চোখের বালি
বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে। বাংলা উপন্যাসকেও তিনি আধুনিকতার পথ দেখিয়েছেন। আধুনিক মনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল আত্মসচেতনতা; এই আত্মসচেতনতাবোধ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্য। মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, মধ্যবিত্ত সমাজের প্রাধান্য ও চরিত্রভিত্তিক জীবনজিজ্ঞাসা আধুনিকতার চিহ্ন। রবীন্দ্রনাথ নগ্নতা নির্ভর আধুনিকতা পরিত্যাগ করে বাঙালি ঐতিহ্যের প্রতি অনুরক্ত থেকে চিরন্তন আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন। আর এই আধুনিকতারই প্রতিফলন ঘটেছে “চোখের বালি” উপন্যাসে। চোখের বালি উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব বিশ্লেষণ করা হলো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অন্যতম বিখ্যাত উপন্যাস “চোখের বালি”। এই উপন্যাসে মানুষের মনোজগতের বিচিত্র ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সফলতা-ব্যর্থতার নানা মুহূর্তের ছবি প্রকাশ হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ মনের অতলে ডুব দিয়ে চরিত্রগুলোর অন্তর্মনসের বিচিত্র চিন্তা-চেতনা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। মনের বহুবিধ উত্থান-পতন, ঘাত-প্রতিঘাতের চিত্র ব্যক্ত করেছেন। দাম্পত্য জীবনের সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়গুলো এই উপন্যাসে প্রতিফলিত হয়েছে।
“চোখের বালি” উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ এক বিধবা নারীকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। এক সময় ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথার প্রচলন ছিল; তখন নারীদেরকে স্বামীর সাথে একই চিতায় জীবন্ত দাহ করা হতো। সমাজে নারীর কোনো অধিকার ছিল না। রাজা রামমোহন রায়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
রাজা রামমোহন রায়ের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে ভারতবর্ষে বিধবা নারীরা জীবন্ত পুড়ে মরার এই কুপ্রথা থেকে মুক্তি পায়। কিন্তু মুক্তি মেলেনি সমাজের কাছ থেকে। পদে পদে জীবনের সাথে লড়তে হয়েছে তাদের। সমাজের চোখে হতে হয়েছে ঘৃণার পাত্র। সমাজে কোনো অধিকার ছিল না এই বিধবা নারীদের। এই বিধবা নারীদের নিয়ে প্রথম কথা বলেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে হিন্দু সমাজে বিধবা বিবাহ প্রচলন ও আইনি স্বীকৃতি দানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু তখনও সমাজে বিধবাদের মুক্তি মেলেনি। পদে পদে জীবনের সাথে লড়তে হয়েছে। সাহিত্যে প্রথম বিধবা অধিকার নিয়ে কাজ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। “কৃষ্ণকান্তের উইল”-এ রোহিনীর মাধ্যমে সমাজের বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি রোহিণীকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। আর এই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীর মাধ্যমে বিধবা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এ কারণেই সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন,
“চোখের বালির পর থেকে বিধবা প্রেমের এক নতুন অভিনয়ে বিরোধী হয়েছে বিনোদিনী, হীরা ও রোহিনীর মনোরাজ্য বহির্ভূত এক উচ্চতর। বিচিত্র তার মঞ্চ অধিকার করেছে।”
এই উপন্যাসে রাজলক্ষ্মী পুত্রস্নেহে অন্ধ ছিলেন, তিনি তার পুত্রকে তার নিজের আয়ত্তে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার পুত্র মহেন্দ্র যখন বিনোদিনীকে বিবাহ করবে না বলে ঘোষণা করেন, তখন মনে মনে পুত্রের মাতৃভক্তির প্রসন্নতা অনুভব করেন। মহেন্দ্র যখন মায়ের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আশালতাকে বিবাহ করে, তখন মনে মনে কষ্ট পান। বেশি ক্রোধান্বিত হন অন্নপূর্ণার প্রতি। তারই আশ্রয়ে তিনি পুত্রকে হারাচ্ছেন এই ভাবনা রাজলক্ষ্মীকে কষ্ট দেয়। অন্নপূর্ণা কাশি চলে গেলে সমস্যা কিছুটা সমাধান হলেও আশালতাকে নিয়ে মহেন্দ্রের প্রাধান্য তাকে এতটাই কষ্ট দিল যে বিহারীর সাথে পরামর্শ করে বারাসাতে আত্মীয়ের বাড়িতে চলে গেলেন।
