সিরাজউদ্দৌলার নাটকটি নবাব সিরাজউদ্দৌলার করুন পরিণতি এবং বাংলার স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়ার করুণ কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে। সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি মূলত একটি করুনরসাত্মক নাটক। এখানে নবাব সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর মাধ্যমে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে যার কারণে ট্রাজেডিও বটে। ১৭৫৭ সালে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীনতা হরণ হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক কাহিনী অবলম্বন করে সিকান্দার আবু জাফর সিরাজউদ্দৌলা নাটকটি রচনা করেন। সিরাজউদ্দৌলার নাটক রচনায় তার অভাবনীয় প্রতিভার প্রকাশ পায়। ইতিহাস ভিত্তিক নাটক রচনায় সিরাজউদ্দৌলা সর্বজন স্বীকৃত একটি নাটক। এই নিবন্ধে সিরাজউদ্দৌলার নাটকের মূলভাব, সংক্ষিপ্ত কাহিনী, চরিত্র বিশ্লেষণ ও জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর আলোচনা করা হল।

সিরাজউদ্দৌলার নাটকের লেখক সিকান্দার আবু জাফর
সিকান্দার আবু জাফর মূলত একজন কবি ছিলেন, তবুও সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি সমানভাবে বিচরণ করেছেন। তিনি ১৯১৮ সালে সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘদিন সাহিত্য পত্রিকা সমকালের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পাকিস্তানি অপশাসনের বিরুদ্ধে তেরি সর্বদা স্বেচ্ছার ছিলেন। তার বিখ্যাত কয়েকটি নাটক হল সিরাজউদ্দৌলা, মাকড়সা, শকুন্ত উপখ্যান ও মহাকবি আলাওল।তিনি ১৯৬৬ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান ছিল অসামান্য। তিনি ১৯৭৫ সালের বাঁশি আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ঐতিহাসিক পটভূমি
বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে ইউরোপীয়রা দীর্ঘকাল ধরে ভারতের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছিল। তৎকালীন সময়ে ইউরোপে ভারতীয় পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল সে উদ্দেশ্যে তারা ভারতবর্ষে এসেছিল। পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা ১৪৯৮ সালে ভারত আবিষ্কার করেন। তারপর থেকে একের পর এক ইউরোপীয় দেশ ভারতবর্ষে এসেছে বাণিজ্য করতে। সেখান থেকেই তারা বিভিন্ন অপকর্ম থেকে শুরু করে। দস্যুবৃত্তি থেকে শুরু করে এদেশের মানুষের উপর নির্যাতন ও বিভিন্ন অপকর্মের লিপ্ত ছিল তারা। সম্রাট জাহাঙ্গীর এদের দমনে তৎপর ছিলেন। ১৬৩২ সালে বাংলার সুবেদার যুবরাজ শাহ সুজার অনুমতি পেয়ে ইংরেজরা হুগলিতে কারখানায় স্থাপন করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৬৯৮ সালে ইংরেজরা সন্তানটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা গ্রাম ক্রয় করে। পরবর্তীতে সেখান থেকেই কলকাতা নগরীর উৎপত্তি ঘটে।
মুঘল সম্রাট ফররুখ শিয়রকে শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন ইংরেজ ডাক্তার হ্যামিলটন। আর এরই পুরস্কার হিসেবে তিনি ইংরেজদের এদেশে বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার ফরমান জারি করেন। তারপর থেকে ইংরেজরা এদেশে বিনাশুলকে বাণিজ্য শুরু করে। দিল্লির এমন আদেশ মুর্শিদকুলি খাঁ, সুজাউদ্দিন খাঁ, সরফরাজ খাঁ এবং আলীবর্দী খাঁ মেনে নেননি। তারা তাদের নিজেদের এলাকায় খুবই শক্তিশালী ছিল এবং তারা ইংরেজদের কে তাদের এলাকা থেকে বারবার পরাজিত করছিল।
