কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অসামান্য জনপ্রিয় এবং শক্তিমান কবি ছিলেন। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। পরাধীন দেশের দুঃখ দুর্দশাজনিত বেদনা, শোষিত মানুষের কর্মজীবন এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জন্য সংগ্রাম তার কবিতার মূল প্রেরণা। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র (১৯৪৮) বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তুর অভিনবত্বের চেয়ে ও প্রকাশ ভাঙার বলিষ্টতা এবং প্রতিমা নির্মানের জন্য কালজয়ী অভিনবত্বের জন্য বাংলা সাহিত্যে এ তা তাঁর কাব্যগ্রন্থ অবিস্মরনীর হয়ে আছে। এবং অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে। এই আর্টিকেলে ছাড়পত্র কাব্যের বিষয়বস্তু, সাম্যবাদী চেতনা বিশ্লেষণ করা হল।
ছাড়পত্র কাব্যের বিষয়বস্তু
১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালে রচিত হয় ছাড়পত্র। একদিকে মহামারী যুদ্ধ, বন্যা আর দুর্ভিক্ষের লেলিহান আগুন অন্যদিকে জীবনপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে। এদিকে ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতবর্ষের মানুষ মুক্তি পেতে আপষহীন সংগ্রাম করছে। এরই মধ্যে ৪৩ দুর্ভিক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারের অব্যবস্থাপনা এই দুর্ভিক্ষের আগুনে ঘি ঢালে। এসময় হিটলারের জার্মান সমাজতন্ত্রের আতুর ঘর সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করে। এর ফলে বিশ্বব্যাপী মানবতা ভুলন্ঠিত হয়। এই পটভূমিতে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য রচনা করেন ছাড়পত্র কাব্যগ্রন্থটি। সুকান্তের কবিতা সম্পর্কে বিশিষ্ট সাহিত্যিক বদরুদ্দীন উমর বলেছেন
“যে যুগে সুকান্তের আর্বিভাব যে যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো শ্রেনী সংগ্রামের অপেক্ষাকৃত তীব্রতা এক উচ্চতর পর্যায়ে তার উত্তরন।”
সুকান্ত ভট্টাচার্য মার্কসবাদী কবি। তিনি সমাজের সমতা আনার লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। নিষ্পেষিত শোষিত মানুষের অধিকার নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। তাদের অধিকারের কথা তিনি ছাড়পত্র কাব্যে বলিষ্ঠতার সঙ্গে তুলে ধরেন। যেটা তার সমসাময়িক আর কোন কবি বলতে পারেনি। পৃথিবীতে তখন যুদ্ধের আগুন জ্বলতে। আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা যুদ্ধে মেতেছে। সাধারণ মানুষের মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এই দুঃশাসনের আগুনের ভারতবর্ষেও এসে পৌঁছেছিল। দাবানলের মত এই আগুন বিশ্বকে ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে। এই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে কবি মানবতার জয় গান গেয়েছে। ভুলন্ঠিত মানবতাকে দ্বিধাহীন সাহসের সাথে
“তুলে ধরেছেন। ব্যথিত চিত্তে বলেছেন
অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি।
জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশ ভূমি।
অবাক পৃথিবী! আমরা যে পরাধীন।
অবাক, কি দ্রুত জন্মে ক্রোধ দিন দিন।”
(অনুভব: ১৯৪০, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
কবিতার মাধ্যমে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীর চিত্র ব্যক্ত করেছেন। তিনি জন্মেই দেখেছেন স্বদেশ জ্বলছে। পরাধীনতার জিঞ্জির আমাদের পায়ে পরানো।
এই পরাধীনতার প্রতিবাদে তিনি কবিতার মাধ্যমে করেছেন। বুকের ভিতর লুকায়িত ক্ষোভ প্রতিবাদের হাতিয়ার হয়ে কবিতায় উঠে এসেছে। যে শিশু পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছে তার মধ্যেও কবি প্রতিবাদী চেতনা লক্ষ করেছেন। এজন্য কবি এই পৃথিবীকে শিশুর বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছেন এই পৃথিবী যেন প্রতি শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে
তার মুখে খবর পেলুম
সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক,
নতুন বিশ্বের দ্বারে ব্যক্ত করে তার অধিকার
জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।
এ বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবো আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
(ছাড়পত্র, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
তিনি মনে করেন নবজাতকের জন্য এই পৃথিবী নিরাপদ নয়। এই পৃথিবীতে যে শিশু জন্মগ্রহণ করবে তার জন্য এই পৃথিবীবাস যোগ্য নয়। চারিদিকে যুদ্ধের লেলিহান শিখা ধ্বংসযোগ্য প্রতিটি শিশুর জন্য অনিরাপদ। এ নিয়ে পৃথিবীতে কারোর কোন মাথা ব্যাথা নেই। তারা যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত তাই কবি এই পৃথিবীতে শিশুর বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়াও তিনি দেখেছেন দরিদ্র পীড়িত অসহায় শিশুদের। যারা ফুটপাতে জন্মগ্রহণ করে। তাদের জন্য এই পৃথিবীকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল করার আশা ব্যক্ত করেছেন এই কবিতা।
