বিলাসী গল্পের মূলভাব, চরিত্র বিশ্লেষণ খুঁটিনাটি আলোচনা

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিলাসী গল্পে ধর্ম, বর্ণ ও জাত প্রথার ঊর্ধ্বে মানবতার জয়গান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দুই জাতের নর-নারীর প্রেম জাতিগত বিভেদের প্রাচীর চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মৃত্যুঞ্জয়ের নিজ ধর্ম, বর্ণ ও জাত বলিদান দিয়ে নিচু জাতের মেয়েকে বিয়ে করার মাধ্যমে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই গল্পে সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে সকল রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কার দূর করার অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন।

শরৎচন্দ্র তার অন্যান্য নায়িকাদের মতো বিলাসীকে এই গল্পে এক অতিমানবীয় নারী চরিত্ররূপে দাঁড় করিয়েছেন, যার সেবায় ও মমতায় মুগ্ধ হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়। মৃত্যুঞ্জয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও প্রেমের মহিমায় বিলাসী নির্দ্বিধায় স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নিয়ে এক অমর প্রেম কাহিনী সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি, নিচু জাতের প্রতি অবহেলা এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য। এই আর্টিকেলে বিলাসী গল্পের মূলভাব, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং খুঁটিনাটি আলোচনা করা হল।

 

বিলাসী গল্পের মূলভাব

 

 

বিলাসী গল্পের লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের এক অমর ব্যক্তিত্ব শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি ১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার দেবানন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং কালজয়ী কথাসাহিত্যের মধ্যে তিনি অন্যতম একজন ছিলেন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি সন্ন্যাসী হয়ে গৃহত্যাগ করেছিলেন। জীবিকার তাগিদে বার্মা বর্তমান মায়ানমারেও গিয়েছিলেন।

তিনি “মন্দির” নামে একটি গল্প রচনা করেছিলেন, যা কুন্তলীন পুরস্কার প্রাপ্ত হয়েছিল। তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে

  • দেবদাস
  • পল্লী সমাজ
  • চরিত্রহীন
  •  শ্রীকান্ত
  •  গৃহদাহ
  •  দেনা পাওনা ইত্যাদি

এসব উপন্যাসে তিনি প্রেম এবং নারীদের অসামান্য চরিত্ররূপে অঙ্কিত করেছেন। তার বহু উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৩ সালে তাকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদকে সম্মানিত করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৩৬ সালে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রী প্রদান করে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৬ জানুয়ারি কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।

 

বিলাসী গল্পের মূলভাব

বিলাসী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি অন্যতম কালজয়ী ছোট গল্প। লেখক সর্বদর্শী অবস্থান থেকে কাহিনী বর্ণনা করেছেন এবং সবগুলো চরিত্রকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করেছেন। গল্পের প্রথমে দেখানো হয়েছে গ্রামের ছেলেরা চার ক্রোশ পথ হাঁটিয়ে বিদ্যা অর্জন করতে স্কুলে যায়। চার ক্রোশ মানে ৮ মাইলের থেকেও বেশি। বর্ষার দিনে ছেলেরা মাথার উপর বৃষ্টি ও পায়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদা নিয়ে এবং গ্রীষ্মের দিনে জলের বদলে সূর্যের কড়া রোদ এবং ধুলার মধ্যে দিয়ে অনেক কষ্ট করে বিদ্যা অর্জন করতে স্কুলে যায়। কিন্তু এই বিদ্যা অর্জনের ফল কি?

 

এই চার ক্রোশ পথ হাঁটার সময় তারা পথে কার বাগানে আম পেকেছে, কার বাগানে খেজুর পেকেছে, কার বাগানে অপর্যাপ্ত ফল আছে সেগুলোর খবর রাখে কিন্তু লেখাপড়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো মনোযোগ নেই। সাধারণ কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেও তারা উত্তর দিতে পারে না। যেমন, সাইবেরিয়ার খনির মধ্যে কি পাওয়া যায়—সোনা না রূপা? এ সকল প্রশ্নের উত্তরও তারা দিতে পারে না। ফলস্বরূপ তারা মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে আসে। এমন মনে হয় যেন শিক্ষককেই মারা উচিত। এই ছিল তাদের পড়াশুনোর অবস্থা। এই বিদ্যা কি তাদের মানুষ করে গড়ে তুলবে? সমাজের সকল অন্ধত্ব দূর করতে সাহায্য করবে এই বিদ্যা?

