চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ: প্রশ্ন-উত্তর, মূলভাব ও লেখক পরিচিতি

চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ এ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ভারতবর্ষের কৃষকদের দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন। কৃষকদের শোচনীয় অবস্থা তুলে ধরেছেন এই প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন ভারতবর্ষের শহরের মানুষের জীবন যাপন কতটা বিলাসবহুল, তারা পাকা বাড়ি, রেলওয়ে, এরোপ্লেন মোটরগাড়ি, টেলিফোন সহ কত আধুনিক জীবন যাপন করে কিন্তু, সেই দেশের কৃষকের  পেটে এক মুঠো খাবার জোটে না, শীতে বস্ত্র নেই, অসুখে চিকিৎসা নেই। এদেশের কৃষকেরা চাল কিনতে না পেরে কুমড়া লাউ সিদ্ধ করে ক্ষুধা নিবারণ করে। তিনি এই চরম দারিদ্র্যের জন্য সভ্যতা নামক এক শ্রেণীর মানুষকে দায়ী করেছেন। তিনি আবার কৃষকদের বিলাসিতাকেও দায়ী করেছেন। গ্রামীণ কুটির শিল্প ধ্বংসের জন্য ব্রিটিশদের দায়ী করেছেন।

চাষার দুঃখ প্রবন্ধ

চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ’র লেখক রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন

বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানায় পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন জমিদার কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে তিনি ছিলেন রক্ষণশীল। তিনি মনে করতেন মেয়েদের বাড়ির বাইরে গিয়ে শিক্ষা লাভ করা উচিত নয়। ১৮৯৮ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বেগম রোকেয়ার বিবাহ হয়। স্বামীর কল্যাণে তিনি শিক্ষা লাভের সুযোগ পান।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মেয়েদেরকে অন্তঃপুরের বাইরে নিয়ে এসে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তিনি মেয়েদেরকে অন্তরাল থেকে বের করতে চেয়েছিলেন। এ কারণে তিনি মেয়েদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং মেয়েদের জন্য বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখালেখি করেছেন। তিনি সমাজের সকল ধর্মীয় গোড়ামী ও কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছিলেন। তার অন্যতম গদ্যগ্রন্থ গুলো হল মতিচুর ও অবরোধবাসিনী। এবং উপন্যাস হলো সুলতানার স্বপ্ন ও পদ্মরাগ। ১৯৩২ সালের ৯ই ডিসেম্বর বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মৃত্যুবরণ করেন।

চাষার দুঃখ প্রবন্ধের মূলভাব

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ‘চাষার দুঃখ’ প্রবন্ধে ভারতবর্ষের চাষিদের দুঃখ-দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন। যারা চাষ করে এ দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়, সেই চাষিদের পেটে ভাত নেই। সেই চিত্রই এঁকেছেন এই প্রবন্ধে। তিনি দেখিয়েছেন, আমরা কত সভ্য! আমাদের ট্রেন, রেলওয়ে, স্টিমার, এরোপ্লেন, মোটর, টেলিফোন, টেলিগ্রাম সবকিছুই আছে, কিন্তু সেই দেশের চাষিদের পেটেই ভাত নেই। দেখিয়েছেন, এ দেশের মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সব ধন-সম্পদ। তারাই যত বিলাসিতা করে, অথচ কৃষকেরা এক বেলায় এক মুঠো ভাতও খেতে পারে না।

তিনি দেখিয়েছেন, চটকল ও পাটকলের কর্মচারীরা মাসে ৫০০-৭০০ টাকা বেতন পেয়ে নবাবী হালে চলে, কিন্তু সেই পাট যারা উৎপাদন করে, তাদের পেটে অন্ন জোটে না। কৃষকদের দুর্দশার কথা বলতে ৩০ থেকে ৩৫ বছর পূর্বে বিহারে দুই সের খেসারির বিনিময়ে কৃষককন্যা বিক্রি করত। সে সময় পান্তা ভাতের সঙ্গে মানুষ লবণ খেতে পারত না বলে চাল সমুদ্রের জলে ধুয়ে লবণের অভাব মেটাত। এতটাই অভাব ছিল যে, তারা চাল কিনতে পারত না। লাউশাক, কুমড়োশাক সিদ্ধ করে ক্ষুধা নিবারণ করত। এই কৃষকেরা সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়, সেই কৃষকদের পেটে খাবার নেই, শীতে পরার মতো বস্ত্র নেই। খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করত। এই হল তৎকালীন কৃষকদের দুর্দশার চিত্র।

