নারীর জীবন সংগ্রামের এক কঠিন বাস্তবতা নিয়ে রচিত মাসি-পিসি গল্প। স্বামীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে পিতামাতাহীন আহ্লাদি আশ্রয় নেয় মাসি পিসি’র কাছে। পুরুষহীন দুই নারীর জীবন সংগ্রাম এবং আহ্লাদিকে প্রতিকূল পৃথিবী থেকে বাঁচিয়ে রাখার এক বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী প্রচেষ্টা গল্পটিকে অনন্য করে তুলেছে। এই গল্পে ফুটে উঠেছে স্বামীর নির্যাতনের চিত্র। এবং একই সাথে পারিপার্শ্বিক পুরুষ নারীদের কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখে। দুই বিধবা নারীর যে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ এই গল্পে দেখা যায় তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। আহ্লাদিকে নিয়ে মাসি পিসি’র জীবনযুদ্ধ এই গল্পকে মাহাত্ম্য দান করে।

মাসি-পিসি গল্প’র লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা কথা সাহিত্য জগতের তিনি এক অনন্য ব্যক্তি। মানিক বন্দোপাধ্যায় ১৯০৮ সালের ১৯ মে বিহারের সাঁওতাল পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিক্রমপুরে। তিনি মাত্র ২০ বছর বয়সে বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে তাঁর প্রথম গল্প অতসীমামী লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। বাংলা কথাসাহিত্যে তার অবদান অসামান্য। তিনি অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখেছেন । তার রচনা গুলো তুলে ধরা হলো –
- জননী
- দিবারাত্রির কাব্য
- পদ্মানদীর মাঝি
- পুতুলনাচের ইতিকথা
- চিহ্ন
তাঁর বিখ্যাত ছোটগল্পের মধ্যে উল্লেখযোগ্য
- প্রাগৈতিহাসিক
- সরীসৃপ
- সমুদ্রের স্বাদ
- কুষ্ঠরোগীর বৌ
- টিকটিকি
- হলুদ পোড়া
- আজ কাল পরশুর গল্প
- হারানের নাতজামাই
- ছোট বকুলপুরের যাত্রী
এভাবে তিনি অসংখ্য ছোট গল্প উপন্যাসে লিখে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ১৯৫৬ সালে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
মাসি-পিসি গল্পের মূলভাব বিশ্লেষণ
নারীর জীবনসংগ্রাম ও চারপাশের প্রতিকূল পরিবেশ নিয়ে রচিত ‘মাসি-পিসি’ গল্পটি বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। পিতামাতাহীন এক অসহায় মেয়েকে বাঁচানোর জন্য মাসি-পিসির আপ্রাণ চেষ্টা পাঠকদের বিমোহিত করে। মাসি-পিসি আহ্লাদিকে শুধু স্বামীর নির্যাতন বা ক্ষুধার জ্বালা থেকে বাঁচায়নি, চারপাশের পরিবেশের লুলুপ দৃষ্টি থেকেও আহ্লাদিকে বাঁচিয়েছে। গল্পটি রচনার মাধ্যমে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর অভাবনীয় প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন।
‘মাসি-পিসি’ গল্পে দুর্ভিক্ষের কবলে খাদ্যাভাবে অসংখ্য লোক মারা যায়। একই সঙ্গে কলেরা মহামারি আকার ধারণ করে। দুর্ভিক্ষ ও মহামারি কলেরায় আহ্লাদির মা, বাবা ও ভাই মারা যায়। আহ্লাদির আপন বলতে শুধু মাসি-পিসি বেঁচে ছিল। স্বামীর ঘরে আহ্লাদি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হতো। সে নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাসি-পিসির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে।
মাসি-পিসি আহ্লাদির বাবা-মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা তাকে সেবা করে সুস্থ করে তোলে। তাদের পরিবারে কোনো পুরুষ নেই। মাসি-পিসি কঠোর পরিশ্রম করে দুবেলা দুমুঠো খাবার জোগাড় করে। এই গল্পে তাদের কঠিন জীবনসংগ্রামের বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। মাসি-পিসি নৌকায় করে শহরে শাক, সবজি, ফলমূল নিয়ে বিক্রি করে। এভাবে তারা কঠোর পরিশ্রম করে জীবন চালায়।
