বলাকা কাব্যের বিষয়বস্তু, গতিবাদ ও শিল্পমূল্য আলোচনা করা হল

যাকে বাদ দিলে বাংলা সাহিত্য অসম্পূর্ণ থেকে যায় তিনি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে নিরন্তর  ছুটে চলেছেন নতুন দিগন্তের দিকে, নতুন সৃষ্টি দিকে। জীবনের এই ছুটে চলাকে নানাভাবে উপলব্ধি করেছেন তিনি। তিনি উপলব্ধি করলেন মহাকাল ছুটে তার নিজের গতীতে। এই গতি মহাজাগতিক যা কখনো থামার নয়। সবকিছুর মধ্যে তিনি একধরণের গতি উপলব্ধি করলেন।  তারই পরিপ্রেক্ষিতে রচনা করেন বলাকা কাব্য। এই আর্টিকেলে বলাকা কাব্যের বিষয়বস্তু, গতিবাদ ও শিল্পমূল্য আলোচনা করা হল।

বলাকা কাব্যের বিষয়বস্তু

বলাকা কাব্যের বিষয়বস্তু

বলাকা কাব্য জীবনের সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  বেদনা, কণ্টকাকীর্ণ পথ এসবকে পিছনে ফেলে জীবনের নতুন সম্ভাবনা বিনির্মানের কথা কাব্যিক ভাষ্যে তুলে ধরেছেন বিশ্বকবি। এই কাব্য কবির জীবনের পরিপক্ব সময়ের কাব্য। কবি ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন দার্শনিক বার্গসঁর এর গতিবাদ তত্ত্ব দ্বারা। আর তারই ধারাবাহিকতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করলেন বলকা কাব্য। যেটাকে এক কথায় গতিবাদের কাব্য বলা যায়, কেননা এই কাব্যের মূল সুর গতিবাদ। এ ছাড়াও তিনি এই কাব্যে নবজাগরণের আহবান করেছেন, সংগ্রাম-যুদ্ধের কথা ব্যক্ত করেছেন।

এই কাব্যের শুরুতেই দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তরুনের আহ্বান করেছেন এই দেশ, সমাজ থেকে দূর্বলদের টেনে তুলতে। তরুনদের মধ্য দিয়ে সমাজকে পরিশীলিত করার প্রয়াস ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন-

 

“ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা

ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,

আধ-মরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।”

(বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; ১ সংখ্যক কবিতা)

কবি এখানে তরুনদের উদ্দীপনা, প্রাণশক্তি দিয়ে এই জরাজীর্ণ ঘুনেধরা সমাজকে ও পিছিয়ে পড়া মানুষদের মধ্যে কর্মতৎপরতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। তিনি নতুনদের মধ্যে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে বলেছেন। নতুনদের সাহস ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সমাজকে বিনির্মানের আহ্বান করেছেন কবি।

বলাকা কাব্যের ৩ সংখ্যক কবিতায় মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা ব্যক্ত করেছেন। ঘরে আবদ্ধ থেকে মানুষ কখনো কিছু জয় করতে পারে না, কিছু জয় করতে হলে সর্বদা সম্মূখ পথে ছুটে যেতে হয়, রক্তপায় সংগ্রাম করে জীবনের জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। মানুষ কখনো অনায়াসে কিছু লাভ করতে পারে না, জীবনের বিজয়সূর্যকে ছিনিয়ে আনতে ঘর ছেড়ে বের হতে হবে, রক্ত ঝড়াতে হবে, বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। এই কবিতায় কবি মানুষের জীবনের ইতিবাচক সম্ভাবনার দিকে অগ্রসরের আহ্বান করেছেন।