শুধু খাবারের কষ্ট ছিল না, তাদের ছিল বস্ত্রের সংকট। সে সময় তারা এন্ডি কাপড় বুনতে পারত। এটি দিয়ে তাদের পরিবারের সমস্ত বস্ত্রের চাহিদা পূরণ হতো। চার-পাঁচটি এন্ডি চাদর থাকলে শীতের জন্য তাদের আর লেপ-কম্বল লাগত না। কিন্তু বিলাসিতা তাদের ধ্বংস করেছে। সভ্য হওয়ার ফলে আর এন্ডি চাষ করে না হলে তাদের বস্ত্রের চাহিদা আর পূরণ হয় না। বিলাসী ও সভ্য হওয়ার কারণে তাদের এই দুর্দশা।

সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের দুঃখের পেছনে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কুটিরশিল্প ধ্বংসকে দায়ী করেছেন। কুটিরশিল্প ধ্বংসের কারণে বাঙালি কৃষকেরা আজ এই দুর্দশায় ভুগছে। তিনি আরও দেখেছেন, বাঙালিরা অনুকরণপ্রিয়। তাদের কয়েকটা টাকা হলেই বাড়ির পাশের বড়লোকদের অনুকরণ করে থাকে। তাদের মতো চলাফেরা করার চেষ্টা করে। তাদের দুঃখের পেছনে এটাই হলো মূল কারণ।

এই প্রবন্ধে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন চাষার দুঃখ-দুর্দশাকে তুলে ধরেছেন এবং একই সঙ্গে তাদের বিলাসিতা ও অনুকরণপ্রিয়তাকেও তুলে ধরে সেটাকে ব্যঙ্গ করেছেন। তিনি চাষার দুঃখের পেছনে কুটিরশিল্প ধ্বংসকে দায়ী করেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি চাষার দুঃখ-দুর্দশার বর্ণনা দিয়েছেন। তাই তিনি চাষার দুঃখ ঘোচাতে কুটিরশিল্প পুনরুদ্ধারের কথা ব্যক্ত করেছেন। এই প্রবন্ধে তিনি আমাদের বিলাসিতা, অনুকরণপ্রিয়তা ও আরামপ্রিয়তা থেকে ফিরে এসে পরিশ্রমী হতে বলেছেন। দেশের কুটিরশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য তিনি এই প্রবন্ধে আমাদের আহ্বান জানিয়েছেন। পল্লিগ্রামে সুশিক্ষা বিস্তারের কথা বলেছেন। এরই মাধ্যমে চাষার দুঃখ ঘুচে যাবে বলে লেখিকা মনে করেন।

 

চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ’র সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

 

১. চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ টি কোন গ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে ?

রোকেয়া রচনাবলী থেকে

২. রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?

 ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর

৩. তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?

 রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার অন্তর্গত পায়রাবন্দ গ্রামে

৪. তার স্বামী কি ছিলেন? 

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট

৫. তিনি কত সালে মারা যান? 

১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর

৬. কত বছর পূর্বে ভারতবাসী অসভ্য বর্বর ছিল? 

দেড়শ বছর পূর্বে 

৭. এখন আমাদের কি রাখিবার স্থান নেই? 

সভ্যতা ও ঐশ্বর্য

৮. এখন আমরা কিসে চলাচল করি?

 রেলওয়ে মোটর গাড়ির এরোপ্ল্যান

৯. ধান ভানিতে কিসের গান? 

শিবের গান

১০. সমাজের মেরুদন্ড কি?

 চাষা

১১. জুট মিলের কর্মচারীরা মাসিক কত টাকা বেতন পায়?

 500 – 700

১২. তারা কোন হালে চলে? 

নবাবী হালে

১৩. যারা পাট উৎপাদন করে তাদের অবস্থা কি?

 পাছায় জোটে না ত্যানা

১৪. কি পৃথিবীকে সর্বস্বান্ত করেছে? 

ইউরোপের মহাযুদ্ধ

১৫. ৫০ বছর পূর্বে টাকায় কত সের সরিষা তেল ছিল?

 ৮ সের

১৬. ৫০ বছর পূর্বে টাকায় কত সের ঘৃত ছিলো?

৪ সের

১৭. কার মাথায় বেশ ঘন ও লম্বা চুল ছিল? 

কৃষক কন্যা জমিরনের

১৮. তার মাথায় কতটুকু তেল লাগিত?

