কবর নাটকের বিষয়বস্তু, ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও চরিত্র বিশ্লেষণ

কবর নাটকটির রচয়িতা বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যকার মুনীর চৌধুরী(১৯২৫-১৯৭১)। তার পুরো নাম আবু নয়ীম মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। তিনি একাধারে নাট্যকার, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক, ভাষাবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী প্রভৃতি। কবর নাটকটি মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছিলেন। কবর নাটকটি বাংলা সাহিত্যের নাট্যজগতের অন্যতম কালজয়ী রচনা। তাঁর আর একটি অন্যতম বিখ্যাত নাটক রক্তাক্ত প্রান্তর, যেটা পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছিলেন। এছাড়া তার অন্যান্য নাটকের মধ্যে রয়েছে চিঠি, আপনি কে?, মুখরা রমণী বশীকরণ ইত্যাদি।  এই নিবন্ধে কবর নাটকের বিষয়বস্তু, ভাষা আন্দোলনের পটভূমি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করা হলো।

কবর নাটক

কবর নাটকের বিষয়বস্তু

কবর নাটকটি বাংলা নাটক সাহিত্যে একটি অনবদ্য সৃষ্টি। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত কবর নাটকই প্রথম প্রতিবাদী রচনা। এই নাটকটির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনের সময়কার প্রতিবাদ ও মানুষের ভেতরকার অমানবিকতার ভয়ার্ত চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।

কবর নাটকটি মূলত মুনীর চৌধুরী জেলে বসে লিখেছিলেন। তিনি জেলে গিয়েছিলেন মূলত ভাষা-আন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালনের জন্য। তাকে রাজবন্দী হিসেবে জেলে পাঠানো হয়েছিল। এটা ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনা। সেই সময় রনেশদাশ গুপ্ত মুনীর চৌধুরীকে একটি অনুরোধ করে চিঠি পাঠিয়েছিলেন।  রনেশ দাশ গুপ্তও রাজবন্দী হিসেবে জেলে ছিলেন। তিনি মূলত মুনীর চৌধুরীকে প্রথম শহীদ দিবস উদযাপন উপলক্ষে একটি চিঠি লেখার অনুরোধ করেন। নাটকটি জেলেই মঞ্চস্থ হবে এ কথা ভেবে চিন্তেই নাটকটি রচনা করেন বিশিষ্ট নাট্যকার মুনীর চৌধুরী। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে সর্বপ্রথম নাটকটি জেলখানাতেই মঞ্চস্থ হয় প্রথম শহীদ দিবস উদযাপন উপলক্ষে।

মুনীর চৌধুরী জর্জ বার্নাড শ’র ব্যঙ্গাত্মক জীবন-জিজ্ঞাসা দ্বারা অনেকাংশে প্রভাবিত ছিলেন।  কবর নাটকটির মধ্যে সেই প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়। মুনীর চৌধুরী এই নাটকে ভাষা-আন্দোলনে আন্দোলনকারী শহীদের গুম হওয়ার প্রতিবাদ ব্যঙ্গাত্মকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভাষা আন্দোলন শত শত মানুষ শহীদ হলেও সবার পরিচয় মেলেনি, শত শত লাশ গুম করা হয়েছিল, এহেন ঘৃণ্য অমানবিকতার প্রেক্ষিতে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ এই নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে।

নাটকটির পুরো ঘটনার কেন্দ্রস্থল হলো একটি কবরস্থান। ভাষা আন্দোলনে শত শত লাশ গুম করার প্রক্রিয়াটা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কবরস্থানে একজন মদ্যপ, দুশ্চরিত্র, অসৎ নেতা তার লোকজন নিয়ে এসেছিলেন। তার এই কাজে সাহায্য করার জন্য আসে হাফিজ নামক এক ইন্সপেক্টর। আর কবরস্থানে থাকা এক প্রতিবাদী চরিত্র মুর্দাফকির। আর কয়েকটি লাশের এবসার্ড কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে দিয়ে নাটকটি এগিয়ে যায়।

