বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প ‘অপরিচিতা’। এই গল্পে পুরুষশাসিত সমাজ ও যৌতুকপ্রথার নির্মমতা দেখা যায়। এবং কল্যাণীর মতো এক দৃঢ়চেতা ও আত্মপ্রত্যয়ী নারীর প্রতিবাদী রূপ ফুটে উঠেছে। মায়ের অতিরিক্ত শাসনে অনুপম ব্যক্তিত্বহীন ও পরনির্ভরশীল হয়ে ওঠে। তার মতামত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। পুরুষের জবানিতে লেখা এই গল্পে নারীর আত্মমর্যাদার পরিচয় ফুটে উঠেছে। কল্যাণী ও শম্ভুনাথ সেনের মাধ্যমে যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদ করা হয়েছে। এখানে তারা সামাজিক মর্যাদাকে তোয়াক্কা না করে যৌতুকপ্রথার মতো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। অপরিচিতা গল্পের প্রশ্ন উত্তর ও মূলভাব আলোচনা করা হলো।

অপরিচিতা গল্পের লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ছোটগল্পের রচিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা সাহিত্যকে যথাযথ মর্যাদায় নিয়ে গেছেন। বিশ্ব বরেণ্য এই কবির জন্ম ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে ৭ই মে কলকাতার বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পিতামহের নাম দ্বারকানাথ ঠাকুর, এবং মাতার নাম সারদা দেবী। মাত্র ১৬ বছর বয়সে ভিখারিনী গল্পের মাধ্যমে ছোটগল্পকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি মোট ৯৫ টি গল্প লিখেছেন। কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বসবাসকালে সব থেকে বেশি ছোট গল্প রচনা করেছেন। প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে তিনি এই ছোট গল্পগুলো রচনা করেছেন। তার কিছু কিছু সাহিত্যকর্ম তুলে ধরা হলো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প
- প্রথম ছোটগল্প: ‘ভিখারিনী’
- পোস্টমাস্টার
- শুভা
- ক্ষুধিত পাষাণ
- নষ্টনীড়
- একরাত্রি
- অতিথি
- হৈমন্তী
- ‘ল্যাবরেটরি’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস
- চোখের বালি – ১৯০৩
- গোরা – ১৯১০
- ঘরে-বাইরে – ১৯১৬
- চতুরঙ্গ – ১৯১৬
- শেষের কবিতা – ১৯২৯
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটক
- রাজা (১৯১০)
- ডাকঘর (১৯১২)
- অচলায়তন (১৯১২)
- মুক্তধারা (১৯২২)
- রক্তকরবী (১৯২৩)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনে অসংখ্য সাহিত্যকর্ম লিখে গেছেন। তিনি ১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট ঠাকুরবাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন।
অপরিচিতা গল্পের মূলভাব
অপরিচিতা গল্পে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যৌতুকপ্রথার নির্মমতাকে তুলে ধরেছেন। যৌতুকপ্রথা সমাজে একটি ব্যাধির মতো রূপ নিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়েছিলেন শম্ভুনাথ সেন ও কল্যাণী। তাঁদের স্বতন্ত্র ও বলিষ্ঠ প্রতিরোধে এই গল্পটি রচিত হয়েছে। গল্পে পুরুষতন্ত্রের অমানবিকতা দেখানো হয়েছে। যেখানে বিয়ে করার জন্য তার পিতার দেওয়া স্বর্ণ নকল না আসল, সেটা যাচাই করা বিয়ের থেকেও জরুরি।