কিন্তু বিপত্তি ঘটে নবাব সিরাজউদ্দৌলা অল্প বয়সে ক্ষমতায় আহরণ করলে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছে। সিরাজউদ্দৌলার বয়স কম থাকার কারণে অভিজ্ঞতাও ছিল কম। সে কারণে তিনি আলীবর্দী খাঁ বা তার পূর্ববর্তী নবাবদের মত এতটা বিচক্ষণ ছিলেন না। পরাজয়ের পেছনের সবচাইতে বেশি প্রভাব রেখেছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। তার নিজ সেনাপতি এবং কাছের লোকরাই তার সবচাইতে বেশি ক্ষতি করেছে। মীরজাফর, রাজা রারবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ এবং তার নিজ খালা ঘসেটি বেগমও তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ইংরেজদের চাইতে নবাবের সেনা গোলাবারুদ সবকিছুই ছিল অনেক বেশি। কিন্তু ষড়যন্ত্রের কারণে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। কারণ তার অধিকাংশ সেনাপতি ছিল নিষ্ক্রিয়। তারা কোনভাবেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। দেশের স্বাধীনতার চেয়ে তাদের কাছে সে সময় বড় হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিস্বার্থ। এ ভাবে ব্যক্তিস্বার্থের কাছে বলি হয়েছিল ভারতবর্ষে স্বাধীনতা।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের মূলভাব
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের মূলভাব হল নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন এবং এর পিছনে তার নিজের লোকের বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বার্থপরতা। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। তিনি সিংহাসনে আরোহণের করার পর থেকে এদেশের মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ছিল কম। অন্যদিকে ইংরেজরা বহু আগ থেকেই বাণিজ্যের লক্ষ্যে এ দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। তারা বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। কিভাবে নবাবকে পরাজিত করা যায় এবং এদেশকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে আসা যায়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতায় আসার পর তাদের প্রতীক্ষিত সময় চলে আসে।
তারা নবাবের কাছের লোকদের হাত করে নেয়। এর মধ্যে মীরজাফর ছিল সবচাইতে বড় বিশ্বাসঘাতক। এ ছাড়াও জগৎশেঠ, রাইদুর্লভ, রাজবল্লভ, ঘসেটি বেগম এই ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। তারা যেভাবেই হোক নবাবের পরাজয় চেয়েছিল। মীরজাফর সিংহাসনে আরোহণের আশায় ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়েছিল। ক্ষমতার লোভ তার কাছে দেশের স্বার্থের চাইতে বড় হয়ে উঠেছিল। জগৎশেঠ, রাইদুর্লভ অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছিল। নবাব ক্ষমতায় বসার পর একদিনও নিশ্চিন্তে রাজ্যভার পরিচালনা করতে পারেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের পাশাপাশি ইংরেজদের দৌরাতো চারিদিকে বেড়েই চলেছে চলেছিল।
