি করা হয়, খিস্তি খেউর করা হায়, সেই ভাষাকে বিকৃত করা হয়, অবমাননা করা হয় তখন কবির হৃদয় ব্যথিত হয়ে পড়ে। কবি মর্মাহত হয়ে হয়ে বর্ণমালাকে দুঃখীনি মায়ের সাথে তুলনা করলছেন৷ এত কষ্টের অর্জিত বর্ণমালাকে কবি দুঃখিনী মা বলে সম্বোধন করেছেন।
“এখন তোমাকে ঘিরে খেত্তরার নোংরামি,
এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি খেউয়ের পৌষমাস।
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায়না তাকানো,
বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।”
(বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা; শাসমুর রাহমান)
লাঞ্ছিত, শোষিত অবহেলিত মায়ের মতো বর্ণমালাও আজ দুঃখী। স্বৈরাচার শাসনের জাতাকলে পিষ্ট হওয়া প্রতিটা মানুষের হৃদয়ের ব্যথিত সুর কবি কবিতায় তুলে ধরেছেন। এই কবিতা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করার কথা ব্যক্ত করেছেন। স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে এ এক ব্যঙ্গ প্রতিবাদ। তৎকালীন স্বেরাচারী শাসনের আমলে প্রতিটা মানুষের মুখ তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে শোষণের যাতাকলে পিষ্ট করা হতো। তাই তো কবিরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে রূপকার্থে বা ব্যঙ্গাত্মক ভাবে প্রতিবাদ করতেন।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা কবি হাসান হাফিজুর রহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘তোমার আপন পতাকা’। বাঙালি জাতি যুগ যুগ ধরে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, শোষিত হয়ে আসছে। হাসান হাফিজুর রহমান বাঙালির উপর সেই সব দেশি, বিদেশি, পরাশক্তি, অপশক্তি সব ধরণের শোষনের পরে অবশেষে বাঙালি স্বাধীনতার আপন পতাকা হাতে পাওয়ার পরের আবেগাপ্লুত ভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই কবিতায়। এই পতাকার পিছনে রয়েছে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস।
দেশের প্রতিটি শ্রেণীর প্রতিটি পেশার রক্ত, কান্না, বেদনা, হাহাকার মিশ্রিত সংগ্রামের বিনিময়ে পাওয়া এই লাল সবুজের পতাকা। এই পতাকাতলে এবার মানুষের সকল কান্না, গ্লানি, হতাশা উড়িয়ে দিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার পালা। এমন মর্মকথাই কবি এই কবিতায় ব্যক্ত করেছেন।
‘এবার মোছাব মুখ তোমার আপন পতাকায়,
হাজার বছরের বেদনা থেকে জন্ম নিল
রক্তিম সূর্যের অধিকারী যে শ্যামকান্ত ফুল
নিঃশঙ্ক হাওয়ায় আজ ওড়ে,দুঃখ ভোলানিয়া গান গায়।”
(তোমার আপন পতাকা; হাসান হাফিজুর রহমান)
অনেক আত্মত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রামের পরে পাওয়া স্বাধীনতাকে পাওয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এই কবিতায়। পরাধীনতার গ্লানি মুছে লালসবুজের পতাকাকে প্রেরণার উৎস করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান করেছেন।
FAQ
১. মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতায় কোন কোন বিষয় প্রধানত ফুটে উঠেছে?
উত্তর: মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতায় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, দেশপ্রেম, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ, শোষণ-নির্যাতন ও বিজয়ের চেতনা ফুটে উঠেছে।
২. ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কবিতায় একুশে ফেব্রুয়ারির তাৎপর্য কী?
উত্তর: এসব কবিতায় মাতৃভাষার অধিকার, ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ এবং বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম প্রকাশ পেয়েছে।
৩. মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কবিতার মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?
উত্তর: ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কবিতার মূল বিষয় মাতৃভাষার অধিকার, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতার মূল বিষয় স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রাম।
৪. বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক কবিতার গুরুত্ব কী?
উত্তর: এসব কবিতা বাঙালির জাতীয় ইতিহাস, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে।
৫. মুক্তিযুদ্ধ ও ভাষা আন্দোলনভিত্তিক উল্লেখযোগ্য কবি ও কবিতার নাম কী কী?
উত্তর: শামসুর রাহমানের ‘স্বাধীনতা তুমি’, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ এবং মাহবুব উল আলম চৌধুরীর ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ উল্লেখযোগ্য কবিতা।
আরো পড়ুন
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- তিরিশের দশকের কবি ও কবিতার প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস






