বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে রবীন্দ্রনাথের পদচারণা পড়েনি। উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধ সব ক্ষেত্রে তার হাতের ছোঁয়া লেগেছে। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করার অবদান সবচেয়ে বেশি তাঁর। তিনি একাধারে একজন কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সমাজ-সংস্কারক, চিত্রশিল্পী, গীতিকার। ১৯১৩ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে তিনি সর্বপ্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী, জন্ম
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয় ১৮৬১ সালের ৭ই মে, ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫শে বৈশাখ, কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে। তার পিতার নাম মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা সারদা দেবী। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর পরিবারের চতুর্দশতম সন্তান এবং অষ্টম পুত্র। পিতামহ ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যান্য বিখ্যাত ভ্রাতাগণের মধ্যে ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বোন স্বর্ণকুমারী দেবী। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তার মা মারা যান।
বিখ্যাত ঠাকুর পরিবার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ ছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। তিনি ঠাকুর পরিবারের ব্যবসা এবং জমিদারী ধন-সম্পদ বৃদ্ধিতে অবদান রাখেন। তিনি ব্যবসার পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক কাজেও আত্মনিয়োগ করেন। উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণ ও ধর্ম সংস্কার আন্দোলনে দ্বারকানাথ ঠাকুরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এ সময়ের একেশ্বরবাদের প্রবক্তা রামমোহন রায় ছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রামমোহন রায়ের আদর্শ দ্বারকানাথ ঠাকুর এবং তার পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রভাবিত করে। রামমোহন রায় সেই সময়ে ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক বিধবা বিবাহ প্রচলনকারী এবং একজন দার্শনিক। দ্বারকানাথ ঠাকুর সেই আদর্শে প্রভাবিত হন এবং তিনি তার সন্তানদেরকে সেই আদর্শে প্রভাবিত করেন।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পিতার দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হযন। ফলে তিনি সততা, ধর্মবোধ, ঋষিসুলভ ও চারিত্রিক গুণের অধিকারী হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমগ্র সাহিত্য জীবন তার পিতার আদর্শে প্রভাবিত ছিল। সে যুগে ঠাকুর পরিবার ছিল সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুক্তাচিন্তা ও প্রগতিশীল ভাবধা সমৃদ্ধ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন একজন প্রগতিশীল ব্যক্তি। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, সততা ও ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করে। তিনি নিয়মিত উপনিষদ চর্চা করতেন। এসব গুণ রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও ব্যাপক প্রভাব ফেলে। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্যে তার পিতার আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে। সেসময় ঠাকুর পরিবার ছিল মার্জিত, শিক্ষিত ও আধুনিক ধারার। বাল্যকাল থেকে তিনি এই আবহে বেড়ে ওঠেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা জীবন
শুরু থেকেই রবীন্দ্রনাথের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি অনীহা ছিল। তিনি বাড়িতে গৃহশিক্ষকের নিকট বিদ্যালাভে আগ্রহী ছিলেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয় কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে ১৮৬৭ সালে। সেখানে তিনি বেশ কিছু দিন একাডেমি শিক্ষা লাভ করেন। এরপর তিনি কিছুদিন নর্ম্যাল স্কুলে লেখাপড়া করেন ১৮৭০ সালে। ১৮৭১ সালে বেঙ্গল অ্যাকাডেমি থেকে তিনি বাংলা ভাষা ভালো ভাবে আয়ত্ত করেন। তারপর তিনি সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুবই অনিয়মিত ছিলেন। ফলে গৃহশিক্ষকের কাছ থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেন।
এরপর ১৮৭৩ সালে তিনি পিতার সাথে দেশভ্রমণে বের হন। প্রথমে তিনি যান শান্তিনিকেতনে। তারপর পাঞ্জাবের শিখদের উপাসনালয়ে। সেখান থেকে পিতার সাথে হিমালয়ে নির্জন গৃহে বেশ কিছুদিন প্রাকৃতিক পরিবেশ বসবাস। সেখান থেকে তিনি পিতার কাছে সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তার পিতা তাকে বিভিন্ন দার্শনিক, মনিষী ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনীগ্রন্থ পড়ান।
দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় তার অনিহা দেখে তার মেজদা সত্যেন্দ্রনাথ তাকে ১৮৭৮ লন্ডনে নিয়ে যান। প্রথমে তিনি ভর্তি হন ব্রাইটনের একটি পাবলিক স্কুলে কিছু দিন লেখাপড়া করেন। ১৮৭৯ সালে ভর্তি হন ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইন বিষয়ে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের প্রতি তার গভীর অনুরাগ ছিলো। ফলে সেই শিক্ষাও সমাপ্ত হয়নি। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হন। এসময় তিনি শেক্সপিয়ার ও অন্যান্য সাহিত্যিকদের দ্বারা প্রভাবিত হন। ১৮৮০ সালে তিনি দেড় বছর পরে দেশে ফেরেন।
বিবাহ ও পারিবারিক জীবন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৩ সালে ২২ বছর বয়সে ঠাকুর বাড়ির কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণীকে বিয়ে করেন।পরবর্তীতে তার নামকরণ করেন মৃণালিনী দেবী। সাহিত্যচর্চায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিরবে সাহায্য করতেন। তাঁদের সংসারে মোট পাঁচ সন্তান জন্ম নেয় – মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা এবং শমীন্দ্রনাথ। রেণুকা ও শমীন্দ্রনাথ খুবই অল্প বয়সে মারা যায়। ১৯০২ সালে মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃণালিনী দেবীর অকাল মৃত্যু ঘটে। রবীন্দ্রনাথ গভীরভাবে শোকাহত হন। তিনি আর দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। তার স্মৃতি আঁকড়ে ধরে তিনি জীবন কাটিয়েছিলেন। ১৯০৫ সালে পিতাও মারা যান।
১৮৮৪ সালে রবীন্দ্রনাথের বিয়ের চার মাস পরে তার বৌঠান জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী কাদম্বরী দেবী আফিম খেতে আত্মহত্যা করেন। এজন্যই ঠাকুর পরিবারে বিশাল হতাশা নেমে আসে। রবীন্দ্রনাথও গভীরভাবে শোকাহত হন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি ও জনকল্যাণমূলক কাজ
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি একজন জমিদার ছিলেন।পিতার আদেশে ১৮৯১ সালে নাদিয়া, পাবনা, রাজশাহী ও ওড়িশার জমিদারি দেখাশোনা করেন। তিনি একজন প্রজাহিতৈষী মানুষ ছিলেন। প্রজারাও তাকে অনেক ভালোবাসতো। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি দীর্ঘদিন অতিবাহিত করেছেন। ‘পদ্মা’ নামক একটা বোটে তিনি বাংলার সৌন্দর্য দেখতেন। জমিদারির সময় তিনি অনেক জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো – সমবায় ব্যাংক, স্কুল,দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রজাদের বিনা সুধ বা অল্প সুধে ঋণ দিতেন। তিনি তার নোবেল পুরষ্কারের অধিকাংশ টাকা এই কাজে ব্যবহার করতেন।
তিনি সেচ পদ্ধতি নিয়ে অনেক কাজ করেছেন। কিভাবে কৃষি কাজকে সহজ করা যায় সে বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। তাই তো ১৯০৬ সালে নিজের বড়ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমেরিকায় পাঠান আধুনিক কৃষি, সেচ ও গোপালন বিদ্যা শেখার জন্য। তিনি সম্পূর্ণ নিজের অর্থায়নে কৃষকদের সহায়তা করতেন। এরপর ১৯০৭ সালে ছোট জামাতা নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কেও আমেরিকা পাঠান কৃষি বিজ্ঞান শেখার জন্য।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য জীবন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র আট বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কবিতা লিখে গেছেন।এক সময় তার কলম থেমে গিয়েছিল কিন্তু তিনি থেমে যাননি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুখে মুখে কবিতা আওড়িয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার পর্ব
তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় আট বছর বয়সে ভারতী ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। প্রথম জীবনে তিনি ভানুসিংহ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন। তিনি সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন কবিতায়। তার কবিতাগুলোকে আটটি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো তুলে ধরা হলো।
১. সূচনা পর্ব
রবীন্দ্রনাথ প্রতীভার প্রথম তিন বছরকে সূচনা পর্ব বলা হয়। এসম তার কবিতার হাতেখড়ি হয়। ১৮৭৮ থেকে ১৮৮১ সালের মধ্যের এই সময়কে সূচনা পর্ব বলা হয়। এসময় প্রকাশিত হয়- রূদ্রচন্ড, বাল্মীকি প্রতিভা, কালমৃগয়া, শৈশব সংগীত।
২. উন্মেষ পর্ব
১৮৮২ থেকে ১৮৮৬ পর্যন্ত সময়কে উন্মেষ পর্ব বলা হয়। এ সময় তার মধ্যে স্বকীয়তা লক্ষ্য করা যায়। তিনি নিজেকে বিকাশিত করেছেন ধীরে ধীরে। এ সময় তিনি প্রকৃতি ও রোমান্টিকতা নিয়েই কাব্যচর্চা করতেন। তিনি লেখেন – সন্ধ্যাসঙ্গীত, প্রভাতসঙ্গীত, ছবি ও গান, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি ও কড়ি ও কোমল।
৩. ঐশ্বর্য পর্ব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তিরিশ থেকে পয়ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে এই পর্বকে বলা হয় ঐশ্বর্য পর্ব। এই পর্বে কবি প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটে। এই পর্বে কবি হৃদয়ে রোমান্টিক কল্পনা ও বিশেষ জীবনদর্শন, বিশ্বসত্তার সাথে মিলন, জীবনদেবতার লীলা চেতনা, প্রভৃতি বহু বিচিত্র বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটে । এ সময় তিনি লেখেন- মানসী, সোনার তরী, চিত্রা, ক্ষণিকা, কল্পনা, চৈতালী কাব্যগ্রন্থ।
৪. আধ্যাত্ম পর্ব
রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাধনার এই পর্বকে অধ্যাত্মভাবপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা চলে। নৈবেদ্য, খেয়া, কথা ও কাহিনী, স্মরণ এই পর্বের কাব্যগ্রন্থ। কবির জীবনদেবতার কল্পনা এইখানে প্রকাশমান হয়। তাছাড়া জগৎ ও জীবনের মাধ্যমে ভগবৎ উপলব্ধির বৈশিষ্ট্যও এই পর্যায়ের কাব্যে ফুটে উঠেছে। কবি ভগবানকে কোনো সম্প্রদায় নির্দিষ্ট পূজানুষ্ঠান বা রূপধ্যানের মাধ্যমে অনুভব করেননি, বরং উপলব্ধি করেছেন প্রকৃতির পরিবর্তনশীল রূপের মধ্যে।
৫. গীতাঞ্জলি পর্ব
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কাব্য গীতাঞ্জলি। এটা তার সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত কাব্য, এছাড়া এই পর্বে তিনি আরো রচনা করেন ’গীতিমাল্য’ ও ’গীতালি’। গীতাঞ্জলি কাব্যে তিনি তার ভগবত প্রেমের স্বরূপ উল্লেখ করেন। গীতাঞ্জলি ইংরেজি অনুবাদ কাব্যের জন্যে কবি ১৯১৩ সালে নোবেল পুরষ্কার লাভের গৌরব অর্জন করেন। গীতাঞ্জলি কাব্যে দেখিয়েছেন যে, বিধাতা বিচিত্র রূপে প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। এই কাব্যে কবি বিশ্বশান্তি ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা যখন চারিদিকে গ্রাস করেছে ঠিক তখনই তিনি শান্তির বাণী নিয়ে বিশ্ব দরবারে হাজির। এই কাব্যের প্রথম কবিতায় কবি বলেছেন
“আমার মাথা নত করে দাও হে তেমার চরণধুলির তলে”
এখানে তিনি শান্তির বাণী প্রচার করে গেছেন। বিশ্বপ্রেম ও মানবপ্রেমের জয়গান গেয়েছেন। এজন্য নোবেল কমিটি তাকে নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত করে।
৬. বলাকা পর্ব
রবীন্দ্র কবিজীবনের সর্বশেষ পরিণত পর্যকে আমরা বলাকার নামানুসারে চিহ্নিত করতে পারি। বলাকা (১৯১৬), পূরবী (১৯২৫), মাহুয়া (১৯২৯)-এই পর্বের তিনটি কাব্য রবীন্দ্রনাথের প্রৌঢ় জীবনের স্নিগ্ধতার মধ্যে রচিত হলেও এর প্রত্যেক খানিতে যে জাগ্রত জীবনবোধ, বুদ্ধির যে বিশ্বজয়কর দীপ্তি এবং বিশ্ব সম্পর্কে যে বিশালতার ইঙ্গিত রয়েছে তা এক প্রকার বিষ্ময়কর ব্যাপার। এই পর্বের কাব্য কবি গতিবাদের কথা উল্লেখ করেছেন। কবি উপলব্ধি করেছেন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নিরন্তর পরিবর্তনের স্রোত বয়ে চলেছে। এই গতি সৃষ্টির মর্মবাণী।
৭. পুনশ্চ পর্ব