আহ্লাদিকে নিজের কাছে আগলে রাখে। আহ্লাদির সব দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়। আহ্লাদির স্বামীর লোভ ছিল আহ্লাদির বাবার সম্পত্তির ওপর। বারবার আহ্লাদিকে নেওয়ার জন্য লোক পাঠাত। আহ্লাদির স্বামী এলেও মাসি-পিসি তাকে অনেক আদর-যত্ন করে খাওয়ানোর পরেও সে আহ্লাদিকে নির্যাতন করত। তাই মাসি-পিসি সিদ্ধান্ত নেয়, আহ্লাদিকে আর স্বামীর কাছে পাঠাবে না। কারণ, সে যদি আহ্লাদিকে নির্যাতন করে মেরে ফেলে, এই ভয়ে। তারা ভাবে, একটি সন্তান হওয়ার পরে হয়তো জগুর মন ভালো হয়ে যাবে, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা আসবে। তাই সন্তান হওয়ার পরে আহ্লাদিকে পাঠাতে চায়।
তারা নিজের বুকে আগলে রাখে আহ্লাদিকে। মাসি-পিসি শত লড়াই-সংগ্রাম করে আহ্লাদির মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিত। তাকে ভালো রাখার জন্য তাদের হাজার চেষ্টা। কিন্তু তার ওপর কুনজর পড়ে গ্রামের জোতদার, দারোগা ও গুন্ডা-বদমায়েশদের। তারা আহ্লাদিকে তুলে নিয়ে যেতে চায়। এমন সময় দুই বিধবা বয়স্ক নারীর প্রতিবাদ আমাদের মুগ্ধ করে। মাসি-পিসি তাদের সর্বস্ব দিয়ে আহ্লাদিকে রক্ষার যুদ্ধে নামে। তারা জানে, এর পরিণতি ভালো হবে না, তার পরেও তারা দা হাতে নিয়ে তাদের বিতাড়িত করে। এরপরে তারা সব বিপদের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে।
এই গল্পে আমরা দুই নারীর জীবনসংগ্রাম দেখি। যেখানে তাদের একই সঙ্গে অভাবের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে, আবার গ্রামের প্রভাবশালী গুন্ডা-বদমায়েশদের সঙ্গেও। দুই বিধবা নারীর বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী পদক্ষেপে আহ্লাদি গুন্ডা-বদমায়েশদের লালসা থেকে মুক্তি পায়। আহ্লাদির বাবা-মা থাকলেও হয়তো তার জন্য এত কিছু করত কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে, যা তার মাসি-পিসি তার জন্য করেছে। মাসি-পিসি সাহসের সঙ্গে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুন্ডা-বদমায়েশদের তাড়িয়ে দেয়। এখানে মাসি-পিসির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত, কিন্তু তারা সে কথা না ভেবে শুধু আহ্লাদির কথাই ভেবেছে।
মাসি-পিসি গল্পের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
১. মাসি-পিসি গল্প টি প্রথম কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়?
পূর্বাশা পত্রিকায়
২. পরে এটি কোন গল্প গ্রন্থে সংকলিত হয়?
পরিস্থিতি
৩. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
বিহারের সাঁওতাল পরগনায়
৪. এই প্রথম কোন গল্পটি লিখে খ্যাতি অর্জন করেন?
অতসীমামী
৫. মানিক বন্দোপাধ্যায়ের সব থেকে বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি ?
পদ্মা নদীর মাঝি
৬. শেষ বেলার খালে এখন কি?
পুরো ভাটা
৭. কিসের কাছে খালের ধারে লাগানো শান্তি থেকে খড় তোলা হচ্ছে?
কংক্রিটের পুলের
৮. আহ্লাদীর গড়ন কেমন ?
থমথমে গড়ন গোলগাল মুখ
৯. মাসি পিসি ফিরেছে কৈলাস কে বললো ?
বুড়ো লোকটি
১০. কৈলাস কিসে ব্যস্ত ছিলো মাথায়?
খড় চাপাতে
১১. আহ্লাদী সিঁথির সিঁদুর কোন পর্যন্ত টেনে দেয়?
ঘোমটা পর্যন্ত
১২. বেলা আর নেই কৈলাস কে বলে ?
মাসি
১৩. কৈলাসের কার সাথে দেখা হয়েছিল?
জগুর সাথে
১৪. কিসের দোকানে জগুর সাথে দেখা হয়েছিল?
চায়ের দোকানে
১৫. হাতে দুটো পয়সা এলে তোমাদের স্বভাব বিগড়ে যায় কথাটি কার ?
পিসির
১৬. এসব একরকম ছেড়ে দিয়েছে এখানে কার কথা বলা হয়েছে?
জগুর
১৭. লোকটা কেমন বদলে গেছে মাসি এখানে কার বদলানোর কথা বলা হয়েছে?
জগুর
১৮. মাসি পিসি কি বেচে জগুকে ভালো-মন্দ খাওয়াইয়া ছিল?
ছাগল
১৯. ঘরে এলে খাতির না করব কেন তবে কি করবেনা?
মেয়ে পাঠাবে না
২০. ছল ছল চোখে আহ্লাদির দিকে একবার তাকায় কে?
বুড়ো রহমান
২১. কার মেয়েটা শ্বশুরবাড়িতে মরছে অল্প দিন ?
বুড়ো রহমানের
২২. কে মামলা করবে ?
জগু
২৩. জগু কি জন্য মামলা করবে?
বউ নেবার জন্য
২৪. কারা উড়ে এসে বসে পাতা শূন্য গাছটাই ?
