বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বিড়াল’ একটি হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ। যেখানে সমাজের সকল বঞ্চিত’ অবহেলিত, নিষ্পেষিত, দলিত মানুষের ক্ষোভ ও মর্ম বেদনা উচ্চারিত হয়েছে। বিড়ালের মাধ্যমে বঙ্কিমচন্দ্র সমাজের যত অবহেলিত মানুষ আছে তাদের ব্যথা-বেদনাকে ব্যাঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বিড়ালের মাধ্যমে বলেছেন সমাজে যাদের খাবারের অভাব নেই অর্থাৎ যারা ধনী লোক, তাদেরকে মানুষ জোর করে খাওয়ায়, আর যারা একবেলা এক মুঠো খেতে পারে না তাদেরকে আমরা সব সময় বঞ্চিত করি। বিড়ালের মুখ দিয়ে তিনি অধিকার বাঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলেছেন। বিড়ালকে তার সোসিয়ালিস্টিক বা সুবিচারক মনে হয়। তাই বিড়ালের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত বঞ্চিত শোষিত মানুষের কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। বিড়াল প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর মূলভাব নিয়ে আলোচনা করা হলো।

বিড়াল প্রবন্ধের লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাসের জনক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনি বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। তিনি ১৮৩৮ সালের ২৬ এ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী লেখেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবদান অসামান্য। তিনি উপন্যাস প্রবন্ধের পাশাপাশি পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস গুলো হলো
- কপালকুণ্ডলা
- মৃণালিনী
- বিষবৃক্ষ
- কৃষ্ণকান্তের উইল
- চন্দ্রশেখর
- আনন্দমঠ
- দেবী চৌধুরাণী
- রাজসিংহ
- সীতারাম
- Rajmohon’s Wife
এছাড়াও তিনি ধর্ম, দর্শন, সাহিত্যে,সমাজ ও ভাষা নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ গুলো তুলে ধরা হলো –
- লোকরহস্য
- বিজ্ঞানরহস্য
- কমলাকান্তের দপ্তর
- সাম্য
- কৃষ্ণচরিত্র
- বিবিধ প্রবন্ধ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সাহিত্যেচর্চা করেছেন। সমাজের সমস্যা গুলো সুন্দর করে তুলে ধরেছেন তার লেখায়। বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি ছিল সাহিত্য সম্রাট। তিনি ১৮৯৪ সালের ৮ই এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
বিড়াল প্রবন্ধের মূলভাব
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংকলন হলো ‘কমলাকান্তের দপ্তর’। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ হলো ‘বিড়াল’। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি হাস্যরসাত্মক ও ব্যঙ্গাত্মকভাবে সমাজের গরিব-দুঃখী, অভাব-বঞ্চিত মানুষদের অধিকারের কথা ব্যক্ত করেছেন। বিড়ালের মাধ্যমে তিনি এখানে প্রতিবাদের সুর ব্যক্ত করেছেন। বিড়ালকে তিনি প্রতিবাদী মানুষের রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
কমলাকান্ত একদিন আফিম খেয়ে নেশায় বুঁদ হয়ে ওয়াটারলু যুদ্ধের কথা ভাবছিলেন। এমন সময় একটা বিড়াল এসে তার জন্য রাখা দুধটুকু খেয়ে ফেলে। তিনি বুঝতে পেরে লাঠি নিয়ে বিড়ালটিকে মারার জন্য উদ্যত হলেন। নেশার ঘোরে তিনি অনুভব করলেন, বিড়ালটি যেন দিব্যকর্ণ প্রাপ্ত হয়েছে। বিড়ালের মুখ দিয়ে তখন সমাজের অভাব-বঞ্চিত মানুষের অধিকারের কথা ব্যক্ত হয়েছিল। বিড়ালের কথাগুলো তখন তাঁর ভারী সোশ্যালিস্টিক মনে হয়েছিল। সমাজের অবহেলিত, দলিত, মথিত, নির্যাতিত মানুষের অধিকারের কথা বিড়ালের মুখ দিয়ে বর্ণিত হয়েছিল।
