বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব, নায়ক কে ও চরিত্র বিশ্লেষণ

বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী মীর মশাররফ হোসেনের পদচারণা বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। উপন্যাস, নাটক, ধর্মতত্ত্ব, ইতিহাস, কাব্য ও আত্মজীবনী সবদিক থেকেই তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী। সাহিত্যে সর্বদা সত্য ও সুন্দরকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তিনি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের সাথে জড়িত ছিলেন না। মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্যে সমাজের চেয়ে জীবন, প্রতিষ্ঠানের চেয়ে হৃদয়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি কোলাহলের চেয়ে নিঃসঙ্গতার মাঝে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের মধ্যে তার অবদান ছিল সর্বাপেক্ষা বেশি। এই আর্টিকেলে বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব, নায়ক কে ও চরিত্র বিশ্লেষণ করা হল।

 

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব

 

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূলভাব

তৎকালীন সময়ে মুসলমানরা শিক্ষা, শিল্প, দর্শন, সাহিত্য সবদিক থেকেই পিছিয়ে ছিল। ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের কারণে মুসলমানরা প্রচলিত ধারা থেকে পিছিয়ে ছিল। তৎকালীন মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিমুখ ছিল। আরবি ও ফারসি চর্চাতে তাদের বেশি আগ্রহ দেখা যেত। মীর মশাররফ হোসেন যে পরিবারের জন্ম নিয়েছিলেন, সেই পরিবারে অনেকেই বাংলাও জানতেন না, তবে আরবি ও ফারসির প্রতি তাদের বেশি আগ্রহ ছিল। বাংলা গদ্যসাহিত্যে মুসলমানদের আধুনিক সাহিত্যচর্চায় মীর মশাররফ হোসেনের হাত ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। যেখানে বঙ্কিম, মধুসূদন, দীনবন্ধুর মতো শক্তিমান লেখকরা বাংলা সাহিত্যে তাদের স্থান শক্ত করে নিয়েছে, সেখানেই মীর মশাররফ হোসেন স্বকীয় ও নিজস্ব প্রতিভায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলা গদ্যের বিকাশে মীর মশাররফ হোসেনের অবদান তাই অসামান্য। এ প্রসঙ্গে মুহম্মদ আব্দুল হাই বলেছেন,

 

“বাংলা গদ্যের বিকাশ ও পরিণতিতে তারও একটা নির্দিষ্ট অবদান আছে।” (হাই ও আহসান, ১৯৫৬ : ১১৪)

 

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের পটভূমিতে রয়েছে ঐতিহাসিক কারবালার কাহিনী। কারবালার কাহিনী নিয়ে মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে বহু সাহিত্যকর্ম রচিত হয়েছে। হযরত আলীর মৃত্যুর পর ইরাকের মানুষ তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র হাসানকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে মাবিয়া নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। মাবিয়া ছিলেন সাহসী ও দৃঢ়চিত্তের অধিকারী। তার কাছে হাসান হার স্বীকার করে সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে মদিনায় চলে যান। পরবর্তীতে হাসান পারিবারিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।

 

৬৮০ খ্রিস্টাব্দে মাবিয়া পুত্র এজিদ সিংহাসন আরোহণ করেন এবং নিজেকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু হোসেন তা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে হোসেন এবং এজিদের মধ্যে সংঘর্ষের সূচনা হয়। ইরাকি সমর্থকরা হোসেনকে আগমনের আমন্ত্রণ জানান। তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে হোসেন শতাধিক আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে কুফার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে এজিদ বাহিনী অবরোধ সৃষ্টি করলে উভয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে হোসেন ও তার সঙ্গীরা নিহত হন। হোসেনের খণ্ডিত মস্তক দামেস্কে এজিদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে কারবালায় সমাধিস্থ করা হয়। ইতিহাসের এই কাহিনীকে অবলম্বন করে মীর মশারফ হোসেন ‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসটি রচনা করেন।

 

‘বিষাদ সিন্ধু’ উপন্যাসের মূল উপজীব্য কারবালার ঘটনা হলেও ঐতিহাসিক সত্যকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরা হয়নি। কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যেগুলো কারবালার প্রান্তরে ঘটেনি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাবিয়ার পুত্র নিধন, এজিদের জন্ম, ইমাম হাসানের সঙ্গে জয়নাবের বিয়ের কথা, জয়নাবের প্রতি এজিদের আকর্ষণ এসব বিষয় কাল্পনিক। এসব অতিপ্রাকৃত ঘটনা উপন্যাসটিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হতে কিছুটা বাধা দিয়েছে।

 

