৫১তম বিসিএস প্রস্তুতি কিভাবে শুরু করবেন?

বিসিএস বাংলাদেশের অন্যতম সম্মানজনক ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পেশাগুলোতে নিয়োগের সুযোগ পাওয়া যায়। হাজারো শিক্ষার্থী বিসিএসের স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সঠিক গাইডলাইন ও দিকনির্দেশনার অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। কীভাবে পড়লে বিসিএস সহজ হবে, কোন পদ্ধতিতে পড়তে হবে, কোন কোন বই অনুসরণ করতে হবে এবং কোন রুটিন অনুসরণ করে পড়তে হবে, তার সম্পূর্ণ গাইডলাইন থাকছে এই আর্টিকেলে। তাই এই আর্টিকেলে শূন্য থেকে বিসিএস প্রস্তুতি এবং এর খুঁটিনাটি সবকিছু আলোচনা করা হয়েছে। এই আর্টিকেল পড়লে বিসিএস নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না।

বিসিএস প্রস্তুতি

 

১. কিভাবে শুরু করবেন

বিসিএস প্রস্তুতি অনার্সের ১ম বর্ষ থেকে শুরু করা উচিত। অনার্সে ভর্তি হয়ে ধীরে ধীরে রুটিন মেনে পড়া উচিত। বিশেষ করে ইংরেজি এবং গণিত প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় প্র্যাকটিস করা উচিত। গণিতের প্রতিটি অধ্যায় নিয়মিত আয়ত্তে রাখতে হবে। বিসিএসের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে গণিত। এই গণিতে যদি ভালো নম্বর তোলা যায়, তাহলে ভালো করা সম্ভব। সেই সঙ্গে ইংরেজি গ্রামার প্র্যাকটিস করতে হবে। প্রতিদিন নতুন নতুন কিছু ভোকাবুলারি মুখস্থ করতে হবে। সঙ্গে সাহিত্য সম্পর্কেও কিছু ধারণা রাখতে হবে, কারণ ইংরেজি সাহিত্য থেকেও বেশ কিছু প্রশ্ন এসে থাকে। নিয়মিত ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় এবং বৈশ্বিক ঘটনা সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। কারণ শুধু পুঁথিগত বিদ্যা থাকলেই হবে না, বাহ্যিক কিছু ধারণাও রাখা দরকার। সেই সঙ্গে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করার মতো কিছু জ্ঞান আয়ত্ত করতে হবে।

 

২. পরীক্ষা ধাপ ও মানবণ্টন

 

ক. প্রিলিমিনারি (২০০ নম্বর)

  • বাংলা – ৩০
  • ইংরেজি – ৩০
  • বাংলাদেশ বিষয়াবলি – ২৫
  • আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি – ২৫
  • গাণিতিক যুক্তি – ২০
  • মানসিক দক্ষতা – ১৫
  • সাধারণ বিজ্ঞান – ১৫
  • কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি – ১৫
  • ভূগোল ও পরিবেশ – ১০
  • নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন – ১৫

খ. লিখিত পরীক্ষা (৯০০ নম্বর)

সাধারণ ক্যাডার পদে মোট ৯০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হয়। এখানে বিস্তারিত লেখা লাগে। লিখিত পরীক্ষার বিষয়গুলো হলো:

  • বাংলা: ২০০ নম্বর (১০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৩ ঘণ্টা, ২০০ নম্বরের পরীক্ষায় ৪ ঘণ্টা)
  • ইংরেজি: ২০০ নম্বর
  • বাংলাদেশ বিষয়াবলি: ২০০ নম্বর
  • আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি: ১০০ নম্বর
  • গাণিতিক যুক্তি: ৫০ নম্বর
  • মানসিক দক্ষতা: ৫০ নম্বর
  • সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ১০০ নম্বর

গ. মৌখিক পরীক্ষা (১০০ নম্বর)