সিরাজউদ্দৌলা তাদের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন হয়তো তারা ভালো হয়ে যাবে। তাই তিনি মিরজাফরসহ সবাইকে কোরআন শরীফ শপথ করান। কিন্তু কোরআন শপথ করেও মীরজাফরের মত বিশ্বাসঘাতকরা পলাশীর প্রান্তরে সেদিন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। পলাশীর প্রান্তরে সেদিন ইংরেজিরদের চাইতে নবাবের সেনা গোলাবারুদ সবকিছু বেশি ছিল। কিন্তু সেদিন সব সেনাপতি ছিল নিরব।
যুদ্ধে যখন নবাবের জয়ের মুখোমুখি তখন মিরমর্দান এবং মোহনলাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য নবাবকে অনুরোধ করেন। কিন্তু নবাব মীরজাফরের কথা শুনে যুদ্ধ বন্ধ করেন তারই পরিপ্রেক্ষিতে ইংরেজরা নবাবের সৈন্যদের উপর আক্রমণ করে অনেক এবং চরম পরাজয় নেমে আসে।
এই নাটক আমাদের শিক্ষা দেয় যে মানুষের বাইরের শক্তি যতটা না করতে পারে ঘরের শক্তি তার চাইতে বহুগুণ ক্ষতি করতে পারে। যেমনটি ঘটেছে নবাবের ক্ষেত্রে। এর মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা চলে যায় ইংরেজদের হাতে এবং ২০০ বছর পরাধীনতার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়েছে আমাদের।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের সংক্ষিপ্ত কাহিনী
প্রথম অঙ্ক
১ম দৃশ্য
সময়: ১৯ জুন, ১৭৫৬
স্থান: ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ (কলকাতা)
ঘটনা: ইংরেজরা নবাবের অনুমতি ছাড়া ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সংস্কার করছে। এজন্য নবাব ইংরেজদের উপর খুবই ক্ষিপ্ত হয়। তিনি ইংরেজদের উপর আক্রমণ করেন এবং তাদেরকে পরাজিত করে কলকাতা দখল করেন যা পরে আলিনগর নামে নামকরণ করা হয়।
২য় দৃশ্য
সময়: ৩ জুলাই, ১৭৫৬
স্থান: কলকাতার ভাগীরথী নদীতে ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজ
ঘটনা: সিরাজের আক্রমণে পরাজিত হয়ে গভর্নর ড্রেক, কিলপ্যাট্রিক ও অন্যান্য ইংরেজ কর্মকর্তা জাহাজে আশ্রয় নেয়। তাদের চরম দুর্দশা, পারস্পরিক কলহ এবং উমিচাঁদের মাধ্যমে মাদ্রাজ থেকে সাহায্য পাঠানোর ও ষড়যন্ত্রের সংবাদ পাওয়া যায়। এভাবে তারা নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
৩য় দৃশ্য
সময়: ১০ অক্টোবর, ১৭৫৬
স্থান: ঘসেটি বেগমের বাড়ি (মতিঝিল)
ঘটনা: ঘসেটি বেগম ও রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ মিলে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।তারা যে কোন উপায়ে নবাবকে পরাজিত করতে বদ্ধপরিকর। সিরাজ সেখানে উপস্থিত হয়ে ঘসেটির গোপন সভা ছত্রভঙ্গ করেন এবং তাকে বন্দি করে রাজপ্রাসাদে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু তিনি তার খালাকে বিন্দুমাত্র অসম্মান করেননি।
দ্বিতীয় অঙ্ক
১ম দৃশ্য
সময়: ১০ মার্চ, ১৭৫৭
স্থান: নবাবের দরবার (মুর্শিদাবাদ)
ঘটনা: নবাব সিরাজউদ্দৌলা রাজসভার সদস্যদের নিয়ে ইংরেজদের আগ্রাসন ও ভেতরের দেশদ্রোহীদের নিয়ে আলোচনা করেন। মীরজাফর ও ইংরেজদের আঁতাত নিয়ে সন্দেহ দানা বাঁধে। নবাব এসময় কিছুটা সন্দেহ বোধ করেন। তারপরও তিনি জোরালো কোন পদক্ষেপ নেননি।
২য় দৃশ্য
সময়: ১৯ মে, ১৭৫৭
স্থান: মীরজাফরের আবাস