গল্পের কথক অনুপম একজন শিক্ষিত যুবক, কিন্তু পরিবারতন্ত্রের কাছে একটি অসহায় পুতুল মাত্র। পরিবার তাকে যেভাবে বলে, সে সেইভাবে চলে। তার নিজের মতামত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। নিজের কথা বলার কোনো স্বাধীনতা নেই। মা এবং তার মামা যেটা বলবে, তাকে সেটাই মেনে নিতে হবে। নিজের সিদ্ধান্তে এসে একটি পা-ও বাড়ায় না। মামা ও মা তার অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এই গল্পে। অনুপম যেন এখনো সেই শিশু অনুপমের মতো আচরণ করে।
অনুপমের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছিল। তার এক বন্ধু ছিল হরিশ। হরিশ একজন রসিক মানুষ। সে আড্ডা জমাতে অদ্বিতীয়। সে কানপুরে কাজ করত, সেখানে একটি মেয়ের খোঁজ দেয় অনুপমকে। অনেক দেখাশোনার পরে অনুপমের বিয়ে ঠিক হয় কল্যাণী নামের এক সেই মেয়েটির সঙ্গে। অনুপমের মামা বিয়ের আগে যৌতুকের বিষয়টা নির্ধারণ করে নেয় তার পিতার সঙ্গে।
অনেক জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন করা হয়। ঘোড়ায় চেপে রাজকুমারের মতো বিয়ে করতে যায় অনুপম। বিয়ের সময় তার মামা যৌতুক নিয়ে কন্যার পিতার সঙ্গে চরম অপমানজনক ঘটনা ঘটিয়ে বসে। বিয়েতে বসার আগে অনুপমের মামা আগে মেয়ের বিয়েতে দেওয়া স্বর্ণের গহনা যাচাই করে নিতে চান। কল্যাণীর পিতা শম্ভুনাথ সেন নকল গহনা দিয়েছেন কি না, সেটা তিনি পরীক্ষা করে নিতে চান। তিনি নিজেকে খুবই চালাক মনে করেন এবং কারও কাছে হারবেন না বলে বিয়ের আগে সমস্ত গহনা স্বর্ণকার দ্বারা পরীক্ষা করে নিতে চান।
কিন্তু শম্ভুনাথ সেন ছিলেন ব্যক্তিত্ববান মানুষ। এটা তাঁর ব্যক্তিত্বে বাঁধে। এজন্য গহনা পরীক্ষার আগে অনুপমের মতামত চাই, কিন্তু অনুপম ব্যক্তিত্বহীন মানুষ। তার নিজের মতামত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই। ফলে বিয়ের গহনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষা করার পর দেখা যায়, সমস্ত গহনা খাঁটি সোনার।
তারপর শম্ভুনাথ সেন সবাইকে খাওয়াদাওয়া করিয়ে চলে যেতে বলেন। এমন মেরুদণ্ডহীন মানুষের সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে দিতে চান না। শুধু ব্যক্তিত্বহীন ছেলে বলে নয়, একই সঙ্গে যৌতুকপ্রথার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছেন। ব্যক্তিত্ববান মানুষ শম্ভুনাথ সেন বলিষ্ঠ প্রত্যাখ্যান করে এক নতুন ইতিহাস গড়েন। কল্যাণী ও তার পিতার ব্যক্তিত্বে সেটা বাঁধে। তাই তারা বলিষ্ঠ প্রতিরোধ করেন এবং এই ঘৃণ্য প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। কল্যাণী দেশের সেবায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করে। কল্যাণীর প্রতিবাদ এই গল্পে তাকে অসামান্য নারী করে তুলেছে। তার যে বলিষ্ঠ ভূমিকা, তা মনে করিয়ে দেয়, নারীরা কোনো খেলার জিনিস নয়, তাদেরও অধিকার আছে।
শেষে অনুপম নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং কল্যাণীকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে, কিন্তু কল্যাণী আর ফেরে না। সে দেশ ও জনগণের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করে। তার এই ব্যক্তিত্ব এই গল্পে তাকে অসামান্য নারী করে তুলেছে।
অপরিচিতা গল্পের প্রশ্ন উত্তর
১. অপরিচিতা গল্পটি প্রকাশিত হয় কোন পত্রিকায়?
সবুজপত্র
২. সবুজপত্র পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন কে?
প্রমথ চৌধুরী
৩. অপরিচিতা গল্পটি কত সালে প্রকাশিত হয়?