পুনশ্চ পর্ব কবির গদ্যছন্দে রচিত কাব্যগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। কবি এই পার্যায়ে তার চিরাচরিত পন্থা অনুসরণ না করে নতুন পথের অভিযাত্রী হলেন। কাব্যের অন্তমিলের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য উপেক্ষা করে গদ্যছন্দের রচনা করেন। তাই এই পর্বে তিনি নতুন ছন্দ ব্যবহার করেন। এই পর্বের কাব্য গুলো হলো – পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, পত্রপুট ও শ্যামলী।
৮. অন্তপর্ব
অন্তপর্বের কাব্যগুলো হলো 'প্রান্তিক', 'আকাশ প্রদীপ' সেজুতি, নবজাতক, সানাই, রোগশয্যায়, আরোগ্য জন্মদিনে প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগুলোর মধ্যে শৈথিল্যপূর্ণ কবিকল্পনা সহজ সরল ছন্দ সহকারে প্রকাশ পেয়েছে। এই সব কাব্যের মাধ্যমে মরণের উপকূলে দাড়িয়েও কবি নতুন চিন্তা ও অনুভূতিকে আত্মসাৎ এবং নতুন ছন্দে তা রূপায়িত করেছেন। শেষ অন্তপর্বের কাব্যে কবি পূর্ববর্তী কাব্যসমূহের ভাবধারাকে অভিনবত্ব দান করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবদ্দশায় বহু উপন্যাস লিখেছেন। একেকটি উপন্যাস একেকটি পটভূমিতে লিখেছেন। ১৮৮৩ সাল থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তিনি মোট ১৩ টি উপন্যাস লিখেছেন। তার উপন্যাস গুলো বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।
ঐতিহাসিক ও পারিবারিক
- বউ-ঠাকুরানীর হাট – ১৮৮৩
- রাজর্ষি – ১৮৮৭
সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক
- চোখের বালি – ১৯০৩
- নৌকাডুবি – ১৯০৬
- প্রজাপতির নির্বন্ধ – ১৯০৮
- গোরা – ১৯১০
- ঘরে-বাইরে – ১৯১৬
- চতুরঙ্গ – ১৯১৬
আধুনিকতা ও রাজনৈতিক
- যোগাযোগ – ১৯২৯
- শেষের কবিতা – ১৯২৯
- দুই বোন – ১৯৩৩
- মালঞ্চ – ১৯৩৪
- চার অধ্যায় – ১৯৩৪
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা, উপন্যাসের পাশাপাশি বহু নাটক লিখেছেন। তার নাটক সমূহকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ যায়।
১. গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য
- বাল্মীকিপ্রতিভা (১৮৮১)
- কালমৃগয়া (১৮৮২)
- মায়ার খেলা (১৮৮৮)
- চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২/১৯৩৬)
- চণ্ডালিকা (১৯৩৩)
- শ্যামা (১৯৩৯)
২. কাব্যনাট্য
- প্রকৃতির প্রতিশোধ (১৮৯০)
- মালিনী (১৮৯৬)
- বিদায়-অভিশাপ (১৯০০)
- গান্ধারীর আবেদন (১৯০৭)
- সতী (১৯০৭)
- লক্ষ্মীর পরীক্ষা (১৯০৭)
৩. নাটক (পূর্ণাঙ্গ ও সামাজিক)
- রাজা ও রাণী (১৮৮৯)
- বিসর্জন (১৮৯০)
- প্রায়শ্চিত্ত (১৯০৯)
- রাজা (১৯১০)
- ডাকঘর (১৯১২)
- অচলায়তন (১৯১২)
- মুক্তধারা (১৯২২)
- তাসের দেশ (১৯৩৩)
- চিরকুমার সভা (১৯২৬)
৪. প্রহসন ও কৌতুকনাট্য
- গোড়ায় গলদ (১৮৯২)
- বৈকুণ্ঠের খাতা (১৮৯৭)
- হাস্যকৌতুক ও ব্যঙ্গকৌতুক (১৯০৭)
- শেষরক্ষা (১৯২৮)
৫. রূপক-সাংকেতিক নাটক
- শারদোৎসব (১৯০৮)
- ফাল্গুনী (১৯১৬)
- রক্তকরবী (১৯২৪)
- অরূপ রতন (১৯২০/১৯২৪)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা, নাটক, উপন্যাসের মতো অসংখ্য ছোটগল্প লিখেছেন। তিনি প্রায় ৯৫ টির মতো ছোটগল্প লিখেছেন। তার গল্পগুলো হলো-
১. বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গল্প
- কাবুলিওয়ালা
- পোস্টমাস্টার
- শুভা
- ক্ষুধিত পাষাণ
- নষ্টনীড়
- একরাত্রি
- অতিথি
- হৈমন্তী
- সমাপ্তি
- অধ্যাপক
২. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গল্প
- খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন
- জীবিত ও মৃত
- দেনা-পাওনা
- মনিহারা
- সম্পত্তি-সমর্পণ
- স্ত্রীর পত্র
- চৌরঙ্গী
- বলাই
- ল্যাবরেটরি
৩. প্রথম ও শেষ গল্প
- প্রথম ছোটগল্প: ‘ভিখারিণী’
- শেষ ছোটগল্প: ‘ল্যাবরেটরি’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান
তিনি সাহিত্যচর্চা পাশাপাশি বহু গান লিখেছেন। তিনি প্রায় ২০০০ এর বেশি গান লিখেছেন যা ‘গীতবিতান’ গ্রন্থে সংকলিত। তার কিছু বিখ্যাত গানের তালিকা হলো-
১. প্রেম ও প্রকৃতি
- আমার পরান যাহা চায়
- তুমি রবে নীরবে
- আকাশ ভরা সূর্য তারা
- আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে
- সখী ভাবনা কাহারে কয়
২. পূজা ও প্রার্থনা
- পুরানো সেই দিনের কথা
- আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে
- বিপদে মোরে রক্ষা করো
- আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান
- তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে
৩. স্বদেশ ও পূজা
- আমার সোনার বাংলা
- ও আমার দেশের মাটি
- সার্থক জনম আমার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকর্ম
তিনি অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। তিনি প্রায় ২৫০০ এর বেশি ছবি এঁকেছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ নামহীন। তার কিছু উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম হলো-
- বার্ড ফ্যান্টাস্টিক
- ল্যান্ডস্কেপ
- ড্যান্সিং ওম্যান
- ওম্যানস ফেস
- ম্যাস্কেড ফেসেস
- প্রোবাবেল অ্যানিম্যাল
- দ্য ব্লু ল্যান্ডস্কেপ
- ডেথ সিন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুরস্কার ও সম্মাননা
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবদ্দশায় বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। নিচে তাঁর প্রধান পুরস্কার ও সম্মাননাগুলোর তালিকা দেওয়া হলো-
- নোবেল পুরস্কার (১৯১৩): ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ বা Song Offerings কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল লাভ করেন।
- নাইটহুড (১৯১৫): ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘স্যার’ (Knight) উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি এই উপাধি বর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত সম্মানসূচক ডিলিট (D.Litt.)
- কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯১৩ সালে।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯৩৬ সালে।
- অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯৪০ সালের ৭ই আগস্ট।
- ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯৩৮ সালে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সম্মাননা
- এফআরএএস (FRAS)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একজন কিংবদন্তি ব্যক্তি ছিলেন। যার বিশালতা বাংলা সাহিত্যের অপূর্ণতাকে পূর্ণতা দান করেছে। তিনি মানবপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, শান্তি ও সৌন্দর্যের প্রেমিক ছিলেন। যিনি তার জীবনের একটি দিনও সাহিত্যচর্চা ছাড়া কাটাননি। ৭/৮ বছর বয়স থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি একাধারে লিখে গেছেন। তিনি জীবনের বহু প্রতিকূল পথ তিনি পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর কাব্যচর্চার পথ এটটা সহজ ছিল না। অভাবনীয় প্রতিভার শক্তিতে তিনি বিশ্ব জয় করেছেন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। হাজার হাজার অভিজ্ঞতায় তিনি তাঁর সাহিত্য জগতকে সাজিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অমর হয়ে আছেন। এই কিংবদন্তি কবির মহাকাব্যিক যাত্রা ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট শেষ হয়। বাংলা সনের হিসেবে দিনটি ছিল ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮।
তথ্যসূত্র:
১. ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ। জীবনস্মৃতি। বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ। ২. মুখোপাধ্যায়, প্রভাতকুমার। রবীন্দ্র-জীবনী (প্রথম খণ্ড)। আনন্দ পাবলিশার্স।
আরো পড়ুন
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস ও জীবনী
- কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনী
- বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ধারা ও বৈশিষ্ট্য
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন: এর রচয়িতা, সাহিত্যিক গুরুত্ব, আঙ্গিক, ছন্দ ও অলংকার
- চল্লিশের দশকের কবি ও কবিতার ধারা
- বাংলা সাহিত্যের যুগ বিভাগ
- পঞ্চাশের দশকের কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।
- দেশভাগের পরবর্তী উপন্যাস: বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সাহিত্যিক গুরুত্ব
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস | বাংলাদেশের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