এই নাটকে নেতা চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠে দমননীতি। তিনি ক্ষমতার লোভে অসৎ, নিকৃষ্ট কাজ করতে পিছপা হন না। তিনি ভাষা আন্দোলনের মতো এত বড় ব্যাপারকে সামান্য গন্ডগোল বলে অভিহিত করেন। ভাষা আন্দোলনে শহীদদের তিনি অবাধ্য দুষ্টু ছেলে বলে অভিহিত করে এবং তাদের শাস্তিস্বরূপ গুলিবর্ষণকে স্বাভাবিক ঘটনা করে মনে করেন। নেতা চরিত্রটির মাধ্যমে সমাজের সকল দুশ্চরিত্র, অসাধু, হঠকারী নেতাদের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে। যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমাজের সাধারন মানুষদের দলিত মথিত করে। এই নাটকে নেতা চরিত্রটি পাকিস্থানি হানাদার বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করে। যারা প্রতিনিয়ত এদেশের মানুষকে দলিত মথিত করে গেছে। নেতার এমন দমননীতির কথা নাটকে এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-

“পু্ঁতে ফেল। দশ-পনেরো -বিশ-পঁচিশ হাত যত নিচে পারো। একেবারে পাতাল পর্যন্ত খুঁড়তে বলে দাও। পাথর দিয়ে, মাটি দিয়ে ভরাট করে গেঁথে ফেল। কোনদিন যেন আর উপরে উঠতে না পারে। কেউ যেন টেনে উপরে তুলতে না পারে, যেন চেচাতে ভুলে যায়।” (কবর; মুনীর চৌধুরী)

এভাবে লাশগুলোকে গুম করার মধ্য দিয়ে নেতা চরিত্রের দমননীতি, দুশ্চরিত্রতা, অসততা, অমানবিকতা, পাশবিকতা ফুটে উঠে। নেতা চরিত্রটি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করে যে ক্ষমতার লোভে সকল প্রকার অপকর্ম নির্ধিধায় করে য়ায়।

ইন্সপেক্টর হাফিজ চরিত্র একজন মেরুন্ডহীন,চাটুকার পুলিশ হিসেবে দেখানো হয়েছে৷ যাকে নাটকের পুরো সময় জুড়ে একটু প্রমোশনের জন্য নেতার অপকর্মকে সায় দেওয়া এবং নেতার পা চাটা তাকে তোষামোদ করতেই দেখা যায়। নিজের সুবিধার জন্য, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য তার সকল আদর্শ সততা বিসর্জন দিতে দেখা যায়। হাফিজ সরকারের একনিষ্ঠ ভক্ত কর্মচারী কারন শুধু নিজ স্বার্থ হাসিল। তাই সরকারের সকল অপকর্মকে বিনা বাক্যে মেনে নিয়ে নিরীহ মানুষদের উপর গুলিবর্ষণকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়া, নেতাকে লাশ গুম করতে সাহায্য করা এবং কর্মক্ষেত্রে সুবিধা ভোগের জন্য হঠকারিতায় দারুণ পারদর্শীরূপে দেখা যায়। নাটকে তার আত্মকেন্দ্রিকতা ও হঠাকরিতার বহিঃপ্রকাশ এভাবে ঘটেছে-

“আমাদের ত কোনো রাজনীতি নেই স্যার। সরকারই মা বাপ। যখন যে দল হুকমত চালায় তার হুকুমই তামিল করি।”  (কবর;মুনীর চৌধুরী)