৯ সংখ্যক কবিতায় কবি ঈশ্বরকে নিজের মধ্যে ধারণ করার কথা ব্যক্ত করেছেন। এটা মূলত আত্মজাগরণ মূলক  কবিতা। ঈশ্বরের মধ্যে যে বোধ রয়েছে সেই বোধ মানুষের মধ্যে ধারণ করতে পারলেই মানুষের আত্মার উন্নতি সম্ভব কবি এ কথাই বলেছেন। মানুষের মধ্যে ঈশ্বর অমৃতরসের সঞ্চার করেন তাইতো মানুষ দেবলোকে পানে চেয়ে থাকে। পার্থিব জগতে রাজারাও কাজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন কিন্তু ঈশ্বরের অবসর নেই। তিনি পার্থিব জগতের পথিকদের আর্শীবাদের কাজে সর্বদা নিয়োজিত। মানুষের মধ্যে এই গতিবাদ কবি ধারণ করতে বলেছেন।

এই পৃথিবী প্রতিটা জিনিস, প্রতিটা বস্তু একটা নির্দিষ্ট গতিতে চলছে, কোনো কিছু একই ভাবে, একই অবস্থানে সারাজীবন থাকে না। প্রতিটা বস্তু তার নিজস্ব গতিতে ধাবমান হচ্ছে প্রতিনিয়ত। গতি স্থির হলে মানুষের জীবনও স্থবির হয়ে যাবে। পৃথিবীর প্রতিটা জিনিসের মধ্যে গতি আছে বলেই পৃথিবী আজও টিকে আছে। এই পৃথিবীতে গতিই সত্য। আর এই সত্য প্রবহমান। এই প্রবহমানতা রুদ্ধ হলে মানুষের জীবনেও রুদ্ধ হয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যের প্রায় প্রতিটা কবিতায় প্রতিটি বস্তুর এই প্রবহমানতা, এই গতিবাদকে তুলে ধরেছেন। কবি বলেন-

“ কী প্রলাপ কহে কবি!

তুমি ছবি।

কে বলে রয়েছ স্থির রেখার বন্ধনে

নিস্তব্ধ ক্রন্দনে?”

 (বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ; ৬ সংখ্যক কবিতা)

কবি বলেছেন, তাঁর প্রিয় মানুষটি শুধুমাত্র নিস্তব্ধ ক্রন্দনের মধ্যে আবদ্ধ নয়, জীবনের বহমানতার প্রতীক। কবি তাঁর প্রিয় মানুষের ছবিটাকে শুধু একটা স্থির ফ্রেমে আবদ্ধ কোনো ছবি হিসেবে দেখছে না।। এই ছবিতে রয়েছে কবি ও তাঁর প্রিয় মানুষের জীবনের যুগ যুগ ধরে হাসি কান্নার গতিময়তা। কবির মতে পৃথিবীর প্রতিটি জিনিসের মধ্যে রয়েছে প্রবাহমান গতি। এই ছবির মানুষটি একসময় তার কাছেই ছিল  কিন্তু আজ আকাশে দূর গ্রহ, তারা, নক্ষত্রের মতো আলোকবর্ষ দূরে চলে গেছে। কবি চাইলেও আর তাকে ছুটে পারবে না। কবির কাছে গ্রহ, তারা, নক্ষত্রের মতো সত্য ও প্রবহমান তাঁর প্রিয় মানুষের ছবি।

কবির প্রিয় মানুষটি চলে যেতে পারে, কিন্তু কবির মনের মধ্যে সেই মানুষটি চিরকাল আসা যাওয়ার মধ্যেই থেকে যায়, তার স্মৃতি আজীবন কবির মনে মধ্যে বেঁচে থাকে। তাই এই ছবি শুধু পটে আঁকা ছবি না, নীহারিকার গ্রহ, নক্ষত্র ধ্রুবতারার মতোই সত্য, গতিশীল।

কবির কাছে পৃথিবীর একমাত্র সত্য প্রবহমানতা, গতিশীলতা। কিন্তু যদি এই গতি থেমে যায় এই ধরা নিশ্চল হয়ে যাবে জড় বস্তুতে পরিণত হবে। কবির মতে, কোনো প্রাণের বিরাম নেই। এমনকি তার চলার পথে ক্ষনিক বাধাও প্রাণকে জড় বস্তুতে পরিণত করতে পারে। কবির মতে, প্রতিটা প্রাণকে শুধু ধাবমান হতে হবে। উদ্দাম বেগে, পিছনে না ফিরে, যা কিছু মানুষের প্রাপ্য সবকিছু দু হাত মেলে ধেয়ে যেতে হবে। কবি বলেন-