  প্রায় আধ পোয়াটাক

১৯. কত বছর পূর্বে বিহার অঞ্চলে দুই সের খেসারীর বিনিময়ে কৃষক পত্নী কন্যা বিক্রয় করত? 

৩০/৩৫ বছর পূর্বে

২০. কোন অঞ্চলের মানুষ পান্তা ভাতের সাথে লবণ ব্যতীত আর কোন কিছু সংগ্রহ করিতে পারত না?

 ওড়িশা অন্তর্গত কণিকা রাজ্যে

২১. কি পরম উপাদেয় ব্যঞ্জন বলিয়া বলিয়া পরিগণিত হত?

শুটকি মাছ

২২. তখন টাকায় কত সের চাল ছিল? 

২৫/২৬ সের

২৩. কোন অঞ্চলের মানুষের পান্তা ভাতের সাথে লবণ জুটতো না?

 সাত ভাই নামক সমুদ্র তীরবর্তী গ্রামের মানুষের

২৪. তারা কিভাবে ভাত রাধিত? 

সমুদ্রের জলে চাল ধুয়ে

২৫. পুরুষেরা বহু কষ্টে স্ত্রীদের জন্য কি কাপড় সংগ্রহ করিত?

৮/৯  হাত লম্বা

২৬. আর পুরুষেরা কি পড়িত? 

কৌপীন ধারণ করতো

২৭. শীতকালে দিনের বেলায় কি করত? 

মাঠে মাঠে রৌদ্র যাপন করতো

২৮. রাতের বেলায় কি করতো?

 পাটখড়ি জালাইয়া আগুন পোহাইতো

২৯. আসাম ও রংপুর জেলায় এক প্রকার রেশম হতো  তাকে স্থানীয় ভাষায় কি বলে?

এন্ডি

৩০.একখানা এন্ডি কাপড় অবাধে কত বছর টিকতো?

 ৪০ বছর

৩১. কই খানা এন্ডি চাদর থাকলে লেপ কম্বল প্রয়োজন হতো না?

 চার-পাঁচখানা

৩২. পূর্বে পল্লী বাসিগণ কি প্রস্তুত করিয়া কাপড় কাচতো?

 ক্ষার প্রস্তুত করে

৩৩. এখন তাদের বিলাসিতা কোথায়? 

শিরায় শিরায় ধমনীতে

৩৪. বিলাসিতার সঙ্গে আর কোন ভূত তাদের কান্দে চাপিয়েছে? 

অনুকরণপ্রিয়তা

৩৫. আর্থিক সামান্য সচ্ছল হইলেই তারা কি করে? 

বড়লোক প্রতিবেশীদের অনুকরণ করে

৩৬. এন্ডি কাপড় আসামে কি নামে অভিহিত হয়?

 সিল্ক নামে

৩৭. এখন তা কাদের দেহে শোভা পায়?

 ইউরোপীয় নর নারীদের দেহে

৩৮. আসাম হইতে এন্ডি গুটি কোথায় চলে যায়?

 বিদেশে

৩৯. বঙ্গের গভর্নর কে ছিলেন?

 লর্ড কারমাইকেল

৪০. তিনি কিসের জন্মস্থান অনুসন্ধান করেন? 

একখানি দেশি রুমালে

৪১. তিনি কোথায় এই রুমালের জন্মস্থান আবিষ্কার করলেন? 

পূর্ব মুর্শিদাবাদ

৪২. আবার সেই মারাই ভরা ধান, ঢাকা মুসলিম ইত্যাদি লাভ করার একমাত্র উপায় কি? 

দেশী শিল্প

৪৩. জেলায় জেলায় পাটের চাষ কমিয়ে কিসের চাষ বাড়াতে হবে? 

কার্পাসের চাষ

৪৪. কি করলে সমগ্র বঙ্গ দেশে বস্ত্র ক্লেশ লাঘব হইবে?

 আসাম এবং রংপুরবাসিনি ললনাগণ এন্ডিপোকা চাষ করলে

৪৫. কি বিস্তার হওয়া চাই? 

পল্লী গ্রামে সুশিক্ষা

৪৬. কি করলে চাষার দারিদ্র্য ঘুচিবে?

  গ্রামে গ্রামে পাঠশালা আর ঘরে ঘরে চরকা ও টেকো হলে

৪৭. অভ্রভেদি মানে কি? 

আকাশচুম্বী

৪৮. মহীতে মানে কি? 

পৃথিবীতে

৪৯. টেকো মানে কি? 

সুত পাকাবার যন্ত্র

৫০. এন্ডি মানে কি? 

মোটা রেশমি কাপড়

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120