ঘটনা: মীরজাফরের বাসভবনে ইংরেজ প্রতিনিধি ওয়াটস ও ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন বৈঠক। নবাবের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ ও সিংহাসনচ্যুত করার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়। এখানে তারা নিজেদের স্বার্থ ও নবাবের পরাজয়ের পরে কে কোন দায়িত্ব পালন করবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়।
৩য় দৃশ্য
সময়: ৯ জুন, ১৭৫৭
স্থান: মীরনের আবাস
ঘটনা: মীরজাফরের পুত্র মীরনের বাড়িতে চক্রান্তকারীদের গোপন তৎপরতা এবং নবাবের অনুগতদের দুর্বল করার পরিকল্পনা। এই সময় তারা বিভিন্ন রকম নাচ গান আমোদ ফুর্তিতে লিপ্ত হয়। সেখানেই ওয়াটস এবং ক্লাইভ নারীর ছদ্মবেশে প্রবেশ করে। নবাব কে পরাজিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং সমস্ত দলিলের স্বাক্ষর করা হয় যে কে কি পরিমান সম্পদ গ্রহণ করবে এবং কে কোন পদ নেবে।
তৃতীয় অঙ্ক
১ম দৃশ্য
সময়: ১০ জুন থেকে ২১ জুন, ১৭৫৭
স্থান: লুৎফুন্নিসার কক্ষ
ঘটনা: এ সময় নবাবের মা আমিনা বেগম এবং লুৎফুন্নেসার মধ্যে কথোপকথন চলে। ঘসেটি বেগম নানাভাবে সিরাজকে অপমান অপদস্থ করতে থাকে। তখন লুৎফুন্নেছা তার প্রতিবাদ করে। এ সময় সিরাজের সাথেও ঘসেটি বেগমের কথা কাটাকাটি চলতে থাকে।
২য় দৃশ্য
সময় ২২ জুন ১৭৫৭
স্থান: পলাশীতে নবাবের শিবির
ঘটনা: পলাশীর যুদ্ধ শুরু হয় (২৩ জুন, ১৭৫৭)। এখানে নবাব মোহনলাল এবং মীর ময়দানের মধ্যে যুদ্ধ নিয়ে পরামর্শ চলে । নবাব জানেন তার সৈন্য গোলাবারুদ সবদিক থেকেই অনেক বেশি। কিন্তু তার মনে কোন একটা সন্দেহ ছিল যে তার সৈন্যরা যদি ঠিকমত যুদ্ধ না। করে যদি তারা বিশ্বাসঘাতকতা করে এই সংশয় তার মনে দানা বেঁধেছিল।
৩য় দৃশ্য
২৩ জুন ১৭৫৭
স্থান: পলাশীর যুদ্ধশিবির / রণাঙ্গন
ঘটনা: যুদ্ধক্ষেত্রে বিশ্বস্ত সেনারা প্রাণপণে যুদ্ধ করছিল কিন্তু মীরজাফর সহ অন্যান্য সেনাপতিদের সুন্দরাম যুদ্ধে নিরব ছিল এছাড়াও এই সময় নবাবের অনেক সেনাপতিরা নিহত হতে থাকে। মীরজাফরের কুরামর্শে যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন সিরাজ। এই সুযোগে ক্লাইভের বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে এবং নবাবের বিশাল পরাজয় ঘটে।
৪র্থ দৃশ্য
সময় ২৫ জুন ১৭৫৭
স্থান: রাজধানী মুর্শিদাবাদ / প্রাসাদের ভেতরের দৃশ্য
ঘটনা: অবতার দরবারে এসে মানুষদেরকে বোঝাতে থাকে যে বাংলা স্বাধীনতা একবার যদি অস্তমিত হয় তাহলে আর কোনদিনও এই স্বাধীনতা ফিরে আসবে না তাই তিনি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে আসার জন্য আহ্বান করে কিন্তু তার কথাই কেউ সাড়া দেয়নি। লুৎফুন্নেসা এসে নবাবকে সান্তনা দেয় এবং প্রাসাদ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
চতুর্থ অঙ্ক
১ম দৃশ্য
সময় ২৯ জুন ১৭৫৭
স্থান: মির্জাফরের দরবার
ঘটনা: এখানে মীরজাফর ক্লাইভের হাত ধরে সিংহাসনে আহরণ করেন এবং নিজেদের ভিতরে সবকিছু ভাগাভাগি করে নেন। কুশা করে সমস্ত সম্পদ তারা ভাগ করে নেয় এবং মির্জাপুর কে নামমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে ক্ষমতাও পরিচালনা করে রবার্ট ক্লাইভ। এ সময় খবর আসে পলাশী থেকে পালিয়ে নৌকাযোগে পাটনার দিকে যাওয়ার পথে রাজমহলে মীরজাফরের অনুচরের মাধ্যমে সিরাজউদ্দৌলা ধরা পড়েন এবং বন্দি হন। রবার্ট ক্লাইভ নবাব কে হত্যার জন্য মিরনকে দায়িত্ব দেন। মিরন মোহাম্মদী বেগকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে নবাব কে হত্যার জন্য রাজি করায়।