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যৎ বাণী ছিল, মাবিয়া পুত্র এজিদ ইমাম হোসেনকে অস্ত্র আঘাতে এবং হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করবে। ভবিষ্যৎ বাণী এড়াতে মাবিয়া তার পুত্রকে নিয়ে মদিনা থেকে দামেস্কে চলে যান। কিন্ত ভবিষ্যৎ বাণী ব্যর্থ করতে পারেনি। মাবিয়া পুত্র এজিদ মুসলিম জাহানের খলিফা হলে হোসেন তা মেনে নিতে পারেনি। এছাড়াও ইরাকি সমর্থকরা ইমাম হোসেনকে মুসলিম জাহানের খলিফা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। এভাবে ঘটনার সূত্রপাত হয়।

 

এজিদ ছিল জয়নাবের প্রেমে মুগ্ধ। জয়নাবকে পাওয়ার জন্য সে অন্ধ ছিল। জয়নাব ছিল রূপবতী ও গুণবতী নারী। তাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। গ্রিক মহাকাব্য ‘ইলিয়াড’-এর ‘হেলেন’ চরিত্রের মতো জয়নাবকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের যাবতীয় দ্বন্দ্ব, যুদ্ধ, রক্তপাত এবং ট্র্যাজেডি আবর্তিত হয়েছে। জয়নাব ছিলেন পরম রূপবতী, সতীসাধ্বী ও গুণবতী নারী। এজিদ জয়নাবকে পাওয়ার জন্য জয়নাবের স্বামীকে তালাক দিতে বাধ্য করে। তারপরেও জয়নাব তাকে শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করে। জয়নাব সৎ, ন্যায়পরায়ণ, সাহসী হাসানকে বিয়ে করেন। ফলে হাসানের প্রতি এজিদের ক্ষোভ তীব্রভাবে বেড়ে যায়। এজন্য এজিদ হাসানকে হত্যার পরিকল্পনা করে।

 

হাসানকে হত্যার জন্য এজিদের অনুচর মারওয়ান কৌশল অবলম্বন করে। মায়মুনা নামের এক লোভী ও কুচক্রী বৃদ্ধাকে মোটা অঙ্কের টাকা ও মদিনার প্রধান রাজবৈদ্যের পদ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে নিজের দলে টানে। মায়মুনা কৌশলে জায়েদার সতীন-বিদ্বেষকে উসকে দেয় এবং তাকে দিয়ে ইমাম হাসানকে বিষ পান করিয়ে হত্যা করে। কুফাবাসী ইমাম হোসেনকে কুফায় গিয়ে খিলাফতের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। পরিস্থিতি যাচাই করতে ইমাম হোসেন তাঁর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি মুসলিম বিন আকিলকে কুফায় পাঠান।

 

ইয়াজিদের গুপ্তচর ও গভর্ণর ইবনে জিয়াদের নির্মম অত্যাচারে কুফাবাসী ভয়ে পিছু হটে। শেষ পর্যন্ত মুসলিম বিন আকিল ও তাঁর সহায়তাকারী হানির শোচনীয় মৃত্যু ঘটে। কুফার পথে রওনা হয়ে ইমাম হোসেন পরিবার ও অল্প কিছু অনুসারী নিয়ে ফোরাত নদীর তীরে কারবালা প্রান্তরে এসে পৌঁছান। ইবনে জিয়াদ ও ওমরের বিশাল বাহিনী তাঁদের ঘিরে ফেলে এবং পানি সরবরাহের পথ বন্ধ করে দেয়। আশুরার দিনে ইয়াজিদের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে ইমাম হোসেন ও তাঁর সঙ্গীরা বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেন। একে একে ইমাম হোসেনের পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও অনুসারীরা শহীদ হন। পরিশেষে তৃষ্ণার্ত ইমাম হোসেনকে নৃশংসভাবে শহীদ করা হয় এবং তাঁর খণ্ডিত মস্তক দামেস্কে এজিদের কাছে পাঠানো হয়।

 

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসে মীর মশাররফ হোসেন এক কালজয়ী চরিত্র হিসেবে এজিদকে নির্মাণ করেছেন, যার চরিত্রের উজ্জ্বলতায় সমস্ত চরিত্র ম্লান হয়ে যায়। ইতিহাসের এজিদ ও বিষাদ সিন্ধুর এজিদ একেবারেই ভিন্ন। উপন্যাসে সে যেন তেজদীপ্ত পুরুষ হয়ে আমাদের সামনে উঠে এসেছে। তার চরিত্রে প্রেম, পাপ, ধর্মদ্রোহ, রাজনীতিতে বিচক্ষণতা, সময়বিদ্যায় পারদর্শিতা ইত্যাদি রূপ পাওয়া যায়। এজিদ জয়নাবের প্রেমে অন্ধ ছিল। কিন্তু জয়নাবকে বন্দী অবস্থায় পেয়ে তার প্রতি সদাচরণ করেছে। এজিদকে মেঘনাদবধ কাব্যের রাবণের সাথে তুলনা করা হয়। রাবণের মতো সে যে ছিল শক্তিমান ও বীরপুরুষ। মানবীয় দোষ-গুণে এজিদ সিন্ধুর কেন্দ্রীয় চরিত্র। সে জয়নাবের প্রেমের নিকট পরাজয় বরণ করেছে, যা এজিদ চরিত্রের বড় ট্রাজেডি।