“যদি তুমি মুহুর্তের তরে

ক্লান্তিভরে

দাড়াও থমকি

তখনি চমকি

উচ্ছ্রিয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে।”

(বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর;৮সংখ্যক কবিতা)

কবি এখানে প্রতিটি মানুষের মধ্যে কর্মতৎপরতা ও গতিশীলতাকে দেখিয়েছেন। মানুষের মধ্যে আমৃত্যু এই গতিশীলতাকে আকড়ে ধরতে হবে। ক্ষনিক সময়ের জন্য কখনো রুদ্ধ হওয়া যাবে না। কিছু মুহুর্তের জন্যও যদি কেউ হঠাৎ থমকে যায়  তবে তার সামনে এসে দাড়াবে পাহাড়সম বাধা বিপত্তি।  তাই নিরবচ্ছিন্নভাবে মানুষের এই প্রবহমানতা ধরে রাখতে হবে।

কখনো আবার কবির মনে হয়, জীবনে গতিই যদি একমাত্র সত্য হয় তাহলে মৃত্যু এসে একদিন মানুষকে স্থবির করে দিবে। কবির মনের এই আশঙ্কা কবির ভিতর একধরণের মৃত্যুভয় জাগিয়ে তোলে। কিন্তু এই মৃত্যুভয় কবিকে বেশিক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখতে পারেনি। এ ভাবনা কবির পরমুহুর্তেই কেটে যায়। কবির মনে হতে থাকে জীবনের এই ধ্রুব সত্য গতিশীলতার কারনেই জীবনে মৃত্যু আসবে। এই মৃত্যুই জীবনের গতিবাদের অন্যতম দিক। এজন্য কবি বলেছেন-

“ভালোবাসিয়াছি এই জগতের আলো,

জীবনেরে তাই বাসি ভালো।

তবুও মরিতে হবে, এও সত্য জানি।”

(বলাকা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ১৯ সংখ্যক কবিতা)

কবি এখানে জীবনের স্বাভাবিক প্রবহমানতা ও মৃত্যু সম্পর্কে এক পরিচ্ছন্ন চিন্তা তুলে ধরেছেন। জীবন, মৃত্যু দুটোই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। জীবনের এই গতিময়তায় মৃত্যুও একটা স্বাভাবিক প্রবাহ। কবি তাই জীবনের সাথে সাথে মৃত্যুকেও যে গ্রহণ করতে হবে তা হৃদয়ে ধারণ করেছেন।কিন্তু এই মৃত্যুর সাথে সাথেই জীবনের গতিশীলতা থেমে যায় না। সেখান থেকে জন্ম নেয় নতুন গতি।

রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যের মূল সুর দেখিয়েছেন গতিবাদকে। তাই তো তিনি এই কাব্যে যৌবন, মৃত্যু, যুদ্ধ সম্বন্ধীয় কবিতা এই কাব্যে তুলে ধরেছন। কেননা এসবই গতিবাদের সাথে একসূত্রে গ্রথিত। রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর মধ্যে যেমন গতি দেখিয়েছেন তেমনি যৌবনের মধ্যেও গতিকে দেখিয়েছেন।

“আছি আমি অনন্তের দেশে

যৌবন তোমার

চিরদিনকার।”

 (বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ১৩ সংখ্যক কবিতা)