২য় দৃশ্য (শেষ দৃশ্য)
সময় ২রা জুলাই ১৭৫৭
স্থান: জাফরগঞ্জের কয়েদখানা
ঘটনা: মীরজাফরের পুত্র মীরনের আদেশে ঘাতক মোহাম্মদি বেগের দ্বারা সিরাজউদ্দৌলার নিষ্ঠুর হত্যা সংঘটিত হয়। নবাবের বাবা মোহাম্মদী বেগকে খুবই স্নেহ করে বড় করেছিল সেই মোহাম্মদী বেগের হাতেই নবাবের প্রাণ যায়। এর মাধ্যমে নাটকের সমাপ্তি ঘটে নাটকের সমাপ্তি ঘটে।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পরিচিতি
আলিবর্দি খাঁ
১. বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব।
২. প্রকৃত নাম মির্জা মুহাম্মদ আলি।
৩. সিরাজউদ্দৌলার নানা।
সিরাজউদ্দৌলা/সিরাজ
১. সিরাজউদ্দৌলা নাটকের কেন্দ্রীয় ও নায়ক চরিত্র।
২. পিতা জয়নুদ্দিন ও মাতা আমিনা বেগমের জ্যেষ্ঠ পুত্র।
৩. জন্মগ্রহণ করেন ১৭৩৩ সালে।
৪. সিংহাসনে আরোহণ করেন-১৭৫৬ সালে (২৩ বছর বয়সে)
৫. দেশ রক্ষার স্বার্থে মিরজাফর, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ ও উমিচাঁদকে পবিত্র কোর’আন এবং তুলসী গঙ্গাজল ছুঁইয়ে শপথ করান।
৬. কলকাতা অভিযান করে ইংরেজদের দুর্গ ধ্বংস করেন।
৭. কলকাতার নাম পরিবর্তন করে রাখেন আলিনগর।
৮. তিনি ছিলেন দেশ প্রেমিক এবং বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।
৯. তার স্ত্রীর নাম বেগম লুৎফুন্নেছা।
১০. মোহাম্মদী বেগের হাতে তিনি নিহত হন।
আমিনা বেগম
১. নবাব আলিবর্দি খাঁর কনিষ্ঠ কন্যা।
২. সিরাজউদ্দৌলার মাতা।
৩. তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সিরাজ, কনিষ্ঠ পুত্র মির্জা মাহদি।
ঘসেটি বেগম
১. নবাব আলিবর্দি খাঁর প্রথম কন্যা।
২. সিরাজউদ্দৌলার খালা এবং শওকতজঙ্গের পালক মাতা।
৩. সিরাজকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তবে তিনি সিরাজের নজরবন্দী ছিলেন।
৪. আমির অমাত্য সেনাপতিদের সমর্থন আদায়ে টাকা খরচ করেন এবং রাজা রাজবল্লাভের সহায়তা নেন।
৫. তিনি ছিলেন উদ্ধত, ঈর্ষাপরায়ণ, চক্রান্তকারী।
৬. তার উক্তি, “তুমি কম সাপিনী নও।” (আমিনা বেগমকে এ কথা বলেন)
মীর্জাফর
১. প্রকৃত নাম মির জাফর আলি খান।
২. তিনি ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান সেনাপতি।
৩. পারস্য থেকে হিন্দুস্তান এসেছিলেন।
৪. একদিনের জন্য হলেও মসনদে বসার স্বপ্ন দেখেছেন।
৫. তিনি ছিলেন বিশ্বাসঘাতক।
রবার্ট ক্লাইভ
১. সে ছিল অত্যান্ত তথ্য মিথ্যাবাদী এবং কৌশলেী। ষড়যন্ত্র সে খুবই পারদর্শী ছিল
২. নবাবের সমস্ত লোভী স্বার্থপর বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের নিজের দলে ভিড়িয়ে নেন
৩. তার নেতৃত্বেই পলাশীর প্রান্তরে নবাবের সৈন্যদের চরম পরাজয় হয়
৪. মির্জাফরকে নামমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে সেই সমস্ত ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ।
সিরাজউদ্দৌলা নাটকের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর
১. সিরাজউদ্দৌলা নাটকের লেখক কে?