বিসিএস মৌখিক পরীক্ষা ১০০ নম্বরের হয়ে থাকে। মৌখিক পরীক্ষার সময় প্রার্থীর নিজ জেলা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাংলাদেশ বিষয়াবলি এবং সাম্প্রতিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোর ওপর বেশি প্রশ্ন করা হয়ে থাকে। কথা বলার ধরন, বাচনভঙ্গি এবং মানসিক চাপের মুখে শান্ত থাকার সক্ষমতাও এখানে মূল্যায়িত হয়। তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করার মতো জ্ঞান ও ধৈর্য থাকা খুবই প্রয়োজন।

 

৩. সিলেবাস সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা

বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সিলেবাস। কারণ কোথা থেকে প্রশ্ন আসবে এবং কী পড়ব, সেটা না জানলে মরুভূমির মধ্যে সুচ খোঁজার মতো অবস্থা হবে। তাই সর্বপ্রথম কাজ হলো সিলেবাস সংগ্রহ করা এবং এ সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা নেওয়া। সিলেবাসের কোথায় কী আছে, সেটা ভালোভাবে দেখতে হবে। সিলেবাস অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি টপিক শেষ করতে হবে এবং সাজেশন ফলো করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো পড়তে হবে। তাই বিসিএসের জন্য সিলেবাস সংগ্রহ ও বিস্তারিত ধারণা নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।

 

৪. বিগত সালের প্রশ্ন বিশ্লেষণ

বিগত সালের প্রশ্নব্যাংক সংগ্রহ করতে হবে এবং প্রতিটি সালের প্রশ্ন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের খুঁটিনাটি দেখতে হবে, যাতে প্রশ্নের ধরন কেমন হয়, সেটা বোঝা যায়। বিগত সালের প্রস্তু থেকে অনেক সময় প্রশ্ন এসে থাকে। তাই বিসিএসের জন্য বিগত সালের প্রশ্ন সংগ্রহ করা ও এ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া খুবই জরুরী

 

৫. রুটিন অনুসারে পড়তে হবে

একটি আদর্শ রুটিন বানাতে হবে এবং সেই রুটিন অনুসরণ করে দিনে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা পড়তে হবে। বিসিএসের জন্য একটি আদর্শ রুটিন তৈরি করা হয়েছে। এই রুটিন ফলো করে পড়লে আশা করি বিসিএস নিয়ে আর কোন সমস্যা হবে না

সকাল (০৮:০০ – ১১:০০): নতুন বিষয় পড়া বা জটিল বিষয় চর্চা। (যেমন: গণিত, মানসিক দক্ষতা এবং ইংরেজি গ্রামার)।

দুপুর (১২:০০ – ০৩:০০): তুলনামূলক সহজ বিষয়। (যেমন: বাংলা সাহিত্য ও ব্যাকরণ, কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি)।

বিকেল/সন্ধ্যা (০৬:৩০ – ০৮:৩০): সাধারণ জ্ঞান ও মুখস্থ বিষয়ের জন্য সময় বরাদ্দ করুন। (যেমন: বাংলাদেশ বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, ভূগোল ও পরিবেশ)।

রাত (০৯:৩০ – ১১:০০): পুরো দিনের পড়া রিভিশন এবং বিগত সালের প্রশ্ন (জব সল্যুশন) সমাধান।

৬. বিষয়ভিত্তিক ধারণা

বিষয়ভিত্তিক প্রতিটি সাবজেক্ট সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে, যেন যেখান থেকেই প্রশ্ন আসে, উত্তর দেওয়া যায়।

বাংলা

বাংলা সাহিত্যের যুগবিভাগ অনুযায়ী প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। এছাড়া গ্রামারের জন্য সন্ধি, সমাস, কারক ও বিভক্তি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে নিয়মিত চর্চা করতে হবে। বাংলা ব্যাকরণের জন্য নবম-দশম শ্রেণির বোর্ড বই ছাড়াও ‘অভিযাত্রী’, ‘অগ্রদূত’, ‘লাল নীল দীপাবলি’সহ বিভিন্ন বই আছে, যেগুলো অনুসরণ করলে বিসিএসের জন্য বাংলা নিয়ে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।