মহেন্দ্র পড়াশোনা, কাজকর্ম সব বাদ দিয়ে সারাক্ষণ আশালতাকে নিয়ে পড়ে থাকেন। এই ব্যথা রাজলক্ষ্মীকে ব্যথিত করে, ফলে তিনি বিহারীর সঙ্গে পরামর্শ করে বিনোদিনীর বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। পুত্রের মাতৃভক্তি পরীক্ষা করার জন্য তিনি পুত্র থেকে দূরে চলে যান, কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন তার পুত্র তার প্রতি ভালোবাসা কতটা। নিরুপায় হয়ে তিনি ফিরে এলেন এবং সাথে নিয়ে আসলেন বিনোদিনীকে।
উপন্যাসের বিনোদিনী একজন বিধবা নারী, যার সাথে মহেন্দ্রর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মহেন্দ্র তাকে প্রত্যাখ্যান করে। বিনোদিনী একজন রূপবতী, গুণবতী ও শিক্ষিত নারী। রবীন্দ্রনাথ তাকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন, কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কৃষ্ণকান্তের উইলে রোহিণীকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলেননি। এখানে বিনোদিনী এবং রোহিনীর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। বিনোদিনীর মধ্যে অনেক গুণ ছিল এবং সে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত। রাজলক্ষ্মী বিনোদিনীর মাধ্যমে মহেন্দ্রকে অনেকটা প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন এবং আশালতার সাথে তার তুলনা করে ছোট করতে চেয়েছিলেন।
মহেন্দ্রের মধ্যে আমরা আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা ও আবেগহীনতার চিত্র দেখতে পাই। প্রথমে তার মধ্যে মাতৃভক্তি প্রবল ছিল, পরবর্তীতে সে যখন বিহারীর জন্য আশালতাকে দেখতে যায়, তখন আশালতাকে তার পছন্দ হয়ে যায় এবং তাকে বিবাহ করতে চায়। এখানেই তার চরিত্রের অস্থিরতা প্রকাশ পায়। বিবাহের পরে সে আশালতাকেই ধ্যানজ্ঞান করেছে রাজলক্ষ্মী অন্নপূর্ণা ও বিহারী তার মনের বাইরে চলে গিয়েছে। সে শুধু ভোগবিলাসীতায় মগ্ন, কিন্তু বিরতিহীন ভোগ সর্বস্বতা চিত্তে শান্তি আনে না। তাই আশালতা থেকে তার দৃষ্টি অচিরেই বিনোদিনীর উপর পড়ে যায় এবং বিনোদিনীকে পাওয়ার তীব্র বাসনায় বিহারীকে শত্রু করে তুলেছে। বিনোদিনীকে পাওয়ার তীব্র বাসনায় মহেন্দ্র পাগলের মতো সমাজ সংস্কারকে ভুলে যায়। কিন্তু বিনোদিনী তার কাছে অধরাই থেকে যায়।
বিনোদিনী “চোখের বালি” উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল চরিত্র। তার চরিত্রের উজ্জ্বলতা সব চরিত্রের চেয়ে বেশি। আধুনিক জীবন জিজ্ঞাসায় বিধবা নারীর কামনা-বাসনা, আকাঙ্ক্ষা ও অনুরাগকে স্বাভাবিক জীবনধারার অনুভূতি হিসেবে লেখক দেখিয়েছেন। আধুনিক নারী রূপে রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীকে সৃষ্টি করেছেন, যাকে তিনি শিক্ষিত, গুণবতী ও রূপবতী নারীরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মহেন্দ্রর নতুন দাম্পত্য জীবনের পাশে ঈষান্বিত দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথ এই বিধবা নারীকে সৃষ্টি করেছেন। মহেন্দ্রর আত্মনিয়ন্ত্রণহীনতা ও চারিত্রিক দুর্বলতা অচিরেই বিনোদিনী দখল করে তার উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে। সে বিহারীকে জয় করেছিল। এরই মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ “চোখের বালি” উপন্যাসে বিধবা নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করেছেন।
“চোখের বালি” উপন্যাসে বিহারী ছিল ন্যায়, সত্য ও মানবতার প্রতীক। এ ছিল মহেন্দ্রের বন্ধু। তার বন্ধুত্বের প্রমাণ সে প্রথম থেকেই দিয়ে চলেছে। মহেন্দ্র বিহারীর জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে আশালতাকে তার নিজের পছন্দ করে। তারপর বিহারী হাসিমুখেই আশালতাকে মহেন্দ্রের জন্য ছেড়ে দেয়; এখানে তার মহানুভবতা প্রকাশ পায়। মহেন্দ্রর বিপদে আপদে বা আশালতার দুঃখে সহমর্মিতা দেখায়, গোপনে আত্মত্যাগ করে বন্ধুত্বের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয় দেয়। বিধবা জেনেও বিনোদিনীকে বিবাহ করার প্রস্তাবের মাধ্যমে তার চিত্তের ঔদার্য ও মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়।