উত্তর: সিকান্দার আবু জাফর।
২. তিনি কত সালে জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: ১৯১৮ সালে।
৩. তিনি কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
উত্তর: সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে।
৪. তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার নাম কী?
উত্তর: মাসিক সমকাল।
৫. তিনি কত সালে মৃত্যুবরণ করেন?
উত্তর: ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায়।
৬. সিরাজউদ্দৌলা নাটকে মোট কয়টি অঙ্ক?
উত্তর: ৪টি।
৭. সিরাজউদ্দৌলা নাটকে মোট কয়টি দৃশ্য?
উত্তর: ১২টি।
৮. এ নাটকের মোট কয়টি চরিত্র?
উত্তর: ৪০টি।
৯. সিরাজউদ্দৌলা কোন ধরনের নাটক?
উত্তর: ঐতিহাসিক নাটক।
১০. রস বিচারে নাটকটি কোন রসের?
উত্তর: ট্র্যাজেডিধর্মী।
১১. প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যে কোন দুর্গের বর্ণনা আছে?
উত্তর: ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ।
১২. এ নাটকে ‘কোম্পানি’ শব্দটি দিয়ে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে।
১৩. ‘যুদ্ধে জয়লাভ অথবা মৃত্যুবরণ, এই আমাদের প্রতিজ্ঞা।’ উক্তিটি কার?
উত্তর: ক্লেটনের।
১৪. ‘চুপ বেইমান। কাপুরুষ বাঙ্গালির কাছে যুদ্ধ বন্ধ হবে না।’ উক্তিটি ক্লেটন কাকে বলেন?
উত্তর: ওয়ালি খানকে।
১৫. ‘ইংল্যান্ডের বীর সন্তান’ বলে নিজের পরিচয় দেন কে?
উত্তর: ক্লেটন।
১৬. নবাবের গোলন্দাজ বাহিনী কোন খাল পেরিয়ে ইংরেজ দুর্গের দিকে আসছে?
উত্তর: শিয়ালদহের মারাঠা খাল।
১৭. ‘ব্রিটিশ সিংহ ভয়ে লেজ গুটিয়ে নিলেন, এ বড় লজ্জার কথা।’ উক্তিটি কার?
উত্তর: উমিচাঁদের।
১৮. যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দেবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছিল কে?
উত্তর: ক্যাপ্টেন ক্লেটন।
১৯. হলওয়েল কে?
উত্তর: গাইস হাসপাতালে হাতুড়ে সার্জন।
২০. উমিচাঁদ কাকে কমান্ডার ইন চিফ বলেন?
উত্তর: হলওয়েলকে।
২১. ইংরেজরা আত্মহত্যার নামে কোথায় গোপন অস্ত্র আমদানি করছিল?
উত্তর: কাশিমবাজারে।
২২. নবাবের নিষেধ অমান্য করে হলওয়েল কাকে আশ্রয় দিয়েছিল?
উত্তর: কৃষ্ণবল্লভকে।
২৩. ফোর্ট উইলিয়ামে আক্রমণ বন্ধ করতে উমিচাঁদ কার নিকট চিঠি পাঠায়?
উত্তর: রাজা মানিকচাঁদের নিকট।
২৪. সিরাজউদ্দৌলার তাড়া খেয়ে ইংরেজরা কোথায় আস্তানা গেড়েছে?
