Skip to main content

Study Journalx

বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হচ্ছে তিরিশের দশক। বাংলা সাহিত্যের অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গেছেন। তাঁর কবিতার বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেম, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা, মানবপ্রেম, বিশ্বপ্রেম ইত্যাদি। কিন্তু রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার বৈশিষ্ট্য আধুনিকতায় সমুজ্জ্বল। ইউরোপীয় আদর্শ অনুসারে বাংলা কবিতার এক নবতর দিক উন্মোচিত হয়েছে। তিরিশের দশকের কবিতার বৈশিষ্ট্য হলো, কালের দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত এবং সুরের দিক থেকে নবতম সুরের সাধক। পাঁচজন বিশিষ্ট কবির হাত ধরে তিরিশের দশকে বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সূচনা ঘটে। এদের ‘পঞ্চপাণ্ডব’ বলা হয়। তাঁরা হলেন: জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তী ও বুদ্ধদেব বসু। তাঁদের আদর্শ ছিলেন ইংরেজ কবি টি. এস. এলিয়ট। এই আটিকেলে তিরিশের দশকের কবি ও কবিতার প্রবণতা, বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস আলোচনা করা হল।

 

তিরিশের দশকের কবিতা

 

তিরিশের দশকের কবি ও কবিতার বৈশিষ্ট্য

তিরিশের দশকের কবিতা আধুনিকতায় সিক্ত। কিন্তু আধুনিকতাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট চিহ্ন দ্বারা অবিকলভাবে সনাক্ত করা যায় না। এর মধ্যে জীবনের আনন্দ, দুঃখ, বিস্ময়, সামাজিক জীবনের সংগ্রাম আর আত্মিক জীবনের তৃষ্ণা খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলো একাধারে প্রতিবাদের, বিদ্রোহের, সংশয়ের, ক্লান্তির ও হতাশার কবিতা। আধুনিক কবিদের কবিতা মূলত মিশ্র সংস্কৃতির। এর বর্ণ ধূসর, মর্ম জটিল, ধর্ম বহুঈশ্বরবাদী এবং এর পটভূমি বিস্তৃত। ঐশ্বর্য বিচিত্র, স্বরূপ উদ্ঘাটন করা কঠিন। পারিপার্শ্বিক যান্ত্রিক সভ্যতার আঘাতে তাঁর জল ঘোলাটে, কিন্তু তাঁর সমুদ্রের সমান প্রার্থনা। এসবই আধুনিক কবিতার মূল সুর।

আধুনিক কবিতা কালের দিক থেকে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এবং ভাবের দিক থেকে রবীন্দ্র-প্রভাবমুক্ত। অনন্ত মুক্তির প্রত্যাশী এই কবিতা নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাতে রক্তাক্ত, ক্লান্ত ও নিরাশ; আত্মবিরোধে অনিকেত। তাই ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের মাধ্যমে তৃপ্তি খোঁজে। শৈল্পিক দক্ষতায় তিরিশের দশকের কবিতার অভিনবত্ব রয়েছে। ভাষা সম্পর্কে সব রকমের শুচিবায়ু পরিহার করা হয়েছে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য পুরাণ এবং বিখ্যাত কবিদের ভাবনার উদ্ধৃতির সহযোগে অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন অনুভূতির যোগ করা হয়েছে। প্রাচীন উপমার প্রয়োগে নতুন চিত্রকল্প সৃষ্টি করা হয়েছে। গদ্যছন্দের ব্যবহার ও মধ্যমিলের সৃষ্টি, বক্রোক্তির আধিক্য, ব্যঙ্গ, বিতর্ক, অদ্ভুত ও বীভৎস রসের বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। তবে বিষয়বৈচিত্র্যও আধুনিক কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

আধুনিক কবিতার আরও কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো:

১. নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক সভ্যতার অভিঘাত
২. বর্তমান জীবনের ক্লান্তি
৩. আত্মবিরোধী মনোভাব
৪. বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য থেকে সচেতন গ্রহণ
৫. ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানের প্রভাব
৬. মার্কসবাদী দর্শনের প্রভাব
৭. ঈশ্বর, নীতি ও ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস
৮. রবীন্দ্র-ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ

 