চোখের বালি একটি মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রগুলোর অন্তরলোকের বিচিত্র অলিতে গলিতে পদার্পণ করে তাদের মনোজগতের বিচিত্র চিন্তা-চেতনার কথা এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। চরিত্রগুলোর মধ্যে মনোজগতের সূক্ষ্ম দ্বন্দ্ব সংঘাত চলে। বিধবা নারীর তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও ব্যাকুলতা রবীন্দ্রনাথ বিনোদিনীর মাধ্যমে এই উপন্যাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। বিধবা মনের অন্দরমহলে সুক্ষ্ম টানাপোড়েন রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে তুলে ধরেছেন।
বিনোদিনীর আসক্তি, হতাশা, প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও প্রাপ্য নয় এমন বিষয়কেও লাভ করার প্রবল প্রতিজ্ঞা, রাজলক্ষ্মীর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা এবং বিরোধ, মহেন্দ্রকে সহজেই জয় করা ও বিহারীকে ভালোবেসে না পাওয়ার বেদনা এসবই তার চরিত্রের স্বভাবে নিহিত ছিল। নারী হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা সেইসব বিচিত্র আশা-আকাঙ্ক্ষা ও নৈরাশ্যের ছায়াপাতে, দুঃখবেদনার খণ্ড খণ্ড মুহূর্তগুলো চেতনার বিভিন্ন রঙে সজ্জিত হয়ে ওঠে। মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের মনোবিকলন ও অন্তর্ভুক্ত চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় এখানে।
বাংলা সাহিত্যের এক ঐতিহাসিক ও মানবিক উপন্যাস চোখের বালি। মানবিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তিনি এই উপন্যাসটি রচনা করেছেন। মানব মনের অন্দরমহলের সূক্ষ্ম টানাপোড়েন ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব সংঘাত চিত্রায়িত করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো তিনিও বিধবা নারীকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বিনোদিনীর মাধ্যমেই তিনি সেটাই ব্যক্ত করেছেন। তাই পরিশেষে বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ঐতিহাসিক মানবিক উপন্যাস চোখের বালি।
FAQ
১. বিনোদিনী কার কাছে পড়াশোনা করেছে?
মিশনারীর মেমের কাছে।
২. রাজলক্ষ্মীর জন্মভূমি কোথায়?
বারাসাতে।
৩. রাজলক্ষ্মী কার সাথে বিনোদিনীর বিবাহ দিতে চেয়েছিলেন?
ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে।
৪. বিনোদিনীর শ্বশুরবাড়ি কোথায় ছিল?
বারাসাতে।
৫. মহেন্দ্র কী পাশ করার পর ডাক্তারি পড়ছিলো?
এম. এ করার পর।
৬. বিহারী মহেন্দ্রকে কী ডাকত?
দাদা।
৭. মহেন্দ্র কার সাথে অন্নপূর্ণতার বোনঝির বিয়ে ঠিক করে?
বিহারীর সাথে।
৮. অন্নপূর্ণার বোনঝির নাম কী?
আশালতা।
৯. আশালতা কার কাছে থাকত?
-জ্যাঠার কাছে।
১০. আশার জ্যাঠার বাড়ি কোথায়?
শ্যামবাজারে।
আরো পড়ুন
- গোরা উপন্যাস এর অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ
- আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক কাব্য’র প্রেম ও বিরহ চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ
- গীতাঞ্জলি কাব্য’র আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেম।
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা
- পথের পাঁচালী উপন্যাসের বিষয়বস্তু, প্রকৃতি চেতনা ও চরিত্র বিশ্লেষণ
- নবান্ন নাটকের বিষয়বস্তু, নামকরণের সার্থকতা ও চরিত্র বিশ্লেষণ
- বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব, নায়ক কে ও চরিত্র বিশ্লেষণ
- কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও নামকরণের সার্থকতা
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

One Response