উত্তর: ভাগীরথী নদীতে ফোর্ট উইলিয়াম জাহাজে।
২৫. কোথায় ফিরে নবাব ইংরেজদের মুক্তি দেন?
উত্তর: মুর্শিদাবাদে।
২৬. ‘তোমরা কোম্পানির সত্তর টাকা বেতনের কর্মচারী।’ উক্তিটি কার?
উত্তর: ড্রেকের।
২৭. ‘Patience is the key-word, young men.’ উচ্চকণ্ঠে উক্তিটি করেন কে?
উত্তর: ড্রেক।
২৮. ভাগীরথী নদীতে ইংরেজদের ভাসমান জাহাজ থেকে কলকাতার দূরত্ব কত?
উত্তর: চল্লিশ মাইলের মধ্যে।
২৯. ইংরেজদের ভাসমান জাহাজে কোন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়?
উত্তর: ম্যালেরিয়া ও আমাশয়।
৩০. ‘আমি চিরকালই ইংরেজের বন্ধু। মৃত্যু পর্যন্ত এই বন্ধুত্ব আমি বজায় রাখব।’ উক্তিটি কার?
উত্তর: উমিচাঁদের।
৩১. কোম্পানির প্রতিনিধির কাছে লবণ বিক্রি করেনি বলে কারা জনৈক প্রজার বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়?
উত্তর: কোম্পানির ষণ্ডারা।
৩২. লবণের ইজারাদার কে?
উত্তর: কুঠিয়াল ইংরেজ।
৩৩. ইংরেজরা কাকে ঘুষ দিয়ে চন্দননগর ধ্বংস করেছে?
উত্তর: বেইমান নন্দকুমারকে।
৩৪. দশ লাখ টাকা খেসারত দিয়ে নবাবের কাছ থেকে মুক্তি লাভ করেন কে?
উত্তর: মানিকচাঁদ।
৩৫. ‘আমাদের কারও অদৃষ্ট মেঘমুক্ত থাকবে না শেঠজি।’ সংলাপটি কার?
উত্তর: মিরজাফরের।
৩৬. মিরনের বাসগৃহে ছদ্মবেশে প্রথম প্রবেশ করে কে?
উত্তর: রায়দুর্লভ।
৩৭. ‘চারদিকে শুধু অবিশ্বাস আর ষড়যন্ত্র।’ উক্তিটি রায়দুর্লভ কাকে উদ্দেশ্য করে বলেন?
উত্তর: মিরনকে।
৩৮. ইংরেজদের মধ্যে কারা রমণীয় ছদ্মবেশে মিরনের বাসগৃহে প্রবেশ করেন?
উত্তর: ওয়াটস ও ক্লাইভ।
৩৯. দলিলে সর্বশেষ স্বাক্ষর করেন কে?
উত্তর: মিরজাফর।
৪০. শওকত জঙ্গের পিতার নাম কী?
উত্তর: সৈয়দ আহমদ।
৪১. শওকত জঙ্গের মাতার নাম কী?
উত্তর: শাহ বেগম।
৪২. মিরজাফরের বিশ্বস্ত গুপ্তচর কে?
উত্তর: উমর বেগ জমাদার।
৪৩. বদ্রি আলি খাঁর শ্বশুর কে?
উত্তর: মিরমর্দান।
৪৪. এ নাটকে কোন পাখির ডাকের ঘটনার উল্লেখ আছে?
উত্তর: অমঙ্গলসূচক পেঁচার।
৪৫. মোহনলালের অনুচরদের কাছে ক্লাইভ কর্তৃক মিরজাফরকে লেখা কয়টি চিঠি ধরা পড়েছে?
উত্তর: ৩টি।
৪৬. নবাবের রাজধানী কোথায় ছিল?
উত্তর: মুর্শিদাবাদে।
৪৭. কোন সৈনিক ফ্রান্সের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল?
উত্তর: সাঁফ্রে (ফরাসি সেনাপতি)।
৪৮. কাদেরকে ‘Standing like pillars’ বলা হয়েছে?