তিরিশের দশকের কবিদের পরিচয় তুলে ধরা হলো

১. জীবনানন্দ দাশ

জীবনানন্দ দাশকে চিত্রকল্পময়তার কবি বলা হয়। তিনি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্যসাধারণ কবি। তিনি তিরিশের দশকের একজন প্রধান কবি। তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধী মনোভাব দেখা যায়। রবীন্দ্র-রোমান্টিকতাকে তিনি বলেছেন, “বুড়ো হয়ে গেছ তুমি এই বুড়ো পৃথিবীর মতো।” তিরিশের দশকের সংশয়ী মানবাত্মার ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত পরিচয় ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর পোড়া মাটিতে তিনি ফলাতে চেয়েছিলেন সোনালি ফসল। নারীর চোখে তিনি দেখেছেন বেতের ফলের মতো ঘোলা দৃষ্টি।

তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে নগরজীবনের যন্ত্রণা ও হতাশার চিত্র, বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও আত্মবিরোধী মনোভাব। রবীন্দ্রনাথের কাব্যের বিরোধিতা স্পষ্টভাবে দেখা যায় তাঁর কবিতায়। তিনি তিরিশের দশকের অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর কবিতায় চিত্রকল্পময়তার অনন্য পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘ঝরাপালক’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’, ‘বনলতা সেন’, ‘মহাপৃথিবী’, ‘সাতটি তারার তিমির’, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ এবং ‘রূপসী বাংলা’।

 

 

২. সুধীন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলা সাহিত্যের তিরিশের দশকের অন্যান্য বিখ্যাত কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠেছে নগরজীবনের যন্ত্রণা ও হতাশা। তাঁর কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধী মনোভাবও স্পষ্ট। তাঁর নঞর্থক ও ক্ষণবাদী জীবনদর্শনের বৈশিষ্ট্যের কারণে আধুনিক কবিদের মধ্যে তিনি স্বতন্ত্র। তাঁর কাব্য পড়লে মনে হয়, তিনি এক নিঃসঙ্গ চূড়ায় দাঁড়িয়ে আধুনিক জীবনের শূন্যতা ও নিরাশায় ভারাতুর নয়নে চেয়ে আছেন।

তিনি রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে প্রথম সুস্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তিনি প্রথম গ্রহণ করেন ধ্রুপদি শিল্পীর নিষ্ঠা, প্রতীকী কবিদের সংহত ব্যঞ্জনাধর্মী স্বল্পভাষ কাব্যাদর্শ। তাঁর কবিতায় নগরজীবনের যন্ত্রণা, দেহকেন্দ্রিক প্রেম, বর্তমান জীবনের ক্লান্তি, নাস্তিক মনোভাব এবং ফ্রয়েডীয় মনোবিকলন তত্ত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁর কবিতায় যৌনতা ও দেহকেন্দ্রিক প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে, যা রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার বিরোধী। ‘অর্কেস্ট্রা’ কাব্যের ‘শাশ্বতী’ কবিতায় আমরা এই দেহকেন্দ্রিক প্রেমের পরিচয় পাই। তাঁর প্রায় সব কবিতাতেই আধুনিকতার এই পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘অর্কেস্ট্রা’, ‘ক্রন্দসী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘সংবর্ত’, ‘দশমী’ প্রভৃতি।

 

 

৩. বিষ্ণু দে

তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক কাব্যজগতের প্রথম অস্তিবাদী কবি। আধুনিক কাব্যের ক্লান্তি, হতাশা, নৈরাশ্যবাদী চিন্তা, জিজ্ঞাসা, সংশয়, বিতৃষ্ণা, নৈরাশ্য ও নির্বেদের বিশৃঙ্খল বাষ্পপুঞ্জ থেকে তিনি সৃষ্টি করেছেন বিশ্বাসের ধ্রুবলোক। তাঁর বহু কবিতায় রাজনৈতিক মত ও তির্যক ব্যঙ্গের প্রকাশ রয়েছে। তিনি কবিতায় আধুনিকতার চর্চা করেছেন। তাঁর কবিতা সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক চিন্তাঘন। তিনি মার্কসীয় চিন্তা কবিতায় লালন করেছেন। মার্কসবাদী দর্শন তাঁর কবিতায় সবচেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে।

তাঁর প্রায় সব কাব্যেই তিনি সমাজের সকল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম ছিল আজীবন। তাই তিনি ‘চোরাবালি’ কাব্যের ‘ঘোড়সওয়ার’ কবিতায় এই বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘উর্বশী ও আর্টেমিস’, ‘চোরাবালি’, ‘পূর্বমেঘ’, ‘সন্দীপের চর’, ‘অন্বিষ্ট’, ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’ প্রভৃতি।

 

 