 

এই উপন্যাসের সব থেকে মহান চরিত্র ইমাম হোসেন। তিনি শৌর্য, বীর্য, সাহস, দৃঢ়তা, উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতায় সবার থেকে এগিয়ে। ইমাম হোসেনের যুদ্ধ ছিল সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সব মহান গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও, নিয়তির কাছে তাকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। কারবালার প্রান্তরে তাকে শহীদ হতে হয়েছে এজিদের সৈন্যের হাতে। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

 

বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জীবন্ত ও উজ্জ্বল চরিত্র হলো জাহেদা। সে যেন বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। স্বামীর ভাগ তিনি দিতে চাননি, এজন্য স্বামীকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। ইমাম হাসান তৃতীয় বিয়ে করলে জাহেদা খুবই ক্ষুব্ধ হন। এজিদের ষড়যন্ত্রের প্ররোচনায় পড়ে জাহেদা নিজের স্বামীকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন এবং পরে এজিদকে বিয়ের আশায় দামেস্কে যান। সেখানে গেলে এজিদও তাকে প্রত্যাখ্যান করে। এভাবে বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসে জাহেদার চরিত্রের করুন পরিণতি ঘটে।

 

উপন্যাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নারী চরিত্র জয়নাব। গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড-এর ‘হেলেন’ চরিত্রের সাথে জয়নাবের চরিত্রের তুলনা করা যায়। তাকে কেন্দ্র করেই উপন্যাসের সমস্ত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছে। জয়নাবকে রামায়ণের সীতা চরিত্রের সাথে তুলনা করা যায়। সীতাকে অপহরণের মাধ্যমে রাবণ ও রাম-লক্ষণের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল।। এই উপন্যাসেও জয়নাবকে কেন্দ্র করে এজিদ ও হাসান হোসেনের দ্বন্দ্ব সংঘাত হয়েছিল। জাহেদাও সে কথা স্বীকার করে,

 

“এই হতভাগিনীই বিষাদ সিন্ধুর মূল।” (বিষাদ সিন্ধু, মীর মশারফ হোসেন)

 

পরিশেষে বলতে পারি, বাংলা সাহিত্যের একটি কালজয়ী মহাকাব্যিক উপন্যাস বিষাদ সিন্ধু। কারবালার ঐতিহাসিক যুদ্ধ নিয়ে রচিত এই উপন্যাসে মীর মশারফ হোসেনের শৈল্পিক দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। কাহিনীর অভিনবত্ব, চরিত্র চিত্রণের পারদর্শিতা, বর্ণনার চমৎকারীত্ব এবং ভাষার প্রবাহমানতায় বিষাদ সিন্ধু বাংলা সাহিত্যের একটি অনন্য সম্পদ।

 

FAQ

১. বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু কী?
উপন্যাসটির মূল বিষয়বস্তু হলো কারবালার মর্মান্তিক ঘটনা, ক্ষমতার লোভ, ষড়যন্ত্র এবং সত্য ও ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগ।

২. বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসের মূল শিক্ষা কী?
সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে হয় এবং অন্যায় ও ক্ষমতার লোভ শেষ পর্যন্ত ধ্বংস ডেকে আনে।

৩. বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসে কারবালার ঘটনার গুরুত্ব কী?
কারবালার ঘটনা উপন্যাসের প্রধান ভিত্তি, যার মাধ্যমে আত্মত্যাগ, বীরত্ব ও মানবিক বেদনাকে তুলে ধরা হয়েছে।

৪. বিষাদ সিন্ধু নামকরণ কেন সার্থক?
উপন্যাসের কাহিনি গভীর শোক, বেদনা ও ট্র্যাজেডিতে পূর্ণ। তাই অসীম দুঃখের প্রতীক হিসেবে ‘বিষাদ সিন্ধু’ নামটি সার্থক।

৫. বিষাদ সিন্ধু উপন্যাসে কোন মূল্যবোধ প্রকাশ পেয়েছে?
উপন্যাসে সত্য, ন্যায়, ত্যাগ, ধৈর্য, মানবতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মূল্যবোধ প্রকাশ পেয়েছে।

 

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120