উত্তর: মিরজাফর, রাজবল্লভ এবং রায়দুর্লভকে।
৪৯. ‘আপনার বিরাট সেনাবাহিনী চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে Standing like pillars।’ উক্তিটি কার?
উত্তর: সাঁফ্রের।
৫০. রাইসুল জুহালাকে বুটের লাথি মারে কে?
উত্তর: রাজা রামকান্ত রায়।
৫১. নাটোরের মহারানি ভবানীর স্বামীর নাম কী?
উত্তর: রাজা রামকান্ত রায়।
৫২. ‘রাজবল্লভ’ কোন গোত্রের ছিল?
উত্তর: ব্রাহ্মণ।
৫৩. ‘রায়দুর্লভ’ কোন গোত্রের ছিল?
উত্তর: কায়স্থ।
৫৪. ‘মহাতার শেঠ’ কোন ধর্মের অনুসারী ছিল?
উত্তর: জৈন।
৫৫. ‘উমিচাঁদ’ কোন ধর্মের অনুসারী ছিল?
উত্তর: শিখ।
৫৬. খ্রিস্টান ওয়াটস কোন জাতের ছিল?
উত্তর: ফিরিঙ্গি।
৫৭. পলাশীর যুদ্ধে নবাবের কত সৈন্য ছিল?
উত্তর: ৫০ হাজারের বেশি।
৫৮. পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পক্ষে কামান কতটি ছিল?
উত্তর: ৫০টির বেশি।
৫৯. পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের কামান ছিল কয়টি?
উত্তর: গোটা দশেক।
৬০. যুদ্ধে নবাব পরাজিত হলে উমিচাঁদকে কত টাকা দেওয়ার কথা ছিল?
উত্তর: ২০ লক্ষ টাকা।
৬১. মিরজাফরকে সহায়তার জন্য ক্লাইভ বার্ষিক কত টাকা পায়?
উত্তর: ৪ লক্ষ টাকা।
৬২. পলাতক নবাব সিরাজ মিরকাশিমের সৈন্যদের হাতে বন্দী হন কোথায়?
উত্তর: ভগবানগোলায়।
৬৩. নবাবকে হত্যা করে কে?
উত্তর: মোহাম্মদী বেগ।
৬৪. নবাবের মুখের শেষ বাক্যটি কী ছিল?
উত্তর: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।
আরো পড়ুন
- আমার পথ প্রবন্ধ প্রশ্ন উত্তর
- কাজী নজরুল ইসলাম – সম্পূর্ণ জীবনী
- বিভীষণের প্রতি মেঘনাদ কবিতার ব্যাখ্যা ও মূলভাব বিশ্লেষণ
- সোনার তরী কবিতার মূলভাব, ব্যাখ্যা এবং জ্ঞানমূলক প্রশ্ন উত্তর
- বিড়াল প্রবন্ধ’র মূলভাব, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- রেইনকোট গল্প’র মূলভাব ও Best 50 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
- অপরিচিতা গল্প‘র, Best 40 টি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর ও মূলভাব
- HSC বাংলা ১ম পত্র Best সাজেশন 2026, গুরুত্বপূর্ণ সব অধ্যায়
- Hsc বাংলা ২য় পত্র best সাজেশন ২০২৬
- মাসি পিসি গল্প’র সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর,HSC+Admisson Best1
- চাষার দুঃখ প্রবন্ধ: মূলভাব ও Best 50 সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন উত্তর HSC
- লালসালু উপন্যাসের মূলভাব
- নেকলেস গল্পের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন-উত্তর, মূলভাব, চরিত্র বিশ্লেষণ
- বিলাসী গল্পের মূলভাব, চরিত্র বিশ্লেষণ এবং খুটিনাটি আলোচনা
- বিদ্রোহী কবিতার মূলভাব, বিষয়বস্তু ও কবিতার লাইন ব্যাখ্যা