১৯১৪ সালে
৪. অপরিচিতা গল্পটি কোন পুরুষে লেখা?
উত্তম পুরুষ
৫. অপরিচিতা গল্প’র লেখক কে?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬. অনুপমের বয়স কত?
২৭ বছর
৭. ছেলেবেলায় পন্ডিতমশাই তাকে কিসের সাথে তুলনা করতো?
শিমুল ফুল ও মাকাল ফলের শরীর
৮. অনুপমের পিতা এককালে কি ছিলেন?
গরিব
৯. কি করিয়া তার পিতা প্রচুর টাকা রোজগার করিয়াছেন?
ওকালতি
১০. অনুপম কার হাতে মানুষ?
মায়ের হাতে
১১. মা কেমন ঘরের মানুষ?
গরিব
১২. অনুপমের আসল অভিভাবক কে?
তার মামা
১৩. মামা তার থেকে কত বছরের বড়?
৬ বছর
১৪. কন্যার পিতামাত্রই কি স্বীকার করিবে?
অনুপম সৎপাত্র
১৫. পৃথিবীতে তার ভাগ্যদেবতার প্রধান এজেন্ট কে?
মামা
১৬. মামার কেমন কন্যা পছন্দ নয়?
ধনী কন্যা
১৭. অথচ কিসের প্রতি তার আসক্তি অস্থিমজ্জায়?
টাকার প্রতি
১৮. অনুপমের বন্ধু কে?
হরিশ
১৯. হরিশ কোথায় কাজ করে?
কানপুরে
২০. হরিশ মানুষটা কেমন ছিল?
রসিক
২১. অনুপমের মন কেমন ছিল?
তৃষ্ণার্ত
২২. কে আসর জমাতে অদ্বিতীয়?
হরিশ
২৩. মামার মন কেন ভার হল?
কন্যার বয়স ১৫ শুনে
২৪. বাপ সবুর করিতেছে কিন্তু সবুর করিতেছে না কি?
কন্যার বয়স
২৫. কলকাতার বাইরে যে পৃথিবী আছে মামা তাকে কি বলিয়া মনে করেন?
আন্দামান দ্বীপ
২৬. কন্যাকে আশীর্বাদ করার জন্য কাকে পাঠানো হলো?
বিনুদা
২৭. বিনুদা কে?
অনুপমের পিসতুতো ভাই
২৮. কন্যার পিতা কে?
শম্ভুনাথ সেন
২৯. শম্ভুনাথ সেনের বয়স কত?
৪০ বছর
৩০. শম্ভুনাথ সেন কি করেন?
ডাক্তারি
৩১. শম্ভুনাথ সেন তাকে বিবাহের কয়দিন আগে নিজের চোখে দেখে?
৩ দিন
৩২. মামা নিজেকে কি বলিয়া অভিমান করে থাকেন?
অসামান্য চতুর
৩৩. তিনি কিসে বাঁধিয়া গহনা নিয়ে আসছিল?
গামছায়
৩৪. গহনাগুলোর মধ্যে কি ছিলো?
একজোড়া এয়ারিং
৩৫. কল্যাণী কি বলে?
সে বিবাহ করবে না
৩৬. বিবাহ ভাঙার পর থেকে কল্যাণী কি গ্রহণ করেছে?
মেয়েদের শিক্ষার ব্রত
৩৭. বিয়ের সময় অনুপমের বয়স কত ছিল ?
২২ বছর
৩৮. অনুপম এখনো কি ছাড়ে নি ?
আশা
আরো পড়ুন
- HSC বাংলা ১ম পত্র Best সাজেশন 2026, গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়
- বিড়াল প্রবন্ধ’র মূলভাব, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- রেইনকোট গল্প’র মূলভাব ও Best 50 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- আমার পথ প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- Verb কত প্রকার ও কী কী? Best 15 টি সহজ নিয়ম ও উদাহরণ
- রেইনকোট গল্প’র মূলভাব ও Best 50 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