এই নাটকে প্রতিবাদী ও সর্বহারা চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে মূর্দা ফকির। রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে অসুস্থ এই সমাজে এই সর্বহারা মানুষগুলোই প্রতিবাদী হয়ে উঠে। নাটকটিকে এক অনন্যমাত্রায় সংযোজন করেছে মুর্দাফকির। সে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষে ছেলে মেয়ে মা বোন সব আপন মানুষদের মারা যেতে দেখেছে চোখের সামনে। তারপর থেকেই গ্রামের স্কুলের মাস্টার থেকে হয়ে যায় মুর্দা ফকির। সে সবসময় কবরস্থানেই থাকে। এই অসম রাষ্ট্রব্যবস্থাই দায়ী এসবের জন্য। মুর্দা ফকির অসম রাষ্ট্রকাঠামোর এই নির্দয়তা নিষ্ঠুরতার করাল গ্রাসে আবদ্ধ।

এই নাটকে হঠাৎ করে “ঝুটা” বলার মধ্য দিয়ে মূর্দাফকিরের আগমন ঘটে। আগমনের পর থেকেই তার মুখে অসংলগ্ন অথচ নিদারুণ গভীর ও প্রতিবাদী প্রতিটা কথা বলে অসৎ নেতা ও চাটুকার হাফিজকে ঘাবড়ে দেয়। মুর্দাফকির বলে

“মাটির নিচের লাশগুলোর মধ্যে জীবন আছে, তারা বেঁচে আছে, লাশ হলো নেতা ও হাফিজ।” (কবর; মুনীর চৌধুরী)

আপাতদৃষ্টিতে কথাগুলো অসংলগ্ন হলেও নাটকের সারকথা এটাই। হঠাকারী হাফিজ বা অসৎ নেতা তাদের ঠিকই ক্ষমতার পতন হবে তারা মাটির নিচে যাবে কিন্তু শহীদরা আজীবন মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

কবর নাটকটি শুধু একটি নাটক নয়, এটি অন্ধকারের ঘোর অমানিশার মধ্যে স্বাধীনতার আলোকবার্তা, এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। নাট্যকার প্রতীকের মাধ্যমে নাটকটিকে দাড় করিয়েছেন, যেখানে কবর কেবল কবর নয় অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত মানুষের জেগে উঠার বার্তা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অদম্য জাগরনের আহ্বান। নাটকের চরিত্ররা মৃত্যুর পরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, সমাজের নিষ্ঠুরতা ও রূঢ় বাস্তবতাকক তোয়াক্কা না করে সত্যের পক্ষে আওয়াজ তোলে। সমাজে অসৎ, চাটুকার, ক্ষমতালোভী নেতা ও হাফিজের মতো মানুষ যেমন আছে তেমনি প্রতিবাদ করতে পারার মতো মূর্দাফকির ও মৃত লাশের মতো ব্যক্তিরাও আছে। যারা মৃত্যুকেও তোয়াক্কা করে না সত্যের পক্ষে কথা বলতে। এই নাটক প্রতিটি বাঙালি জাতির মধ্যে প্রতিবাদী সত্ত্বা জাগিয়ে তোলে, অন্ধকারেও আলো দেখায়।

 

FAQ

২. কবর নাটকটি কত সালে রচিত হয়?
উত্তর: কবর নাটকটি ১৯৫৩ সালে রচিত হয়।

৩. কবর নাটকের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: কবর নাটকের মূল বিষয়বস্তু হলো ভাষা আন্দোলনের চেতনা, স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।

৪. কবর নাটকের নামকরণের সার্থকতা কী?
উত্তর: নাটকটিতে কবরকে কেন্দ্র করে শাসকের দমন-পীড়ন, ভয় ও প্রতিবাদের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে বলে নামকরণটি সার্থক।

৫. কবর নাটকের প্রধান চরিত্র কারা?
উত্তর: কবর নাটকের উল্লেখযোগ্য চরিত্র হলো মুর্দা ফকির, মুনশি, পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং মেয়র।

 

আরো পড়ুন

Oliur Rahman Sohag
Oliur Rahman Sohag

Md Oliur Rahman Sohag বাংলা সাহিত্য, বাংলা ব্যাকরণ, কবি-সাহিত্যিক জীবনী এবং শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লেখালেখি করেন। তিনি Study Journal X-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কনটেন্ট লেখক।

Articles: 120