বিড়াল বলে, এই দুধে আমারও সমান অধিকার আছে, কারণ দুধ মঙ্গলার আর দুহিয়াছে প্রসন্ন গোয়ালিনী, সুতরাং আমার সমান অধিকার আছে। তোমাদের ক্ষুধা-পিপাসা আছে, কিন্তু আমাদের কি নেই? তোমরা খাও, তাতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা খেলেই তোমরা লাঠি নিয়ে কেন মারতে আসো। বিড়াল বলে, চোর অপেক্ষা অধিক পাপী হলো কৃপণ ধনী। সে গরিবদেরকে বঞ্চিত করে অধিক সম্পদ জমা রাখে, অথচ সমাজের অনেক গরিব মানুষ খেতে পায় না বলে চুরি করে। সে ক্ষেত্রে চোর অপেক্ষা অধিক পাপী হলো এই কৃপণ ধনী।
বিড়াল আরও বলে যে মানুষেরা পাতের কাঁটা এবং অবশিষ্ট ভাত দিয়ে বিড়ালকে সন্তুষ্ট করতে পারে, কিন্তু তারা তা না করে সবকিছু নর্দমায় ফেলে দেয়। আরও বলে যে সমাজে ধনী বা সমাজের বড় কোনো ব্যক্তি আসলে তাদের খাওয়ার জন্য অনেক জোরাজুরি করি, কিন্তু গরিবদের খাওয়ার কথা বলি না। এখানে তাই বিড়াল ব্যঙ্গাত্মকভাবে বলেছে, “তেলা মাথায় তেল দেওয়া মানুষ জাতির স্বভাব।” বিড়াল সমাজের যত অবহেলিত, বঞ্চিত, গরিব মানুষের কথা ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরেছে এবং সমাজের ধনী মানুষদের দিকে আঙুল তুলে তাদের কৃপণতা এবং অমানবিকতা তুলে ধরেছে।
বিড়াল যুক্তি উপস্থাপন করে যে একজন বিচারককে তিন দিন না খাইয়ে রাখলে সে যদি চুরি না করে, তাহলে সব চোরকে ফাঁসি দেবেন। এর মাধ্যমে তিনি সমাজে অবহেলিত, অভাব-অনটনপীড়িত মানুষের দারিদ্র্যের কথা তুলে ধরেছেন। তারা কেন চুরি করে, সেটা ধনী লোক জানে না। বিড়াল মনে করে, সমাজের ধনবৃদ্ধিতে শুধু ধনী লোকেরই উন্নতি হয়, গরিবের কোনো উন্নতি হয় না। তারা গরিবদের বঞ্চিত করে সম্পত্তির মালিক হয়, আর অসহায়-বঞ্চিত মানুষ না খেয়ে থাকে।
তাই বিড়ালকে কমলাকান্তের সোশ্যালিস্টিক বা সুবিচারক মনে হলো। কারণ, যে সমাজের অন্যায় এবং গরিবদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। এই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র বিড়ালের মুখ দিয়ে ধনী-দরিদ্র, শোষক-শোষিত এবং সাধু-চোরের অধিকারবিষয়ক সংগ্রামের কথা যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।
বিড়াল প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর
১. বিড়াল প্রবন্ধটি কোন রচনার সংকলন থেকে নেওয়া হয়েছে?
কমলাকান্তের দপ্তর
২. কমলাকান্তের দপ্তর কয় অংশে বিভক্ত?
৩ অংশে
৩. প্রবন্ধটির লেখক কে?
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
৪. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
১৮৩৮ সালের ২৬ শে জুন
৫. তার পিতা কি ছিলেন?
ডেপুটি কালেক্টর
৬. তিনি কোন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন?
বঙ্গদর্শন
৭. বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি কি ছিল?
সাহিত্যসম্রাট
৮. তিনি কত সালে মৃত্যুবরণ করেন?
১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল
৯. কমলাকান্ত শয়নগৃহে কিসের উপর বসিয়েছিলেন?