যৌবনের সঙ্গেই বাধা জীবনের এধার ওধার। কবির সৃষ্টিকর্মকে কবি যৌবনের সাথে তুলনা করেন। তাইতো জীবন, মৃত্যু সবকিছুর সিংহদ্বার হিসেবে কবি যৌবনকে দেখিয়েছেন। যৌবনকে কবি জীবনের একটা নির্দিষ্ট বয়সকে নয় বরং জীবনের কর্মতৎপরতা, প্রাণশক্তি, চাঞ্চল্য, গতিশীলতাকে বুঝিয়েছেন। যৌবন হলো নবীনতার স্মারক। এখানে কবি নব উদ্যমে, নব উল্লাসে প্রাণশক্তিকে সঞ্চার করে ছুটে চলতে বলেছেন। জীবনের গতিময়তাকে যৌবন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন কবি এই কবিতায়।

বলাকা কাব্যগ্রন্থের ৭ সংখ্যক কবিতায় কবি সম্রাট শাহজাহান তাঁর পত্নীর মমতাজ নির্মানের প্রসঙ্গের মধ্য দিয়ে গতিবাদকে দেখিয়েছেন। কবি বলেন, শাহজাহানের তৈরী মমতাজের জন্য প্রেমের সৌধ আজন্মকাল পৃথিবীর সকল প্রেমিকের প্রেমস্মৃতিবাহী হয়ে৷ থাকবে। শাহজাহানের ধন, মান, জীবন, যৌবন সব কালের স্রোতে ভেসে গেলেও এই পৃথিবীতে শাহজাহান মমতাজের সকরুন দীর্ঘশ্বাস আজন্মকাল এই পৃথিবীতে বিরাজমান থাকবে।

“শুধু থাক।

একবিন্দু নয়নের জল

কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জল

এ তাজমহল।”

 (বলাকা; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; ৭ সংখ্যক কবিতা)

শাহজাহানের তৈরি তাজমহল এ পৃথিবীতে চিরকাল প্রেমময়তার সাক্ষী বহন করবে। মৃত্যুর পরে শাহজাহান মমতাজ প্রেমময়তার করুন সুর সারাজীবন মানবহৃদয়ে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।

৮ সংখ্যক কবিতায় চঞ্চলা,  নদী, ভৈরবী, বৈরাগিনী বিভিন্ন নামের মধ্যে জীবনের প্রবাহমানতাকে দেখিয়েছেন। জীবনের গতিমানতা, প্রবাহমানতা নিরন্তর ধেয়ে চলাকে নির্দেশ করেছে এই কবিতায়।

পরিশেষে বলা যায়, বলাকা কাব্য রবীন্দ্রনাথের এমন এক কাব্য যেখানে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূর্ণ পরিপক্কতার সাক্ষর রেখেছেন। এই কাব্যে তিনি স্রষ্টার প্রতি প্রেমকে যেমন দেখিয়েছেন তেমনি জীবনের নিরন্তর ধেয়ে চলা, জীবনের গভীরতা ও গতিশীলতাকে নির্দেশ করেছেন।

FAQ

১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয় কী?
উত্তর: ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয় হলো জীবনপ্রবাহ, গতি, নবজাগরণ, বিশ্বচেতনা ও গতিশীলতার দর্শন।
২. ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থের নামকরণের তাৎপর্য কী?
উত্তর: আকাশে উড়ন্ত বলাকার চিত্রের মাধ্যমে কবি জীবনের অবিরাম গতি ও অগ্রযাত্রার প্রতীক তুলে ধরেছেন।
৩. ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থে গতিবাদের পরিচয় কীভাবে ফুটে উঠেছে?
উত্তর: প্রকৃতি, জীবন ও বিশ্বজগতের সর্বত্র অবিরাম পরিবর্তন ও গতির মধ্য দিয়ে কাব্যগ্রন্থে গতিবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
৪. ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যে কেন গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: আধুনিক ভাবনা, গতিচেতনা, দার্শনিক উপলব্ধি ও কাব্যশৈলীর অভিনবত্বের জন্য ‘বলাকা’ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থে কবির জীবনদর্শন কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে?
উত্তর: জীবনকে স্থির নয়, বরং চিরপ্রবহমান ও গতিশীল হিসেবে দেখার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন প্রকাশিত হয়েছে।

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120