 

বিলাসী গল্পের কাহিনী খুবই আকর্ষণীয়। ন্যাড়ার জবানীতে মৃত্যুঞ্জয় ও বিলাসীর ব্যতিক্রমী প্রেমের মহিমা বর্ণিত হয়েছে। মৃত্যুঞ্জয় ছাত্র হিসেবে ছিল খুবই দুর্বল। সে ক্লাস থ্রির উপরে কখনো উঠতে পারেনি। পড়াশোনা না পারলেও সে ছিল মানবিক। তার মধ্যে মানবতা ও উদারতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায়। বাবা-মা কেউ ছিল না। তার একটি ২০-২৫ বিঘার আমবাগান ছিল। সেই আমবাগানের মধ্যে একটি পোড়া ঘরে একা রান্না করে খেত। তার এক খুড়ো ছিল, যে এই আমবাগান দখল করার জন্য বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করে এবং সেটা দখল করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। মৃত্যুঞ্জয় এই আমবাগানের আম বিক্রি করে যে টাকা পেত, সেই টাকা দিয়ে চলত।

 

মৃত্যুঞ্জয়ের একবার ভয়ানক অসুখ হয়। এক বুড়ো তাকে চিকিৎসা করে এবং তার মেয়ে বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়কে সেবা যত্ন করে, সেবার মতো মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে। বিলাসী এই আমবাগানের মধ্যে একটি পোড়াঘরে একজন অসুস্থ রোগীকে নিয়ে দিনের পর দিন পার করে অনেক সেবাযত্ন করে মৃত্যুঞ্জয়কে সেবার মতো বাঁচিয়ে নিয়ে আসে। মেয়েটি নিজের জীবনের কোনো চিন্তা না করে শুধু মৃত্যুঞ্জয়ের কথা ভেবে তার সেবা করে।

 

এরপর মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীকে বিয়ে করে। বিয়ের খবর যখন তার খুড়ো জানতে পারে, তখন সে খুবই রাগান্বিত হয়। বিলাসীর বাবা ছিল সাপুড়ে, তাই সাপুড়ে মেয়েকে বিয়ে করার ফলে তাদের জাত চলে গেছে। এখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা থেকে দেখা হয়েছে। খুড়ো গিয়ে বিলাসীকে মারতে মারতে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কিছুদিন পরে মৃত্যুঞ্জয়ও বিলাসীদের বাড়িতে গিয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে সুখে সংসার করে।

 

মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীর বাবার থেকে সাপ খেলা শিখে সাপ খেলা দেখিয়ে জীবিকা অর্জন করতে থাকে। কিন্তু এইসব খেলা বিলাসীর পছন্দ নয় কারণ সাপের কামড়ে যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে। এ সময় গল্পকথক ন্যাড়ার সাথে তাদের দেখা হয়। ন্যাড়াও মৃত্যুঞ্জয়ের থেকে সাপ খেলা শিখে একসাথে সাপ খেলা দেখাতে থাকে। একদিন সাপ ধরতে গিয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে সাপে কামড়ায়। অনেক চেষ্টার পরেও মৃত্যুঞ্জয়কে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

 

বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যুকে সহ্য করতে পারেনি। ফলে সে আত্মহত্যা করে। এখানে বিলাসীর মধ্যে আমরা এক অতিমানবীয় নারীর পরিচয় পাই। বিলাসী সমাজের সকল রক্ষণশীলতার জবাব দিয়ে প্রেমের মহিমায় স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ বেছে নিয়েছে। তার বুদ্ধি, কর্মনিপুণতা ও সেবাব্রত মনোভব পাঠককে মুগ্ধ করে। সকল অন্ধত্ব ও কলুষিতার বিরুদ্ধে মানবতার মুক্তি এই গল্পের মূল প্রতিপাদ্য।