সুকান্ত ভট্টাচার্য সমাজের দরিদ্র অসহায় মানুষকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। তিনি কবিতার মধ্যে সমতার কথা বলেছেন। এখানে ধনী ও বুর্জোয়া শ্রেনীরা সবসময় নিরীহ অসহায় বঞ্চিত মানুষদের শোষণ করে আসছে। তাদের ন্যায্য মূল্যটুকু না দিয়ে পশুর মত কাজ করিয়ে নেয়। তাদেরকে একপ্রকার দাসে পরিণত করেছে। এই শ্রেণীর বিরুদ্ধে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ছাড়পত্র কাব্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন। এজন্য সমাজে সমতা আনার লক্ষ্যে কাব্য চর্চা করেছেন। এসব কবিতার মধ্যে সিড়ি, একটি মোরগের কাহিনী, কলম, সিগারেট, দেশলাই কাঠি উল্লেখযোগ্য। এসব কবিতার রূপকের আড়ালেও দেখা যায় প্রতিবাদী চেতনা।
“আমরা বার বার জ্বলি নিতান্ত অবহেলায়
তা তো তোমরা জানই
কিন্তু তোমরা তো জান না
কবে আমরা জ্বলে উঠব
সবাই শেষবারের মতো”
(দিশলাই কাঠি, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
কবিতায় তিনি গণমানুষের অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন যারা বুর্জোয়া শ্রেণী শোষণে শোষিত হচ্ছে। তিনি ছিলেন গণমুখী চেতনার অধিকারী। তাই অবহেলিত মানুষের দুঃখে তিনি সর্বদা ব্যতীত হয়েছেন। এই কবিতায় দেখা যায় শোষিত মানুষের মর্মবেদনা। তিনি লেলিন ও মার্কসবাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। ফলে সমাজে সমতা আনার লক্ষ্যে সর্বদা যুদ্ধ করেছেন। এসব কবিতাই তিনি গণমুখী মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলা সাহিত্যে গণমুখী কবিতার চর্চা চলছে। সুকান্ত ভট্টাচার্যও এই গণমুখী চেতনায় প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। লেলিনের আদর্শ ধারণ করতেন এজন্য লেনিন কবিতায় বলেছেন
“লেনিন ভেঙেছে রুশ জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন প্রথম প্রতিবাদ।”
(লেনিন, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
তার কবিতা শুধু গণমুখী নয় তার মধ্যে লুকিয়ে ছিল দেশপ্রেম। এসব কবিতাকে শুধু গণমানুষের কবিতা বলা যায় না এগুলো নিছক দেশপ্রেমের কবিতাও। তার কবিতাই দেশপ্রেম ও মানুষের সমতার জয় গান একই সূত্রে গাথা
“সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়
জ্বলে-পুড়ে মরে ছাড়খার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।”
(দুর্মর, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
সে সময় যখন বিশ্ব যুদ্ধের আগুনে জ্বলছে। তখন অন্যান্য কবিরা যুদ্ধকে না দেখে তারা প্রেমের কবিতা রচনায় ব্যস্ত। তারা চাঁদকে তাদের প্রিয়তমার মুখের সাথে তুলনা করেছে। অথচ সে সময় মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। দূর্ভিক্ষের কবলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছে সেদিকে তাদের কোন খেয়াল নেই। সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে বলেছেন
“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
(হে মহাজীবন, ছাড়পত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য)
পরিশেষে তুরস্কের বিপ্লবী কবি নাজিম হিকমতের বক্তত্য উপথাপন করে বলা যায়, সেই শিল্প খাঁটি শিল্প, যার দর্পনে জীবন প্রতিফলিত তার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে যা কিছু সংঘাত, সংগ্রাম আর প্রেরণ জয় পরাজয় আর জীবনের ভালোবাসা। খুঁজে পাওয়া যাবে একটি মানুষের সবকটি দিক। সেই হচ্ছে খাঁটি শিল্প, যা জীবন সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা দেয় না।” সুকান্তের কবিতার মধ্যে এ বক্ততের যথার্থতা খুঁজে পাওয়া যায়।
FAQ
১. ছাড়পত্র কাব্যের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: ছাড়পত্র কাব্যের মূল বিষয়বস্তু হলো মানবমুক্তি, সাম্য, শোষণমুক্ত সমাজ এবং নতুন পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশা।
২. ছাড়পত্র কাব্যের রচয়িতা কে?
উত্তর: ছাড়পত্র কাব্যের রচয়িতা হলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য।
৩. ছাড়পত্র কাব্যের বিখ্যাত কবিতা কোনটি?
উত্তর: ‘ছাড়পত্র’ কাব্যগ্রন্থের অন্যতম বিখ্যাত কবিতা হলো ‘ছাড়পত্র’, যার বিখ্যাত পঙ্ক্তি ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান’।
৪. ছাড়পত্র কাব্যে কবির কোন মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: ছাড়পত্র কাব্যে কবির বিপ্লবী চেতনা, মানবতাবাদ, সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি আশাবাদ প্রকাশ পেয়েছে।
৫. ছাড়পত্র কাব্যের সাহিত্যিক গুরুত্ব কী?
উত্তর: ছাড়পত্র কাব্য বাংলা সাহিত্যে তারুণ্য, সাম্যবাদী চিন্তা, গণমানুষের অধিকার ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
আরো পড়ুন
- চোখের বালি উপন্যাসের বিষয়বস্তু
- কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের বিষয়বস্তু, চরিত্র বিশ্লেষণ ও নামকরণের সার্থকতা
- গোরা উপন্যাস এর অসাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তাবাদ
- আবুল হাসানের পৃথক পালঙ্ক কাব্য’র প্রেম ও বিরহ চেতনা
- দ্বিতীয় দিনের কাহিনী উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ
- গীতাঞ্জলি কাব্য’র আধ্যাত্মিকতা ও মানবপ্রেম।
- অগ্নিবীণা কাব্য’র আলোকে কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী চেতনা
- সোনার তরী কাব্য’র প্রকৃতি ও সৌন্দর্য প্রেম
- বনলতা সেন কাব্য’র চিত্ররূপকল্পময়তা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী
- ষাটের দশকের কবিতা ও স্যাড জেনারেশন
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কবিতা: গুরুত্বপূর্ণ কবি ও কবিতা
- তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের বিষয়বস্তু ও সমাজ-জীবন।