চারপায়ীর উপর
১০. তিনি কি হাতে ঝিমাইতে ছিলেন?
হুকা হাতে
১১. তিনি কি ভাবিতে ছিলেন?
যদি নিয়ে নেপোলিয়ান হতেন
১২. তিনি নেপোলিয়ান হলে কি করিতেন?
ওয়াটার লু জিতিতেন
১৩. নেপোলিয়ন কে?
ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট
১৪. ওয়েলিংটন হঠাৎ কি প্রাপ্ত হলেন?
বিড়াল
১৫. ওয়েলিংটন কে?
তিনি একজন বীর যোদ্ধা যিনি ওয়াটার লু যুদ্ধে নেপোলিয়ানকে হারিয়েছিলেন
১৬. মার্জার মানে কি?
বিড়াল
১৭. প্রসন্ন কে?
গোয়ালিনী
১৮. বিড়াল কেমন দুধ পান করেছে?
নির্জল দুধ
১৯. মঙ্গলা কে?
গরু
২০.আমি যদি সেই চিরগত প্রথা অমান্য করি তাহলে আমি মানুষ হলে কি হিসাবে পরিচিত হব?
কুলাঙ্গার হিসেবে
২১. বিড়াল যদি তার স্বজাতি মন্ডলে কমলাকান্তকে কি বলিয়া উপহাস করে?
কাপুরুষ
২২.অনেক অনুসন্ধানে কি আবিষ্কার করিলেন?
ভগ্ন যষ্টি
২৩. কার কাছে শিক্ষা লাভ ব্যতীত তোমাদের জ্ঞান উন্নতির উপায়ান্তর দেখি না?
বিজ্ঞ চতুষ্পদ এর কাছে
২৪. তোর অপেক্ষা অধিক অধার্মিক?
কৃপণ ধনী
২৫. কাদের দোষে দরিদ্র চোর হয়?
ধনীর দোষে
২৬. বিড়ালের কথাগুলো কি?
ভারি সোশ্যালিস্টিক
২৭. সমাজের ধন বৃদ্ধি অর্থ কি?
ধনীর ধন বৃদ্ধি
২৮. বিড়াল কি?
সুবিচারক ও সুতার্কিক
২৯. যে বিচারক চোরকে সাজা দিবেন তার আগে কি করা উচিত?
তিন দিন উপবাস থাকা উচিত
৩০. বিজ্ঞ লোকেরা বিচারে পরাস্ত হইলে কি করে?
গভীরভাবে উপদেশ প্রদান করে
৩১. তুমি যদি চাও তাহলে তোমাকে আমি কি দিতে পারি?
নিউম্যান এন ও পার্কের গ্রন্থ
৩২. যষ্টি মানে কি?
লাঠি
৩৩. দিব কর্ণ মানে কি?
ঐশ্বরিকভাবে শ্রবণ করা
৩৪. শিরোমনি মানে কি?
সমাজপতি
৩৫. ভার্যা মানে কি?
স্ত্রী
৩৬. লাঙ্গল মানে কি?
লেজ
৩৭. সোসিয়ালিস্টিক মানে কি?
সমাজতান্ত্রিক
আরো পড়ুন
- আমার পথ প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর
- চাষার দুক্ষু প্রবন্ধ: প্রশ্ন-উত্তর, মূলভাব ও লেখক পরিচিতি
- মাসি-পিসি গল্প: মূলভাব, লেখক পরিচিতি, প্রশ্ন-উত্তর HSC বাংলা
- রেইনকোট গল্প’র মূলভাব ও Best 50 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- অপরিচিতা গল্প‘র, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর ও মূলভাব
- HSC বাংলা ১ম পত্র Best সাজেশন 2026, গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়
- Hsc বাংলা ২য় পত্র best সাজেশন ২০২৬
- মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত
- কাজী নজরুল ইসলাম সংক্ষিপ্ত জীবনী ও বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম সমূহ
- Verb কত প্রকার ও কী কী? Best 15 টি সহজ নিয়ম ও উদাহর
Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।