 

বিলাসী গল্পের মাধ্যমে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সমাজের সকল রক্ষণশীলতা, ধর্মীয় গোড়ামী, কুসংস্কার এবং জাতপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সুর ব্যক্ত করেছেন। জাতিগত বিভেদের সংকীর্ণ সীমা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে মানবমুক্তির পথ তুলে ধরেছেন। সমাজের সকল মানুষকে সমান চোখে দেখার জন্য এই গল্পে আহ্বান করা হয়েছে। মানুষ হিসেবে না দেখে যা জাতপ্রথাকে বড় করা হয়েছে, সেই প্রথা ভেঙে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার জন্য শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এই গল্পে আহ্বান করেছেন।

 

বিলাসী গল্পের চরিত্র বিশ্লেষণ

বিলাসী

বিলাসী কর্মনিপুণ, সেবাব্রতী, বুদ্ধিমতি ও প্রেমময়ী নারী, সাপুড়ের মেয়ে। মৃত্যুঞ্জয়কে সেবাযত্ন করে সুস্থ করে তোলে এবং মৃত্যুঞ্জয়কে বিয়ে করে। মৃত্যুঞ্জয় সাপের কামড়ে মারা গেলে বিলাসীও আত্মহত্যা করে মারা যায়। প্রেমের জন্য জীবন দিতেও এক মুহূর্ত ভাবেনি সে। এই তার চরিত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

 

 

মৃত্যুঞ্জয়

মৃত্যুঞ্জয় খুবই খারাপ ছাত্র, থ্রার্ড ক্লাসের উপরে উঠতে পারেনি। কিন্তু সে ছিল মানবিক ও হৃদয়বান মানুষ। তার ২০-২৫ বিঘার একটি আমবাগান ছিল, সেই আমবাগান তার খুড়ো দখল করতে চেয়েছিল। সে বিলাসীকে বিয়ে করে এবং সাপ খেলা দেখায়। সাপের কামড়ে মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু হয়। জাত প্রথা সে তুচ্ছ করে মানবতাকে বড় করে দেখেছে।

 

ন্যাড়া

ন্যাড়া এই গল্পের গল্পকথক। সে মানবতাকে সবার উপরে মূল্য দিয়েছে। সাপ খেলা শিখে সে মৃত্যুঞ্জয়ের সাথে সাপ খেলা দেখাত। তার চরিত্রে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের উপর মানবতার মূল্য পেয়েছে।

 

খুড়ো

মৃত্যুঞ্জয়ের খুড়ো একজন লোভী ছিল। সে সকল ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও জাতীগত বিভেদকে মেনে চলত। মৃত্যুঞ্জয়ের আমবাগান দখল করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করে। মৃত্যুঞ্জয় বিলাসীকে বিয়ে করলে খুড়ো বিলাসীকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং মৃত্যুঞ্জয় মারা গেলে তার সকল সম্পত্তি ও আমবাগান দখল করে নেয়।

 

FAQ

১. ‘বিলাসী’ গল্পের নামকরণের সার্থকতা কী?
উত্তর: গল্পের প্রধান চরিত্র বিলাসীকে কেন্দ্র করেই কাহিনি আবর্তিত হয়েছে, তাই নামকরণটি সার্থক।

২. বিলাসী চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: বিলাসী প্রেমময়, সাহসী, ত্যাগী ও মানবিক নারী।

৩. ‘বিলাসী’ গল্পে কী ধরনের সামাজিক সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে?
উত্তর: জাতিভেদ, কুসংস্কার ও সামাজিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

৪. ‘বিলাসী’ গল্পে মানবতাবাদ কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: জাতি-শ্রেণির ঊর্ধ্বে মানুষের ভালোবাসা ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে।

৫. ‘বিলাসী’ গল্পের মূল শিক্ষা কী?
উত্তর: সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা ও মানবিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120