ইংরেজি

Periods of English Literature অনুযায়ী প্রতিটি যুগের বিখ্যাত কবি ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। Grammar, Part of Speech থেকে শুরু করে সিলেবাস অনুসরণে গুরুত্বপূর্ণ টপিকগুলো ভালোভাবে আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে। English এর জন্য এই বইগুলো অনুসরণ করলে আশা করি আর কোন সমস্যা থাকবে না।

  • A Handbook on English Literature (প্রফেসর মো. আকবর আলী বা অন্যান্য): ইংরেজি সাহিত্যের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি বই।
  • English Literature BCS Preliminary And Other Competitive Exam : বিসিএস প্রিলির সিলেবাস অনুযায়ী সাজানো।
  • Master English Language (অন্যান্য প্রকাশনা যেমন প্রফেসর’স): গ্রামারের বিস্তারিত আলোচনা ও বহু নির্বাচনী প্রশ্ন অনুশীলনের জন্য ভালো।
  • Advanced Learner’s Communicative English (চৌধুরী ও হোসেন): বেসিক গ্রামার ও রুলের জন্য এটি পড়তে পারেন।

গণিত

বিসিএসের জন্য গণিত খুবই দরকারি একটি সাবজেক্ট। গণিতের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো মনোযোগ সহকারে আয়ত্ত করতে হবে। নিয়মগুলো ভালোভাবে আয়ত্তে নিয়ে আসতে হবে, যেন যেকোনো নিয়ম আসলে সমাধান করা যায়। গণিত নিয়ম অনুযায়ী করতে হবে। শর্টকাট নিয়ম আয়ত্ত করলে হবে না।

  • খায়রুলস বেসিক ম্যাথ
  • শাহীনস বেসিক টু অ্যাডভান্সড ম্যাথ
  • ওরাকল বিসিএস গাণিতিক যুক্তি

এছাড়া বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, অর্থনীতি, পৌরনীতি, ভূগোল ও নৈতিক শিক্ষা সম্পর্কেও বিস্তারিত ধারণা নিতে হবে, যেন যেকোনো বিষয় থেকে প্রশ্ন আসলে উত্তর দেওয়া যায়।

 

৭. দুর্বল বিষয় খুঁজে বের করা

বিসিএস প্রস্তুতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ টপিক হলো নিজের দুর্বল বিষয় খুঁজে বের করা। কোন বিষয়ের কোন টপিকে দুর্বলতা আছে, সেটা খুঁজে বের করে তার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। সেই বিষয়টি বারবার পড়তে হবে।অনেকেই গণিতে দুর্বল থাকতে পারে, আবার কেউ কেউ ইংরেজিতে দুর্বল থাকতে পারে। এজন্য কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, তা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেই বিষয়ের ওপর বেশি জোর দিতে হবে।

 

৮. যে ভুল করা যাবে না

  • একদিনে সব জানার চেষ্টা করা যাবে না। ধারাবাহিকভাবে রুটিন অনুসরণ করে পড়তে হবে।
  • প্র্যাকটিস না করা। গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট প্র্যাকটিস না করা যাবে না। প্রতিনিয়ত এগুলো প্র্যাকটিস করতে হবে।
  • কোনো দিকনির্দেশনা বা সাজেশন ফলো না করা। বিসিএসের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা সাজেশন খুবই জরুরি।
  • কোন রুটিন অনুসরণ করে না পড়া। নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করতে হবে এবং সেই রুটিন অনুযায়ী পড়তে হবে।
  • সাধারণ জ্ঞান ও ভূগোলের জন্য একটি ম্যাপ নিয়ে সেটা দেখে সাধারণ জ্ঞান মনে রাখতে হবে।

 

সর্বোপরি, বিসিএসের ভালো প্রস্তুতি নিতে হলে অবশ্যই নিয়মিত ধৈর্য সহকারে রুটিন অনুসরণ করে পড়তে হবে। লক্ষ্য স্থির রেখে অধ্যবসায় নিয়ে পড়তে হবে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন টেকনিক অবলম্বন করে পড়তে হবে। বিসিএসের সব প্রস্তুতি ও আপডেট পেতে https://studyjournalx.com/  এর সঙ্গে থাকুন।

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120