শকুনরা
২৫. মায়ের বোন মাসি আর বাপের বোন পিসি ছাড়া বাপের ঘরের কেউ নেই কার ?
আহ্লাদির
২৬. আহ্লাদির বাবা মা কিসের জন্য মারা গেছিল?
মহামারী কলেরায়
২৭. মাসি পিসি কি করে রোজগার করত ?
ধান ভেনে, কাঁথা সেলাই করে, ডালের বড়ি বেচে, হোগলা গেঁথে
২৮. বছরের পর বছর ধরে তাদের কেমন পুঁজি হয়েছিল ?
রুপার টাকা আধুলি সিকি
২৯. কিসের সময় বাচবার জন্য তাদের লড়তে হয়েছিল সাংঘাতিকভাবে ?
দুর্ভিক্ষের সময়
৩০. কার সেবা যত্নে আহ্লাদী সেবার বেচে গিয়েছিল?
মাসি পিসির সেবা যত্নে
৩১. কে পাল্লা দিয়ে আহ্লাদীর জীবনের জন্য লড়েছিল?
মাসি পিসি
৩২. চারিদিকে কি জন্য মানুষ মরতে শুরু করছিল?
না খেতে পেয়ে
৩৩. মরণ ঠেকাতে তাদের কি ফুরিয়ে আসছিল ?
জীবনীশক্তি
৩৪. কোথায় তরকারি ও ফলমূলের দাম চড়া ?
শহরের বাজারে
৩৫. বাপের ঘর দুয়ার জমি জায়গাটুকু কার উপর বর্তেছে?
আহ্লাদির
৩৬. বাবার বাকি জায়গাটুকু কার কবলে গেছে ?
গোকুলের কবলে
৩৭. আহ্লাদীর জমিটুকু উপর কার লোভ প্রবল?
জগুর
৩৮. আহ্লাদির কত মাসের গর্ভবতী?
চার মাসে
৩৯. ছেলের মুখ দেখলে কি হয় ?
পাষাণ নরম হয়
৪০. কে ছিল জগুর মত?
আহ্লাদির পিসে
৪১. নিজেকে কারা নোংরা, নর্দমার মত লাগে?
আহ্লাদীর
৪২. মাসি, পিসি কে পাগল করে তুলছে কে ?
গোকুল
৪৩. আহ্লাদী কিভাবে শোয়?
এক পাশে পিসি একপাশে মাসি
৪৪. বাইরে থেকে হাক আসে কার?
কানাই চৌকিদারের
৪৫. কার সাথে বাজারের তোলা নিয়ে ঝগড়া করতে অর্ধেক জীবন শেষ হয়ে গেছে দুজনের ?
সরকারবাবুর সঙ্গে
৪৬. কিসের উপোস করেছে তারা দুজন গতকাল?
শুক্লপক্ষের একাদশীর
৪৭. কানাই এর সাথে কে এসেছে ?
গোকুলের তিনজন পেয়াদা
৪৮. কোন লোকটা তাদের অচেনা ?
মাথায় লাল পাগড়ি আটা লোক
৪৯. কানাই তাদের কোথায় যাওয়ার কথা বলে ?
কাছারিবাড়ি
৫০. কে এসে বসে আছে বাবুর সাথে ?
দারোগাবাবু
৫১. কোথায় তিন চার জন ঘুপটি মেরে আসে?
পাশের ডোবার ধারে কাঁঠাল গাছের ছায়ায়
৫২. ঘুপটি মেরে আছে কারা?
গায়ের গুন্ডা সাধু বৈদ্য ওসমানেরা
৫৩. মাসি কি নিয়ে আসে?
বটিটা
৫৪. পিসি কি নিয়ে আসে?
রামদা
৫৫. তারা কি জলে চুবিয়ে রাখে?
কম্বল
৫৬. কিসের আয়োজন করে তৈরি হয়ে থাকে মাসি পিসি ?
যুদ্ধের
৫৭. সালতি মানে কি ?
শালকাঠের নৌকা
৫৮. কদমছাট কি?
মাথার চুল কদমফুলের মতো ছাটা
৫৯. লগি কি?
সরু বাশ
৬০. সোমাত্তা মানে কি ?
যৌবনপ্রাপ্ত
৬১. ব্যঞ্জন কি?
রান্না করা তরকারি
৬২. রসুই চালা কি?
রান্নাঘার
আরো পড়ুন
- বিড়াল প্রবন্ধ’র মূলভাব, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- রেইনকোট গল্প’র মূলভাব ও Best 50 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- অপরিচিতা গল্প‘র, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর ও মূলভাব
- HSC বাংলা ১ম পত্র Best সাজেশন 2026, গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়
- Hsc বাংলা ২য় পত্র best সাজেশন ২০২৬
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- Verb কত প্রকার ও কী কী? Best 15 টি সহজ নিয়ম ও উদাহর