৪. অমিয় চক্রবর্তী

তিনিও তিরিশের দশকের কবিতার একজন বিখ্যাত কবি। তাঁর কবিতায় জটিল ও দ্বিধাবিভক্ত কবিমানসের পরিচয় মেলে। তাঁর চিত্তের গভীরে দ্বন্দ্বজর্জরিত ক্ষত ও অনিকেত সত্তার সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি একজন আধুনিকতাবাদী কবি। তাঁর কবিতায় যান্ত্রিক জীবনের যন্ত্রণা ও হতাশার চিত্র মেলে। দেহকেন্দ্রিক প্রেমের স্বরূপও পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘খসড়া’, ‘এক মুঠো’, ‘মাটির দেয়াল’, ‘অভিজ্ঞান বসন্ত’, ‘পারাপার’, ‘পালাবদল’, ‘ঘরে ফেরার দিন’ প্রভৃতি।

 

 

৫. বুদ্ধদেব বসু

বুদ্ধদেব বসু একজন প্রেমের কবি। কাব্যচর্চার শুরুতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে অনুসরণ করতেন। ‘মর্মবাণী’ কাব্যে রবীন্দ্র-প্রতিধ্বনি শোনা যায়। রবীন্দ্র-প্রভাবের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ শুরু হয় ‘বন্দীর বন্দনা’ থেকে। তিনি কবিতায় দেহকেন্দ্রিক প্রেমের চর্চা করেছেন। তাঁর কবিতায় ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণ তত্ত্বের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বুদ্ধদেবের কাছে যৌবন যেন এক অভিশাপমাত্র। তাঁর মতে, বিধাতা নয়, বরং ক্লান্তিহীন সংগ্রাম ও অন্তহীন যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মানুষ তার প্রতিটি অধিকার জয় করেছে। কবি যৌনবাসনা থেকে মুক্তির চেষ্টা করেছেন। কারণ, তিনি মনে করেছেন এই বাসনার মধ্যেই মানবসত্তার চরম বিকাশ ঘটে। তিনি দ্রৌপদীর শাড়ির মতো একে একে দেহ ও মনের সকল রহস্য উন্মোচন করতে চেয়েছেন।

তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘মর্মবাণী’, ‘বন্দীর বন্দনা’, ‘পৃথিবীর পথে’, ‘কঙ্কাবতী’, ‘নতুন পাতা’, ‘দময়ন্তী’, ‘রূপান্তর’, ‘দ্রৌপদীর শাড়ি’, ‘শীতের প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর’, ‘যে আঁধার অধিক’, ‘এক পয়সায় একটি’, ‘বিদেশিনী’ ইত্যাদি।

 

 

পঞ্চপাণ্ডব ছাড়াও ত্রিশোত্তর পর্বে আরও কিছু আধুনিক কবি রয়েছেন, যাঁরা নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল এবং আধুনিকতার চেতনায় প্রোথিত।

 

 

প্রেমেন্দ্র মিত্র

তিরিশের দশকের অন্যান্য কবিদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁর কবিতায় আধুনিকতা, নগরজীবনের যন্ত্রণা ও হতাশা, দেহকেন্দ্রিক প্রেম এবং মার্কসবাদী চিন্তার প্রকাশ মেলে। তিনি কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধী মনোভাব পোষণ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘প্রথমা’, ‘সম্রাট’, ‘ফেরারী ফৌজ’, ‘সাগর থেকে ফেরা’, ‘হরিণ চিতা চিল’।

 

 

সুকান্ত ভট্টাচার্য

বিপ্লবী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যকে ‘কিশোর কবি’ বলা হয়। তাঁর কবিতায় রাজনৈতিক কমিটমেন্ট স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে। তিনি ছিলেন একজন মার্কসবাদী কবি। সমাজের সকল অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলো হলো: ‘ছাড়পত্র’, ‘পূর্বাভাস’, ‘ঘুম নেই’, ‘মিঠেকড়া’ ইত্যাদি। এসব কাব্যগ্রন্থে তাঁর আধুনিকতার নিদর্শন মেলে।

 

 

সমর সেন

তিনি ছিলেন প্রধানত নাগরিক কবি। গদ্যছন্দে তিনি কবিতা লিখতেন। তাঁর কবিতাতেও আধুনিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘গ্রহণ ও অন্যান্য কবিতা’, ‘নানা কথা’, ‘তিন পুরুষ’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ।

 

এছাড়াও সজনীকান্ত দাস, অন্নদাশঙ্কর রায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, মনীশ ঘটক, জগদীশ ভট্টাচার্য ও হরপ্রসাদ মিত্র তিরিশের দশকের উল্লেখযোগ্য কবি।

আরো পড়ুন